21/07/2026
ছবির পিছনে যে গল্প থাকে- দর্শক সেই ছবি দেখে যা ভাবে, এই দুটি ঘটনা যদি এক হয়ে যায় তবেই সার্থক ছবি। এখানেই সৃজন শীলতা। বুদ্ধিদীপ্ততা।
এখানে আপনি যা দেখছেন, তা কি গভীর ভাবে ভাবছেন? ছবিটার মাহাত্ম্য কোথায়? ছবি দেখতে শিখুন আগে। পড়াশুনা করুন তারপর ছবি আঁকতে বসবেন।
ছবির নামঃ ভিক্টোরিয়া মর্টিস (১৯২১)Victoria Mortis (1921)
শিল্পীর নাম — ওউয়ে জার্গে (Owe Zerge) 📍 ব্যক্তিগত সংগ্রহ।
"এখন বুঝতে পারি কেন মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে পারে।" একটি ছোট কাঠের টেবিলের সামনে নগ্ন অবস্থায় বসে আছেন এক তরুণ, সম্পূর্ণ দাবা খেলায় মনোযোগ নিবদ্ধ। তার ঠিক বিপরীতে কোনো মানুষ নয়, বরং স্বয়ং 'মৃত্যু' বসে আছে—গাঢ় লাল আলখেল্লায় আবৃত হয়ে শান্তভাবে পরবর্তী চালের অপেক্ষায়।
দুটি চরিত্রঃ মানুষ ও মৃত্যু।
ছবিটির শিরোনামের অর্থ "মৃত্যুর জয়" (Victory of Death), আর এখানেই ছবিটির মূল আতঙ্ক নিহিত।
লোকটি ভাবছে, হিসাব-নিকাশ করছে এবং সামনের খেলাটিতে টিকে থাকার চেষ্টা করছে;
কিন্তু মৃত্যুকে বিন্দুমাত্র উদ্বিগ্ন মনে হচ্ছে না। তার কোনো তাড়াহুড়ো নেই। খেলার পরিণতি কী হবে, তা সে আগেই জানে।
টেবিলের ওপর রাখা বালুঘড়িটি hourglass দৃশ্যটিকে আরও হিমশীতল করে তোলে। বালুর প্রতিটি দানা মনে করিয়ে দেয় যে, সময়ও এই খেলারই একটি অংশ।
লোকটি খেলা চালিয়ে যেতে পারে, পরিকল্পনা করতে পারে এবং প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে—কিন্তু এই লড়াই সমানে-সমান নয়। মৃত্যু জেতার জন্য কোনো চেষ্টা করছে না। মৃত্যু কেবল সেই জয়ের অপেক্ষায় আছে যা অনিবার্য। আর ঠিক এই বিষয়টিই জার্গের ছবিটিকে এমন এক ভুতুড়ে ও গভীর অনুভূতিতে আচ্ছন্ন করে তোলে।
এখানে কোনো সহিংসতা নেই, কোনো রণক্ষেত্র নেই, কিংবা কোনো নাটকীয় চূড়ান্ত মুহূর্তও নেই। আছে কেবল একটি শান্ত ঘর, একটি দাবা-বোর্ড এবং সেই ভয়াবহ উপলব্ধি—জীবন এমন এক খেলা যা আমরা আমাদের সমস্ত বুদ্ধি, ভয় ও আশা দিয়ে খেলি, অথচ খেলার শেষ চালটি আসলে কখনোই আমাদের হাতে থাকে না।
ওভে জার্গে (Owe Zerge) ছিলেন একজন সুইডিশ শিল্পী, যিনি ১৮৯৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৮৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন। জার্গে তাঁর বিমূর্ত (abstract) এবং পরাবাস্তববাদী (surrealist) চিত্রকর্মের জন্য পরিচিত ছিলেন, যেখানে প্রায়শই উজ্জ্বল রঙ এবং সূক্ষ্ম ও জটিল সব অনুষঙ্গের উপস্থিতি দেখা যেত। তাঁর শিল্পকর্মে কিউবিজম (Cubism) এবং এক্সপ্রেশনিজম (Expressionism)-এর সংমিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়, যা বিভিন্ন শৈলীর এক অনন্য মেলবন্ধনকে ফুটিয়ে তোলে। লুই লে ব্রোকি (Louis le Brocquy), ভ্যাসিলি ক্যান্ডিনস্কি (Wassily Kandinsky), থেরেসা ফারবার বার্নস্টাইন (Theresa Ferber Bernstein)-এর মতো সমসাময়িক শিল্পীরা জার্গের শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে ভূমিকা রেখেছিলেন। এই শিল্পীরা জার্গের নান্দনিক বোধের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন এবং তাঁকে তাঁর শিল্পকর্মে নতুন কৌশল ও বিষয়বস্তু নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে অনুপ্রাণিত করেন। চিত্রকর্মের ক্ষেত্রে জার্গের উদ্ভাবনী দৃষ্টিভঙ্গি এবং আধুনিক শিল্প আন্দোলনে তাঁর অবদান আজও তাঁর শিল্প-উত্তরাধিকারের সাক্ষ্য বহন করছে।