09/05/2026
আজ ২৫ বৈশাখ।
রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী।
আজ দেশব্যাপী উদযাপিত হবে এই দিন। পূজিত হবেন কবিশ্রেষ্ঠ রবীন্দ্রনাথ। একটা উৎসবের মেজাজে ভাসব আমরা সবাই। যেমন ভাসি আর অন্য উৎসবে। চর্চিত হবে তার প্রেম ও প্রকৃতির গান। তারপর এই দিনটি অতিক্রান্ত হলে আবার যেই কে সেই। এভাবেই পূজার ছলে ভুলে থাকার মধ্য দিয়েই চর্চা করে চলেছি আমরা রবীন্দ্রনাথকে।
কিন্তু যে রবীন্দ্রনাথ সম্প্রীতির, যে রবীন্দ্রনাথ প্রতিবাদের, যে রবীন্দ্রনাথ অনুপ্রেরণার আজ এই বিপন্ন সময়ে আসুন তাকে চর্চা করি।
যে রবীন্দ্রনাথ আমাদের শিক্ষা দেয় মানুষকে নিজের করে পেয়ে মানুষ হওয়াই হল বাকি সব হওয়ার শুরু---
"সাহিত্যের শিক্ষাতেই আমরা আপনাকে মানুষের এবং মানুষকে আপনার বলে অনুভব করছি। তারপরে আমরা ডাক্তারি শিখে মানুষের চিকিৎসা করি, বিজ্ঞান শিখে মানুষের মধ্যে জ্ঞান প্রচার করতে প্রাণপাত করি। গোড়ায় যদি আমরা মানুষকে ভালোবাসতে না শিখতুম তাহলে সত্যকে ভালোবাসতে পারতুম কি না সন্দেহ" (সাহিত্য)।
রবীন্দ্র সৃষ্টি তাই মানবমুখি। কোন মানুষ? এ সভ্যতার অসহায় মানব সন্তান। যাদের শ্রমে এ সভ্যতার ভীত রচনা হয়, রবীন্দ্র সাহিত্য সে মানুষের পক্ষে। তাই তিনি বলেন
"চিরকালই মানুষের সভ্যতায় এক দল অখ্যাত লোক থাকে, তাদেরই সংখ্যা বেশি, তারাই বাহন, তাদের মানুষ হবার সময় নেই; দেশের সম্পদের উচ্ছিষ্টে তারা পালিত। সবচেয়ে কম খেয়ে কম পরে কম শিখে বাকি সকলের পরিচর্যা করে ; সকলের চেয়ে বেশি তাদের পরিশ্রম, সকলের চেয়ে বেশি তাদের অসম্মান। কথায় কথায় তারা উপোসে মরে' উপরওয়ালাদের লাথি- ঝাটা খেয়ে মরে-- জীবনযাত্রার জন্য যত কিছু সুযোগ সুবিধে সব কিছুর থেকেই তারা বঞ্চিত। তারা সভ্যতার পিলসুজ, মাথায় প্রদীপ নিয়ে খাড়া দাড়িয়ে থাকে--- উপরের সবাই আলো পায়, তাদের গা দিয়ে তেল গড়িয়ে পড়ে।"(রাশিয়ার চিঠি)।
রবীন্দ্রকাব্য সেই মানুষের পক্ষে--
"ওরা চিরকাল
টানে দাঁড়, ধরে থাকে হাল;/ ওরা মাঠে মাঠে
বীজ বোনে, পাকা ধান কাটে।/ ওরা কাজ করে
নগরে প্রান্তরে" ( ওরা কাজ করে)
তাই কবি বলেন
"মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক,/আমি তোমাদেরই লোক/আর কিছু নয়/
এই হোক শেষ পরিচয়," (পরিচয়)।
মানুষই রবীন্দ্রসৃষ্টির মূল প্রাণ সত্তা। সেই মানুষ ধর্মের নয়, জাত পাতের নয়। নয় সম্প্রদায়ের।
তাই মানুষে মানুষে বিভাদকামী মৌলবাদকে কটাক্ষ করেছেন কবি, বলেছেন--
"ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে /অন্ধ সে জন মারে/ আর শুধু মরে"
বলেছেন, "পূজা গৃহে তোলে রক্তমাখানো ধ্বজা/ দেবতার নামে এ যে শয়তান ভজা।" এভাবেই রবীন্দ্রসৃষ্টি প্রাসঙ্গিক হয়ে যায় বারবার। প্রাসঙ্গিক হয়ে যায় তার প্রাণসত্তা দিয়ে। অলঙ্কার দিয়ে নয়।
কবি যখন নির্মলকুমারী মহলানবীশকে লেখা চিঠিতে বলেন
"এরা সভ্য জাত! আজ দুশো বছরের সিভিলাইজড রাজ্য শাসনের ফলে দেশে না আছে অন্ন, না আছে শিক্ষা, এমনকি একটুখানি তৃষ্ণার জল তা-- আমরা পাইনি, কিন্তু পেয়েছি শুধু ল এন্ড অর্ডার"
স্বাধীন দেশেও এ কথা প্রাসঙ্গিক হয়ে যায়না কি! আজ আমরা যারা সৃজনশীলতার সাথে যুক্ত, আমাদের সৃষ্টি কি এই মানুষের কথা বলে? যেমন বলেছেন রবীন্দ্রনাথ। শুধু শিল্পী সত্তানিয়ে সমাজের ঘটে চলা অন্যায়ের থেকে দূরে সরে থাকেননি তিনি। নিপাট কাব্য চর্চায় আত্মনিয়োগ করেন নি। সব সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিলেন সামনের সারিতে। ১৮৯৭ সালে সংবাদ পত্রের কণ্ঠরোধকারী সিডিশন বিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন যে রবীন্দ্রনাথ, যে রবীন্দ্রনাথ প্রতিবাদ করেন ১৯১২ সালের ভারত রক্ষার নামে ভারতবাসীকে অত্যাচারের আইনের বিরুদ্ধে, যে রবীন্দ্রনাথ জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের পর ছটফট করেছেন, বলেছেন--
"এই দুঃখের তাপ আমার বুকের পাজর পুড়িয়ে দিলে।... কেবল মনে হতে থাকল-- এর কোনো উপায় নেই? কোনো প্রতিকার নেই? কোনো উত্তর দিতে পারব না? কিছুই করতে পারব না? এও যদি নীরবে সইতে হয়, তা হলে জীবন ধারণ যে অসম্ভব হয়ে উঠবে।" তারপরে ত্যাগ করেন নাইটহুড। সে রবীন্দ্রনাথকে আমরা কতজন উপলব্ধি করি? শুধু ঘটনায় নয়, তার এ যন্ত্রণা আমাদের কতজনকে স্পর্শ করে! তিনিই ত বিশ্বত্রাস মানবতার শত্রু ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লেখক শিল্পীদের হয়ে বিশ্বময় শান্তির বানি নিয়ে ফ্যাসিবাদের পরাজয় কামনা করে পদচারণা করেন। যিনি বাজার দখলের সাম্রাজ্যবাদী লোভকে উদঘাটন করে দিয়ে বলেন,
"বাণিজ্য আজ আর শুধু বাণিজ্য নয়, সাম্রাজ্যের সাথে তার গান্ধর্ব বিবাহ ঘটিয়া গিয়াছে।" সাম্রাজ্যবাদ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তার অমোঘ বাণি----
"নাগিনীরা চারিদিকে/ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস/ শান্তির ললিত বানী/ শুনাইবে ব্যর্থ পরিহাস/ যাবার আগে তাই/ ডাক দিয়ে যাই/
দানবের সাথে যারা/
সংগ্রামের তরে/
প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে"
এই রবীন্দ্রনাথের চর্চা আজ খুব প্রাসঙ্গিক। সব শেষে বলব যিনি তার জীবন দিয়ে বয়ে নিয়ে বেড়িয়েছেন দু -দুটো বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাত, দেখেছেন মড়কে ক্ষুধার্ত মানুষের বুক চেরা গভীর আর্তি। দেখেছেন এক জাতির উপর আরেক জাতির অত্যাচার, শোষন। এত দেখেও তিনি হতাশায় জীবন বিমুখ হন নি। শেষ জীবনে সোভিয়েত রাশিয়াতে গিয়ে তিনি দেখেছেন এ ধনতান্ত্রিক সভ্যতার অসীম লোভের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে আরেক সভ্যতা। যা দেখে আশায় বুক বেধেছেন কবি। বলেছেন
"সোভিয়েত ব্যক্তিগতভাবে ধনীকে বঞ্চিত করেছে, কিন্তু যে ঐশ্বর্যে সমস্ত মানুষের চিরদিনের অধিকার--- বর্বরের মতো তাকে নষ্ট হতে দেয়নি। এতদিন যারা পরের ভোগের জন্য জমি চাষ করে এসেছে এরা তাদের যে কেবল জমির স্বত্ব দিয়েছে তা নয়, জ্ঞানের জন্য, আনন্দের জন্য মানব জীবনের যা কিছু মূল্যবান সমস্ত তাদের দিতে চেয়েছে' ( রাশিয়ার চিঠি)।
পরে বলেছেন, "শ্রেষ্ঠ তীর্থ দর্শন।" এই রবীন্দ্রনাথ আজও ভীষণ ভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি চেয়েছিলেন মানুষের সর্বাঙ্গিন বিকাশ। জ্ঞানে, চিন্তায়, নৈতিকতায়, বৈজ্ঞানিক যুক্তি বোধে। মিথ্যাকে কখনই প্রশ্রয় দেন নি কবি। বলেছেন, "সত্য কঠিন, সে কঠিনেরে ভালোবাসিলাম" তার সেই চাওয়াকে আমাদের জীবনে অর্জনের জন্য সংগ্রামে আত্মনিয়োগের মধ্যেই আছে আজকের রবীন্দ্রচর্চা। যে রবীন্দ্রচর্চা আমাদের মানুষ হতে বলে, বলে "মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ"। তাই হয়ত আজকের শাসক রবীন্দ্রসৃষ্টির এই দিকগুলিকে আড়াল করতে চায়। তাই হয়ত কোথাও কোথাও নিষিদ্ধ হয়ে যান রবীন্দ্রনাথ। তখন আমাদের রবীন্দ্রপ্রেম যেন কবির বানি বয়ে নিয়ে যেতে কুণ্ঠিত না হয়। আসুন রবীন্দ্রমননের এই দিকগুলিকে সুগভীর উপলব্ধি দিয়ে আমরা চর্চা করি। রবীন্দ্রসৃষ্টিকে সাথে নিয়ে যাত্রা করি মনুষ্যত্বের পথে। তাহলেই আমাদের রবীন্দ্রচর্চা সার্থক।
'উন্মেষ' পরিবারের পক্ষ থেকে মানবপ্রেমী কবিকে শ্রদ্ধার্ঘ্য