03/08/2026
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর উত্তরাধিকার: ইতিহাস, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বর্তমান রাজনীতির প্রশ্ন
বিজেপি সাংসদ অনন্ত মহারাজের বুটের নিচে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু - এ ছবি নির্দ্বিধায় শেয়ার করে চলেছে তথাকথিত মহারাজের অনুগামীরা। এর মাত্র কিছুদিন আগে বিজেপি নেতা শমীকবাবু রীতিমত বিষোদগার করেছেন সুভাষ বসুকে নিয়ে। তিনি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর গড়ে তোলা ফরোয়ার্ড ব্লক দলটিকে উনি গুন্ডাদের দল বলেন। আসলে ইতিহাস বলে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আর শ্যামাপ্রসাদ কখনো একসাথে যায় না। তাই এর আগে যতই সুভাষ বসুর গুমনামি তত্ত্ব হাজির করে নিজেদের দিকে ঝোল টানার চেষ্টা করুক না কেন, তা যে ধোপে টেকেনি তা তো বেশ বোঝা যাচ্ছে। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের হিন্দু মহাসভার রাজনীতির তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন।
বিজেপি সাংসদ অনন্ত মহারাজের কিছু ইতিহাস বিকৃত করা বক্তব্য দিয়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে অসম্মান করা শুরু হয় (লিঙ্ক কমেন্ট বক্সে)। এখন প্রশ্ন হল কে এই অনন্ত তথাকথিত "মহারাজ" – পূর্ব পরিচিতি - গ্রেটার কোচবিহার পৃথক রাজ্যের দাবিতে অনেকদিন ধরেই আন্দোলন করছে গ্রেটার কোচবিহার পিপলস অ্যাসোসিয়েশন(GCPA)। প্রথম GCPA-র প্রধান নেতা ছিলেন বংশীবদন বর্মণ - ২০০৫ সালে আন্দোলন শুরু করেন। উত্তাল হয়ে ওঠে কোচবিহার। এরপর বংশীবদন গ্রেফতার হন। এর মাঝে হঠাৎ আবির্ভাব হয় অনন্তের। বংশীবদন গ্রেফতার হওয়ার পর ধীরে ধীরে আন্দোলনের রাশ নিজের হাতে নেন অনন্ত মহারাজ। ধীরে ধীরে তাঁর পক্ষে সমর্থন বাড়ে। অনন্ত মহারাজ নগেন্দ্র রায় নামেও পরিচিত, একজন ভারতীয় রাজনীতিবিদ, বর্তমানে ভারতীয় জনতা পার্টির সদস্য। তিনি পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভারতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় নির্বাচিত হন।
শাসকশ্রেণি যখন নিজের রাজনৈতিক সংকট ঢাকতে চায়, তখন তারা ইতিহাসকেও নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করে। স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়কদের উত্তরাধিকার তখন আদর্শের প্রশ্নে নয়, ভোটের অঙ্কে পরিণত হয়। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুও দীর্ঘদিন ধরে সেই রাজনৈতিক দখলদারির শিকার। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু স্বাধীন ও অবিভক্ত ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিভিন্ন নেতা ও প্রবক্তারা প্রায়ই প্রচার চালিয়ে থাকেন। কিন্তু প্রশ্ন হল তাদের সাংসদ অনন্ত মহারাজের বিরুদ্ধে তারা কার্যত মৌনতা অবলম্বন করেছে কেন? অর্থাৎ একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বাংলায় সুভাষ বসুর আবেগকে ব্যবহার করাই কি তাহলে উদ্দেশ্য ছিল? যে সাংবাদিকরা কিছুদিন আগে বীর বিক্রমে মিছিল করলো তারাও কার্যত চুপ - অর্থাৎ কর্পোরেট মিডিয়া পুরো বিষয়টিকে চেপে রাখতে চাইছে বাংলার মানুষের কাছে?
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষের ঐক্য। তিনি কখনও ধর্মীয় পরিচয়কে রাষ্ট্রগঠনের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেননি। চিত্তরঞ্জন দাশের বেঙ্গল প্যাক্টের প্রভাব, ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের ঐক্যের চেতনা এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত সংগ্রামের ধারণা তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রে ছিল। তাঁর কাছে ভারত ছিল হিন্দু, মুসলিম, শিখ, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী—সমস্ত মানুষের যৌথ মাতৃভূমি। সেই কারণেই আজাদ হিন্দ ফৌজে ধর্মের ভিত্তিতে কোনো বিভাজন ছিল না; ছিল সংগ্রামের ভিত্তিতে ঐক্য।
আজাদ হিন্দ ফৌজের মূলমন্ত্র—“ইত্তেফাক, ইত্তেমাদ, কুরবানী” অর্থাৎ একতা-ভরসা-ত্যাগ - শুধু একটি স্লোগান নয়, ছিল একটি রাজনৈতিক দর্শন। ঐক্য, পারস্পরিক আস্থা এবং আত্মত্যাগের মাধ্যমে মুক্ত ভারতের স্বপ্ন নির্মাণই ছিল তার লক্ষ্য। "স্বরাজ"-এর পরিবর্তে "আজাদ" শব্দের ব্যবহার, হিন্দুস্তানি ভাষায় জাতীয় সংগীত রচনা, সামরিক কাঠামোয় ধর্মনিরপেক্ষ চর্চা— এসবই প্রমাণ করে যে নেতাজির ভারতবর্ষ ছিল সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ঊর্ধ্বে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, আজ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর উত্তরাধিকার হিসাবে অধিকাংশ বাঙালি সমাজ নিজের ব্যক্তি অবস্থান রক্ষাতেই বেশি ব্যস্ত; ইতিহাস, মর্যাদা ও সত্যের প্রশ্নে উচ্চকণ্ঠ হওয়ার সাহস ক্রমশ হারিয়ে ফেলছে। যে বাঙালি একসময় চিন্তা, সংস্কৃতি ও স্বাধীনতার আদর্শে সমগ্র ভারতকে পথ দেখিয়েছিল, সেই বাঙালিই আজ কি আত্মগোপনের এক সংকীর্ণ পরিসরে নিজেকে বন্দী করে ফেলছে? এই প্রশ্ন আমাদের সকলের সামনে রয়েছে।
তবে এই বিতর্কে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে মনে রাখা জরুরি—কোনো ব্যক্তি বা জনপ্রতিনিধির কর্মকাণ্ডের দায় কখনোই একটি সম্পূর্ণ জনজাতি, সম্প্রদায় বা অঞ্চলের মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। সেটি ন্যায়বিচার নয়, মানবিকতাও নয়। একই সঙ্গে ইতিহাসের সত্যকে আড়াল করা, অথবা বিতর্কিত ঘটনার ক্ষেত্রে নীরব থাকা, একটি গণতান্ত্রিক সমাজের পক্ষে শুভ লক্ষণ নয়। ইতিহাসের মর্যাদা রক্ষা, সত্য প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় ব্যক্তিত্বদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন— এসব কোনো দলীয় আনুগত্যের বিষয় নয়; এগুলো গণতান্ত্রিক চেতনা ও নাগরিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।
অতএব, আমার আবেদন—কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ নয়, আবার ইতিহাসের প্রশ্নে নীরবতাও নয়। সত্যকে সত্য বলার সাহস, ইতিহাসকে মর্যাদা দেওয়ার দায়িত্ব এবং মানবিক মূল্যবোধকে অটুট রাখার মধ্য দিয়েই একটি সুস্থ সমাজ গড়ে উঠতে পারে। সেই পথ বাঙালিকে
গ্রহণ করতে হবে।
নোট - লেখার স্বপক্ষে তথ্য কমেন্ট বক্সে রইল