30/03/2021
একটা বড়ো মাপের কালবৈশাখী হয়ে যেত শেষ চৈত্রের বিকেলে। ততদিনে আমাদের সাদা কাপড়ের ওপরে রঙিন সুতোয় রান ফোঁড়ের পাখি, বেড়াল, বাঘমামা বানানো হাতকাটা নতুন জামা এসে গেছে, এসে গেছে মা, কাকিমা, ঠাম্মার বেগমপুরী নয় ফরাসডাঙ্গা শাড়ি,বাবা জেঠু দাদুদের আদ্দির ফতুয়া। এই ক'টা দিন রোজ গাজনের চড়ক ঠাকুর নিয়ে এপাড়া ওপাড়ায় ঘুরতো লাল কাপড় পরা ছেলেরা তারা নাকি সন্ন্যাসী হয়েছে শুধু এই মাসটার জন্য। তকতকে উঠোনে ওরা এলেই ঠাম্মা কাঁসার ঘটিতে এক ঘটি জল দিয়ে ধুয়ে দিত। ওখানে ঠাকুর বসিয়ে শুরু হত ঢাক বাজানো। শিব পার্বতী সেজে আসত দুজন লোক। শিবের মুখে গায়ে ছাই আর পার্বতী পুরোটাই আবীর মাখা। নাচ থামলে ঠাম্মা একটা থালায় চাল মুগ ডাল আলু বেগুন সাজিয়ে দিত। সিধে বলত একে। কেন বলত জানিনা। তখন জীবনটা এমন সরল সিধে ছিল কি না!
আর আমরা এনে দিতাম সর্ষের তেল, সিঁদুর। গাজন ঠাকুরকে মেয়েদের ছুঁতে নেই। বাচ্চাদের অবশ্য দোষ ছিলনা। সেই তেল সিঁদুর কাঠের গাজন ঠাকুরকে লাল কাপড়টা একটু সরিয়ে মাখিয়ে ওরা রওনা দিত অন্যবাড়িতে। ঠাম্মা পরে থাকা সামান্য তেল সিঁদুর উঠোন থেকে কাচিয়ে তুলে আমাদের মাথায় ছোঁয়াতে বলত। একদিন সকালে হঠাৎ ধুম পরে যেত দুব্বো কুড়োনোর, বেল পাতা তোলার। আকন্দের মালা, ঘেঁটুর মালা, আঁশ শ্যাওড়া, বেল আর একটা কুড়িয়ে আনা একটু বড়ো নিটোল কাঁচা আম বোঁটা সহ। সেদিন হল নীল ষষ্ঠী। আমাদের বাড়িতে ছিল নীল ঘন্টা ফুলের গাছ। অদ্ভুত ভাবে এই সময়ই ফুলটা ফুটত।ওই ফুল ছাড়া নীলের পুজো যে হবেইনা। ঠাম্মা বলত... নীলের ঘরে দিয়ে বাতি, জল খায় পুত্রবতী। পুত্র অর্থে সন্তান। নারী পুরুষ ভেদ ছিল না পুজোয়। সন্ধ্যায় সব উপকরণ গুছিয়ে আমরাও যেতাম মায়েদের সাথে বটতলায়। পুজোর শেষে একটা মোম জ্বালিয়ে মা ফিরে আসত বাড়ি তখন তুলসী তলায় প্রদীপ জ্বলছে।
বড়ো পাথরের শিবটার চারপাশে ছড়িয়ে থাকত লোভনীয় কাঁচা আম। ওই দিনের পর থেকেই আমের ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠে যেত আমাদের, ঠাকুর পেয়ে গিয়েছেন যে।বড়ো হয়ে বুঝলাম আম বড়ো হওয়ার আগে খেলে কষে মুখের ঘা হতে পারে তাই এই নিষেধ। বাড়িফিরে পাথরের বাটিতে ভেজানো সাবু নারকোল কোরা,বাতাসা, সন্ধক লবন,কর্পুর, কলা,দই, গন্ধরাজ লেবু দিয়ে মেখে, ডাবের পানা, কুচো ফল, বেলের পানা খাওয়ার আগে নীলের কথা শুনতাম সবাই মিলে বসে। চারদিকে কেমন একটা উৎসব উৎসব ভাব।ধুপের গন্ধ, দূর থেকে ভেসে আসা চরক মেলার ঢাকের আওয়াজ, আলো আঁধারিতে চোখ বেয়ে নেমে আসা ঘুম, ভোরে চোখ খুলতেই দে দৌড়। ততক্ষণে সারা রাত ধরে টুপটাপ ঝরা আমের কুশি কারা যেন বেশিরভাগটাই কুড়িয়ে নিয়ে চলে গেছে। হাতের ছোট্ট সাজিতে আম, গিমেপাতা বোঝাই করে বাড়ি ফিরতাম।
ছোলার ছাতু, যবের ছাতু খই এর ছাতু দই মাখা খেতে হত তার আগে তিন রাস্তার মোড়ে। অদৃশ্য শত্রুর মুখেএক মুঠো ছাতু মাথার পেছনে উড়িয়ে পেছনে না তাকিয়ে ফিরে আসার নাম হয়ত চৈত্র সংক্রান্তি।
সেদিন দুপুরে কাক কে খোঁজা হত কত পথে ঘাটে মাঠে তার ইয়েত্তা নেই। একটা কলাপাতায় কাক কে খেতে দিয়ে হা পিত্যেস করে থাকা কখন কাক মুখে দেবে অন্ন।আসলে বছরের শেষ দিনে পূর্বজ দের অন্ন প্রদান। তাদের আশীর্বাদ পাওয়া। আমাদের ওপরে সেই গুরুদায়িত্বটা থাকত। একটা কলাপাতায় মোড়া ভাত তরকারি দলা মাখা টোপলা নিয়ে ছুটতাম নদীর পাড়ে,মাঠে, বাগানে।কাক খাইয়ে নিশ্চিত হয়ে বাড়ি ফিরলেই সবাইকে খেতে দিত মা ঠাকুমা। কলাপাতায় দুহাতা গরম আতপ চালের ভাত, ঘী, গিমা পাতার বড়া,দু রকম ডাল,লাউ দিয়ে কাঁচা মুগ ডাল উচ্ছেভাজা আর আদাবাটা ঘী দেওয়া তেতোর ডাল, আর মটর ডালের আম দিয়ে সর্ষে শুকনো লংকা ফোড়নের আম ডাল। সাথে এঁচড়ের ডালনা, সর্ষে আলু সজনের চচ্চড়ি, তেঁতুলের হাত টক। পরম তৃপ্তির সেই খাওয়া।
বিকেলে চরকের মেলায় মাটির পুতুল বেলুন, কাঠের চাকা লাগানো গাড়ি কিনে বাড়ি ফেরা। সে রাতে ঘুম হত না। কেমন একটা চাপা আনন্দ। একটা আস্ত নতুন বছর আসছে। বদলে যাবে ক্যালেন্ডার৷ বাড়িটাই হয়ে যাবে আরো এক বছরের পুরোনো। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পরতাম আমরা। পরদিন সকাল নতুন আশা, নতুন স্বপ্নের।
সকালে স্নান সেরে নতুন জামা পরে,মায়ের সাথে মন্দিরে পুজো দিয়েই শুরু হত আমাদের পয়লা বৈশাখ।
বছরের প্রথম দিন! আরো একটা পালক খসে যাওয়া হাঁসের ডানায়। গুরুজনদের প্রনাম সাথে কিছু পাওনা। মিষ্টি মুখ আর রান্নাঘর থেকে লুচি ভাজার গন্ধ মিলেমিশে একটা গোটা নতুন বছর। কাঁসার থালায় বাসন্তি পোলাও ছানার ডালনা, রুই মাছের কালিয়া আর কচি পাঁঠার মাংসের সাথে জুটত দই মিষ্টি। আর সেদিন নাকি পায়েস খেতে হয় পায়েস টা দেওয়া হত বিকেলে। সেদিন বাবার হাত ধরে হালখাতা করতে যেতাম আমরা, কাগজের প্লেটে ঝুরিভাজা বোঁদে নিমকি রসোগোল্লা যাচাই করে খাওয়া। বাড়ির জন্য ও প্যাকেটে জোর করে দিয়ে দিত। সন্ধ্যে গড়িয়ে নামত আঁধার এক টুকরো মেঘ কখন অন্ধকার করে দু ফোঁটা তপ্ত জল ফেলেছে আমাদের মাথায়। দূর থেকে এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া গত বছরের যাবতীয় ফেলে আসা অতৃপ্তি অভিমান ক্ষোভ বেদনা দুঃখ এক ঝটকায় উড়িয়ে দিয়ে একটা স্নিগ্ধ আলো আলো নববর্ষ উপহার দিত। গরীব বড়োলোক সব বাঙালীর বাগানে ফুটে ওঠা জুঁই, হাসনুহানা, বেলের গন্ধ মাখা এক পবিত্র নববর্ষ।
সেরকম একটা নববর্ষ সাজিয়ে রেখেছে সুন্দরগ্রাম। ঢাকের তালে বর্ষবরণ। সাথে ঠাকুরবাড়ির রান্নার বনেদিআনা, পদ্মাপাড়ের গল্প। গানে কবিতায় গল্পে এক সুন্দর নববর্ষ.....
যোগাযোগ