27/05/2023
ছোটবেলায় গরমের ছুটি পড়লেই ব্যস্ত হয়ে উঠতাম "র-সু-ন" সন্ধ্যার আয়োজনে। মে মাসেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী ও কবি সুকান্তের মৃত্যুবার্ষিকী, তাই আলাদা তিনটে অনুষ্ঠানের বদলে এক সন্ধ্যায় তিনজনকে স্মরণ করার পন্থা নিয়েছিলাম আমরা। প্রথমে ঠিক হতো কে কি করবে, যদিও অনুষ্ঠানের দিনে সে সব অল্প বিস্তর পরিবর্তিত হতোই। আর এই পুরো অনুষ্ঠানের দায়িত্বে থাকতাম পাড়ার কচিকাঁচারা, বড়দের প্রশ্রয়ে। এই অনুষ্ঠানে একটি নাটক উপস্থাপনা ছিল বাধ্যতামুলক। সেই মতো শুরু হয়ে যেত রিহার্সাল। কে কোন রোল করবে সেই নিয়ে কিছু মন কষাকষিও ছিল স্বাভাবিক, কিন্তু সে সবের সমাধান হয়ে যেত তাড়াতাড়ি। আমাদের বাড়িতে শুরু করতাম রিহার্সাল। মঞ্চস্থ হওয়ার দু দিন আগে অবধি কারোর সংলাপ মুখস্ত হতো না। কিন্তু রিহার্সালে খামতি থাকতো না, রোজ মা-কাকিমারা সানন্দে ভালো খাবার দাবার বানিয়ে দিতো যাতে আমাদের উৎসাহ বজায় থাকে। পড়াশোনার চাপ এই সময়ে এমনিতেই কম কারণ সবে নতুন ক্লাসে উঠেছি আর পরীক্ষাও বেশ কয়েক মাস পরে।
যাই হোক, এভাবেই এসে যেত সেই শুভদিন। সকাল থেকেই পাড়ায় সাজসাজ রব, বিশেষ করে আমাদের মধ্যে। প্রথম কাজ ছিল চারটে চৌকি জোগাড় করা, কারণ ওই দিয়ে স্টেজ বানানো হবে। এরপর পাড়ার কোনো দাদা ডেকোরেটর্সের ছেলেকে ধমক দিয়ে পাঠিয়ে দিতো যাতে সে ফ্রিতে আমাদের স্টেজ বানাতে সাহায্য করে দেয়। দুপুরের মধ্যে স্টেজ রেডি , আলোর ব্যবস্থাও পাকা কাউকে ব'লে ক'য়ে। এরপর বাড়ি গিয়ে খাওয়া দাওয়া ক'রে একবার জমায়েত নাটকের ফাইনাল রিহার্সালে। সেখানেও কেউ কেউ সংলাপ ভুল করলে সেই নিয়ে কিছু ঝামেলা আর তার মীমাংসা ক'রে, কার কি সাজসজ্জা হবে ঠিক করে অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুত হওয়া। এর মাঝে স্টেশনে গিয়ে ফুল কিনে এনেছে কোনো একজন আর তিনজনের ছবির ব্যবস্থাও হয়ে করা হয়েছে। আমরাও সন্ধে ছ'টার মধ্যে পাঞ্জাবি পরে সেজেগুজে পৌঁছে যেতাম স্টেজের কাছে। মাইকে ঘোষণা হতো অনুষ্ঠান শুরু হতে চলেছে আর কিছুক্ষনের মধ্যেই কিন্তু শুরু হতে হতে সাড়ে সাতটা বাজবেই। উদ্বোধনী সংগীতের পরেই নতুন নতুন অনুরোধ পারফরম্যান্সের - কেউ গান, কেউ আবৃত্তি, কেউ নাচ এভাবেই কখন ঘন্টা দুই পার হয়ে যেত কারোর খেয়াল থাকতো না। এর মাঝে "একটি মোরগের কাহিনী" দু লাইন বলার পরে ভুলে গিয়ে নেমে যাবে কেউ, কেউ আবার তবলচি আসেনি তাই গান পরে গাইবো ব'লে অনুরোধ ক'রবে। সব শেষে আমাদের নাটকের পালা - যেটি অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ। মঞ্চস্থ করতে গিয়ে সংলাপ ভুল করা ছিল সাধারণ ঘটনা, কারোর আবার গোঁফ খুলে যাবে স্টেজের ওপরে আর তা দেখে হাসির রোল দর্শকের মাঝে। এভাবে শেষ হতো আমাদের অনুষ্ঠান "আসছে বছর আবার হবে" ঘোষণার মধ্যে দিয়ে।
✍ দেবজয় বিশ্বাস
Desh Bidesh || A Complete Bengali Portal for Travel, Sports, Music and Social Welfare