28/06/2026
Companion24
|| উত্তরপ্রদেশে বন্ডেড লেবার ও দেশজুড়ে বিদ্যমান আধুনিক দাসত্ব — সভ্যতার লজ্জা ||
মনে করুন, আপনাকে একটা কারখানায় বন্ধ করে রাখা হয়েছে। আপনি ভোর ৪টা থেকে মাঝ রাত পর্যন্ত — টানা ২০ ঘন্টা অমানুষিক শ্রম দিতে বাধ্য। মাঝে কোনো সময় যদি ঘুণাক্ষরেও একটু রেস্ট নিতে চান, কারখানায় মালিকের লোকেরা আপনার পিঠে-পেটে — সারা শরীরে লোহার রড ও চাবুক দিয়ে পেটাতে দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং সেই দায়িত্ব তারা পালন করে তাদের পবিত্র কর্তব্য হিসেবে। মালিকপক্ষের হাতে রয়েছে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। আপনি একটু জিরোতে চাইলে বা প্রতিবাদ করলেই বন্দুকের গুলির ভয়ানক শব্দে আপনার ক্লান্তিও ভয়ে ছুটে পালাবে। আপনার কাজের তদারকির জন্য মালিক সেই কারখানায় রেখেছে একটা বড় মাপের হিংস্র পিটবুল। দিনে একবার শুধুমাত্র তুষের রুটি, লবণ ও লাল লঙ্কার গুঁড়ো আপনার খাদ্যের চাহিদা পূরণ করার জন্য বরাদ্দ। এভাবেই দিনের পর দিন, মাসের পর মাস আপনি কাজ করতে বাধ্য। আপনি যখনই মজুরি চাইছেন বা এই অত্যাচার আপনার সহ্য না হওয়ায় কাজ ছেড়ে চলে যেতে চাইছেন, তখনই বন্ধ কারখানায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আপনাকে পেটানো হচ্ছে।
না, এই রোমহর্ষক অত্যাচার স্পার্টাকাসের যুগের কোনো ক্রীতদাসের কাহিনীর বিবরণ নয়। আধুনিক ভারতের উত্তরপ্রদেশের মুজফফরনগর জেলার একটি ছোট ডিসপোজেবল্ প্লেট তৈরির কারখানার ঘটনা। গত ২২শে জুলাই উত্তরপ্রদেশ পুলিশ ঐ কারখানা থেকে ১২ জনকে উদ্ধার করে, গ্রেপ্তার হয়েছে ২ জন, কারখানার মালিক পলাতক। ১৯৭৬ সালে ভারত সরকার বন্ডেড লেবার (অ্যাবলিশন) অ্যাক্ট পাশ করলেও সমস্ত আইন-কানুন বিধি-নিষেধকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিনের আলোয় মাসের পর মাস, বছরের পর বছর এই ঘটনাই ঘটে চলছিলো মুজফফরনগরের ঐ কারখানার ভেতরে।
বিবিসি হিন্দি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই উদ্ধার হওয়া শ্রমিকদের মধ্যে একজন, উত্তরাখণ্ডের বাসিন্দা রামু, বলছেন, “আমাদের মোবাইল ফোনগুলো কেড়ে নেওয়া হয়েছিল এবং আধার কার্ডগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমাদের লাঠি দিয়ে পেটানো হতো এবং শুধু তুষের রুটি খেতে দেওয়া হতো।” ছত্তিশগড়ের বাসিন্দা নারায়ণ দিল্লি রেল স্টেশন থেকে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে এখানে নিয়ে আসা হয়। দুই ভাই ও দুই সন্তানের প্রতিপালনের দায়িত্বে থাকা নারায়ণ সরল মনে প্রতিশ্রুতিটিকে সত্যি বলে মনে করে কাজে যোগ দেন। নেপালের বাসিন্দা দান বাহাদুর থাপা প্রায় ২ বছর এই পরিস্থিতিতে কাজ করতে বাধ্য হন।
এই বন্ডেড লেবার ব্যবস্থা ভারতবর্ষের ইতিহাসে একটা দগদগে ঘায়ের মতো, যা শুধুমাত্র ইতিহাসের পাতাতেই আবদ্ধ নেই, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্নভাবে অগণিত শ্রমিক আজও বন্ডেড লেবার হয়ে দিন কাটাচ্ছেন। Global Slavery Index 2023 মোতাবেক আনুমানিক ১ কোটি ১০ লক্ষ শ্রমিক ভারতবর্ষে আজও আধুনিক দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
National Campaign Committee for the Eradication of Bonded Labour (NCCEBL)-এর ২০২৫ সালের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, যে শ্রমিকদের ওপর এই সার্ভে করা হয়েছিলো, তাদের মধ্যে ৮০% শ্রমিকই জানিয়েছেন যে তাদের উদ্ধার করার পরও কোনো FIR করা হয়নি। ২০১৬ সালে কেন্দ্র সরকার বন্ডেড লেবারদের পুনর্বাসনের যে প্রকল্প নিয়ে আসে তার আগে কিংবা পরে — উভয় ক্ষেত্রেই দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার একেবারেই নগণ্য। যে শ্রমিকদের ওপর এই সার্ভে হয়েছিলো, ২০১৬-র পূর্বে ঘটা ঘটনাগুলির একটির ক্ষেত্রেও কেউ দোষী সাব্যস্ত হয়নি, ২০১৬-র পর মাত্র ৩.৬% ক্ষেত্রে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। ফলে এই শ্রমিকদের প্রতি সরকার তথা প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি দিনের আলোর মতো স্বচ্ছ।
২০২৫ সালের মার্চ মাসে কেন্দ্রীয় সরকারের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৮ থেকে ২০২৫ সালের শুরুর সময় পর্যন্ত অফিসিয়ালি প্রায় ২.৯৭ লক্ষ বন্ডেড লেবারদের উদ্ধার করা হয়েছে। NCCEBL-এর মতে এই সংখ্যাটি দেশে বিদ্যমান প্রকৃত দাসত্বের মাত্রার তুলনায় অত্যন্ত সামান্য; আর এই কম হিসাব দেখানোর বিষয়টি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে স্ট্রাকচারাল কারণ। এই রিপোর্টে আরও দেখা গেছে যে উদ্ধার হওয়া শিশুদের অর্ধেকেরও বেশি এবং উদ্ধার হওয়া প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কোনো ক্ষতিপূরণই পাননি। এমনকি এই উদ্ধার হওয়া বন্ডেড লেবারদের প্রতি চূড়ান্ত সরকারি ও প্রশাসনিক ঔদাসীন্যের ফলাফল সম্পর্কে বলতে গিয়ে NCCEBL-এর আহ্বায়ক নির্মল গোরানা আরও বলেন, “অধিকাংশই আবার দাসত্বের জীবনে ফিরে যায়। পুনর্বাসন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।”
স্বভাবতই, যে সভ্যতার বড়াই করে তথাকথিত সভ্য সমাজ নিজেদের পিঠ চাপড়ায়, সেই সভ্যতার কারিগররা আজও দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ। এই বন্ডেড লেবার আমাদের স্মরণ করায় দুই সহস্র বছর পূর্বের দাস প্রথার কথা। অবর্ণনীয় অত্যাচার, চূড়ান্ত নীপিড়ন ছিল তখনকার সমাজের বৈশিষ্ট্য। আজকের বন্ডেড লেবার ব্যবস্থা নয়া ফর্মে সেই ঐতিহ্যকেই বহন করে চলেছে। এই বর্বরতা, নৃশংসতা, নারকীয় শোষণ মালিকি প্রথার হাতিয়ার। ৫০ বছর পূর্বে আইনি প্রক্রিয়ায় বন্ডেড লেবার বেআইনি বলে ঘোষিত হলেও, আজও এদেশজুড়ে রমরমিয়ে চলছে বন্ডেড লেবার প্রথা। যারা এই প্রথার রক্ষক, তারাও আপনার আমার মতোই খোলা বাতাসে প্রশ্বাস নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই দাগি আসামিরাই আজ চার চাকায় চড়ে কলার তুলে ঘুড়ে বেড়ায়। শ্রমিকদের রক্ত, ঘাম, শবদেহ এই মালিকদের সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার সোপান। আর সরকার একটা আইন পাশ করে, কিংবা প্রকল্প নিয়ে এসেই খালাস। আধুনিক দাসত্ব রোধে তাদের যেন কোনো দায়-ই নেই!