27/05/2025
"থার্ড থিয়েটার -বাংলা নাটকের এক বিপ্লবী পর্ব"
লেখক: পুষ্পেন্দু রায়
বাংলা নাটকের ইতিহাসে ‘থার্ড থিয়েটার’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক পরিবর্তনের নাম। এই ধারা শুধু নাটকের আঙ্গিক নয়, দর্শন এবং পরিবেশনের প্রথাগত গণ্ডিকেও ভেঙে দেয়। এই আন্দোলনের জনক বাদল সরকার, যিনি বাংলা থিয়েটারকে উপহার দেন এক নতুন জীবনবোধ এবং নাটকচর্চার একটি অল্টারনেটিভ পথ।
থার্ড থিয়েটার: একটি সংজ্ঞা
‘থার্ড থিয়েটার’ শব্দটি থেকেই বোঝা যায় যে এটি প্রচলিত প্রথম ও দ্বিতীয় ধারার বাইরে একটি বিকল্প পন্থা।
"ফার্স্ট থিয়েটার" ছিল প্রথাগত প্রোসেনিয়াম মঞ্চনির্ভর নাট্যরীতি, যা বেশি শহুরে ও অভিজাত শ্রেণির জন্য নির্মিত।
"সেকেন্ড থিয়েটার" ছিল সমাজ-রাজনীতির প্রতিফলন, IPTA-ঘরানার প্রভাবশালী রীতি।
এই দুই ধারা থেকেই ভিন্নতর পথে হাঁটে থার্ড থিয়েটার। এটি জন্ম নেয় ১৯৬০-৭০-এর দশকে, যখন তরুণ নাট্যকাররা উপলব্ধি করেন—নাট্যচর্চাকে মানুষের আরও কাছে, আরও সহজ ও অন্তরঙ্গ করে তোলা দরকার।
বাদল সরকার: একজন নাট্য-সাধক
বাদল সরকার (১৯২৫–২০১১) ছিলেন থার্ড থিয়েটারের প্রাণপুরুষ। প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও, নাট্যচর্চার প্রতি তাঁর ভালোবাসা তাঁকে নিয়ে আসে এক নতুন পথে। তাঁর বিশ্বাস ছিল, নাটক হতে হবে মানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতার ভাষ্য—নির্ভর করবে না মঞ্চ, আলো কিংবা প্রযুক্তির উপর।
তাঁর বিখ্যাত উক্তি: “থিয়েটার হল সম্পর্কের শিল্প।”
তিনি বিশ্বাস করতেন নাটক দর্শকের সঙ্গে একটি জীবন্ত সংলাপ, যেখানে কোনও দেয়াল নেই। দর্শক-অভিনেতার বিভাজন বিলুপ্ত হয়ে যায়।
থার্ড থিয়েটারের বৈশিষ্ট্য
অপ্রথাগত স্থান: স্কুলের মাঠ, পার্ক, খোলা চত্বর, গ্রামীণ প্রাঙ্গণ—যেকোনো জায়গায় নাটক মঞ্চায়ন করা যায়।
সহজ কুশল ও পোশাক: অভিনয় কৌশলকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, প্রপস বা কস্টিউম নয়।
দর্শক-অভিনেতার মিশ্রণ: নাটক যেন একটা সমবেত যাত্রা, যেখানে দর্শক শুধু দর্শক নয়—প্রক্রিয়ার অংশীদার।
আত্মবিশ্লেষণমূলক থিম: সমাজের গভীর প্রশ্ন, অস্তিত্ব, নিপীড়ন, নাগরিকতা ইত্যাদি থার্ড থিয়েটারের মূল উপজীব্য।
বাদল সরকারের প্রধান নাটকসমূহ
“এবং ইন্দ্রজিৎ” (১৯৬৩): নাগরিক জীবনের একঘেয়েমি ও অস্তিত্বের সঙ্কট নিয়ে তৈরি এক গভীর নাটক।
“ভোমা”: সমাজের নিপীড়িত শ্রেণির আত্মপ্রকাশ।
“জুলুস”: গণ-আন্দোলনের ভাষ্য, যেখানে ব্যক্তির অভিজ্ঞতা সমাজের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
এইসব নাটকে দেখা যায় এক ধরণের পল্লবিত কবিতা ও গণনাট্যের মিলন—যেখানে শব্দ, দেহভঙ্গি, আবেগ এবং স্তব্ধতা—সব একত্রে গড়ে তোলে নাটকের আত্মা।
প্রভাব ও উত্তরাধিকার
বাদল সরকারের থার্ড থিয়েটার শুধু ভারত নয়, আফ্রিকান ও লাতিন আমেরিকান থিয়েটার আন্দোলনের সঙ্গেও সুর মিলিয়ে চলে। তাঁর নাট্যভাবনা পরবর্তী নাট্যকর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে—বিশেষত গ্রামাঞ্চল ও বিকল্প থিয়েটার দলের মধ্যে। ভারতের বাইরে থার্ড থিয়েটার আন্দোলনের তুলনা করা হয় ব্রাজিলের অগুস্তো বোয়ালের "Theatre of the Oppressed" এর সঙ্গে।
উপসংহার
বাদল সরকার ও তাঁর থার্ড থিয়েটার নাটককে এক নতুন দিশা দেখিয়েছে। তিনি প্রমাণ করেছেন, থিয়েটার শুধুই বিনোদন নয়—এটি সমাজ-মানুষ-মননের অন্তর্গত সঙ্কটের এক নির্মম আয়না। আজকের নাট্যচর্চায় যেসব বিকল্প রীতি, ছোট মঞ্চ, বা খোলা চত্বরভিত্তিক অভিনয় দেখা যায়, তার অনেকটাই ঋণী এই ভাবনার কাছে।
থার্ড থিয়েটার আমাদের মনে করিয়ে দেয়: নাটক একটি মুক্তির শিল্প, যেখানে না আছে দেওয়াল, না আছে বিভাজন—আছে কেবল মানুষ ও মানুষের গভীর সংলাপ।