05/08/2026
৫ আগস্ট | দ্বিতীয় বার্ষিকী
— রক্তে লেখা এক অনির্বাণ ভোরের গল্প:
কিছু দিন ইতিহাসে শুধু তারিখ হিসেবে আসে না, ইতিহাসের গতিপথ পুরোপুরি বদলে দিতে আসে। ৫ আগস্ট তেমনই একটি দিন।
আজ সেই ঐতিহাসিক ৩৬ জুলাই, আমাদের চূড়ান্ত বিজয়ের দ্বিতীয় বার্ষিকী।
আজকের এই শান্ত বিকেলে বসে যখন পেছন ফিরে তাকাই, বুকের ভেতরটা যেন আজও কেঁপে ওঠে। মনে পড়ে সেই অগ্নিগর্ভ জুলাইয়ের কথা—শহরের রাজপথ তখন আর সাধারণ কোনো রাস্তা ছিল না, তা পরিণত হয়েছিল যেন এক একটি রণাঙ্গনে। বাতাসে বারুদের গন্ধ, টিয়ারগ্যাসের ঝাঁজ, আর চারপাশের কানফাটা গর্জন।
প্রথমে দূর থেকে দেখা আন্দোলন, ঘরের কোণে ছটফট করা মন; তারপর ভয় নামক দেয়ালটাকে এক ধাক্কায় ভেঙে রাজপথে নেমে আসা। চোখের সামনে দেখা একের পর এক মিছিলে হাজারো অচেনা মুখ, যাদের চেনার দরকার হয়নি—কারণ সবার চোখে ছিল এক অদ্ভুত মুক্তির তৃষ্ণা, আর বুকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার সাহস।
রাজপথে তখন বুলেটের শব্দ ছাপিয়ে উঠেছিল তরুণের চিৎকার। আবু সাঈদের বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো, অগণিত শহীদের রক্তে ভেজা পিচঢালা পথ, রক্তের প্লাবনে যেন সৃষ্টি হয়েছিল এক 'ব্লাড-ফলস'। অথচ অমানবিক সেই নিষ্ঠুরতা আর শোষণের মুখেও মানুষ পিছু হটে নাই।
জুলাইয়ের শুরুতে যখন আমরা চার দেয়ালের ভেতর বন্দি ছিলাম, তখন এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ আমাদের আত্মাকে নাড়া দিয়েছিল— বলেছিলাম__
> “হে উন্নত রণবীর,
> তবে তুমি কেন আবদ্ধ চার দেয়ালের ঘরে বন্দী?
> তুমি তো আবু সাঈদের মতো ঢাল হবে বাঙালির...
> শুধু তুমি বেরিয়ে এসো, চার দেয়ালের অন্ধকার থেকে।
> তুমি তো সেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গ,
> যে কিনা একদিন পৃথিবীকে জ্বালিয়ে দেবে।”
সেই আহ্বানে রাজপথ জনসমুদ্রে রূপ নিয়েছিল। হাজারো নাম জুলাইয়ের ইতিহাসে অমর হয়ে গেল।
পাসপোর্ট, ডিগ্রি, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কিংবা জীবনের মায়াকে একপাশে সরিয়ে রেখে তরুণরা যখন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল, তখন রক্ত আর কান্নার ভেতর থেকে জন্ম নিয়েছিল এক চূড়ান্ত প্রতিশোধ ও প্রতিরোধের আগুন—
> “মারো, আরও মারো আমায়—
> আজ মারতে মারতে আমাকে শহীদ করে দাও...
> তবে সাবধান—ভুল করো না।
> আমার নিশ্বাসে যে আগুনটুকু আছে তাকে বাঁচিয়ে রাখার সাহস দেখিয়ো না।
> যে নিভে গিয়েও ভস্মের নিচে জ্বলতে থাকবে,
> সময় এলেই সে আবার দাউ দাউ করে জ্বলে উঠবে।”
অবশেষে এলো সেই ৫ আগস্ট।
এক দীর্ঘ, কুৎসিত দুঃস্বপ্নের পর জাতি সেদিন দেখেছিল—স্বৈরাচারের অহংকারের বরফও একদিন গলে যায়, অন্যায়ের তথাকথিত শক্তিশালী মসনদও একদিন জনস্রোতের সামনে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।
দুই বছর কেটে গেছে। আজ এই মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়ার মুহূর্তে বিজয়ের আনন্দের চেয়েও হৃদয়ে অনেক বেশি চেপে বসেছে দায়বদ্ধতার এক অদৃশ্য ভার। যে রক্তের বিনিময়ে আজ আমরা মুক্ত গলায় কথা বলতে পারছি, সেই রক্তকে আজ শুধু স্মৃতির অ্যালবামে বন্দি রাখলে চলবে না।
আজ এই বর্তমানের শান্তিতে বসে সেই শহীদের রক্ত আর অদম্য লড়াকুদের ত্যাগকে স্মরণ করি এক গভীর অঙ্গীকারে—
> “আমার তেজস্ক্রিয়তা নিভিয়ে ফেলার স্বপ্ন দেখো না—
> আমি ছাইয়ের নিচে লুকানো অগ্নিস্ফুলিঙ্গ,
> একবার জেগে উঠলে পুরো আকাশই ছাই করে দিই।”
জুলাইয়ের সকল শহীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
সকল অদম্য জুলাইযোদ্ধাদের সালাম।
জুলাইয়ের রক্তে জেগে ওঠা সেই অনিবার্য ভোর—
আমাদের স্মৃতিতে, আমাদের বিবেকে, আমাদের ভবিষ্যতে চিরকাল বেঁচে থাকুক।
— ফিরাক | Firaq