16/07/2026
মহিষাদলের রথের মেলা: নাটকের আসর বসতো -- ইতিহাসের চাকা ঘুরে, আবেগের পথে.......
বর্ষার প্রথম মেঘ যখন আকাশ ঢেকে দেয়, তখনই যেন মহিষাদলের বুকের ভেতর শুরু হয় আর এক উৎসবের স্পন্দন। সে শুধু রথযাত্রা নয়, সে ইতিহাসের সঙ্গে মানুষের মিলন, ঐতিহ্যের সঙ্গে আবেগের আলিঙ্গন। প্রায় আড়াই শতাব্দী ধরে এই উৎসব বহন করে চলেছে এক রাজকীয় উত্তরাধিকার, এক জনপদের আত্মপরিচয়।
১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে মহিষাদল রাজবাড়ির রানি জানকি দেবী এই রথযাত্রার সূচনা করেন।।রানি জানকি দেবীর সময়কার ২০ চূড়াবিশিষ্ট রথ পরে ১৮৫১ সালে রাজা লক্ষ্মণপ্রসাদ গর্গের উদ্যোগে নতুন রূপ পায়—১৩ চূড়াবিশিষ্ট, ৩৪ চাকার বিশাল কাঠের রথ। কামানের গর্জনে শুরু হতো রথযাত্রা; সেই ধ্বনি যেন ঘোষণা করত—রাজ্যজুড়ে নেমে এসেছে উৎসব।
আজও সেই ঐতিহ্যের মেনে রাজ পরিবারের বর্তমান সদস্য শ্রী হরপ্রসাদ গর্গ পালকিতে চড়ে রথের সামনে আসেন। তাঁর হাতেই রথের রশিতে পড়ে প্রথম শুভ টান পড়ে ।
একদিন এই মেলা ছিল রাজকীয় জাঁকজমকের প্রতীক। রাজ্য - ভিনরাজোর বণিক, শিল্পী, সাধু, দর্শনার্থী—কত মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠত মহিষাদল। প্রায় এক মাস ধরে চলা সেই মেলা ছিল কেনাবেচার স্থান, আবার মিলনমেলাও। লোকসংস্কৃতি, গান, নাটক, যাত্রা ,হাসি আর মানুষের গল্পে দিন-রাত একাকার হয়ে যেত।
মহিষাদলের ইতিহাস কেবল রথের নয়, নাটকেরও। রাজা লক্ষ্মণপ্রসাদ গর্গ থেকে রাজা সতীপ্রসাদের পরিবারের সদস্যরা ছিলেন নাট্যপ্রেমী ও সংস্কৃতির নিবেদিত পৃষ্ঠপোষক। ১৮৯০ সাল থেকে দুর্গাপূজা ও রথের সময় কলকাতার খ্যাতনামা নাট্যদলগুলি রাজবাড়িতে এসে অভিনয় করত। মহিষাদলের রথ তাই একসময় হয়ে উঠেছিল বাংলার নাট্যচর্চারও এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। রথের মেলা মানেই ছিল নাটের আসর, যেখানে মঞ্চের আলোয় জীবন্ত হয়ে উঠত বাংলা নাটকের সেরা সৃষ্টি।
সময় বদলেছে। রাজকীয় আড়ম্বর আজ অনেকটাই স্মৃতির পাতায়। লোকজ মেলা আধুনিকতার ছোঁয়ায় নতুন রূপ নিয়েছে। তবুও কিছু জিনিস বদলায় না। এখনও রথের মেলায় পাওয়া যায় নানা চারাগাছ, চাষিদের কোদাল কুড়ুল, পেতলের বাসন পত্র।বেতের ধামা-কুলো, সবংয়ের বিখ্যাত মাদুর, গরম জিলিপি, পাপড়, আর গ্রামবাংলার সহজ-সরল জীবনযাত্রার অমলিন ছাপ। এই মেলায় হাঁটলে মনে হয়, বাংলার লোকঐতিহ্য এখনও নিঃশব্দে বেঁচে আছে।
আপনি যদি বর্ষাকালে দীঘার পথে বের হন, তবে নন্দকুমার থেকে একবার ডানদিকে ৮ কিলোমিটার মহিষাদলে চলে আসুন। রাজবাড়ির প্রাচীন অন্দরমহল ঘুরে দেখুন, বিশাল রথের সামনে দাঁড়িয়ে অনুভব করুন কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস। মেলার ভিড়ে হারিয়ে যান, গরম জিলিপির স্বাদ নিন, সবংয়ের মাদুরে হাত বুলিয়ে দেখুন, আর ফেরার পথে একটি পাকা কাঁঠাল মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরুন।
মহিষাদলের রথের মেলা শুধু দেখা যায় না—অনুভব করা যায়। এখানে ইতিহাস কথা বলে, ঐতিহ্য হাতছানি দেয়, আর মানুষ ফিরে যায় এক টুকরো বাংলাকে হৃদয়ে নিয়ে। একবার এলে বুঝবেন, এটি কেবল একটি মেলা নয়; এটি মেদিনীপুরের গর্ব, বাংলার আত্মা, আর আমাদের সম্মিলিত স্মৃতির এক অমূল্য মেলা।
নাট্যকর্মী - অলকেশ পদাতিক
ছবি - সংগৃহীত