26/08/2022
//Facts friday// - পর্ব ৩
ডার্বির আবহে জেনে নিন কিছু জানা-অজানা গল্প...
//অবলুপ্তির পথে ইস্ট - মোহন?//
বাঙালির সাহিত্য, গান, খাদ্য, দুর্গাপুজো এবং আরও সবকিছুর মতই ফুটবলও একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এবং বাঙালির ফুটবলের প্রতি আকর্ষণের মূল প্রাণকেন্দ্র হল ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান। সারা বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে অজস্র বাঙালি, রয়েছে ঘটি, রয়েছে বাঙালও। ঘটি-বাঙালের এই চিরন্তন দ্বন্দ অমর করে দিয়েছে বাঙালির ফুটবল-প্রীতিকে, অমর করেছে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের দ্বন্দ্বকে। নিছকই সামান্য দুটি ক্লাবের ফুটবল প্রতিযোগিতার অনেক উর্দ্ধে উঠে আজ এই প্রতিযোগিতা যুগের পর যুগ ধরে সাক্ষী থাকছে দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির মজার সব লড়াইয়ের, মিষ্টি কিছু গল্পের। নানা বিতর্কও জুড়েছে এই ইতিহাসে। সম্প্রতি নাম নিয়ে নানান বিতর্কের জন্ম নিয়েছে ময়দানে। কোথাও এই ঐতিহ্যবাহী দুই নামের আগে বসেছে atk আবার কোথাও ইনভেস্টরের নাম। কিন্তু আপনার শুনলে হয়তো অবাক হবেন –
‘‘ইস্টবেঙ্গল – মোহনবাগান’’ নাম দুটোই হয়তো থাকত না, হয়তো থাকত না এই নাম দুটিকে কেন্দ্র করে আপামর বাঙালি সমাজের বিপুল উন্মাদনা। কি সেই ঘটনা?
দর্শক আকর্ষণের ক্ষেত্রে ‘ইস্টবেঙ্গল’ নামটা একটি বৃহৎ ভূমিকা পালন করেছিল। ১৯৪৭-এ দেশভাগের পর পূর্ব বাংলা তথা পাকিস্তান হতে অসংখ্য হিন্দু শরণার্থীর পশ্চিমবাংলায় পরিযানের প্রেক্ষাপটে দুই ক্লাবের ফুটবল দ্বন্দ্ব এক কঠোর রূপ ধারণ করেছিল। এ সময় পূর্ববঙ্গীয় হিন্দুদের উপপ্রাদেশিক সাংস্কৃতিক সত্তার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গীয় স্থায়ী অধিবাসীদের স্বার্থসংঘাত থেকে বাঙাল-ঘটির সামাজিক দ্বন্দ্ব অনেক বেশি প্রকট হল। কলকাতাসহ পশ্চিমবাংলায় ঘটিদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে জীবন-জীবিকা সংঘাতপূর্ণ হয়ে উঠল।কলকাতা তথা পশ্চিমবাংলার অভিজাতদের বিরুদ্ধে জীবন-জীবিকা অর্জনের লড়াইতে বাঙালদের মূলধন ছিল একটি সাধারণ আবাসভূমির স্মৃতি, একটি দৈনন্দিন সংস্কৃতি আর নির্যাতন ভোগ ও পরিযানের এক নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতা। আর এরই ভিত্তিতে তথাকথিত বাঙালরা পশ্চিমবাংলায় তাদের সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক স্বীকৃতিলাভের জন্যে লড়াই চালিয়েছিল। নিজস্ব সাংস্কৃতিক সত্তা ও একাত্মতা রক্ষা ও প্রকাশের প্রয়াসে তারা এক সার্থক মাধ্যমরূপে ফুটবলকে বেছে নিয়েছিল। পূর্ববঙ্গীয় হিন্দু শরণার্থীদের দৈনন্দিন সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জীবনসংগ্রামের পাশাপাশি ফুটবল মাঠে ইস্টবেঙ্গল ক্লাব হয়ে উঠেছিল সাংস্কৃতিক উৎকর্ষতা প্রকাশের মাধ্যম এবং আত্মবিশ্বাস-আত্মমর্যাদার প্রতীক।
প্রশ্ন হল, ইস্টবেঙ্গল নামটার সঙ্গে যা হোক অবিভক্ত বাংলার একটা বিরাট অঞ্চলের সম্পর্ক রয়ে গেছে। কিন্তু মোহনবাগানের নাম তো আর ওয়েস্ট বেঙ্গল নয়। তা হলে এই ক্লাবটার গায়ে ঘটিদের স্টিকার লাগানো হল কেন? সেই অর্থে তো এরিয়ান, কুমারটুলি, শোভাবাজার, টাউন, জোড়াবাগান সবই ঘটিদের ক্লাব। এবং এদের জন্ম মোহনবাগানের জন্মের কিছু আগে-পরে। এবং মোহনবাগানের প্রথম শিল্ড জয়ের পর দ্বিতীয় শিল্ড পেতে যখন ৩৬ বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে তার আগে কিন্তু এরিয়ান (জন্ম ১৮৮৩) শিল্ড জিতে নিয়েছে (১৯৪০)। শোভাবাজার বিংশ শতাব্দীর দশ, কুড়ি, তিরিশের দশকে বেশ শক্তিশালী দল। কুমোরটুলি, টাউন তখন সব কটা ক্লাবই তথাকথিত ঘটিদের দ্বারা পরিচালিত।কিন্তু শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের আপামর মানুষদের ক্লাব হয়ে উঠল মোহনবাগান। কারণ স্বাধীনতার পর এরিয়ান, কুমারটুলি, ভবানীপুর, শোভাবাজার যতই জায়ান্ট কিলার হোক না কেন, চ্যাম্পিয়ন তো হয়নি। চ্যাম্পিয়ন তো হত শুধু মোহনবাগান। তাই ধীরে ধীরে মোহনবাগানই হয়ে উঠল পশ্চিমবঙ্গ বাসীর একান্ত আপনার ধন। ঘটিদের ক্লাব।
যেই দুই নামকে ঘিরে গড়ে উঠছিল এত উন্মাদনা, এত রেষারেষি সেই সময়েই জুড়ে বসল অন্য এক উপদ্রব। সেই সময় দুই ক্লাবের রেষারেষি থেকে ময়দানে রোজই অশান্তি হত। তা সামাল দিতে হিমসিম খেতে হত প্রশাসন ও পুলিশকে। আই এফ এ যদি নিরপেক্ষ হত তা হলে হয়তো এত অশান্তি হত না। তারা তো ঝুঁকে ছিল মোহনবাগানের দিকে। সেই সময় বিধানসভায় ছিল বাদল অধিবেশন। একজন বিধায়ক প্রশ্ন তুললেন কলকাতার ফুটবল ক্লাবগুলির সঙ্গে আঞ্চলিকতা, প্রাদেশিকতা আর সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ রয়েছে। এই নামগুলি বদলানোর নির্দেশ দেওয়া হবে না কেন? অমৃতবাজার পত্রিকা আর যুগান্তরে এ নিয়ে বিস্তর সওয়াল করলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও ভাষ্যকার অজয় বসু। প্রস্তাব রাখলেন ইস্টবেঙ্গল, মহমেডান ও রাজস্থান ক্লাবের নাম বদলানোর।
বিধানসভা এবং সংবাদপত্রে এ সব পড়ে বিধান রায় ক্ষেপে গেলেন। কাগজে লেখালেখি দেখে চার ক্লাবের প্রতিনিধিদের মহাকরণে ডেকে বলে দিলেন, “ক্লাবের নাম বদলে দিন। যদি আপনারা স্বেচ্ছায় না বদলান, তা হলে সরকার দেখবে কীভাবে বদলানো সম্ভব।” চারটি ক্লাব হল : ইস্টবেঙ্গল, মহমেডান, রাজস্থান এবং কী আশ্চর্য মোহনবাগানও। অন্য ক্লাবগুলি তেমন প্রতিবাদ না করলেও জ্যোতিষ গুহ সে দিন বলে আসেন, “এটা জনগণের ক্লাব। জনগণ চাইলেই নাম বদলানো যাবে। সরকারের ইচ্ছের বদলানো যাবে না।” তাঁর কথার মধ্যে এমন এক তেজ এবং নির্ভীকতা ছিল যে, মুখ্যমন্ত্রীও নিজের সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য হয়েছিলেন। বাংলার ফুটবলকে এক বিরাট লজ্জার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন জ্যোতিষচন্দ্র গুহ।
#পর্ব২
Emami East Bengal
ATK Mohun Bagan Football Club
Indian Football Team
ISL- Indian Super League
I-League