01/09/2026
সব সকাল দেখে বোঝা যায় না সন্ধ্যেবেলায় কী অপেক্ষা করে আছে। যা দেখা যায় না তা দেখা যাবে, যা শোনা যায় না তা শোনা যাবে, নাকি যা কোনদিন স্বপ্নে ভাবার ধৃষ্টতার কথা মনেও আসে নি সেটাই ঘটবে ।
ব্যক্তিগত জীবনে আমি ঈশ্বর বিশ্বাসী নই এবং যা নিয়ে মাতামাতি হয় তার অস্তিত্ব এবং তথাকথিত বর্ণিত ঈশ্বরের কার্যকলাপ জেনে সেসব বিশ্বাস করার কোনো কারণ খুঁজে পাই নি।
তবে আমারও ঈশ্বর আছেন অবশ্যই। এবং তাঁরা সবাই বায়োলজিক্যাল, যারা হয়ত আজ অনেকেই এই ধরাধামে নেই। যাঁরা জন্মগ্রহণ করেছেন এই দুনিয়ায়, কিছু করে গেছেন পৃথিবীর জন্য, মানুষকে আলো দেখিয়েছেন, অন্ধত্ব ঘুচিয়েছেন, আনন্দ দিয়েছেন, বোধ দিয়েছেন। তাঁরা যে আমার সামনে অবতীর্ণ হবেন এমন ধারণা ছিল না, ওই যাকে বলা যায় স্বপ্নেও ভাবা যায় নি।
গৌরচন্দ্রিকা অনেক হল এবার আসল কথায় আসি।
Shahana Centre for Tagore Music and Culture এবারের অনুষ্ঠানে মঞ্চে বিশেষ অতিথি হিসেবে এনেছিলেন একজন এমন বিখ্যাত ব্যক্তিত্বকে যাঁর অসাধারণত্ব তাঁর সাধারণত্বের মধ্যে। বিখ্যাত playback singer শ্রীমতি কবিতা কৃষ্ণমূর্তি, শুনেছিলাম থাকবেন, কিন্তু অনুষ্ঠানের চাপে অতটা ভাবার অবকাশ পাই নি। পর্দা পড়ে আছে, অনুষ্ঠান শুরু হবে, হারমোনিয়ামের ওপর হাত, কিছু বিশেষ কারণে সামান্য অপেক্ষা করছে সবাই, হঠাৎ নজরে পড়ল মঞ্চে ইন্দ্রাণী দি, সাহানার প্রতিষ্ঠাতা, সাহানার সেক্রেটারি শ্রী পার্থ ঘোষ, ট্রাস্টির সদস্য ও আবৃত্তিকার শ্রী উপমন্যু ভট্টাচার্যর মাঝে বসে রয়েছেন শ্রীমতি কবিতা কৃষ্ণমূর্তি। প্রথম ঘুম ভাঙা। যাই হোক অনুষ্ঠান শুরু হল। ঘুমটা আরো ভাঙল যখন তাঁকে দেখলাম আমার পাশে এসে Podium এ বক্তব্য রাখছেন। কী নিরলঙ্কার নম্রভাষী বিনয়ী আন্তরিক বক্তব্য। কোন উচ্চতার, সাফল্যের এবং পুরস্কার বিজয়ী একজন মানুষ। এবং তাঁর এই বক্তব্য ভিডিওতে ধরে রাখছেন তাঁর স্বামী জগদ্বিখ্যাত বেহালাবাদক শ্রী লক্ষ্মীনারায়ণ সুব্রামানিয়াম। আবার বিহ্বল অবস্থা।
আমাদের অনুষ্ঠান হয়ে গেল।
ভেতরের guest room এ একা বসে বসে টিফিন খাচ্ছি, মঞ্চে তখন দ্বিতীয় অনুষ্ঠান হবে হবে অবস্থা, হঠাৎ দেখি guest room এর দরজায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন শ্রী লক্ষ্মীনারায়ণ সুব্রামানিয়াম বা এল সুব্রামানিয়াম এবং শ্রীমতি কবিতা কৃষ্ণমূর্তি। সাহানার পক্ষ থেকে তাঁদের জন্য একটু জলযোগের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। যিনি সুরের স্বর্গে নিয়ে গিয়ে অমৃতের সন্ধান দেন মানুষকে, যিনি একটি বেহালায় একশ বেহালার শব্দ সৃষ্টি করেন, যিনি কর্ণাটকী সংগীতধারা, উত্তরভারতীয় এবং পশ্চিমী সঙ্গীতধারা প্রত্যেকটিতে সিদ্ধহস্ত এবং জ্ঞানী সেই মানুষটি আমার সামনে।
এখানেই শেষ নয়, উপরি পাওনার শেষ অংশটি বাকি আছে, কবিতাদির সঙ্গে তাঁর গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত " বাজে করুণ সুরে" নিয়ে কথা বলা, তাতে শ্রী সুব্রমনিয়ামের বেহালা বাজানোর ঘটনা শুনলাম। উনি জানালেন কিভাবে সেই রেকর্ডিং হয়েছিল। আহা, সুরের আর মনের ঘড়া কানায় কানায় পূর্ণ হল সুর, বাণী, ভদ্রতা, সরলতা আর সৌজন্যবোধের চূড়ান্ত দৃষ্টান্তের শিল্পী দম্পতির সঙ্গে কথা বলে, সময় কাটিয়ে।
বলা উচিত কিনা জানি না, আমার গানের প্রশংসা করলেন, ওনাদের মুখ থেকে এমন কথা শুনেও তো কেমন যেন ভো ভো অবস্থা। এত বড় ভাগ্য অপেক্ষা করছিল সকালে কেন , কোনদিনই ভাবি নি। বেশ খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে ওনাদের audience এ বসিয়ে এলাম।
ফিরে এসে চুপচাপ খানিকক্ষণ ভাবলাম যে কী হয়ে গেল!!! বুঝলাম আমি আমার ঈশ্বরের দেখা পেলাম, এই বয়সে গান চালিয়ে যাওয়ার যে অনুপ্রেরণার ঘাটতি হয় কখনও কখনও ,কেমন যেন মনে হয় আর কী, কী লাভ গান গেয়ে! ! অনুভব করলাম, না, এখনো সময় আছে। এমন ঈশ্বরের দেখা যখন পেলাম তখন নিজের গুণের প্রতি সম্মান দেখানো উচিত।
পুনরায় ধন্যবাদ সাহানাকে, তাঁদের অনুষ্ঠানের অঙ্গ বলেই এমন সৌভাগ্য হল।