18/05/2025
{জীবনের গোপন কথা}
এই মুহূর্তে আপনি কেমন করে বলে আছেন, কেমন করে এই বইখানি পড়ছেন, কথা বলছেন, তা নির্ভর করে একটি আশ্চর্য যন্ত্রের উপরে। সেটা স্পন্দিত হলে, চোখের পলকে আপনি চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যাবেন। এই অবাক করা দুরন্ত যন্ত্রটির নাম হচ্ছে হৃদপিণ্ড। তাই এই যন্ত্রটি সম্বন্ধেই প্রথমেই কিছু আলোচনা করা দরকার।
মানবদেহের বক্ষস্থলের মাঝামাঝি মধ্যভাগে (Diaphragm)—এর উপরে হৃদপিণ্ডটি অবস্থান। দেখতে অবিকল একটি বড় পাতা মত। গোল প্রান্তে খাঁজকাটা চিন্তা উঠেছে। এই স্থানে অঙ্গানুরূপ চিহ্নিত হয়েছে। প্রত্যেকটা ভাগে আবার দুই ভাগে ভাগ। উপরের দিকে দুটি ভাগ এবং নিচের দিকে দুটি ভাগ আছে। উপরের একটি নিচে একটি ভাগ রয়েছে। উপরের ভাগের নাম ডান অলিন্দ (Right Atrium), নিচের ভাগের নাম ডান নিলয় (Right Ventricle)। অনুরূপভাবে, হৃদপিণ্ডের বাম অংশের উপরের অংশের নাম বাম অলিন্দ (Left Atrium) এবং নিচের অংশের নাম বাম নিলয় (Left Ventricle)। হৃদপিণ্ডের দুইপাশে উপরের এবং নিচে মিলে রয়েছে দুটি ভাউজারের মত ঝিলিক। এগুলো ফুসফুস বা ফাপড়ি (Lungs) বলা হয়েছে। এর নিম্নাংশে তন্ত্র থেকে অর্টিক নামক একধরণের ঝিলিক ছড়িয়ে দিয়ে মিশিয়ে হৃদপিণ্ডে পাঠিয়ে দেয়, যার উপরে আমাদের জীবন নির্ভর করে।
মানবদেহে অজস্র রক্তবাহী নালী আছে, যাদের ভিতর দিয়ে দেহে রক্ত চলাচল করে দেহের সর্বত্র রক্ত পৌঁছে থাকে। এই নালীগুলো দু’রকমেরঃ একটি নালী যাকে বলা হয় ধমনী যা দেহের অন্তরাংশে রক্ত হৃদপিণ্ড নিয়ে যায় শোষণের জন্য। অন্যটি হলো শিরা যা দেহের শোষিত রক্ত সরাসরি প্রেরিত হয়ে পড়ে।
অনুষ্ঠিত উপায়ে হৃদপিণ্ড কাজ করে চলে। হৃদপিণ্ডটা একটা গোটানো পিশি। দেহের শিরাগুলো থেকে রক্ত আসতে থাকে, রক্ত যখন উঠতে থাকে তখন অন্তরের গোটানো পিশিগুলো প্রসারিত হয়ে রক্তটা গ্রহণ করে পরে সেই রক্তকে সে সংকুচিত করে ডান নিলয়ে ঠেলে দেয়। এই ব্যবস্থাটা একটা ব্যাকাপ ঘরে। ডান অলিন্দ এবং ডান নিলয়ের মধ্যে একটা কপাটিকা রয়েছে অর্থাৎ দরজার মত। সেটা ইংরেজি ‘V’ অক্ষরের মতই কিছু নিচের দিকে খোলা। ডান অলিন্দ যখন সংকুচিত হয়ে রক্তকে ডান নিলয়ে পাঠাতে শুরু করে, রক্ত..
তখন এই কপাটিকা বা দরজাটি (Mitral Valve)
তখন এই কপাটিকা বা দরজাটি (Mitral Valve) দিয়ে অতিক্রম করে। রক্তে ডান নিলয় ভরে যায় তখন এই কপাটিকা বা দরজাটি বন্ধ হয়ে যায়। ডান নিলয় থেকে এই রক্ত একটা নালী দিয়ে সরাসরি হৃদপিণ্ডের দু’দিকের দুটি ফুসফুসে ঢুকে। এটিকে ফুসফুসে ফুসফুস থেকে যে অক্সিজেন সংগ্রহ করে রেখেছে, রক্ত তা ভিতরে একাকার সঙ্গে দুইদিকের দু’টো ফুসফুসের সঙ্গে অর্টিক নামক ঝিলিক রক্তকে শরীরের উপরের ও নিচের অংশে পাঠিয়ে দেয়, তার উপরে আমাদের জীবন নির্ভর করে।
বাম অলিন্দ তখন উপরের অংশের উপরেরভাগে বাম অলিন্দ প্রবেশ করে। বাম অলিন্দ সঙ্গে সঙ্গে সেই রক্ত বাম নিলয়ে প্রেরণ করে। এখানেও অলিন্দ ও নিলয়ের মধ্যে একটা দরজা আছে। হৃদপিণ্ডে দেখা যায় তা খোলে, বাম অংশেও তাই হয়। বাম অংশ থেকে রক্ত যখন বাম নিলয়ে যায়, তখন বাম নিলয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি শুরু হয়। রক্ত সংকুচিত করে তাকে সে প্রেরণিত হয় এবং পরে সংকুচিত করা হয়। সংকুচিত হবার সময় সে রক্তকে অর্টিক নামক ঝালাপালা দিয়ে এক রক্তকে এক মিনিটের ভিতরে দেহের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে— এমনকি চলন্ত গাড়ি, চোখের মনি, হাত ও পায়ের আঙুলের মাথার পথেও সংবহন করে দেয়।
{ভাববার কথা}
হৃদপিণ্ডের প্রতিটি অংশ সংকুচিত ও সম্প্রসারিত হয়ে দিয়ে রক্ত চলাচল অব্যাহত রেখেছে। প্রতি মিনিটে এই স্পন্দনের সংখ্যা প্রায় ৭০ থেকে ৮০ বার। এ রকম স্বাভাবিক স্পন্দন। সাধারণ দৈনিক হৃদপিণ্ডটা প্রায় এক লক্ষ বার স্পন্দিত হয়। অর্থাৎ সংকুচিত হয় ও সম্প্রসারিত হয়। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই চিন্তা করে, অনেক পরীক্ষানিরীক্ষা করে মহাবিজ্ঞানীরা হৃদপিণ্ডের এই রহস্যের কিছুটা ব্যাখ্যা করেছেন বটে, কিন্তু তাঁরা হৃদপিণ্ডটা কেন চলছে, কীভাবে চলছে, আর তার এই চলার শক্তি কোথা থেকে আসছে— একথার কোন জবাব বিজ্ঞানের আছে বলে তাঁরা বিশ্বাস করেন না। তাঁরা বলেন, এটা এমন একটি সৃষ্টির সৃষ্টি যা ভাববার যোগ্য বিষয়। নিরীক্ষণ করে দেখা যায়, দেহতত্ত্ববিদ মহাবিজ্ঞানীদের ছত্র হবার মত জ্ঞানও রাখে না। অথচ বিশেষ একটি বিষয়ে কিছু জেল-টেপের এক আঁটটা পাপড়া-পাপড়া করেছে। মহাবিজ্ঞানী এবং মহাজ্ঞানী আইন্সটাইনের প্রশ্ন করা হয়েছিল, সৃষ্টা বলতে কি কোন মহাশক্তি বিশ্বাস করেন? তিনি উত্তর দিলেন, নিঃসন্দেহে আছেন কিছু তার সন্ধান তোমরা কিছু অনুসন্ধান করতে পারবে না।
আরেকটি ভাববার কথা, হৃদপিণ্ডটা কেন চলে যায় এবং তার এই শক্তি কোথায় কোথা থেকে এলো। যারা শুধু বিজ্ঞানের বিজ্ঞান করে তারা যুক্তি ছাড়া কিছুই মানে না। তারা যুক্তির আঘাতে পড়েছে যুক্তিকে যুক্তিকেও মুক্তিকেও মনে করে। এটা একটি একান্তভাবেই স্বতন্ত্র এবং যা জ্ঞানের অনেক জ্ঞানের জ্ঞানের ফাঁকি দেওয়ার একপ্রকার ধরণ। বিশ্ববিখ্যাত মহাজ্ঞানী বিজ্ঞানী নিউটন নিজের প্রবন্ধে বলেছেন, সে আইন্স সারা বিশ্ব অন্ধ।
চোখ বন্ধ করে মনে নিল। তিনি বললেন, জড় পদার্থে গতি সৃষ্টি না করে দিলে সে গতি সম্পন্ন হয় না এবং হঠাৎ গতি সৃষ্টির কারণ থাকলে ততক্ষণেই ঐ জড় পদার্থ গতি সম্পন্ন থাকে। এ হচ্ছে নিউটনের দেওয়া আইন (Law of Newton)। হৃদপিণ্ড একটা মাংসপিণ্ড অর্থাৎ জড় পদার্থ। হৃদপিণ্ডটা সৃষ্টি হবার পর নিষ্প্র হয়ে পড়েছিল ইতিহাস বলে। এতে কোন স্পন্দন ছিল না, কোন সংকোচন বা সম্প্রসারণ ছিল না। তখন ঐ বাবা অলিন্দ এবং নিলয়ের নিস্তেজ অবস্থায় ছুঁড়ে বলেছিল— হঠাৎ একটি শক্তি এল যেটা ঐ জড়, নিষ্প্রাণ হৃদপিণ্ড এবং হৃদয়ের দুটি অলিন্দ, দুটি নিলয় এবং ত্রয়ীর পথকেও স্পন্দিত করে দিল, অর্থাৎ গতি সৃষ্টি করে না দিলে গতি সম্পন্ন হল— বিজ্ঞানের ভাষায় বিশুদ্ধ যুক্তিবাদী, নাস্তিকরা ঐ আইন মেনে নেয়। এ হয় হৃদপিণ্ড মানুষের জীবনের প্রতিক্ষণে গতি ও অবস্থার বাতিকে রাখছে। সর্বপ্রথম একজন যুক্তি কর্তা বলেছিলেন, যে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে হৃদপিণ্ডটা প্রথম অবস্থায় অত্যন্ত নিস্তেজ ছিল, চির নিস্পন্দন, সম্পূর্ণই, সুনির্বচন এটাকে প্রথম একটি ধাক্কা দিয়ে কে এত গতি সৃষ্টি করে দিল? বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটা আমরা জানি না, এটা আমাদের বোধগম্য হয় না। হৃদপিণ্ড কেন এত মর্মস্পর্শী ছাড়াছাড়ি করে, এক কারণ কেউ আজও খুঁজে বের করতে পারেনি।
হৃদপিণ্ডের এই স্পন্দনের একটা কারণ খুঁজে পেতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা হত্যা হয়ে মহার্ষীদের কীর্তিকার করে নিয়েছে। তারা অনুধাবন করতে পেরেছে যে, ভ্যাগাস (vagus) নার্ভ নামে একটি নালী মাথার মজ্জা থেকে নিয়ে মস্তিষ্কে এসে মিশেছে। এটা হৃদপিণ্ডে গিয়ে মিশেছে। বিজ্ঞানীরা কথায় মানে ভ্যাগাবন্ড (Vagabond) মেশিন প্রয়োগ করে হৃদপিণ্ডে এক ধরণের সংবেদন প্রেরণ (Impulse) করে, সঙ্গে সঙ্গে হৃদপিণ্ড স্পন্দন করে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বহু চেষ্টা করেও পারছে না, ঐ সংবেদন কোথা থেকে আসছে। তারা বলছে বিজ্ঞানেও এক শক্তির হাত আছে এবং ঐ শক্তিই হচ্ছে আমাদের রক্তে আসামি।
এমনি ভাবে দেহতত্ত্ববিদগণ মানব দেহ জীবন্ত করতে গিয়ে অসংখ্য স্থানে মহাশক্তির আভাসগুলো দেখে নিয়েছেন। যদি হৃদপিণ্ডে প্রাণ দিয়েছেন, যদি হৃদপিণ্ডে প্রাণ দিয়েছেন, যদি হৃদপিণ্ডে স্টার্ট দিয়েছেন, যদি ভ্যাগাস নার্ভে জীবন ধারাবাহিক প্রেরণ (Impulse) ইনপুট করে দিয়েছেন, তিনি সমস্ত সৃষ্টি সম্পর্কে জানিয়ে দিয়েছেন, ``আল্লাযি নুকুমুসামাওয়াতি ওয়াল আরদ'' (আল-কুরআন) অর্থাৎ আসমান জমিনে যা কিছু
প্রেরণা পায়, শক্তি পায়, হৃদপিণ্ড তার চলশক্তি পায়, ভ্যাগাস নার্ভ প্রভাহ পায়, জীবকোষ তার শক্তি পায়— এসবের জেনারেটর ছাড়াও আমি, আমি মহাশক্তি, মহাউৎপত্তির শক্তি। আমার মহাশক্তির মেশিন থেকে সবাই শক্তি (Energy) পায়। আমার আলো বিদ্যুতে প্রয়োজনে মত মুক্তিতে খেলে যায় অনবরত, তা থেকে ভ্যাগাস নার্ভ প্রভাব পায়। সেই তরঙ্গ প্রভাব প্রতিনিয়তই হৃদপিণ্ডকে উদ্দীপিত করে এবং তার স্পন্দন শক্তি যোগায়। এ জন্য প্রতিটি মানুষেরই আলাদা অনুবর্তন করে দেখতে বলেছে, ``আফালা তা'কিলুন'' অর্থাৎ তোমাদের বুদ্ধি নেই? তোমরা কি একবারও পাহাড়ের চেয়ে দৃঢ় স্থির হয়ে চিন্তা করো তোমাদের সামনে এক ঝড়ো খাদ্যের পোয়াবারী রাখা হল, ঐ হৃদপিণ্ডটা স্পন্দন না করিলে তুমি মরিয়া যদি না মাংসপিণ্ডটি স্পন্দন করে সে স্পন্দিত হয়ে সংবরণে রক্তকে ঠেলে দিলে, তা হলে তোমার শরীরে রক্ত চলবে না। হৃদপিণ্ড যদি স্পন্দন না করে তবে চলবে না। তোমার মস্তিষ্কে তথ্য পৌছাবে না, তোমার চোখ দেখবে না, তোমার গন্ধ অনুভব হবে না, মুখে কথা হবে না। হৃদপিণ্ড বন্ধ হলেই ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে, মানুষের জ্ঞান হারায়, বিজ্ঞান বলছে চল্লিশ সেকেন্ড, পঁচিশে হার্টআটাক হয়, পঁচিশে শ্বাস বন্ধ, এরপর পঞ্চাশে মৃত্যু, তারপর শব। কিন্তু তোমার ভিতরে মিনিটে ৭০ থেকে ৮০ বার তোমার নিজেরই গোপনজগৎ লাফাচ্ছে, তার শব্দ শুনি স্টেথোস্কোপে কানে গুনতে পাও, অথচ তুমি তো জীবনে কোনদিন এর জন্য তোমার কোন জ্ঞানী পণ্ডিতকে দেখেও এই কারণে জিজ্ঞেস করো না বা ভুলেও একদম একটু চিন্তা করে দেখো না। এ জন্য আল্লাহ বলেন, ``উলীলআলবাবি কাল আনা’আমা বালহুম আযাল'' (আল-কুরআন) অর্থাৎ নিছক চিন্তা করতে যারা যায় না, ভিতরের খবর নেই, বাইরের যত কিছু নিয়ে কহে ও চলাফেরা করে, তারা পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট।
বই:জীবন রহস্য ও দেহতত্ত্ব
লেখক: মুহাম্মদ আযহারুল ইসলাম সিদ্দিকী সাহেব (র:)