09/06/2026
ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু চরিত্র থাকে, যারা ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও নিজেদের চরম খামখেয়ালিপনা আর নিষ্ঠুরতার জন্য চিরকাল খলনায়ক হয়ে থেকে যান। তেমনই একজন ছিলেন প্রাচীন রোমের পঞ্চম সম্রাট নিরো। "রোম যখন পুড়ছিল, নিরো তখন মনের সুখে বাঁশি বাজাচ্ছিলেন"—এই বিখ্যাত প্রবাদটি আমরা কমবেশি সবাই শুনেছি। তবে এর পেছনের প্রকৃত সত্য ও ইতিহাস যেকোনো টানটান থ্রিলার সিনেমার চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়।
৬৪ খ্রিস্টাব্দে রোমের সেই ভয়াবহ মহাগ্নি পুরো শহরকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল। ক্ষমতার মোহে অন্ধ নিরো এই জাতীয় বিপর্যয়কে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে দ্বিধা করেননি। তিনি তাঁর স্বপ্নের এক বিশাল রাজপ্রাসাদ বা 'গোল্ডেন হাউস' তৈরির জন্য এই ফাঁকা জমিকে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন। নিজের ওপর থেকে জনক্ষোভ সরাতে তিনি অত্যন্ত চতুরতার সাথে এই অগ্নিকাণ্ডের সমস্ত দোষ চাপিয়ে দেন তৎকালীন উদীয়মান ও নিরীহ খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর। শুরু হয় ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ও বর্বরতম অত্যাচার। প্রজাদের গায়ে আলকাতরা মাখিয়ে জীবন্ত মশাল বানিয়ে নিজের রাজকীয় বাগান আলোকিত করার মতো নির্মমতাও তিনি হাসিমুখে প্রদর্শন করেছিলেন।
কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী, অহংকার আর অন্যায়ের পতন সবসময়ই অবশম্ভাবী। ক্ষমতার অপব্যবহার আর প্রজাদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন যখন চরম সীমায় পৌঁছায়, তখন চারিদিক থেকে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। নিজের বিশ্বস্ত রক্ষীবাবলী এবং রোমান সিনেট যখন তাঁকে 'জনগণের শত্রু' হিসেবে ঘোষণা করে, তখন তাঁর পালানোর সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে যায়। অবশেষে ৬৮ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ৩০ বছর বয়সে রোমের উপকণ্ঠে এক গোপন খামারবাড়িতে চরম একাকী, অসহায় এবং ভীত অবস্থায় নিজের গলায় ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন এই স্বেচ্ছাচারী সম্রাট। মরার আগের মুহূর্তেও তাঁর রাজকীয় অহংকার কমেনি, বরং আফসোস করে বলেছিলেন, "পৃথিবী আজ কত বড় একজন শিল্পীকে হারাচ্ছে!"
নিরোর এই ট্র্যাজিক ও কুখ্যাত জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অন্ধ অহংকার এবং ক্ষমতার দম্ভ মানুষকে সাময়িক আনন্দ দিতে পারলেও, তার শেষ পরিণতি হয় অত্যন্ত লজ্জাজনক ও বেদনাদায়ক। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না—তা সে সাধারণ মানুষই হোক আর রোমের প্রতাপশালী সম্রাটই হোক। মানুষের মনে ভালো কাজের মাধ্যমে বেঁচে থাকাই প্রকৃত শিল্প, নির্মমতার মাধ্যমে নয়।
Part 10