10/15/2026
# #লাইভ স্ট্রিম
লেখক: মিনহাজ মিজু
প্রথম পর্ব: অ্যালগরিদমের ছায়া
কুয়াশায় ঢাকা নভেম্বর মাসের এক ভোরে ঢাকার দক্ষিণ খানের একটা ছোট দুই রুমের টিনের চাল দেওয়া ঘরের কোণে বসে ছিল সিরাজ। ঘরের বাতাসে স্যাঁতসেঁতে একটা গন্ধ, আর টেবিলে রাখা সস্তা ব্র্যান্ডের একটা পুরনো ল্যাপটপের মনিটর থেকে নীলচে আলো এসে পড়ছে সিরাজের শুকনো, খসখসে মুখে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে একটা ফেসবুক পেজের ড্যাশবোর্ড খোলা। সেখানে লাল-সবুজ রঙের নানারকম গ্রাফ আর সংখ্যার খেলা।
‘টোটাল রিচ: ২.৪ মিলিয়ন। এস্টিমেটেড আর্নিংস: ৮৪০ ডলার।’
সিরাজ চোখের পাতা বন্ধ করল। তার মাথার ভেতর একটা অদ্ভুত যন্ত্রণা হচ্ছে। এই ৮৪০ ডলার—বাংলা টাকায় প্রায় এক লাখ টাকা—তাদের পরিবারের কাছে এখন জীবন-মরণের মতো মূল্যবান। অথচ এই টাকাটা অর্জনের জন্য যে মূল্য চুকাতে হয়েছে, তা কোনো টাকা দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। সিরাজ স্ক্রিনের দিকে তাকাতে পারে না। কারণ, পেজের প্রোফাইল পিকচারে যে হাসিমুখের ছেলেটির ছবি জ্বলজ্বল করছে, সে আর এই পৃথিবীতে নেই।
সে মিরাজ সাদিক। সিরাজের বড় ভাই।
মাত্র ছয় মাস আগের কথা। মিরাজ ছিল দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের মাধ্যমে স্টুডент ভিসায় মালয়েশিয়া যাওয়া এক স্বপ্নবাজ তরুণ। কুয়ালালামপুরের এক নোংরা, ঘিঞ্জি সাবলেট রুমে চারজন সহপাঠীর সাথে থাকত সে। দিনে ইউনিভার্সিটি, রাতে একটা ফাস্টফুডের দোকানে খণ্ডকালীন কাজ—এই ছিল মিরাজের জীবন। কিন্তু এসবের পাশাপাশি মিরাজের একটা ঘোর লাগা শখ ছিল—ভিডিও বানানো।
ফেসবুকে ‘মিরাজ সাদিক ভ্লগস’ নামে একটা পেজ খুলেছিল সে। জীবনের ছোট ছোট মুহূর্ত, মালয়েশিয়ার সস্তা রেস্তোরাঁর খাবার, কিংবা রাতে কাজ শেষ করে খালি রাস্তায় হেঁটে ঘরে ফেরার করুণ গল্পগুলো সে ক্যামেরার সামনে বলত। তার কথা বলার মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল এক ধরণের সহজ-সরল আঞ্চলিক টান আর গভীর আবেগ। কিন্তু ইন্টারনেটের দুনিয়া বড় নির্মম। সরলতাকে সেখানে সহজে কেউ পাত্তা দেয় না।
মিরাজের ভিডিওতে ভিউ হতো সর্বোচ্চ ২০০ বা ৩০০। লাইক আসত ২০-২৫টা, যার অর্ধেকের বেশি দিত সিরাজ, তাদের মা, আর পাড়ার দু-একজন বন্ধু। মিরাজ মাঝেমধ্যেই দেশ থেকে সিরাজকে ফোন করে হতাশ হয়ে বলত, “বুঝলি সিরাজ, ভালো জিনিস কেউ দেখতে চায় না রে। মানুষ চায় ড্রামা, মানুষ চায় ঝগড়া, না হয় চটকদার কোনো আলোড়ন। আমার কষ্টের কথা কেউ শোনে না।”
সিরাজ তখন ভাইকে সান্ত্বনা দিত, “তুই কষ্ট করে যা ভাই। একদিন ঠিকই তোর ভিডিও মানুষ পছন্দ করবে।”
কিন্তু ভাগ্য মিরাজকে সেই সময়টুকু দেয়নি।
মিরাজের জন্মগতভাবেই হার্টে সামান্য জটিলতা ছিল। কিন্তু পড়াশোনা আর কাজের চাপে সে নিজের শরীরের দিকে তাকানোর সময় পায়নি। উপরন্তু, মালয়েশিয়ায় গিয়ে খাওয়া-দাওয়ার অনিয়ম আর ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম দুঃশ্চিন্তা তার শরীরকে ভেতরে ভেতরে ক্ষয় করে ফেলছিল।
ঘটনার দিন মিরাজ একটা ছোট ভিডিও শ্যুট করছিল। কুয়ালালামপুরের এক বৃষ্টির রাতে ফুটপাতের এক কোনায় সস্তা নুডলস খেতে খেতে সে বলছিল, “আজকে কাজ শেষে পা দুটো আর চলছে না। মা ফোন করেছিল, দেশে আব্বার ওষুধের টাকা লাগবে। পেজটা থেকে যদি কিছু টাকা আসত, খুব উপকার হতো...”
ভিডিওটি সে সে রাতে শেষ করতে পারেনি। রেকর্ড করার মাঝামাঝি সময়েই হঠাৎ তার হাত থেকে ফোনটা পড়ে যায়। ক্যামেরার লেন্স ঘুরে যায় ঘরের সিলিংয়ের দিকে। ব্যাকগ্রাউন্ডে শুধু শোনা যায় মিরাজের ভারী, কষ্টকর নিঃশ্বাসের শব্দ আর তারপর এক অদ্ভুত নীরবতা।
সেই রাতেই সাবলেটের রুমমেটরা মিরাজকে হাসপাতালে নিয়ে যায়, কিন্তু তার আগেই সব শেষ। ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক।
মৃত্যুর সংবাদটা যখন বাংলাদেশে তাদের ছোট ঘরে পৌঁছাল, তখন পুরো পৃথিবীটা যেন থমকে গিয়েছিল। সিরাজের মা মূর্ছা গেলেন, আর বাবা পক্ষাঘাতগ্রস্ত শরীর নিয়ে শুধু একদৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন দেয়ালের দিকে। কিন্তু এর চেয়েও বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছিল পেছনে। মিরাজকে দেশে ফিরিয়ে আনার মতো বা মালয়েশিয়ায় তার বডি ক্লিয়ারেন্স ও সৎকার করার মতো কোনো অর্থ তাদের ছিল না।
ঠিক সেই অসহায় মুহূর্তে, মিরাজের রুমমেট সেই অসম্পূর্ণ ভিডিওটা—যেখানে মিরাজ নিজের কষ্টের কথা বলছিল এবং শেষ মুহূর্তে ফোন হাত থেকে পড়ে যাওয়ার আগের অংশটুকু—মিরাজের পেজ থেকে আপলোড করে দেয়। সাথে একটি ছোট ক্যাপশন: “আমাদের বন্ধু মিরাজ আর নেই। তার পরিবারকে সাহায্য করুন।”
আর ঠিক তখনই ঘটে গেল সেই অলৌকিক, অথচ নিষ্ঠুর ঘটনাটি।
অ্যালগরিদম—যা এতদিন মিরাজের ঘাম আর স্বপ্নের ভিডিওগুলোকে একপাশে ঠেলে রেখেছিল—তা হঠাৎ জেগে উঠল। মিরাজের ট্র্যাজিক মৃত্যুর ভিডিওটা ইন্টারনেটে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। এক ঘণ্টার মধ্যে ১০ হাজার শেয়ার, চার ঘণ্টার মধ্যে এক মিলিয়ন ভিউ!
পোস্টের নিচে হাজার হাজার মন্তব্য:
“আহা! ছেলেটার চোখ দুটো কত নিষ্পাপ ছিল!”
“ইশ্বর তার আত্মাকে শান্তি দিন, আমরা কেমন নির্দয় সমাজ!”
“ভাইয়ের পরিবারের বিকাশ নম্বর দিন, আমরা সাহায্য করতে চাই।”
যে মিরাজ জীবদ্দশায় ২০০ ভিউয়ের জন্য আকুতি জানাত, মৃত্যুর পর সে রাতারাতি বাংলাদেশের অন্যতম আলোচনার বিষয়ে পরিণত হলো। মিডিয়া তাকে নিয়ে খবর ছাপাল—‘মালয়েশিয়ায় ঝরে গেল এক উদীয়মান ব্লগারের প্রাণ’। ফেসবুকের হাজার হাজার মানুষ, যারা কোনোদিন মিরাজকে চিনত না, তারা তার পুরনো সব ভিডিও বের করে করে দেখতে লাগল। কান্নাভেজা ইমোজি, করুণ ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দিয়ে মিরাজের ক্লিপস বানিয়ে টিকটক আর রিলসে রি-আপলোড করতে লাগল পেজগুলো।
সপ্তাহখানেকের মধ্যে পেজে হু-হু করে ফলোয়ার বাড়তে লাগল। দেড় লাখ, তিন লাখ, পাঁচ লাখ!
সেই ভাইরাল হওয়া ও মানুষের সহানুভূতি থেকে আসা টাকায় মিরাজের মরদেহ দেশে এলো, তার সৎকারের ব্যবস্থা হলো, এমনকি তার বাবার চিকিৎসাও শুরু হলো।
মিরাজের মৃত্যুর তিন মাস পর, একদিন সিরাজ পেজটির ইনবক্স খুলল। হাজার হাজার মেসেজ। সবাই জানতে চায় মিরাজের পরিবারের খবর। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, ফেসবুকের তরফ থেকে মনিটাইজেশনের প্রথম পে-আউট নোটিফিকেশন এসেছে। এক হাজার দুইশত ডলার!
পারিবারিক দেনায় ডুবে থাকা সিরাজের হাত কাঁপছিল।
সিরাজ কোনো ডিজিটাল প্রডিউসার ছিল না, সে স্রেফ এক অনার্স পড়ুয়া সাধারণ ছেলে। কিন্তু সে বুঝে গেল এক নির্মম সত্য—তার ভাই বেঁচে থেকে যা পারেনি, মরে গিয়ে তার চেয়ে অনেক বেশি দিয়ে গেছে। ইন্টারনেটের বাজারে জীবনের চেয়ে ‘মৃত্যুর ট্র্যাজেডি’ আর ‘সহানুভূতি’ অনেক বেশি দামে বিক্রি হয়।
সিরাজ সিদ্ধান্ত নিল, সে পেজটা বন্ধ করবে না। সে ভাইয়ের পুরনো আন-রিলিজড ভিডিও, ভাইয়ের রেখে যাওয়া ছবি আর স্মৃতিগুলো নতুন করে ট্র্যাজিক মিউজিক দিয়ে এডিট করে পোস্ট করা শুরু করল। ক্যাপশনে লিখত: “আজকে ভাইয়ার কথা খুব মনে পড়ছে... ভাইয়া থাকলে হয়তো এমনটা হতো না।”
আর সাথে সাথেই ভিউয়ের বন্যা ভেসে আসত। লাখ লাখ মানুষ কমেন্ট করত, “ধৈর্য ধরো ভাই”, “আমরা তোমার সাথে আছি।”
সিরাজ ধীরে ধীরে বুঝে ফেলল, মানুষ তাদের নিজেদের কষ্টের বদলে অন্যের করুণ গল্প দেখতে ভালোবাসে। এই ডিজিটাল যুগে রক্ত-মাংসের মানুষের চেয়ে স্ক্রিনের পেছনের ‘শোক’ অনেক বেশি আকর্ষক।
দক্ষিণ খানের সেই ছোট ঘর থেকে অনেক দূরে, পাবনা শহরের এক শান্ত মফস্বল এলাকায় বাস করত বিপ্লব।
বয়স বাইশ-তেইশ। বিএ পাস করে বেকার বসে থাকা এক তরুণ। বিপ্লবের দিনগুলো কাটত চায়ের দোকানে বসে মোবাইল স্ক্রল করে আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে। তার জীবনে কোনো বড় স্বপ্ন ছিল না, কোনো বিশেষ প্রতিভা ছিল না। কিন্তু তার মধ্যে একটা গভীর তৃষ্ণা ছিল—খ্যাতি আর নজরে আসার তৃষ্ণা। সে চাইত সবাই তার দিকে তাকাক, তাকে চিনুক।
বিপ্লব প্রতিদিন ফেসবুকে দেখত কীভাবে সাধারণ মানুষ রাতারাতি তারকা হয়ে যাচ্ছে। কেউ অদ্ভুত হেসে, কেউ কেঁদে, আবার কেউ স্রেফ কোনো অঘটন ঘটিয়ে লাখ লাখ ভিউ পাচ্ছে।
সেদিন চায়ের দোকানে বসে মোবাইল স্ক্রল করার সময় বিপ্লবের চোখে পড়ল মিরাজ সাদিকের পেজটি।
সে দেখল, মিরাজের ছোট ভাই সিরাজ একটা নতুন ভিডিও ছেড়েছে—‘ভাইয়ার স্মৃতিবিজড়িত ঘরটা আজ খালি’। মাত্র দুই দিনে সেই ভিডিওর ভিউ চার মিলিয়ন! নিচে মন্তব্যের বন্যা, পেজের রিচ আকাশচুম্বী।
বিপ্লব একদৃষ্টিতে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তার পাশে বসা বন্ধু রানা বলল, “দেখলি বিপ্লব? কপাল কারে বলে! ব্যাটা মরে গিয়েও পরিবাররে কোটিপতি বানিয়ে দিয়ে গেল। একেই বলে ভাইরাল হওয়া!”
বিপ্লব কোনো কথা বলল না। সে শুধু মিরাজের পেজের ভিউ, কমেন্ট আর এনগেজমেন্টের সংখ্যাগুলোর দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে রইল। তার মাথার ভেতরে এক অদ্ভুত চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগল।
সে ভাবল, মিরাজ তো সাধারণ কথা বলত, তাও কেউ দেখত না। কিন্তু সে মারা যাওয়ার পর সবাই তাকে মাথায় তুলে নিল কেন? কারণ ‘ট্র্যাজেডি’। মানুষ আনন্দ দেখতে যত না পছন্দ করে, তার চেয়ে একশো গুণ বেশি পছন্দ করে অন্যের দুঃখ, ক্ষতি আর করুণ পরিণতি দেখে আহা-উহু করতে।
সিম্প্যাথি বা সহানুভূতি হলো ইন্টারনেটের সবচেয়ে বড় কারেন্সি।
বিপ্লব চা কাপে শেষ চুমুক দিল। তার চোখ দুটো কেমন যেন চকচক করে উঠল। সে মনে মনে বলল, “মানুষের মন জয় করতে হলে সাধারণ কিছু দিয়ে হবে না। মানুষকে এমন কিছু দিতে হবে, যা তাদের বুকের ভেতরটা মুচড়ে দেয়। যা তাদের কাঁদায়।”
বাড়ি ফেরার পথে বিপ্লব তাদের যৌথ পরিবারের উঠোনে পা দিল।
উঠোনে তখন মিষ্টি রোদ। বিপ্লবের বড় ভাই কাজের উদ্দেশ্যে বাইরে গেছেন। আর বারান্দায় বসে বিপ্লবের মেজো ভাবি, সুচরিতা, সবজি কাটছেন। আর তার ঠিক পাশেই ধুলোবালিতে বসে খেলা করছে তিন বছরের একটি নিষ্পাপ বাচ্চা—অঙ্কন।
অঙ্কন হলো বিপ্লবের ছোট ভাতিজা। বড় বড় ডাগর চোখ, পতুপতু গাল, আর ঠোঁটের কোণে সবসময় এক আশ্চর্য নিষ্পাপ হাসি লেগে থাকে। অঙ্কন বিপ্লবকে দেখেই দু-হাত বাড়িয়ে দৌড়ে এলো, “চাচা! চাচা!”
বিপ্লব নিচু হয়ে অঙ্কনকে কোলে তুলে নিল। বাচ্চাটি তার নরম হাত দুটো দিয়ে বিপ্লবের গলা জড়িয়ে ধরল এবং মুখে এক গাল হাসি ফুটিয়ে তুলল।
ক্যামেরা প্রসেস করার মতো করে বিপ্লব যেন বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকাল। বিকেলের রোদে অঙ্কনের মুখের সেই নিষ্পাপ হাসিটা যেন এক অদ্ভুত আলো ছড়াচ্ছিল।
বিপ্লবের পকেটে থাকা স্মার্টফোনটা হঠাৎ মৃদু কেঁপে উঠল—একটি নোটিফিকেশন। কিন্তু বিপ্লবের দৃষ্টি তখন তার কোলের এই তিন বছরের বাচ্চার ওপর স্থির হয়ে আছে।
তার মস্তিষ্কের এক অন্ধকার কোণে একটা নতুন অ্যালগরিদম কাজ করা শুরু করেছে। একটা নতুন আইডিয়া, যা হয়তো শুরুতে খুব নির্দোষ, কিন্তু তার পরিণতি কী হতে যাচ্ছে—তা সে নিজেও তখন পুরোপুরি বুঝতে পারেনি।
বিপ্লব অঙ্কনের গালে চুমু খেয়ে বলল, “অঙ্কন, তুই আমার সাথে গান গাইবি?”
অঙ্কন আধো-আধো বোলে বলল, “গাইব!”
বিপ্লব পকেট থেকে ফোনটা বের করল। ক্যামেরা ফ্রন্ট মোডে অন করল। সে জানত না, এই ফ্রন্ট ক্যামেরার লেন্সটি ধীরে ধীরে তার ভেতরের মানুষটাকে গিলে খেতে শুরু করবে।
(প্রথম পর্ব সমাপ্ত)