03/12/2021
মো. হাসার-উদ-দীন কবিরত্ন (৮ নভেম্বর ১৯০৭ - ৩১ ডিসেম্বর ১৯৯৭) নাটোরের সাহিত্যের অঙ্গনের এক বিশিষ্ট নাম। আজ নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি বিস্মৃতপ্রায় মানুষ। সাংবাদিক, কবি, লিপিকুশল হাসার-উদ-দীন স্কুলজীবন থেকেই কাব্যসাধনায় মনোযোগী হন। আজকের সরকারি উচ্চবিদ্যালয় তখন আঞ্জামানিয়া মিডল ইংরেজি স্কুল। তাঁর চর্চায় উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিয়েছেন এই স্কুলের প্রধানশিক্ষক পুলিন গোস্বামী, বাংলার শিক্ষক জাফর আলী খান এবং নাটোরের স্বনামধন্য কবি, মেঘদূত অনুবাদক, নীহার ও নির্ঝর কাব্যের স্রষ্টা সংস্কৃতজ্ঞ ছান্দসিক কবি ( জগদিন্দ্রনাথ তাঁকে উত্তরবঙ্গের রবীন্দ্রনাথ বলতেন) রঘুনাথ সুকুল। স্কুলে আবৃত্তি, বিতর্ক ছাড়াও ছবি আঁকা ও পোস্টার লেখাতে তিনি পারদর্শী ছিলেন। তাঁর সান্নিধ্যে নাটোরের মানুষ, শিল্প, সাহিত্য, জনজীবন ও শিক্ষা -সংস্কৃতির অনেক অজানা বিষয় জানার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। সাদাসিধা জীবনের এই মানুষ অপরিহার্য ছিলেন নাটোরের যেকোনো সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে। বক্তৃতা দিতেন চমৎকার। মুসলিম ইন্সটিটিউট, তৎকালীন জিন্নাহ স্কুল, কানাইখালি মাঠের পাশের আনসার হল, বালিকা বিদ্যালয়, রাইফেলস ক্লাব, ভিক্টোরিয়া পাবলিক লাইব্রেরি - সবখানেই তাঁকে দেখেছি। ছাত্রজীবনে তাঁর স্নেহ ও জীবন গড়ার শক্তি পেয়েছি বলে নিজেকে ধন্য মনে করি। ১৯৫৫ সালে হাসার-উদ-দীন কবিরত্ন উপাধি ও ভিক্টোরিয়া ক্লাবে কিশোর সংঘ কর্তৃক সংবর্ধনা পান। মাইকেলের ছন্দের প্রতি তাঁর প্রবল আকর্ষণ ছিল। সে আকর্ষণের কথা তিনি আমাকেও অনেকবার বলেছেন। নাটোরের কাজী আবদুল মজিদের সাথে যুগ্ম-সম্পাদনায় প্রকাশ করেন "মালতী " নামে একটি মাসিক পত্রিকা। দুটি সংখ্যার পর পত্রিকাটির অকালমৃত্যু ঘটে। নাটোর শহরের বড়গাছার 'দীন মঞ্জিল ' কবির বসবাস ও লেখালেখির মনোরম স্থান। অসংখ্য কবিতা ও প্রবন্ধ লিখলেও প্রকাশিত হয়নি সব। রচিত গ্রন্থের মধ্যে সন্ধানে (কাব্য-নাটিকা), মোড়লের বিচার, সৌভাগ্য-সোপান, শুক্তিমালা, হিজরত কাব্য, দ্বাদশী, বেণুবন, হিলাল, বিষকুম্ভ ইত্যাদির কথা মনে পড়ে।রসিক লেখক হিসেবেও তিনি সমাদৃত ছিলেন। পালপাড়ার শচীনন্দন পাল (১৮৯৬-১৯৭৯), লালবাজারের সাংবাদিক ও কবি গজেন্দ্রনাথ কর্মকার কাব্যরত্ন, সাহিত্যতীর্থ (মৃত্যু - ২১.১১.১৯৭৭) ও কান্দিভিটুয়ার অ্যাডভোকেট প্রদ্যোতকুমার লাহিড়ী ( ১২.১২. ১৯১২ - ৩.৩. ২০০৮ ) তাঁর বড় আপন ছিলেন। আমরা আমাদের গুণীজনের কথা ভুলে যাই। পঠন-পাঠনের স্পৃহা কমে গেছে আমাদের। বিভিন্ন অঞ্চল যেভাবে নিজেদের ঐতিহ্য নিয়ে চর্চায় বেগ সৃষ্টি করেছে, আমরা যেন তেমন করে এখনো জাগতে পারিনি। কর্মজীবনে যেখানেই থেকেছি তিনি নিয়মিত আমাকে চিঠি লিখে খোঁজ নিতেন। বাড়িতে এসে তাঁর সঙ্গে দেখা না করলে দারুণ কষ্ট পেতেন এবং ক্ষোভ প্রকাশ করে চিঠি দিতেন। তাঁর স্নেহের শেকল থেকে আমি কখনো মুক্তি পাইনি, চাইনি। সে বন্ধন স্বর্গীয়। পাড়ার যেকোনো হিন্দু বিয়েতে তিনি উপহার হিসেবে দিতেন গীতা। আমার প্রিয়জন ও অভিভাবক মো. হাসার-উদ-দীন কবিরত্নের স্মৃতির প্রতি প্রণাম জানাই। ( সূত্র - সমর পালের নাটোরের ইতিহাস) কবিপুত্র, আমার সহপাঠী ও উচ্চপদস্থ অবসরপ্রাপ্ত এমডি Frm Hafiz Ul Islam এর কথা মনে করে। (সংগৃহীত)