21/08/2026
দেশভাগ ও এক নারীর গল্প ....… 🌑🔴🌑
#দেশভাগের_গল্প
সাংবাদিকতার দুনিয়ায় #কুলদীপ_নায়ার এক সাড়াজাগনো নাম। নিজের আত্মজীবনী নিয়ে লিখেছেন দুটি বিখ্যাত বই, Beyond the lines এবং Between the lines. নাম শুনে অনেকেই তাঁকে দক্ষিণ ভারতীয় ভাবলেও আদতে ছিলেন #শিখ ধর্মাবলম্বী, যদিও পাগড়ি বা দাড়ি একটা সময়ের পর আর রাখেননি। জন্মসূত্রে পাওয়া পদবী সিং থেকে করে নেন নায়ার। জন্ম ১৯২৩ সালে, অবিভক্ত পাঞ্জাবের #শিয়ালকোটে। তাঁর বাবা ছিলেন নামকরা ডাক্তার। সেই সুবাদে স্থানীয় হিন্দু-মুসলিম ও শিখদের অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। কিন্তু দেশভাগের পর উদ্বাস্তু হয়ে চলে আসেন ভারতে। আইনে স্নাতক হয়েও সাংবাদিকতায় কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। লন্ডনে ভারতের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্বও সামলেছেন। হয়েছেন রাজ্যসভার সদস্য। গল্পটি তাঁর লেখা থেকে অনুবাদ।
দেশভাগের সময়ে মেয়েদের সবচেয়ে বেশি ভুগতে হয়েছে, সব ধরনের নৃশংসতা সইতে হয়েছে। আজ এক শিখ নারীর গল্প বলবো যিনি ভারত পাকিস্তানের লাখো নারীর মতো দেশভাগের ধকল সয়েছেন। রাওয়ালপিন্ডি ছিল মুসলমান-অধ্যুষিত এক শহর। তবে সেখানে কিছু শিখও থাকত। বহু বছর ধরে সেখানে এই দুই সম্প্রদায় শান্তিপূর্ণভাবে পাশাপাশি বাস করেছে, পাকিস্তানের দাবি ওঠার পরই তাদের মধ্যেকার সম্পর্কে তিক্ততা সৃষ্টি হয়। রাতারাতি তাদের মধ্যে এক বিভেদ সৃষ্টি হলো। ব্যাপারটা এমন যেন তারা বছরের পর বছর ধরে একত্রে বসবাস করেনি।
শিখদের পাগড়ি দেখে সহজেই আলাদা করা যেত, তারাই ছিল প্রধান লক্ষ্যবস্তু। বিশেষ করে শিখ নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেন। দাঙ্গা লাগলে তাঁদের অনেকেই সম্ভ্রম বাঁচাতে শহরের কাছে এক কুয়ায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করলেন। সদ্য এক কিশোরীর মা ও বোন কুয়ায় ঝাঁপ দিলেন, কিন্তু মেয়েটি তা না করে দৌড়াতে শুরু করে। এক ধার্মিক মুসলমান পরিবার তাকে উদ্ধার না করা পর্যন্ত তার দৌড় থামেনি। সেই দম্পতি ছিল নিঃসন্তান। ফলে এই মেয়েটি তাঁদের কাছে হয়ে উঠল ঈশ্বর-প্রেরিত। তাঁরা মেয়েটিকে দত্তক নিয়ে তাকে মুসলমান হিসেবে লালনপালন করেন। তারপর সেই দম্পতি মেয়েটিকে মহিলা মাদ্রাসায় পাঠান, সেখানে সে পবিত্র কোরআন মুখস্থ করে।
পবিত্র কোরআনের ওপর মেয়েটির দখল এত বেশি ছিল যে নিজের স্কুলেই সে কোরআন শিক্ষিকা হিসেবে নিয়োগ পান। কেউই সন্দেহ করেনি, তিনি জন্মসূত্রে একজন শিখ।
মেয়েটি নিজেও আরবি শেখায় নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছিল, যাতে কোরআন ও ইসলামের মৌলিক মতবাদ ভালোভাবে বুঝতে পারে। কখনো কখনো আবার সে সঙ্গে করে আনা বাক্সটি খুলে গুরু নানকের ছবিটির দিকে তাকিয়ে থাকতো।সেটি ছিল তাঁর অমূল্য সম্পদ। ছবিটি তাঁকে নিজের শিকড়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিত। এমনকি এক মুসলমান শিক্ষককে বিয়ে করার পরও তিনি এই ছবিটি দেখা বন্ধ করেননি। এই ছবিটাই ছিল তাঁর শিকড়ের সঙ্গে একমাত্র সংযোগ।
মহল্লার লোকজন এমনকি তার স্বামী ও পুত্র কখনোই তাঁর জন্মগত পরিচয় নিয়ে সন্দেহ করেনি। সবাই জানতো তিনি জন্মসূত্রেই মুসলমান।পবিত্র কোরআনের ওপর তাঁর দখল ছিল বলে লোকজন তাঁর কাছে পরামর্শও চাইতে আসতো। কিন্তু একটা সময়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্কের উন্নতি তাঁর জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনলো। শুরু হয়েছিল দু'দেশের মধ্যে যাতায়াত। দেশভাগের সময় যারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছিল তাদের খোঁজে এক দেশ থেকে অন্য দেশে শুরু হলো যাতায়াত। মহিলার এক ভাই জানতো সে কুয়োয় ঝাঁপ দেয়নি। ভারত থেকে রাওয়ালপিন্ডিতে এসে সেই ভাই খোঁজখবর নিয়ে চলে আসে তাদের বাড়িতে। যদিও বেশিক্ষণ থাকতে পারেনি তবে খবরটা চাউর হয়ে যায় যে মহিলা একজন শিখ।
তাঁর স্বামী এটা মেনে নিলেও পুত্রটি খবর জেনে মর্মাহত হয়ে পড়ে। বন্ধুরা তাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করাতে একসময় সবাইকে এড়িয়ে চলে সে এমনকি নিজের মা'কেও । তার মা ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলেও কোনো লাভ হয়নি। সে বুঝতেই চায়নি পাকিস্তান সৃষ্টির অনেক আগেই জন্মসূত্রে তিনি শিখ ছিলেন। এই সত্য এড়িয়ে যাওয়ার কোন উপায় নেই।
ছেলেটি একদিন তার মায়ের অমূল্য বাক্সটি চুরি করে, কাছের এক খালে গিয়ে জিনিসপত্র গুলো ফেলে দেয়। খালের জলে ভেসে ওঠে গুরু নানকের ছবি, একসময় জলের স্রোতে ধীরে ধীরে ছবিটি ডুবে যায়। তারপরও ছেলেটি তার মাকে ক্ষমা করতে পারে না, তাঁর কাছেও যায় না। মহিলা সব কিছু বুঝতে পেরে প্রচন্ড কষ্ট পান, যদিও মুখে কিছু প্রকাশ করলেন না। তিনি মনে মনে যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেন তাঁর ভাই তো তাঁকে খুঁজতে এসেছিলেন, তিনি তো যাননি। অতীতের সঙ্গে সব সম্পর্ক তিনি স্বেচ্ছায় ত্যাগ করেছেন।
ব্যাপারটা এমন দাঁড়ায় যে ছেলেটি তার মায়ের অস্তিত্বকেই ঘৃণা করতে শুরু করে। তার মা সেটা বুঝতেও পারেন। ছেলেটির বাবা স্ত্রীর কষ্ট টের পান, কিন্তু তিনি মনে করেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু তিনি কখনোই ছেলেকে এ ব্যাপারে কিছু বলেন না। প্রতিটি পদক্ষেপে ছেলেটি তার মাকে অপমান করে। সে বোঝাতে চায়, তার তরফ থেকে সে সব সম্পর্ক ত্যাগ করেছে। মহিলা স্মরণ করেন, তাঁর মা ও বোন নিজেদের অতীত মুছে ফেলার জন্য কী করেছিলেন ?
তারপর একদিন যখন তিনি বাড়িতে একা, সব যন্ত্রণার অবসান ঘটানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি সেই কুয়ার কাছে যান, যে কুয়ায় তাঁর মা ও বোন একদিন ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। না, এবার আর তিনি দৌড়ে পালান না। তাঁর ছেলেই প্রথম দেখতে পায় তাঁর ভাসমান লাশ। হ্যাঁ, ওটা তার মায়েরই মরদেহ। এতে হয়তো তার রাগ কিছুটা পড়ে, কিন্তু মাকে হারিয়ে সে এক ফোঁটা চোখের জলও ফেলে না। এবার আর তার সমাজে মুখ দেখাতে বাধা রইলো না।
অনুবাদে ✍🏻©️ স্বপন সেন 🌲
ছবিওয়ালা: সৈকত বিশ্বাস