28/11/2025
2018 NOV
PASCHIMBANGA NATTY MELA
সব দিনগুলি-ই প্রায় একই রকম যায়।গদির পাশা উল্টোনোর খবরে ব্যস্ত থাকেন রাজা,প্রজা তখন পেঁয়াজের দাম কয়েক টাকা কমলেই খুশী।বাঙালি মধ্যবিত্তর ভাবনাগুলোও তাই।ভাবনা যে লাগামছাড়া হবে এই ভাঙা কোমরে সে জোর কোথায়?ইতিহাস বলে আমরা পরাশ্রয়ী জীব।শাষনে মুক্তি,শোষণেও।তবে বেশী হয়ে গেলেই বদহজম,আর সেখান থেকেই বিপ্লবের শুরু হয়।ঝড় ওঠে,আবার সে ঝড় থেমেও যায়।স্বপ্ন দেখা চোখ গুলো কয়েকদিনের জন্যে জ্বলে ওঠে,তারপর কোন এক দামী কাচের আড়ালে চাপা পরে যায় চেয়ে থাকা চোখের স্বপ্ন।
হেয়ালি করতে বেশ লাগে।যা দেখছো সেটা নয়,যেটা আড়ালে রয়েছে সেটাই আসল।জীবনেও তাই,নাটকেও তাই।আর সেটাই যদি না হত,তাহলে সেই ১৯৬৪ সালে গিরিশ কারনাডের লেখা তুঘলক নাটক আজও সমান ভাবে ভাবাত কেন আমাদের?১৯৭২ সালে প্রথম অভিনয় হয়েছিলো বাংলায়,কি অসাধারণ তার চরিত্রায়ন।শম্ভু মিত্র,কুমার রায়,রুদ্রপ্রসাদ চক্রবর্তী।পরবর্তীতে দেবেশ চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁর দল সংসৃতি মঞ্চস্ত করল তুঘলক।রজতাভ দত্তর দারুন অভিনয়।দেবেশ দার অসম্ভব ভালো ডিরেকশন।লক্ষ করলে দেখা যায় এক একটা টালমাটাল সময়ে,অস্থিরতায়,তুঘলক মঞ্চে ফিরে ফিরে এসেছে,বারবার।
শিলিগুড়ির প্যাশনেট পারফর্মার্স এবারের নাট্য উৎসবে কলকাতার মঞ্চে।অমিতাভ কাঞ্জিলালের নেতৃত্বে প্রায় পঞ্চাশের উপর অভিনেতা।সকালে পৌঁছে রাতে গিরিশ মঞ্চে শো,সারারাত হলের চৌহদ্দির মধ্যেই কাটিয়ে দেওয়া এবং পরেরদিন সকাল হলেই শিলিগুড়ি ফিরে যাওয়া,এত গেলো মধ্যবিত্ত নাট্যদলের জীবনচর্চা।
এবার আসি দর্শকদের অভিনয় অংশে।হলে প্রবেশের আগেই খানিক খাওয়া দাওয়া,উপস্থিতি জানান দেওয়া,এবং লেবু চায়ে একটা আরামের চুমুক দিয়ে নাটক দেখতে বসা।
এর সবটাই ছিলো কাল।ঠিক সন্ধ্যে সাড়ে ছটায় নাটক আরম্ভ হয়।সাধারণত নাটক আরম্ভ হওয়ার ঘন্টা খানেক কাটলেই মনে মনে কখন টুক করে হলের বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার চিন্তা শুরু হয়ে যায়,গতকাল ঠিক তখন থেকেই মুগ্ধতার শুরু হয়েছিলো।ইতিহাস তো তার চেনা গতিতেই এগিয়েছে।ইতিহাসের চেনা চরিত্রের পাশে উঠে এসেছে সাধারনের কথাও।কি সাবলীল অভিনয়।সামান্যতম ভুলচুক নেই কোথাও।নাটকে মাত্রা জ্ঞানটা খুব প্রয়োজন।ঠিক কতটা?ঐতিহাসিক নাটক অতিনাটকীয় হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।কিন্তু ম্যাজিকের মত টানটান ভাবে এগিয়েছে অভিনয়।নাম ভূমিকায় অমিতাভ দা স্বতঃস্ফূর্ত।জাত অভিনেতা যাকে বলে।বাকিদের প্রায় কাউকেই আমি চিনি না।কিন্তু নাটকের কস্টিউমে যদি বাইরে কখনো,কোথাও দেখা হয় তাদের সঙ্গে,অনেকদিন বাদেও চিনে নিতে সামান্য অসুবিধে হবে না আমার।অভিনয় যে মনের মধ্যে বসে গেছে।
নাটকের সমালোচনা লেখার মত টেকনিক্যাল লোক আমি নই,আবার আবেগে ভেসে যাওয়ার মত বোকা দর্শকও নই আমি।তাই বিশ্লেষণ মেদহীন হওয়ারই সম্ভবনা প্রবল।মঞ্চসজ্জা জাঁকজমকহীন কিন্তু পারফেক্ট।এসব নাটকে আলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সেক্ষেত্রে খুব সুচারু না হলেও যথাযথ লেগেছে আলো।কস্টিউম ঝকমকে,মনকাড়া।
আজকের এত আধুনিক যুগেও প্রসেনিয়ামে সাউন্ড ক্যাচারের ক্রমশ ম্রিয়মাণ হয়ে পরা ঠিক নেওয়া যায় না।দু চারজন দর্শকের মোবাইল ব্যস্ততা,কারও ঘুম থেকে হঠাৎ জেগে ওঠার শব্দ,এসব স্বাভাবিক দৃশ্যের পাশেও একদল এবং প্রায় হল ভর্তি নাট্যপ্রেমী মানুষ ছিলেন কাল।যাদের স্তব্ধতাই,খুব আস্তে হলেও নাটকের প্রতিটি শব্দ এমন কি স্বগতোক্তিকেও পৌঁছে দিয়েছে আমাদের কানে।
নাটক শেষে হল থেকে বেরিয়ে বাগবাজারের বাজারে ফুলকপির দরদাম করছিলাম আমি আর সুস্মিতা।আমার ছেলেবেলার বন্ধু পরিচিত বামপন্থী সাংবাদিক প্রসূনের সঙ্গে দেখা।বেগুনের দাম শুনে লাফিয়ে উঠলো ও।খুব একটা বাজার করেনা,বোঝাই গেলো,কিম্বা এখনো সেই বছর দশ আগের কলকাতাতেই আছে ভাবছিলো ও।আমি আগুন ছোঁয়া বাজারে দাঁড়িয়ে প্রায় সাতশো বছর আগের তুঘলকের কথা ভাবছিলাম।বুদ্ধিমান গাধা।তুঘলকেরা মরে না কখনো।
সুদীপ ভট্টাচার্যA