22/06/2026
বেহড় বাগী বন্দুক.......... 🔴💥🔵
'কোই রাজপুত হ্যায় ইধর, যো মুঝে পানি পিলানে সকে ?' টানা বারো ঘন্টা ধরে চলা পুলিশের সাথে গুলির লড়াইতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া মৃত্যু পথযাত্রীর আবেদনে সাড়া দিয়ে জলভর্তি ফ্লাস্ক নিয়ে এগিয়ে যান হাবিলদার ত্রিভুবন সিং। পেছন থেকে গর্জে ওঠেন ইন্সপেক্টর মহেন্দ্রপ্রতাপ সিং চৌহান, 'রুক যাও ত্রিভুবন। ডাকুয়ো কি কোই জাত নেহি হোতে!' একবুক তৃষ্ণা নিয়েই দুনিয়া ছাড়লেন চম্বলের সেই ডাকাত, মরণকালেও যিনি অন্য জাতের হাতে জল খেতে রাজি ছিলেন না ! ১৯৮১ সালের ঘটনা, রাত পোহালেই গান্ধী জয়ন্তী !
যাচ্ছিলাম গোয়ালিয়র এক পেপার মিলে ইন্টারভিউ দিতে। আগ্রা থেকে ট্রেন ধরেছি সকালে। কিছুক্ষণ পরেই বদলে গেল দুপাশের দৃশ্য। সবুজ বনানীর জায়গায় এলো কেমন যেন রুক্ষ ঢেউ খেলানো জমি আর বালিয়াড়ি। এই দেখছি মানুষ, পরমুহুর্তেই গায়েব। চোখে বিস্ময়ের ছাপ দেখে মুখ খুললেন পাশে বসা প্রৌঢ় মানুষটি, শুভ্র বসন মাথায় সাদা পাগড়ি কাঁচাপাকা ইয়া এক গোঁফ। ইসকো বোলতে হ্যায় 'বেহড়' বাবুজী। চমকে উঠলাম শুনে, এই তাহলে সেই চম্বল ঘাঁটি!
চম্বল , নাম শুনলেই মনের মধ্যে সবার আগে যে ছবি ভেসে আসে, তা হল ডাকাত। মান সিংহ থেকে ফুলন দেবী – লম্বা গালপাট্টা, বন্দুক কাঁধে দাপিয়ে বেড়ানো ভয়ঙ্কর সব ডাকাতের ছবি।
মূলত উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ আর রাজস্থানের কিছু অংশ মিলিয়ে এই চম্বল। আর যে নদীকে ঘিরে এই নাম তারও নাম চম্বল। দেশের অন্যতম স্বচ্ছ এক নদী, অভিশপ্তও বটে। যার জল একবার খেলে নাকি মানুষ 'বাগী' বা বিদ্রোহী হয়ে যায়!
এখনও আছে ঐ বাগীরা ?
প্রশ্ন শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন বৃদ্ধ, হ্যায় তো বাবুজি লেকিন দুসরা বেশ মে। পহলে উয়োলোগ আমীর কো লুটতা অব গরীব কো পেটমে লাথ মারতে হ্যায়! বুড়োর ইঙ্গিত বুঝতে দেরি হলোনা। ততক্ষণে ট্রেন ঢুকে পড়েছে ভিন্দ স্টেশনে। চল্লিশ বছর আগে এখানেই পুলিশ এনকাউন্টারে নিহত হয় চম্বলের শেষ বাগী, যার জীবনী উঠে এসেছে রূপালী পর্দায় ........ পান সিং তোমর ! 💥
১৯৩২-এ চম্বল উপত্যকার মোরেনা জেলার ভিড়োসা গ্রামে জন্ম এই তরুণ আঠারো বছর বয়সে যোগ দেয় ভারতীয় সেনাবাহিনীতে। ছফুটের ওপর লম্বা পানসিং ভর্তির সময়তেই নজর কেড়ে নেয় সেনা কর্তাদের। তাঁর দৌড়ানোর ভঙ্গী ও শারীরিক সক্ষমতা তাঁকে পাকাপাকি ভাবে জায়গা করে দেয় বাহিনীর Athletics কোটায়। খাতায় কলমে ছিলেন রুরকি'তে 51 Engineering রেজিমেন্টের Bengal Engineer Group এর সুবেদার। নাম শুনে আবার বাঙালি রেজিমেন্ট ভেবে আহ্লাদিত হবেন না যেন! পাক্কা দশবছর ধরে ছিলেন ৩০০০ মিটার Steeplechase এ জাতীয় চ্যামপিয়ন। ১৯৫৮ সালে টোকিও এশিয়ান গেমসে দেশের হয়ে সোনা জিতেছেন। ক্রীড়া জগতের এই নক্ষত্রকে ৬২ এবং ৬৫ তে যুদ্ধে অব্দি যেতে দেয়া হয়নি, যদিও এই সিদ্ধান্তে খুশি ছিলেন না পানসিং তোমর।
মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে এই Steeplechase ইভেন্টটা কি........? Steeple শব্দের অর্থ গীর্জার চূড়ো। বহু অতীতে ইউরোপের সংবাদ বাহকেরা এই উঁচু চূড়ো লক্ষ্য করে মাঠঘাট নদীনালা পেরিয়ে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ছুটে যেতো বা Chase করতো। সেই থেকে উৎপত্তি এই খেলার যা আসলে একধরনের হার্ডল রেস। যাইহোক নির্দিষ্ট চাকরির মেয়াদ উত্তীর্ণ হবার পরও সেনাবাহিনী তাকে প্রশিক্ষক রূপে রাখতে চেয়েছিল কিন্তু ১৯৭৭ সালে পান সিং ফিরে আসে নিজের গ্রামে।
একটুকরো জমি নিয়ে গন্ডগোলটা শুরু হয়েছিল আগেই কিন্তু পানসিং ফিরে আসার পর নতুন করে সেটা মাথা চাড়া দিলো। এমনিতেই চম্বলে চাষযোগ্য জমি কম তাই জ্ঞাতি ভাই জান্দেল ও বাব্বু সিংয়ের হাত থেকে জমির অধিকার ফিরে পেতে মরীয়া পানসিং পঞ্চায়েতের শরণাপন্ন হলো। কিন্তু প্রভাবশালী বাব্বু সিংয়ের সামনে অসহায় পঞ্চায়েত কোন সিদ্ধান্তেই আসতে পারলো না। রাজনৈতিক নেতাদের হাত তো ছিলোই তার মাথায়, সাথে বেশ কয়েকজন বন্দুকধারী স্যাঙাত। এর মাঝে সে একদিন দলবল নিয়ে চড়াও হয় পান সিংয়ের বাড়িতে। কাউকে না পেয়ে তার বৃদ্ধা মাকেই মারধর করে চলে যায়। বস্তুত সেদিনের ঘটনার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল ভবিষ্যতের এক বাগী'র অঙ্কুর। ছেলেরা ফিরে আসতে মা শুধু বলেছিলেন, 'লৌটা দে মেরি ইজ্জত!'
পরদিন ভোর হতেই নিজের লাইসেন্স বন্দুক নিয়ে বেরিয়ে পড়ে পানসিং, সঙ্গী বড়োভাইয়ের ছেলে বলবন্ত। নিজেদের জমিতে চাষের তদারকি করছিল বাব্বু সিং, কিন্তু ওর সঙ্গীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই গুলি চালায় পান সিং। প্রাণভয়ে দৌড় লাগায় সে, কিন্তু থোড়াই পারবে এক জাতীয় পর্যায়ের দৌড়বীরের সাথে! বলবন্তের গুলি থেকে বাঁচতে পালিয়ে যায় বাকি সঙ্গীরা।🔴
সেই শুরু, বছর না ঘুরতেই বিপক্ষ দলের হাতে খুন হয়ে যায় পান সিংয়ের বড়োভাই মাতাদীন। বদলা নিতে পান সিংয়ের দলের হাতে খুন হয় আটজন গ্রামবাসী। প্রশাসন পঞ্চাশ হাজার টাকা ঘোষণা করে পান সিংয়ের মাথার দাম। বাছাই করা দুশো কনস্টেবল নিয়ে তৈরি হয় মধ্যপ্রদেশ পুলিশের বিশেষ টিম। অবশেষে এলো সেই দিন....!
১লা অক্টোবর, ১৯৮১.
ভিড়োসা গ্রামের এক ইনফরমারের কাছ থেকে খবর পেয়ে ভোররাতে পুলিশ 'নাকাবন্দী' করে ভিন্দের কাছে 'রথিয়া কা পুরা' গ্রাম। আগের রাতেই ১৫ জন বিশ্বস্ত সঙ্গী নিয়ে সেখানে পৌঁছেছে পান সিং। বারোঘন্টা ধরে চলা গুলির লড়াইয়ে নিকেশ হয় দলবল সহ পানসিং তোমর, সেই সাথে শেষ হয় ক্রীড়া জগতের এক বর্ণময় অধ্যায়! প্রসঙ্গত ওনার একমাত্র পুত্র সৌরাম সিং তোমর ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত সুবেদার। প্রতিহিংসার আগুন থেকে বাঁচতে সপরিবারে থাকেন চম্বল ঘাঁটি থেকে দূরে ঝাঁসিতে।
কেমন আছে আজ চম্বল.....?
বছরে প্রায় ৮০০ হেক্টর রেটে বেড়ে চলা 'বেহড়' আজ ওখানে সবচেয়ে বড়ো সমস্যা। চম্বলে ডাকাতরা বহুদিন থেকেই নেই। এখন তাদের জায়গা নিয়েছে বালি মাফিয়ারা। দিনরাত চম্বল নদী থেকে বালি তুলছে। আর করবেই বা কি.... ? না আছে সেখানে কলকারখানা না আছে চাষের জমি। আর তাই পুলিশ থেকে প্রশাসন, সবাই সব জেনেও চুপ!
কলমে ✍🏻 স্বপন সেন 🌲