08/07/2026
বিশ্বকাপ জেতা প্রতিটি ফুটবলারের স্বপ্ন। কিন্তু এমন কিছু কিংবদন্তি আছেন, যাঁদের মহত্ত্ব কোনও একটিমাত্র ট্রফির মধ্যে আটকে থাকে না। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো সেই তালিকার প্রথম সারির নাম। টানা ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া, ছয়টি আলাদা বিশ্বকাপে গোল করার বিরল কীর্তি, দুই শতাধিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ, একশোরও বেশি আন্তর্জাতিক গোল, পাঁচটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, পাঁচবার বিশ্বের সেরা ফুটবলারের সম্মান এবং পর্তুগালকে ইউরোপের প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা এনে দেওয়া—সংখ্যাগুলোই বলে দেয় তাঁর উত্তরাধিকার কতটা বিশাল।
তবুও একজন ফুটবলপ্রেমীর মন আজও আক্ষেপ করে, যদি একবার বিশ্বকাপ ট্রফিটাও তাঁর হাতে উঠত! এই গল্প কোনও অপূর্ণতার নয়, বরং এমন এক কিংবদন্তির, যিনি প্রমাণ করে গিয়েছেন যে সত্যিকারের মহত্ত্ব শুধু একটি শিরোপা দিয়ে মাপা যায় না।
----
বিশ্বকাপের মঞ্চে শেষবারের মতো হাঁটছিলেন তিনি। গ্যালারির আলো তখনও জ্বলছে, কিন্তু সেই আলো যেন আর আগের মতো উজ্জ্বল নয়। সবুজ ঘাসের উপর দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। একজন ফুটবলপ্রেমীর কাছে এই দৃশ্য শুধু একটি ম্যাচের সমাপ্তি নয়, একটি যুগের শেষ অধ্যায়। বিশ্বকাপ ট্রফি হয়তো তাঁর হাতে ওঠেনি, কিন্তু ফুটবলের ইতিহাসে নিজের নাম তিনি এমনভাবে লিখে গিয়েছেন, যা কোনও একটি ট্রফির উপর নির্ভর করে না। তবুও মন মানতে চায় না। কারণ কোটি কোটি সমর্থকের মতো তুমিও হয়তো একবার অন্তত দেখতে চেয়েছিলে, লাল-সবুজ পর্তুগাল জার্সিতে রোনাল্ডোর হাতে উঠছে সেই সোনালি বিশ্বকাপ।
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের ফুটবলকে নিজের উপস্থিতিতে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন রোনাল্ডো। ক্লাব ফুটবলে তিনি জিতেছেন পাঁচটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা, পাঁচবার হয়েছেন বিশ্বের সেরা ফুটবলারের সম্মানে ভূষিত, ইংল্যান্ড, স্পেন ও ইতালির লিগ জয় করেছেন, শত শত গোল করে গড়েছেন অসংখ্য রেকর্ড। আন্তর্জাতিক ফুটবলেও তাঁর সাফল্য কম নয়। পর্তুগালের হয়ে দুই শতাধিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে তিনি একশোরও অনেক বেশি গোল করেছেন। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বাধিক গোলদাতার রেকর্ডও তাঁর দখলে। ২০১৬ সালে ইউরোপের সেরা হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করে পর্তুগালকে এনে দিয়েছিলেন প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা। পরে নেশনস লিগ জয়ও এসেছে তাঁর নেতৃত্বেই।
বিশ্বকাপে রোনাল্ডোর যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালে। তারপর ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৬—টানা ছয়টি বিশ্বকাপে মাঠে নেমেছেন তিনি। ফুটবল ইতিহাসে এই কীর্তি আগে কোনও ফুটবলারের ছিল না। আরও একটি অনন্য রেকর্ড তাঁর দখলে। ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার নজিরও গড়েছেন রোনাল্ডো। এত দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বের সর্বোচ্চ মঞ্চে নিজের মান ধরে রাখা যে কতটা কঠিন, তা ফুটবল বোঝা মানুষ খুব ভালো করেই জানে।
তবুও বিশ্বকাপ যেন বারবার একটু দূরেই থেকে গেল। ২০২৬ বিশ্বকাপে পর্তুগালকে ঘিরে প্রত্যাশা ছিল প্রবল। অভিজ্ঞতা আর নতুন প্রজন্মের মিশেলে দলটিকে অনেকেই অন্যতম দাবিদার হিসেবে দেখছিলেন। কিন্তু নকআউট পর্বে স্পেনের কাছে হেরে থেমে যায় পর্তুগালের অভিযান। ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজতেই বোঝা যাচ্ছিল, শুধু একটি দল নয়, হয়তো বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকেও বিদায় নিচ্ছেন ফুটবলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তারকা। কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না থাকলেও বয়স, দীর্ঘ ক্যারিয়ার এবং বাস্তবতা মিলিয়ে এটিই তাঁর শেষ বিশ্বকাপ বলেই মনে করছেন অনেকেই।
অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, বিশ্বকাপ না জিতলে কি একজন ফুটবলারের মহত্ত্ব অসম্পূর্ণ থেকে যায়? ইতিহাস অন্য কথা বলে। ইয়োহান ক্রুইফ, আলফ্রেডো দি স্তেফানো, জর্জ বেস্ট কিংবা ফেরেঞ্চ পুসকাশের মতো কিংবদন্তিরাও বিশ্বকাপ জিততে পারেননি। তবুও তাঁদের নাম ফুটবলের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। রোনাল্ডোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাঁর সাফল্য শুধু ট্রফির সংখ্যায় নয়, প্রতিদিন নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার অদম্য মানসিকতায়, শৃঙ্খলায়, পরিশ্রমে এবং দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের সেরাদের মধ্যে নিজের জায়গা ধরে রাখার অসাধারণ ক্ষমতায়।
কিন্তু একজন সমর্থকের হৃদয় সব সময় যুক্তির কথা শোনে না। তাই আজও মনে হয়, যদি একবার সেই সোনালি ট্রফিটা তাঁর হাতে উঠত! যদি শেষ বিশ্বকাপের মঞ্চে কোটি কোটি মানুষের চোখের সামনে পূর্ণ হতো সেই স্বপ্ন! হয়তো ইতিহাসের পাতায় নতুন কিছু যোগ হতো না, কারণ তাঁর নাম আগেই অমর হয়ে গেছে। কিন্তু অসংখ্য সমর্থকের হৃদয়ে যে ছোট্ট অপূর্ণতা আজও রয়ে গেল, সেটুকু হয়তো চিরদিনই থেকে যাবে। বিশ্বকাপের ট্রফি তাঁর আলমারিতে নেই, কিন্তু ফুটবলকে ভালোবাসা মানুষের স্মৃতিতে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো এমন এক নাম, যার আলো কোনও শিরোপার চেয়েও অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকবে।