16/04/2015
বেঙ্গলী এ্যামেচার থিয়েটার পার্টির পূজার ব্যাপারে লিখিত তথ্যের একান্ত অভাব। তবুও যতদুর জানা গেছে–তাতে ধরে নেওয়া যায় মহেশ নাজিরের পূজার ২৪ বছর পর অথাৎ ১৮৮৭ সালে এই পূজাটি আরম্ভ হয়। তখন অবশ্য এ্যামেচার থিয়েটার পাৰ্টির নামে পূজো হতনা। ঐ নামে কোন পাৰ্টির সৃষ্টি ও হয় নি তখন। পূজাটা হত বৰ্ত্তমান পূজা মণ্ডপেয় জায়গাতেই। প্ৰতি বৎসরেই জঙ্গল পরিস্কার করে নিয়ে পূজো করা হত।
এই অনুমানের স্বপক্ষে দেখলাম, প্ৰথম দিকে এই সাৰ্বজনীন পূজার প্ৰতিমা এরা দু-একবার ঢাকা থেকে আনলেও প্ৰধানত নিজেরাই তৈরী করে নিতেন। এই প্ৰতিমার তৈরীর জন্যে সাৰ্বজনীন পূজা কর্ত্তৃপক্ষ মহেশ নাজিরের কাছ থেকে প্ৰতিমারর মুখের ছাঁচ নিয়ে যেতেন। এই দুটি পূজার মধ্যে যথেষ্ট সহযোগিতার কথা শোনা যায়। এর অনেক পরে ১৮৯৮ সালে পুরোপুরি একটা পাৰ্টি তৈরী হয়। যায় নাম হল তেজপুর এ্যামেচার থিয়েটার পাৰ্টি।
কিন্তু তেজপুর শহরের বাইরে এই দুর্গা পূজার প্ৰতিক্ৰিয়া কি হয়েছিল– পর্য্যালোচনা করতে গিয়ে দেখলাম মহেশ নাজিরের দুর্গা পূজার কথাটি সারাটা জেলায় ছড়িয়ে পড়তেই দুর দুর গ্ৰাম থেকে মানুষজন আসতে শুরু করল। তাঁরা এলেন পূজা দেখতে,পূজা দিতে, আর প্ৰসাদ পেতে। তাঁরা সঙ্গে আনতেন চাল-ডাল তরিতরকারী ফল-মুল, এই সব। যার যা সাধ্য। অসংখ্য পাঁঠা বলি হত। পায়রার ত কোন হিসাবই নেই। নবমির দিন হত মহিষ বলি।
মহেশ নাজিরের পূজার এই ধারা জানকি নাথ পয্যন্ত একই ভাবে চলেছিল। প্ৰিয়নাথ মুখাৰ্জ্জির সময় থেকে অর্থাৎ ১৯২৪ সাল থেকে এখানে বলি বন্ধ হয়ে যায়।
কিন্তু তেজপুরের এই আদি পূজায় সারা জেলার লোক সমাগম হলেও উৎসবটা পূজা আর প্ৰসাদ বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। অন্য কোন আমোদ প্ৰমোদের ব্যবস্থা করা হতনা। সম্ভবও ছিলনা। তখন পূজায় ছিল আনন্দ। অন্য আনন্দের বিশেষ প্ৰয়োজন তাঁরা বোধ করতেন না। জানকি নাথের সময় অবশ্য বাইনাচ, মনিপুরি মেয়েদের নাচ ইত্যাদির ব্যবস্থা করতেন। কিন্তু পূজা উপলক্ষে থিয়েটার করে আনন্দ করার পারিকল্পনাটি প্ৰথম করে ছিলেন তেজপুর এ্যামেচার থিয়েটার পাৰ্টি ১৮৯৮ সালে। এই জেলার মধ্যে পূজার সময় ষ্টেজ বেঁধে থিয়েটার করাটা এই পাৰ্টির আগে আর কোথাও হয়নি।
১৮৯৮ সালের কথা। তেজপুরের কয়েক জন বিশিষ্ট অধিবাসী ঠিক করেন, এখানে একটি সাৰ্বজনীন পূজার ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু খালি পূজা করলেই হবে না, সেটা তো হছেই, করতে হবে থিয়েটার।
ব্যস শুরু হয়ে গেল তোড়জোড়। অবিনাশ মুখাৰ্জ্জির বড় ছেলে অনুকুল মুখাৰ্জ্জির উৎসাহটাও ছিল সবার থেকেই বেশী। সঙ্গে ছিলেন নারায়ণ ব্যনাৰ্জ্জি, প্ৰফুল্ল কুমার বিশ্বাস, বসন্ত দাস, নলিনী মৈত্ৰ ইত্যাদি।
আর ছিলেন, ব্যাথরাম শর্মা, ভবানী ভট্টাচার্য্য, রাম রতন চৌধুরী, হেম গোস্বামী, রাধা নাথ ফুকন, ইত্যাদি।
সবাই মিলে ঠিক হল দুর্গাপূজাও করতে হবে, থিয়েটারও করতে হবে। ঠিক হল তিন দিনের অভিনয়ের মধ্যে দুদিন হবে বাংলা নাটক–আর একদিন হবে অসমিয়া।
বৰ্ত্তমানে যেখানে বেঙ্গলী এ্যামেচার থিয়েটার পাৰ্টির পূজা মণ্ডপটি আছে প্ৰায় ঐ একই জায়গায় জঙ্গল সাফ করে বড় করে ঘরের চালা বানান হল। তৈরী হল পূজা মণ্ডপ। বাঁশ দিয়ে বানান হল মঞ্চ। ত্ৰিপল খাটিয়ে লোক জনের বসবার জায়গা করা হল। উৎসাহের আর অন্ত নেই।
এই পূজার প্ৰথম বছর পুরোহিত ছিলেন দুর্গাচরণ শর্মা আর প্ৰথম সেক্ৰেটারী ছিলেন ব্যাথারাম শর্মা ।
কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, এই সমবেত উৎসাহের শ্ৰোতটি অল্প সময়ের মধ্যেই হারিয়ে ফেলল তার গতিবেগ। সুন্দর সহাবস্থানের হল অকাল মৃত্যু। এর কারনটি অনুসন্ধান করেছিলাম। সঠিক কোন ব্যাখ্যা খুঁজে না পেলেও বিভিন্ন মহল থেকে যতটুকু জানতে পেরেছি তাতে মনে হয়েছে এর কারন ছিল অহেতুক আশঙ্কা, একটি দলের মনে হয়েছে অপর দলের কর্ত্তৃত্বটি বড় একপেশে। মনে প্ৰাণে মেনে নিতে পারছিলেন না একে অপরকে। তাঁরা হয়ত ভেবেছিলেন এক সাথে থাকলে একটি অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী কৃষ্টির চাপে পরে তাঁদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক অগ্রগতি হবে ব্যাহত। তাঁরা স্থির করলেন আলাদা হয়ে যাবেন। হলেনও তাই। আলাদা হলেন ঠিকই কিন্তু এই আলাদা হওয়া নিয়ে কোন রকম তিক্ততার সৃষ্টি হল না। অত্যন্ত হৃদ্যতাপূৰ্ণ পরিবেশের মধ্যেই এই সমস্যাটির সমধান হয়ে গেল ।