01/07/2020
#দাম্পত্য_প্রেম
#রম্য_রচনা
#কলমে_কবিতা_মিত্র
#কভার_এডিটিং_তনিমা_রায়
সকাল থেকেই চলছে দত্ত বাড়িতে চলছে তুলকালাম! দত্ত গিন্নীর চিল চিৎকারে কান পাতা দায়! তার মধ্যেই টেবিলের এককোণে বসে ভবতোষ বাবু খবরের কাগজে মুখ ডুবিয়ে রেখেছেন,,,,,, আসলে আড়াল করে রেখেছেন নিজের মুখ আর মাঝে মাঝেই আঁড়চোখে দেখে নিচ্ছেন গিন্নীর অবস্থান! দত্তবাবু খুবই শান্ত প্রকৃতির মানুষ, এমনিতেই কথা কম বলেন, তার পক্ষে সুবচনী দেবীর বাক্যবাণের পাল্টা জবাব দেওয়া দূরতিকল্প! তাই তিনি চুপ করে থাকাটাই নিরাপদ ভেবে নিয়ে খবরের কাগজে বারবার মনোনিবেশের চেষ্টায় রত রয়েছেন, যদিও তা কিছুতেই সম্ভবপর হচ্ছে না,,,,,,,গিন্নীর কাককন্ঠের দৌলতে! তা প্রায় দু ঘন্টা হতে চললো সুবচনী দেবীর মধুর বচনবর্ষণ-
"বুড়ো বয়সে ভীমরতি,,,,,,দু দুটো মেয়ের বাপ, নাতি-নাতনির দাদু, তবুও শখ গেলো না! পাড়ার ছেলে ছোঁকরাদের মতো এখনো মেয়ে মানুষের সাথে ঢলানি করতে মন চায়? পুরোনো বউ আর ভালো লাগছে না তাই তো? আমিও দেখি কেমন তুমি ওই মেয়ে মানুষের সাথে মেলামেশা করো, দেখা করবে? করাবো দেখা,,,,, দুজনেরই ঠ্যাং খোঁড়া করে রেখে যদি না দিই তবে আমার নামও সুবচনী নয়,,,,, এই আমি বলে রাখলুম!"©️ কবিতা মিত্র
এতদূর বলে দত্তগিন্নী একটু দম নেওয়ার জন্য থামতেই ভাবতোষবাবু সময় পেলেন একটু ভাবার! আসলে যা নিয়ে এতো তুলকালাম সেটা সামান্য একটুকরো কাগজ!! কাগজটা এখনো টেবিলের ওপর রাখা,,,,,,,হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিয়ে দত্তবাবু আরো একবার দেখলেন, এই নিয়ে বারো বার,,,,,,,তবুও মনে করতে পারলেন না এই কাগজটা কোথা থেকে এলো, তাও তার পাঞ্জাবীর পকেটে? সকালে কাঁচার জন্য ধোপাবাড়ি দিতে হবে বলে পাঞ্জাবী হাতড়াতেই গিন্নীর হাতে এটা পড়ে! প্রথমে কিছুক্ষণ জেরা চলবার পরেই সদুত্তর না পেয়ে কথার থার্ড ডিগ্রী শুরু হয়,,,,,তারপরও ভবতোষ বাবু কিছুতেই মনে করতে পারলেন না কাগজটার ব্যাপারে! কাগজটা আরো একবার হাতে নিয়ে দেখলেন,,,,,,,একদিকে লেখা,
প্রিয় পার্কে
দেখা হবে।
অন্যদিকে একটা নাম- সর্বাণী চৌধুরী, তার নিচে একটা ফোন নম্বর! ©️ কবিতা মিত্র
পুরোটাই একটা ধাঁধার মতো লাগছে! ভবতোষ বাবু এমনিতেই বড্ড ভুলোমনা, আজকের কথা কাল ভুলে যান, আর বয়স বাড়ার সাথে সাথে তা যে আরো বেড়েছে বৈ কমেনি সেটা আজকে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন দত্তবাবু! এর থেকে কানে কালা হলে সুবিধা হত,,,,,ভাবতে ভাবতেই গিন্নী এসে ছোঁ মেড়ে কাগজটা হস্তগত করলো,,,,,,"আবার মনোযোগ দিয়ে প্রেমিকার চিঠি পড়া হচ্ছে, এরপরও মিনসের.........."আবার শুরু হওয়ার আগেই দত্তবাবু দৌড়লেন বাইরের দিকে, "বলি যাচ্ছ কোথায়? তার সাথে এখনই এই ভরদুপুরে দেখা করতে চললে নাকি?"-কথাটা শুনেই ইউটার্ন নিয়ে কলঘরের দিকে চলে গেলেন দত্তবাবু! পাক্কা একঘন্টা পর বেরোলেন স্নান সেরে! বেরিয়েই দেখলেন খাবার টেবিলে খাবার ঢাকা দিয়ে রাখা,,,,,,ঘরে উঁকি মারতে চোখে পড়লো গিন্নী শুয়ে পড়েছেন, নিদ্রা গেছেন কিনা জানা নেই, তাকে ডেকে খেতে বলা মানে আবার অগ্নুৎপাত,,,,,,অতএব শান্তি রক্ষার্থে চুপচাপ খেতে বসলেন ভবতোষ বাবু! সব ভাতে ভাত! গিন্নী যা হাতের কাছে পেয়েছে সব ভাতে দিয়ে দিয়েছে,,,,,,,আলু, পটল, ঝিঙে, কুমড়ো,,,,,,,যেন শোকবাড়িতে অশৌচপালন হচ্ছে!©️ কবিতা মিত্র
"কালরাতেই ভাবলাম বাজারে ইলিশ উঠেছে, আজ ইলিশ আনবো, গিন্নীকে বলবো একটু ইলিশভাঁপা করতে,,,,,,,,কি ভেবেছিলাম আর কি খেলাম!"-খেতে খেতে ভাবলেন ভবতোষবাবু! কোনোক্রমে গলাধঃকরণ করে পাশের ঘরে শুয়ে পড়লেন,,,,,,,শুয়ে শুয়ে আবার ভাবার চেষ্টা করলেন কাগজটার ব্যাপারে,,,,,,,তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়লেন!
একটু আগেই ঘুম থেকে উঠেছেন ভবতোষ বাবু,,,,,,আজ আর পার্কে ঘুরতে যাওয়া হবে না,একটা কারণ ঘুম থেকে উঠতে বেশ দেরি হয়ে গেছে, এখন সন্ধ্যা হব হব,,,,, আর দ্বিতীয় কারণটা সহজেই অনুমেয়! ©️ কবিতা মিত্র
"আচ্ছা সত্যিই কি এই সর্বাণী বলে কেউ আমাকে ফোন নম্বর দিয়েছিল? পার্কে দেখা করতে বলেছিল? হাতের লেখাটাও কেমন চেনা চেনা ঠেকছে! কিন্তু এই নামটা তো কিছুতেই মনে করতে পারছি না,,,,,,আর তাছাড়া দিলোই বা কখন চিরকুটটা? যাওয়ার মধ্যে তো বাজার, ব্যাঙ্ক, পোস্ট-অফিস আর বিকেলে নিয়ম করে একটু পার্কে ঘুরতে যাওয়া, সমবয়সীদের সাথে একটু খোশগল্প করা,,,,,,,এর মধ্যে কখন কে,,,,,,,,,"
"চা আ আ আ"ঠক্ করে চায়ের কাপটা সামনে রাখতেই ভাবনায় ছেদ পড়লো। "তা কার কথা ভাবছো শুনি? ওই সর্বাণীর কথা নিশ্চয়ই?" - গিন্নী আর কিছু বলার আগেই ল্যান্ডফোনটা বেজে উঠলো,,,,,ফোনটা ভবতোষ বাবু ধরে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে কেউ একজন বললো-" সর্বাণীর সাথে কথা হয়েছে? আজ তো পার্কেও এলে না, জিজ্ঞাসা করবো ভেবেছিলাম,,,,,তা কথা কি হয়েছে?" নতুন করে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ভবতোষবাবু বলে বসলেন-"সর্বাণী?"
ব্যাস, সঙ্গে সঙ্গে সুবচনী দেবী ঝাঁপিয়ে পড়ে ফোনটা কেড়ে নিয়ে প্রথমেই তার স্বভাবসুলভ মিষ্টি কন্ঠে কথার বুলেট ছোটাতে লাগলেন-"কে সর্বাণী? হ্যাঁরে মুখপুড়ি তোর কি লজ্জা-শরম নেই কোনো? ফাঁদে ফেলার জন্য আমার স্বামীটাকেই পেলি?আর কেউ জুটলো না? চিঠি দিয়েও হয়নি আবার বাড়িতেও ফোন করা হচ্ছে! ফোন নম্বর দেওয়া নেওয়াও হয়েছে,,,,, এতো দূর? কি রে কথা নেই কেন মুখে? বল কিছু?" একনিশ্বাসে কথা গুলো বলে হাঁপাতে লাগলেন সুবচনীদেবী, ওদিকে আচমকা আক্রমণে ফোনের ওপাশে থাকা ব্যাক্তির হার্ট অ্যাটাক হওয়ার জোগাড়! কোনোক্রমে ধাতস্থ হয়ে তিনি বললেন- "বৌদি আমি বসাক দা বলছি, ভবতোষের সাথে পার্কে আড্ডা মারি,,,,চিনতে পারছেন? আসলে সর্বাণীর ব্যাপারে,,,,,,,©️ কবিতা মিত্র
কথা শেষ হওয়ার আগেই দত্ত গিন্নী চেঁচিয়ে উঠলেন-"তার মানে আপনিও এর সাথে জড়িত? আপনি সব জানেন? তাও বাধা দেননি? এমনটা কি করে করলেন বলুন তো? ছিঃ! আপনারা সব পুরুষরা এক" বলেই ঠাস করে ফোন রেখে দিলেন!
ওদিকে প্রমাদ গুণলেন বসাক বাবু, "কিছু একটা গড়বড় হয়েছে! হাওয়া বেগতিক! ভবততোষগিন্নীর কথার মাথামুন্ডু কিছুই বোঝা গেল না, একবার এক্ষুণি যেতে হবে ওবাড়ি"-কথাটা ভেবেই সবসময়ের সঙ্গী কাঁধের ঝোলাব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন!
বসাক বাবু ভবতোষ বাবুর বসার ঘরে বসে এতক্ষণ সবটা শুনলেন ভবতোষ বাবুর মুখে, কাগজটা দেখতে চাইলে সুবচনী দেবী অনিচ্ছার সাথে সেটা এনে বসাকবাবুর হাতে দিলেন, কয়েক সেকেন্ড কাগজটার দিকে তাকিয়ে থেকে নিজের ঝোলা থেকে একটা ডায়েরী বের করে পাতা উল্টেপাল্টে কিছু একটা দেখেই সবার পিলে চমকে দিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন বসাক বাবু! ভবতোষ বাবু আর সুবচনী দেবীর হতভম্ব ভাব কাটিয়ে ওঠার আগেই বসাক বাবু যেটা বলে উঠলেন-"আরে এতো আমার লেখা!" সাথে সাথেই ভবতোষবাবুর মনে পড়ে গেলো যে কেন হাতের লেখাটা চেনা লাগছিল! আর তার সাথে মনে পড়ে গেলো সর্বাণীকে! কিন্তু তিনি কিছু বলে ওঠার আগেই গিন্নী সন্দেহের সুরে জিজ্ঞাসা করলো-"আপনার লেখা মানে? আপনি হঠাৎ এমন কথা লিখতে যাবেন কেন? আপনি কবে থেকে আমার কত্তাকে প্রিয় বলে ডাকতে শুরু করলেন? আর পার্কে তো রোজই যাচ্ছেন তা ঘটা করে চিঠি লিখে আমন্ত্রণ জানানোর কারণটাও বোঝা যাচ্ছে না! আমি বেশ বুঝতে পারছি আপনি আপনার বন্ধুকে বাঁচাতেই এসব বলছেন তাই তো?"©️ কবিতা মিত্র
"এক মিনিট বৌদি, আপনার সব প্রশ্নের উত্তর এক্ষুণি দিয়ে দিচ্ছি,,,,,বলেই ডায়েরীর এক জায়গায় আঙুল দিয়ে ইঙ্গিত করে দেখাতেই সুবচনী আর ভবতোষ বাবু ডায়েরীর ওপর হুমড়ি খেয়ে দেখলেন, চিরকুটটা ডায়েরীর একটা পাতার ছেঁড়া অংশের সাথে জুড়ে দিয়েছেন বসাকবাবু,,,,,,,আর তাতে যে লেখাটা চোখের সামনে দেখা যাচ্ছে তা হল-
-আগামী ১লা জুলাই দেশপ্রিয় পার্কে
নিখরচায় হার্ট পেশেন্টদের দেখা হবে,,,
অতঃপর পিনপতন নিস্তব্ধতা,,,,,হঠাৎ কিছু মনে পড়ায় সুবচনী দেবী আবার বলে ওঠেন-"আর ওই সর্বাণী?"©️ কবিতা মিত্র
"আরে ওর জন্যই তো যত গন্ডগোল! আসলে ভব গতকাল আমাকে আপনার হাঁটু আর কোমরের ব্যথায় কষ্ট পাওয়ার কথা শুনে আমিই সর্বাণীর কথা বলেছিলাম,,,,,ও আমার ভাগ্নী, খুব ভালো অর্থোপেডিক, অনেক ডাক্তার তো দেখালেন তাই ভাবলাম ওকে একবার দেখিয়ে নিলে হতো,তাই নম্বরটাও দিয়েছিলাম, সেটা দেওয়ার জন্যই ডায়েরী থেকে পাতার অংশটা ছিঁড়েছিলাম! তার উল্টোপিঠে আমি আবার একজনের মুখে শুনে ওই মেডিকেল ক্যাম্পের কথাটা লিখে রেখেছিলাম, যদি দেখাই,,,হার্টের পরীক্ষার তো অনেক খরচ তাই! সেটাই যে এমন মোক্ষমভাবে ছিঁড়েছে তাতো বুঝিনি,,,,,তাছাড়া ভব যে একদিনেই সব ভুলে মেরে দেবে তা জানলে পাকাপোক্ত ব্যবস্থা করতাম! আমার জন্যই এতো অশান্তি পোহাতে হলো আপনাদের দুজনকেই বৌদি,,,,,,খুব খারাপ লাগছে!©️ কবিতা মিত্র
এতক্ষণ চুপ করে থাকার পর মুখ খুললেন দত্ত গিন্নী-"না না বসাক দা, সবটাই আমার বোঝার ভুল,,,,,,আসলে ওমন একটা লেখা পড়ে,,,,,,তার ওপর আপনার বন্ধুর মুখে কুলুপ,,,,আগে ওনাকেই একটা ডাক্তার দেখাতে হবে এই ভুলোরোগের জন্য, দেখুন তো কি হয়রানি আর আপনাকেও না বুঝে কি না কি বলেছি, আমারও খুব খারাপ লাগছে! আপনি একটু বসুন দাদা, আমি ভেতর থেকে আসছি"
একটু আগেই বসাকবাবু বাড়ি গেলেন সুবচনী দেবীর হাতে তৈরী পকোড়া আর চা খেয়ে। দত্তগিন্নী রান্নাঘরে ব্যাস্ত রাতের রান্নার জন্য,,,রাতে একটু লুচি আর কষা আলুরদম করবেন, তার সাথে মোহনভোগ! কর্তার খুব পছন্দ তাই! ©️ কবিতা মিত্র
"কাল বাজার থেকে ইলিশ এনো কিন্তু, একটু ভাঁপা করবো ভাবছি"-রাতের খাবার সাজিয়ে গুছিয়ে ভবতোষ বাবুকে দেওয়ার সময় বললেন সুবচনী দেবী! ভবতোষ বাবুর হাঁ করে থাকা দেখে আবার বললেন- "হতে পারে আমি একটু বদমেজাজী আর মুখের কথাও শুনতে মধুর নয়, তোমার ওপর খুব চেঁচামেচিও করি, কিন্তু জেনে রাখো যাই করি আর যাই বলি, তোমাকে আমার থেকে কেউ বেশি চিনবে না আর কেউ বেশি ভালোও বাসবে না! বুঝেছো? আর আজ যা হয়েছে তা,,,,,,
কথা শেষ হওয়ার আগেই গিন্নীর মুখে একটা লুচি গুঁজে দিয়ে ভবতোষ বাবু বললেন-"আজ যা হয়েছে তা ছিল আমার প্রতি তোমার ভালোবাসা, আজ এই বয়সে এসেও সেই ভালোবাসা অক্ষুণ্ণ! তাই তো আমারও আমার সুবচনীর এই কর্কশ, অমিষ্ট বচন গুলোও এতো মধুর লাগে,,,,,,ওগুলো ছাড়া আমার চলবেই না! এটাই তো দাম্পত্য প্রেম,,,,,কি তাই না সুবু?" অনেক আগের সেই পুরোনো ডাকটা শুনে সুবচনী দেবী কিশোরীর মত লজ্জায় লাল হয়ে বলে উঠলেন-"মরণ!"©️ কবিতা মিত্র