09/03/2017
বিশ্ববসু বিশ্বাস লিখছেন -
নাট্য সমালোচনা লইয়া কী করিতে হইবে!
এডিট করিতে হইবে। এডিট করিয়া এমন অদ্ভুত করিতে হইবে যাহাতে কী নাটক, কেন নাটক, কী দেখিবেন, কেন দেখিবেন, কী দেখিবেন না, কেন দেখিবেন না ইত্যাদি সকলই তালগোল পাকাইয়া যায় এবং সমালোচনাটি ভীষণ অরাজনৈতিক হইয়া ওঠে। নাট্য সমালোচনার শুরুতে কোনও শিরোনাম থাকিবে না। কেউ আসিয়া ঘোষণা করিবেনা সমালোচনাটি সদ্যপ্রয়াত নাট্যব্যক্তিত্ব এস এস তারাপোরেকে উৎসর্গ করা হইল এবং কেউ জানিবেনা একুশ শতকে দাঙ্গাবিধ্বস্ত রবীন্দ্র সরোবর স্টেডিয়ামে বসে লেখা এই অরাজনৈতিক সমালোচনাটি লিখনকালে সমালোচকের পশ্চাতে একটি অ্যানোফিলিস মশা কী জোর কামড়াইয়াছিল।
আপনি অ্যাকাডেমি গেলেন। টিকিট কাটলেন। খান দুই সিগ্রেট খেলেন। লাইনে দাঁড়ালেন। তখনও আপনি একটি প্রচণ্ড রাজনৈতিক নাটক দেখবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মনে মনে। বিকেল থেকেই নিয়ে এসেছেন। গোল্ডফ্লেক না খেয়ে জল-বাতাসা খেয়েছেন, মেট্রোয় না এসে রিক্সো করে এসেছেন, জাঙিয়া না পরে ল্যাঙট্ পরে এসেছেন রাজনৈতিক নাটক দেখার আশায়। হঠাৎ আপনার হাতে একখানি কাগজ কে যেন গুঁজে দিয়ে চলে গেল। তাতে লেখা এটি একটি ‘অরাজনৈতিক’নাটক। হিন্দু মৌলবাদের যেক’টা বাছা বাছা পিস নিয়ে মঞ্চে ঝড় উঠবে ভেবে আপনি আজ রান্নায় নুন দিতে ভুলে গ্যাছেন তার একটিও এই নাটকে নেই। নাজীব নেই, শিবসেনা নেই। এমনকি নাটকটা কাউকে উৎসর্গও করা হচ্ছেনা। অ্যাকাডেমি থেকে পাঠানো উৎসর্গবার্তা পেয়ে নাজীব তার অজ্ঞাতবাস থেকে স্কাইপ করে যে আশ্চর্য শান্ত গলায় “থ্যাঙ্ক্যু ফ্রেন্ডস” বলতেন সেটা শুনবেন বলে আপনি আপনভোলা হয়ে আপনার মেয়ের স্কুলের ব্যাগে ভুল করে দুটো বাংলা চটি ভরে দিয়েছেন আজ, অথচ! আকাশ ভেঙে পড়ল আপনার মাথায়।রসনিষ্পত্তি হইবে কী উপায়ে? অ্যানাউন্সমেন্ট? না তাও নেই। কেউ আপনাকে ফোন বন্ধ করার কথাও নাকি মনে করাবে না। এক চোখ জল নিয়ে গুটিগুটি হলে ঢুকতে যাবেন, হঠাৎ ঘাড়ের কাছে একটি পুরুষ কণ্ঠ ফিসফিসিয়ে উঠলো—“দাদা, ফোনটা বন্ধ।” সকলই তোমারই ইচ্ছা, ইচ্ছাময়ী তারা তুমি।
আপনি বসলেন, আপনার বন্ধুবান্ধব চেনা অচেনা সকলে বসল। সিটনম্বর নেই, তাই আরও একটু মাঝখান খুঁজে আপনি আরেকবার বসলেন। দেখলেন ততক্ষণে মঞ্চের অন্ধকারে এসে বসেছে একটি পুরুষ চরিত্র। মঞ্চ বলতে তিন দেওয়ালের সাদা একটি খোপ। সাদা সোফা, সাদা টেবিল, সাদা চেয়ার, সাদা ল্যাপটপ, সাদা টুল। সাদা টুল’টা বেমানান কিন্তু সেদিকে আপনার মনোযোগ যাবেনা। কারণ ততক্ষণে মঞ্চের অন্ধকারে এসে বসেছে একটি পুরুষ চরিত্র। আপনি তাকে দেখছেন। সেও আপনাকে দেখছে।আপনি আলোয়, সে অন্ধকারে। আপনি উঠে এসে মাঝখানে বসা নিয়ে একটু লজ্জা পেলেন। এই নাটকের অরাজনৈতিক চরিত্র সম্পর্কে আপনার অজ্ঞানতা আপনার বুকের মধ্যে একবার ছ্যাঁত করে উঠল। কিন্তু সেই অমোঘ বসে থাকা থেকে আপনি চোখ ফেরাতে পারলেননা যতক্ষণ না সেই ছায়ামানুষটি তার হাতের মোবাইলখানা বার কয়েক নাড়াচাড়া করে একটি সুস্পষ্ট অপেক্ষার ইঙ্গিত দিলেন, একটি নারীচরিত্র গেটউইং দিয়ে বেরিয়ে গটগট করে সেই তিন দেওয়ালের খোপে ঢুকে পড়লেন এবং একটা প্রচণ্ড আলো মঞ্চজুড়ে হঠাৎ জ্বলে উঠে আপনার আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার উপক্রম হল। আপনি দেখলেন একটি ঝকঝকে নির্লজ্জ সুসজ্জিত ঘর এবং তার মধ্যে বেজায় নির্লিপ্ত দুটি মানুষ। আপনি ওয়াকিবহাল হলে এই বাক্সআকৃতির বর্ণহীন মঞ্চসজ্জা এবং তাতে ছায়াহীন আলোকসম্পাত আপনাকে আনন্দ দেবে। আপনি নড়েচড়ে বসবেন। অতঃপর –
এক দীর্ঘ কথোপকথন। কথোপকথন ঠিক নয়, অভিজ্ঞান বলা যেতে পারে। সংলাপ নয়, যেন স্মৃতিচারণ। স্মৃতির মতো উত্তেজক, স্মৃতির মতো অপ্রাসঙ্গিক। পুরুষটি বিজ্ঞাপনচিত্র বানিয়ে থাকেন, নারীটি ইংরেজি পড়িয়ে থাকেন। পুরুষটি ছটফটে, অভিমানী, বয়ঃসন্ধিকাল—প্রকাশ্যে। নারীটিও ছটফটে, অভিমানী, বয়ঃসন্ধিকাল— অপ্রকাশ্যে। পুরুষটি স্থিতাবস্থার সাথে দ্বন্দ্বে অবস্থান করেন, স্থিতাবস্থা থেকে ছিটকে বেরোতে চান। নারীটি স্থিতাবস্থার সাথে একটি শ্লেষাত্মক নির্লিপ্তি নিয়ে সহাবস্থান করেন। পুরুষটি হিন্দু, নারীটি মুসলমান।এবং সবচেয়ে গুরুতর ঘটনা—পুরুষটির একটি অপর পক্ষ আছে— পেশাগত প্রতিদ্বন্দ্বী, ক্রিয়েটিভ ফো।
তাহাকে নিয়ে কী করিতে হইবে? পুরুষটি তাহাকে নিয়ে দেয়ালা করিবেন, ঘ্যানঘ্যান করিবেন, কল্পনায় তাহাকে মারিবেন ধরিবেন, তাহার কৃপাধন্য হইতে চাহিবেন, তাহার স্কন্ধে উঠিয়া নৃত্য করিতে চাহিবেন আর নারী সেই দেয়ালা শুনিবেন, তর্ক করিবেন, পুরুষকে কোলে শোয়াইয়া সান্ত্বনা করিবেন, খুনসুটি করিয়া মুখে হাসি ফুটাইবেন, বকিয়া ঝকিয়া মানুষ করিবারও চেষ্টা করিবেন এবং ক্রমশ তার নিজস্ব অপরের প্রতি বিরক্ত হইয়া কান্নাকাটিও করিবেন। ইহা একটি লুপের মতো ঘুরিবে। আসলে এক প্রবহমান কর্তা-কর্মের খেলা আপনাকে একটি কালেক্টিভ বোরডমের দিকে ঠেলিবে। উচ্চমধ্যবিত্তের প্রেম, যাপন, কামনা, অর্থনীতি, পরকীয়া, সমাজ সচেতনতা ইত্যাদি সকলই ওই তৃতীয়পক্ষের চারিদিকে ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ্-এর ঘুরন্ত দেওয়ালের মতো ঘুরিতে ঘুরিতে আপনাকে এক নিরেট অর্থহীনতার দিকে টানিতে থাকিবে। দিবসের শেষে তাহারা অ্যানিভার্সারির কেক-এ ফুঁ দিয়া মোমবাতি নিভাইয়া কর্তব্য পালন করিবেন। অথ উত্তরাধুনিক দাম্পত্যবিষাদ। কী চমৎকার ক্লিশে। অ্যাকাডেমির অন্ধকারের মধ্যে একটি সাদা বক্স টেলিভিশনে ফেডইন ফেডআউট-এর খেলা চলতে থাকবে, এপিসোডের পর এপিসোড চলতে থাকবে, একরাশ মুখের ওপর সাদা আলো জ্বলতে এবং নিভতে থাকবে। ফেডইন ফেডআউট-এর খেলা চলতে থাকবে, এপিসোডের পর এপিসোড চলতে থাকবে, একরাশ মুখের ওপর সাদা আলো জ্বলতে এবং নিভতে থাকবে। ফেডইন ফেডআউট-এর খেলা চলতে থাকবে, এপিসোডের পর এপিসোড চলতে থাকবে, একরাশ মুখের ওপর..
ভালো লাগছে আপনার? নাটকটা আর তেমন অরাজনৈতিক মনে হচ্ছেনা? হচ্ছে? তাও আপনি মজা পাচ্ছেন? আপনার রাজনৈতিক সততা কী ধুলোয় মিশে গ্যাছে? আপনি কী একটি আলটপকা রাজনৈতিক সংলাপ শুনে রিলেট করতে পেরেছেন এবং আপনার ছাপ্পান্ন ইঞ্চির ভুঁড়ি দুলিয়ে হেসে উঠেছেন? অথবা প্রতিটি ফেডআউটে যখন প্রমাণিত হচ্ছে দম্পতি আসলে দম্পতির কাছে ফেরে তখন কী আপনি প্রতিবার হাততালি দিয়ে ফেলছেন আলো নিভে আসার নিপাট অভ্যেসে? নাকি কোনও এক টুকরো দৃশ্য হঠাৎ সংলাপহীন থেকে গেলে আপনি সেটা কমিক রিলিফ ভেবে হেসে উঠতে গিয়েও উঠছেননা বাকি কেউ হাসছে না বলে? কী করছেন আপনি? আপনাকে নিয়ে কী করিতে হইবে? আপনি কী ঘুমিয়ে পড়েছিলেন? রিপিটেশনের অভিঘাত আপনাকে জাগিয়ে রাখতে পারেনি? নাকি হঠাৎ একবার জেগে উঠে নাটকের নায়ককে স্কিপিং করতে দেখে আবার ভয় পেয়ে নিদ্রায় ফিরে গ্যাছেন ?
আপনার আর দোষ কী? যে সংলাপ নির্মোহ থাকার কথা ছিল তা যদি হঠাৎ ক্ষেপিয়া উঠিয়া খানকয়েক হৃদয়বিদারী শব্দের প্রয়োগ করিয়া আপনাকে একটি নাটকীয় করতালির দিকে প্ররোচিত করিয়া মুখের ওপর আলো নিভাইয়া দেয় আপনি কী হাত গুটাইয়া বসিয়া থাকিবেন? আপনি যখন নাটকের অরাজনীতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন তখন হঠাৎ একটি মোদীজোক এসে যদি আপনার পাকস্থলীতে সুড়সুড়ি দিয়েই ফ্যালে আপনি খ্যাকখ্যাকিয়ে হেসে উঠবেন না-ই বা কেন? আপনি তো বুঝতেই পারছেননা নাটকটি আপনাকে বিষণ্ণ করতে চাইছে নাকি ঝালমুড়িতে কাঁচাছোলার মতো হাস্যরস ছড়িয়ে দিয়ে বিনোদন যোগাতে চাইছে। না-নাটকের নির্লিপ্তি এবং হ্যাঁ-নাটকের উত্তেজনা, উভয়েরই কিছু আধাখ্যাঁচড়া প্রচেষ্টা আপনাকে ত্রিশঙ্কুপ্রায় ঝুলিয়ে রেখে ঘনঘন ফোন দেখতে এবং হাই তুলতে বাধ্য করছে। আপনার আর দোষ কী বলুন? নাটকটি কি ভয় পাচ্ছে,যে শূন্যতায় তারা আপনাকে পৌঁছে দিতে চায়,যথেষ্ট নাটকীয় উস্কানি না পেলে আপনি সেই অব্দি আপনার সিটে বসে থাকতে রাজি হবেন না! ভয় যদি নাই পাবে তবে সংলাপে সেই শূন্যদশা নির্মাণের দুঃসাহস আপনি একবারও টের পেলেন না কেন, আর ভয় যদি পেয়েই যায় তবে আপনি সেই নাগরদোলায় চড়বেন না-ই বা কেন আর নাচতে নাচতে যাবেন না-ই বা কেন। শুধু মাথায় রাখবেন, ক্লিশে বড় বিপজ্জনক। নাটকটি যদি ক্লিশে হয়, দর্শক হিসেবে আপনিও কম ক্লিশে নন। আপনার নাটকটিকে তেমন প্রয়োজনীয় মনে হচ্ছে না? নাটকটিরও আপনাকে বিশেষ প্রয়োজনীয় মনে হচ্ছেনা। দাঁড়ান, এক মিনিট-
নারী চরিত্রে যিনি অভিনয় করছেন তাকে দেখে আপনি মুগ্ধ হয়ে গ্যাছেন, অমন নির্লিপ্ত, অমন সপাট, অমন তেরচা হাসির ঝকঝকে পারফরম্যান্স আপনি বাংলামঞ্চে অনেকদিন দেখেননি। অভিনয়ের ক্ষেত্রে মুডের পরিবর্তন ব্যাপারটা এডিটের কাটপয়েন্ট-এর মতো। অভিঘাত যেমনই হোক, লোভ সামলাতে না পারলে রেলের কামরার মতো সবসুদ্ধু উল্টোয়। ক’টা অভিনয়ে এমন নিয়ন্ত্রণ পান আপনি যখন সেটা আর অভিনয় থাকেনা, সেটা নিজেই নাটকের শরীর হয়েওঠে? এখানে পাবেন। কিন্তু সেই মুগ্ধতা বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারবেন না। পারবেন না কারণ পুরুষ চরিত্রের অভিনেতাটি ততক্ষণে শো-অফে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। নাটকীয় এবং অনাটকীয়’র মধ্যে যখন তখন যাতায়াত করার অপ্রয়োজনীয় জাগলারি করে বুঝিয়ে দিচ্ছেন তিনি এবার খামচা মারেঙ্গা। নাটকীয় মুহূর্ত এলেই অভিনেতার ব্যাকরণ মেনে নাটকীয় হয়ে ওঠা এই নাটকে খুব একটা জরুরী কিনা এইসব আগডুম বাগডুম ভাবতে ভাবতেই আপনি দেখবেন তিনি লাফাচ্ছেন, ঝাঁপাচ্ছেন, স্কিপিং করছেন, মুহুর্মুহু পোশাক পাল্টে ফেলছেন, প্রতিটি হাস্যরস উদ্রেককারী বাক্যবন্ধ আকস্মিক সশব্দে আপনার দিকে ছুঁড়ে মারছেন, চরিত্রের তোয়াক্কাও করছেননা এবং নেহাত ঘরোয়া নৃত্য নাচবার সময়েও সেটা যাতে ‘নেহাতই নাচ’ হয়ে না থেকে দক্ষ শারীরিক অভিনয়ে উত্তীর্ণ হয় সে বিষয়ে প্রবল চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। শুধু একটিমাত্র দৃশ্যে যেখানে পুরুষটি দর্শকদের দিকে পেছন ঘুরে বসে প্রায় কবিতার মতো একটি সংলাপ বলে চলেন টানা এবং নারীটি গালে হাত দিয়ে অভিব্যক্তিহীন মুখে সেটি শোনেন—না,সেখানেও আপনি খুশি হতে পারলেন না। নাটক নিজেকে সেখানে নিয়ে আসতে পারেনি, অভিনেতা নিজেকে সেখানে নিয়ে আসতে পারেন নি, আপনিও নিজেকে সেখানে নিয়ে আসতে পারেন নি।
এবার আপনি ঘেঁটে যাবেন। আপনার ‘আসা যাওয়ার মাঝে’ নামে একটি বাংলা ছবির কথা মনে পড়বে। মুসুরডাল, কালোজিরে, বাসমতীচাল, উজ্জ্বল একঝাঁক পায়রা ইত্যাদি দেখতে ইচ্ছে করবে। দাম্পত্যলীলা নিয়ে শিল্প করতে গিয়ে ঘেঁটে গেলে এগুলোকেই এতদিন আপনি এস্কেপরুট হিসেবে জেনে এসেছেন। ভেনিসে পুরস্কার পাওয়ার পরে নতুন কৌটো কিনেছেন বাড়িতে মুসুরডাল ঢালবেন বলে। তারপরে এই নাটক দেখতে এসেছেন। হঠাৎ দেখলেন পুরুষটি প্রবল বেগে জিজ্ঞেস করছেন তিনি বিছানায় ভালো বলেই নারীটি তার সাথে থাকেন কিনা এবং নারীটি অভিমানী ধমক সহযোগে তাঁর কাউন্টার করছেন—কে বলেছে পুরুষটি বিছানায় ভালো ? [মুখ নামাইয়া ক্রন্দন]। আপনি এ নাটকের মূল নাটক পড়েন নি। আপনি জানেন না সেটিতে কী আছে। কিন্তু এই পুনর্নির্মাণ এবং তার ডায়লগ ডেলিভারির ঠেলায় আপনি ততক্ষণে চোখে ‘প্রাক্তন’ দেখছেন। দর্শক এত হাততালি দিচ্ছে উঠে যেতেও পারছেন না।ইন্টারভ্যালেই ভেবেছিলেন শেষ, শত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হল। আপনি বসলেন, আপনার বন্ধুবান্ধব চেনা অচেনা সকলে বসল। দেখলেন, মঞ্চের অন্ধকারে এসে বসেছে একটি নারীচরিত্র। মঞ্চ বলতে তিন দেওয়ালের সাদা একটি খোপ। সাদা সোফা, সাদা টেবিল, সাদা চেয়ার, সাদা ল্যাপটপ, সাদা টুল। সাদা টুল’টা বেমানান কিন্তু সেদিকে আপনার মনোযোগ যাবেনা। কারণ ততক্ষণে মঞ্চের অন্ধকারে এসে বসেছে একটি নারী চরিত্র। আপনি তাকে দেখছেন। সেও আপনাকে দেখছে। আপনি আলোয়, সে অন্ধকারে।
বেশ কয়েকটি দৃশ্যের পরে আরেকবার যখন দীর্ঘস্থায়ী ফেড টু ব্ল্যাক হল তখন আপনি দেখলেন অনেকে বলছে—শেষ হয়নি, আরও হবে। এই মজাটিকে পরিচালকের সাফল্য হিসেবে দেখার মানসিক অবস্থায় আপনি তখন নেই। আপনি তখন আতঙ্কে এবং অভিশাপে ওই ‘অনেক’-এর দিকে কটমট করে তাকাতে ব্যস্ত।
হঠাৎ বিনামেঘে বজ্রপাতের মতোএকটি হাততালি শুনতে পেলেন ফ্রন্ট রো-এর বাঁকোণ থেকে, এক ভদ্রলোক উঠে দাঁড়িয়ে একপ্রস্থ বেজায় হাততালি দিয়ে এবং দুনিয়াসুদ্ধ লোককে হাততালিতে উস্কে দিয়ে একলাফে মঞ্চের ওপর উঠে কোথায় একটা হারিয়ে গেলেন। আপনি হতভম্ব।এটা কি নাটকেরই অংশ? যদি হয় তবে আপনার অভিজ্ঞতায় এ জিনিস প্রথম এবং রেভলিউশনারি। এর আগে আপনি কখনও বাংলা নাটকে এমন ঘন্টা বাজিয়ে সমাপ্তি ঘোষণা করতে দেখেননি। ভুল দেখেছেন, ভুল দেখেছেন—বিড়বিড় করতে করতে বেরোলেন, ভেবেছিলেন চেনা কাউকে পেলে জিজ্ঞেস করবেন নাটকের শেষদৃশ্যে মোমবাতি নেভানোর আগে আলো নিভিয়ে দেওয়ার অব্ভিয়াস প্রকল্পটি নাটকটিকে পথভ্রষ্ট করছে কিনা। তাও জিজ্ঞেস করলেন না।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে আপনার প্যান্টের ডান পকেটে সেই ঢোকার আগে পাওয়া ভাঁজ করা কাগজটি টের পেলেন আর ভাবলেন পুরুষটি হিন্দু, নারীটি মুসলমান। পুরুষটি হিন্দু, নারীটি মুসলমান। পুরুষটি হিন্দু, নারীটি মুসলমান। বাড়ি ফিরে বউকে ভালোবেসে কাছে ডাকলেন আর বললেন— তুমি যদি মুসলমান হতে, তোমার নাম দিতুম অভয়। বউ ঠোঁট বেঁকিয়ে হেসে উঠে চলে গেল। আপনি আপনাদের ঝুল বারান্দায় এসে বসলেন কফির কাপ হাতে।
ওহ্, দিস ইস সাচ আ বোর!