Kalatan Cultural Academy

Kalatan Cultural Academy nice page. i love it.

কিংবদন্তী কণ্ঠশিল্পী, সুরকার এবং সঙ্গীত পরিচালকশচীন দেববর্মণ (জন্মঃ- ১ অক্টোবর, ১৯০৬ - মৃত্যুঃ- ৩১ অক্টোবর, ১৯৭৫)১৯২৩ খ্...
31/10/2025

কিংবদন্তী কণ্ঠশিল্পী, সুরকার এবং সঙ্গীত পরিচালক
শচীন দেববর্মণ (জন্মঃ- ১ অক্টোবর, ১৯০৬ - মৃত্যুঃ- ৩১ অক্টোবর, ১৯৭৫)

১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রে তিনি প্রথম গান করেন। ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে তিনি অডিশনে ফেল করলেন ভারতের রেকর্ড প্রস্তুতকারী শীর্ষ প্রতিষ্ঠান এইচএমভিতে। তবে সে একই বছর তার প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড বের হয় হিন্দুস্তান মিউজিক্যাল প্রোডাক্টস থেকে শচীন দেবের প্রথম রেকর্ডকৃত দুটি গান হল পল্লীগীতির ঢঙে গাওয়া "ডাকিলে কোকিল রোজ বিহানে" যার গীতিকার হেমেন্দ্র কুমার রায় এবং খাম্বাজ ঠুমরি অঙ্গের রাগপ্রধান "এ পথে আজ এসো প্রিয়" যার গীতিকার শৈলেন রায়। ১৯৩০-এর দশকে তিনি রেডিওতে পল্লীগীতি গেয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। পূর্ব বাংলা এবং উত্তর-পূর্ব বাংলার পল্লীগীতির উপর তাঁর বিশেষ ঝোঁক ছিল। ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে অল ইন্ডিয়ান মিউজিক কনফারেন্সে তিনি গান গেয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে বেঙ্গল মিউজিক কনফারেন্সে ঠুমরি পেশ করে ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁকে মুগ্ধ করেছিলেন। শেখ ভানুর রচনা ‘নিশিথে যাইয়ো ফুলবনে’ দেহ ও সাধনতত্ত্বের গানটিকে প্রেমের গানে রূপান্তর করলেন কবি জসীমউদ্দীনকে দিয়ে এবং রূপান্তরিত এই গানটি রেকর্ড করলেন ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে। ১৯৩৭ এ মীরা ধরকে বিয়ে করেন। মীরা ধর ছিলেন তার সঙ্গীত জীবনের বিশ্বস্ত সঙ্গী। বাংলা গানের জগতে মীরা ধর তথা মীরা দেববর্মণ অন্যতম সার্থক গীতিকার। তাঁর লেখা গানের মধ্যে আছে শোন গো দখিন হাওয়া, বিরহ বড় ভাল লাগে, সুবল রে বল বল, বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে, কে যাস রে ভাটি গাঙ বাইয়া এবং ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে লেখা "তাকদুম তাকদুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল"।

বাবা নবদ্বীপচন্দ্র দেব বর্মন ছিলেন একজন সেতারবাদক এবং ধ্রূপদী সঙ্গীতশিল্পী। তিনিই ছিলেন শচীন দেববর্মনের প্রথম শিক্ষক। এরপর তাঁর সঙ্গীত শিক্ষা চলে উস্তাদ বাদল খান এবং ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে। ধ্রূপদী সঙ্গীতের এই শিক্ষা তাঁর মধ্যে সঙ্গীতের মৌলিক জ্ঞান সঞ্চারে গভীর ভূমিকা পালন করে। এই শিক্ষা তার পরবর্তী জীবনের সুর-সাধনায় প্রভাব বিস্তার করেছিল। পরবর্তীতে তিনি উস্তাদ আফতাবউদ্দিন খানের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।

১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে পিতা নবদ্বীপচন্দ্র কলকাতায় দেহত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তিনি ছিলেন ত্রিপুরার প্রধানমন্ত্রী। শচীন দেব তখন থাকতেন কলকাতার ত্রিপুরা প্যালেসে। নিজের লেখা ‘সরগমের নিখাদ’ নামক আত্মজীবনীতে শচীন দেববর্মণ স্বয়ং লিখেছেনঃ "পিতার মৃত্যুর পর আমি যেন অগাধ জলে পড়ে গেলাম। এই অবস্থায় আমি আগরতলা বা কুমিল্লা গিয়ে থাকলে রাজকীয় আরামে ও নিশ্চিন্তে নিজেদের বাড়িতে বাস করতে পারতাম এবং রাজ্য সরকারের কোনো উচ্চপদে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতাম। আমার বড় ভাইরা আমাকে তাই করতে বললেন। আমার কিন্তু এ ব্যবস্থা মনঃপূত হলো না। নিজে একলা সংগ্রাম করে, নিজে উপার্জন করে সঙ্গীত সাধনায় জীবন কাটিয়ে দেব। মনের মধ্যে একমাত্র এই আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কলকাতার ত্রিপুরা প্রাসাদ ছেড়ে ভাড়া করা সামান্য একখানা ঘরে আমার আস্তানা বাঁধলাম।"

সঙ্গীত পরিচালনা
১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে রাজগী নামক চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তার সঙ্গীত পরিচালনা জীবনের শুরু।

জন্ম ও পরিবার
বীরচন্দ্র মাণিক্যের অর্থানুকূল্যে, কুমিল্লার চর্থায় ৬০ একর জমি নিয়ে প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন কুমার বাহাদুর নবদ্বীপচন্দ্র। এই প্রাসাদে তাঁর ছোট সন্তান শচীন দেববর্মণের জন্ম। মা মণিপুরি রাজবংশের মেয়ে নিরুপমা দেবী। বাবা নবদ্বীপচন্দ্র দেববর্মণের কাছে সঙ্গীত শিক্ষা শুরু করেন। তৎকালীন ত্রিপুরার অন্তর্গত কুমিল্লার রাজপরিবারের নয় সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। ১৯১০ থেকে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ঠাকুরপাড়ার সুরলোক, কান্দিরপাড়ের সবুজ সংঘ নাট্যদল, দি গ্রেট জার্নাল থিয়েটার পার্টি, ইয়ংম্যান্স ক্লাব ইত্যাদি নিয়ে গড়ে উঠেছিল কুমিল্লার সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল। ত্রিপুরার মহারাজারা কুমিল্লায় তৈরি করেছেন টাউনহল, নাট্যশালা, লাইব্রেরি এবং নানা সংস্কৃতিক কেন্দ্র। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের দিকে শচীন দেবের বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন সুরসাগর হিমাংশু দত্ত, অজয় ভট্টাচার্য, মোহিনী চৌধুরী, সমরেন্দ্র পাল, কাজী নজরুল ইসলাম, শৈলবালা দাম, ধ্রুপদীয়া সৌরেন দাশ, সুধীন দাশ প্রমুখ। সেখানে নিয়মিত আসতেন চলচ্চিত্র পরিচালক সুশীল মজুমদার, ননী মজুমদার, ব্রজেন ব্যানার্জি, জিতু দত্ত, অরুণ মহলানবিশ প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। গানের ধরণ ছিল ভোরকীর্তন, নগরকীর্তন, কবিগান, ঢপযাত্রা। সাহিত্যিক, সুরকার, গীতিকার, কবি ও সঙ্গীতজ্ঞগণ একত্রিত হতেন ইয়ংমেন্স ক্লাবে। আড্ডা থেকে ভেসে আসত নজরুল ও শচীন দেবের গান। নজরুল কুমিল্লা এলে থাকতেন তালপুকুরের পশ্চিমপাড়ে একটি ঘরে। কুমিল্লা থেকে শচীন দেব কলকাতা চলে আসেন ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে।
১৯২০ খ্রিস্টাব্দে কুমিল্লা জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হন। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে ঐ কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। খ্রিস্টাব্দে ভিক্টোরিয়া কলেজে বিএ ক্লাসে ভর্তি হন। ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ তে ভর্তি হন। ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে স্থায়ীভাবে মুম্বাইয়ে বসবাস করতে শুরু করেন। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে প্যারালিটিক স্ট্রোক হয়ে কোমায় ছিলেন পাঁচ মাস। ৩১ অক্টোবর তাঁর প্রয়াণ হয়।

বংশ পরিচয়
কুমিল্লার ঐতিহাসিক অভয় আশ্রমের তত্ত্বাবধায়ক সংগীত প্রাণ প্রয়াত শ্রী পরিমল দত্তের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, শহরের চর্থা এলাকার গোল পুকুরের দণি পাড়ের এই বাড়িটি ছিল তৎকালীণ ভারতবর্ষের ত্রিপুরা রাজ্যের মহারাজা বীরচন্দ্র মানিক্য বাহাদুরের সৎভাই মহারাজ নবদ্বীপ কুমার দেব বর্মন বাহাদুরের। ত্রিপুরার এই মহারাজার স্ত্রী ছিলেন বেশ কয়েকজন। তার মধ্যে পাটরাণী পুত্র মহারাজা নবদ্বীপ কুমার দেব বর্মন বাহাদুরকে আরেক রাণীর পুত্র বীরচন্দ্র মানিক্য বাহাদুর হত্যা করতে উঠে পড়ে লাগলে উপায়ান্তর না দেখে মহারাজ নবদ্বীপ রাজ বাড়ির কর্মকর্তা শ্রী কৈলাস সিংহের পরামর্শে সপরিবারে কুমিল্লায় চলে আসেন। জানা যায়, বিখ্যাত ‘রাজমালা’ গ্রন্থটি কৈলাশ সিংহ রচনা করেছিলেন। কৈলাস সিংহের পরামর্শে মহারাজ নবদ্বীপ সিংহাসনের দাবীও এ সময় ছেড়ে দিয়েছিলেন। কুমিল্লা শহরের পূর্ব চর্থায় অবস্থিত এ বাড়িটি তৎসময়ে নির্মিত হয়েছিল। বাড়িটি দেখতে কুমিল্লা শহরের ব্রিটিশ আমলে তৈরী বাড়িগুলোর মতোই মনে হয়। কোন রাজ প্রসাদের মত দেখতে এ বাড়িটি নয়। এই কুমার দেব বর্মন বাহাদুরের পুত্রই হলেন শচীন দেব বর্মন।

সম্মাননা
১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতের সঙ্গীতে নাটক একাডেমি এবং এশিয়ান ফিল্ম সোসাইটি লন্ডন থেকে সম্মাননা লাভ করেন।
১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে ভারত সরকার হতে পদ্মশ্রী খেতাব লাভ করেন।
……………
তথ্য সংগ্রহ । ধন্যবাদ।.........

● শচীন দেব বর্মনের গাওয়া বাংলা গান:
★ নিজের (শচীন দেব বর্মন) লেখা
১. অবোধ মেয়ে
২. বিদেশীরে উদাসীরে
৩. কে যেন কাঁদিছে
★ গৌরি প্রসন্ন মজুমদারের লেখা
১. আমি পথ চেয়ে রবো
২. বাজে না বাঁশিগো
৩. বাঁশি শুনে আর কাজ নাই
৪. দূর কোনো পরবাসে
৫. ঘুম ভুলেছি নিঝুম এ নিশিথে
৬. মালাখানি ছিল হাতে
৭. ও জানি ভোমরা কেন
৮. না না নারে ফুটোনারে ফুল
৯. খুলিয়া কুসুম সাজ, শ্রীমতি যে কাঁদে
১০. কেন আলেয়ারে বন্ধু
১১. আঁখি দুখে ঝরে
১২. আজো আকাশের পথ বাহি
★ মীরা দেব বর্মনের লেখা কিছু গান
১. ভাঙ্গিতে তব নেশা
২. বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে
৩. বিরহ বড় ভালোলাগে
৪. ঘাটে লাগাইয়া ডিঙ্গা পান
৫. কালা সাপে দংশে আমায়
৬. কে যাসরে ভাটি গাং বাইয়া
৭. কী করি আমি
৮. না আমারে শশী চেয়োনা
৯. নিটোল পায়ে রিনিক ঝিনিক
১০. গানের কলি সুরের
১১. রাতের আতরে ভিজিয়া আদরে
১২. রাধার ভাবে কালা হইল গোরা
১৩. শোনগো দখিন হাওয়া
১৪. শ্রীমতি যে কাঁদে
১৫. টাকডুম টাকডুম বাজে
১৬. সুবলরে বল বল
১৭. কই কইরে ঘুঙ্গুর
১৮. যে না জানে
১৯. ঘাটে লাগাইয়া ডিঙ্গা
★ রবি গুহ মজুমদারের লেখা
১. আমি সইতে পারি না বল্
২. বনে ফাগুন মনে আগুন
৩. দোলে রাধা, মধু বৃন্দাবনে
৪. যে না জানে বিরহের মানে
৫. যদি ডাকি অকারণে
৬. মন দিলনা বঁধু
৭. তুমি আর নেই সে তুমি
৮. কেন সে যে হায়
★ অজয় ভট্টাচার্যের লেখা
১. আলো ছায়া দোলা
২. আমি ছিনু একা
৩. ঝন ঝন ঝন ঝন মঞ্জির বাজে
৪. কাঁদিবোনা ফাগুন গেলে
৫. প্রেম যমুনার পারে
৬. তুমি যে গিয়াছ
৭. আমার মিলন মালতি
৮. চম্পক জাগো জাগো
৯. এই মহুয়া বনে
১০. গোধূলির ছায়াপথে
১১. কে যাবি চল বৃন্দাবনে
১২. মেঘ ঝরে যায়
১৩. মম মন্দিরে এলে কে
১৪. মন দুখে মরিরে
১৫. নতুন ফাগুন যবে
১৬. ওরে বন্ধুরে মনের কথা
১৭. ফুলের বনে থাকো ভ্রমর
১৮. পোহালো রাতি জাগিয়া
১৯. প্রিয় আজো নয়
২০. স্বপন দেখেছি
২১. তোমার সাথে সুরে পরিচয়
২২. তুমি যে ছিলে মোর
২৩. তুমি নি আমার বন্ধু
২৪. বাঁশুরিয়া রে
২৫. বন্ধু এসো মধুরাতে
২৬. বল বল বল বন্ধু
২৭. জাগো মন সহেলীগো
২৮. কন্ঠে তোমার দুলবে বলে
২৯. কথা কও দাও সারা
৩০. সাজি নওল কিশোর
★ মোহিনী চৌধুরীর লেখা
১. ভুলায়ে আমারে
২. এই চৈতি সন্ধ্যায়
৩. গায় যে পাপিয়া
৪. হায় কী যে করি মন
৫. জাগার সাথী মম
৬. ঝিলমিল ঝিলমিল বাজেরে
৭. কে আমারে আজো
৮. পিয়া সনে মিলন
৯. প্রেম যমুনায় হয়তো
১০. সেই যে দিনগুলি
১১. তুমি তো বন্ধু জানো
★ আরো কিছু গান
১. পদ্মার ঢেউরে (গীতিকার : কাজী নজরুল ইসলাম)
২. মেঘলা নিশিভোরে ( কাজী নজরুল ইসলাম)
৩. কুহু কুহু কোয়েলিয়া (কাজী নজরুল ইসলাম)
৪. চোখ গেল চোখ গেল ( কাজী নজরুল ইসলাম)
৫. তুই কি শ্যামের বাঁশি (গীতিকার : দুয়াইদনকার (উঁধরফধহশধৎ) ও জসিমুদ্দীন)
৬. রঙ্গিলা রঙ্গিলা রঙ্গিলারে (দুয়াইদনকার ও জসিমুদ্দীন)
৭. যদি দখিনা পবনে (গীতিকার : হিমাংশু দত্ত)
৮. শ্যামরূপ ধরিয়া (শৈলেন রায়)
৯. প্রিয় রজনীগন্ধা বনে (কমল ঘোষ
১০. প্রেমের সমাধি তীরে (শৈলেন রায়)
১১. কী মায়া লাগলো (শৈলেন রায়)
১২. জনম দুখী সীতা (শৈলেন রায়)
১৩. ও কালো মেঘ বলতে পারো ( হেমেন্দ্র কুমার রায়)
১৪. এই পথে আজ এসো ( হেমেন্দ্র কুমার রায়)
১৫. ডাকরে কোকিল রোজ বিহানে ( হেমেন্দ্র কুমার রায়)
১৬. মলয় চল ধীরে (শিশির সেন)
১৭. ধিক ধিক আমার এ জীবন (গিরীন চক্রবর্ত্তী)
★ গীতিকারের নাম জানা যায়নি এমন কিছু গান
ওরে সুজন নাইয়া
তুমি তো বন্ধু এলে না
স্বপন না ভাঙ্গে যদি
পিঞ্জিরার পাখীর মতো
ফিরে গেছি বারে বারে
নতুন ঊষার সৈনিক
নীরবে আঁখি জলে ভরে
মরমিয়ারে উদাস
ললিতা মরমি
কোকিলারে গেয়োনা
কেন হায় স্বপন
কে দিলো ঘুম ভাঙ্গায়ে
কাল সাগরের
যবে আলোকের ফুল
ঝুলনে ঝুলিছে শ্যামরাই
এই কাননের ফুল নিয়ে
ছিল মাধবি রাতিগো
বুঝি আমার প্রাণ যায়
বন্দর ছাড়ো যাত্রীরা
বন্ধু বাঁশি দাও মোরে
গৌররূপ দেখিয়া হইয়াছি পাগল
বঁধু গো এই মধুমাসে
বিদায় দাওগো মোরে
বাসরের ফুল গেল যে
বাংলার মেয়ে
আমার কী হলো
আজ রাতে কে
আজ।তথ্য সংগ্রহ ধন্যবাদ।.........

কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক এবং প্রাবন্ধিকজীবনানন্দ দাশ (জন্মঃ- ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯৯ - মৃত্যুঃ- ২২ অক্টোবর, ১৯৫৪) (সংসদ বাঙা...
22/10/2025

কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক এবং প্রাবন্ধিক
জীবনানন্দ দাশ (জন্মঃ- ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯৯ - মৃত্যুঃ- ২২ অক্টোবর, ১৯৫৪) (সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান অনুযায়ী)

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ১৯২৫ এর জুনে মৃত্যুবরণ করলে জীবনানন্দ তাঁর স্মরণে 'দেশবন্ধুর প্রয়াণে' নামক একটি কবিতা রচনা করেন, যা বঙ্গবাণী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কবিতাটি পরবর্তীতে তার প্রথম কাব্য সংকলন ঝরা পালকে স্থান করে নেয়। কবিতাটি পড়ে কবি কালিদাস রায় মন্তব্য করেছিলেন, "এ কবিতাটি নিশ্চয়ই কোন প্রতিষ্ঠিত কবির ছদ্মনামে রচনা"। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দেই তার প্রথম প্রবন্ধ ‘স্বর্গীয় কালীমোহন দাশের শ্রাদ্ধবাসরে' প্রবন্ধটি ব্রাহ্মবাদী পত্রিকার পরপর তিনটি সংখ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। ঐ বছরেই কল্লোল পত্রিকায় 'নীলিমা' কবিতাটি প্রকাশিত হলে তা অনেক তরুণ কাব্যরসিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ধীরে ধীরে কলকাতা, ঢাকা এবং অন্যান্য জায়গার বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকায় তার লেখা ছাপা হতে থাকে; যার মধ্যে ছিল সে সময়কার সুবিখ্যাত পত্রিকা কল্লোল, কালি ও কলম, প্রগতি প্রভৃতি। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরা পালক প্রকাশিত হয়। সে সময় থেকেই তিনি তার পারিবারিক উপাধি 'দাশগুপ্তের' বদলে কেবল 'দাশ' লিখতে শুরু করেন।

প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের কয়েক মাসের মাথাতেই তিনি সিটি কলেজে তার চাকরিটি হারান। ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে কলেজটিতে ছাত্র অসন্তোষ দেখা দেয়, ফলাফলস্বরূপ কলেজটির ছাত্রভর্তির হার আশঙ্কাজনকহারে কমে যায়। জীবনানন্দ ছিলেন কলেজটির শিক্ষকদের মধ্যে কনিষ্ঠতম এবং আর্থিক সমস্যাগ্রস্ত কলেজ প্রথমেই তাকেই চাকরিচ্যুত করে। এই চাকুরিচ্যূতি দীর্ঘকাল জীবনানন্দের মনোবেদনার কারণ ছিল। কলকাতার সাহিত্যচক্রেও সে সময় তার কবিতা কঠিন সমালোচনার মুখোমুখি হয়। সে সময়কার প্রখ্যাত সাহিত্য সমালোচক কবি-সাহিত্যিক সজনীকান্ত দাস শনিবারের চিঠি পত্রিকায় তার রচনার নির্দয় সমালোচনায় প্রবৃত্ত হন। কলকাতায় করবার মতোন কোন কাজ ছিল না। কবি ছোট্ট শহর বাগেরহাটের প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তবে তিন মাস পরেই তিনি কলকাতায় প্রত্যাবর্তন করেন। এ সময় তিনি চরম আর্থিক দুর্দশায় পড়েছিলেন। জীবনধারণের জন্যে তিনি টিউশানি করতেন এবং লেখালিখি থেকে সামান্য কিছু রোজগার হতো। সাথে সাথে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরির সন্ধান করছিলেন। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে তিনি দিল্লির রামযশ কলেজে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। বরিশালে তার পরিবার তার বিয়ের আয়োজন করছিল এবং ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ৯ই মে তারিখে তিনি লাবণ্য দেবীর সাথে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ে হয়েছিলো ঢাকা শহরে, পুরোনো ঢাকার ব্রাহ্ম সমাজের রামমোহন লাইব্রেরিতে। বিয়ের পর আর দিল্লিতে ফিরে যাননি তিনি, ফলে সেখানকার চাকরিটি খোয়ান। এরপর প্রায় বছর পাঁচেক সময় জীবনানন্দ কর্মহীন অবস্থায় ছিলেন। মাঝে কিছু দিন একটি বীমা কোম্পানির এজেন্ট হিসাবে কাজ করেছেন; ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে অর্থ ধার করে ব্যবসায় করেছেন; কিন্তু কোনটাই স্থায়ী হয়নি। এসময় তাঁর পিতা জীবিত এবং জীবনান্দের স্ত্রী বরিশালেই ছিলেন বলে জীবনানন্দের বেকারত্ব পারিবারিক দুরবস্থার কারণ হয় নি।

১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে কবির প্রথম সন্তান মঞ্জুশ্রীর জন্ম হয়। প্রায় সে সময়েই তার ক্যাম্পে কবিতাটি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সম্পাদিত পরিচয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং সাথে সাথে তা কলকাতার সাহিত্যসমাজে ব্যাপক সমালোচনার শিকার হয়। কবিতাটির আপাত বিষয়বস্তু ছিল জোছনা রাতে হরিণ শিকার। অনেকেই এই কবিতাটি পাঠ করে তা অশ্লীল হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি তার বেকারত্ব, সংগ্রাম ও হতাশার এই সময়কালে বেশ কিছু ছোটগল্প ও উপন্যাস রচনা করেছিলেন;- তবে তার জীবদ্দশায় সেগুলো প্রকাশিত করেন নি। ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি একগুচ্ছ গীতিকবিতা রচনা করেন যা পরবর্তী কালে তাঁর রূপসী বাংলা কাব্যের প্রধান অংশ নির্মাণ করে। জীবনানন্দ এ কবিতাগুলো প্রকাশ করেননি এবং ১৯৫৪-তে তার মৃত্যুর পর কবিতাগুলো একত্র করে ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে রূপসী বাংলা কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের ব্যবস্থা করেন বোন সুচরিতা দাশ এবং ময়ুখ পত্রিকা খ্যাত ভূমেন্দ্র গুহ।

সম্ভবতঃ মা কুসুমকুমারী দাশের প্রভাবেই ছেলেবেলায় পদ্য লিখতে শুরু করেন তিনি। ১৯১৯ সালে তাঁর লেখা একটি কবিতা প্রকাশিত হয়। এটিই তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতা। কবিতাটির নাম বর্ষা আবাহন। এটি ব্রহ্মবাদী পত্রিকার ১৩২৬ সনের বৈশাখ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। তখন তিনি শ্রী জীবনানন্দ দাশগুপ্ত নামে লিখতেন। ১৯২৭ সাল থেকে তিনি জীবনানন্দ দাশ নামে লিখতে শুরু করেন। ১৬ জুন ১৯২৫ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এর লোকান্তর হলে তিনি 'দেশবন্ধুর প্রয়াণে' শিরোনামে একটি কবিতা লিখেছিলেন যা বংগবাণী পত্রিকার ১৩৩২ সনের শ্রাবণ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। তবে দীনেশরঞ্জন দাস সম্পাদিত কল্লোল পত্রিকায় ১৩৩২ (১৯২৬ খ্রি.) ফাল্গুন সংখ্যায় তাঁর নীলিমা শীর্ষক কবিতাটি প্রকাশিত হলে আধুনিক বাংলা কবিতার ভুবনে তার অন্নপ্রাশন হয়। জীবদ্দশায় তাঁর ৭টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। প্রথম প্রকাশিত ঝরাপালক শীর্ষক কাব্যগ্রন্থে তাঁর প্রকৃত কবিত্বশক্তি ফুটে ওঠেনি, বরং এতে কবি কাজী নজরুল ইসলাম, মোহিতলাল মজুমদার ও সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের প্রকট প্রভাব প্রত্যক্ষ হয়। তবে দ্রুত তিনি স্বকীয়তা অর্জন করেছিলেন। দীর্ঘ ব্যবধানে প্রকাশিত দ্বিতীয় কাব্য সংকলন ধূসর পান্ডুলিপি-তে তাঁর স্বকীয় কাব্য কৌশল পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। বাংলা সাহিত্যের ভূবনে তাঁর বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। শেষের দিককার কবিতায় অর্থনির্মলতার অভাব ছিল। সাতটি তারার তিমির প্রকাশিত হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে দুবোর্ধ্যতার অভিযোগ ওঠে। নিজ কবিতার অবমূল্যায়ন নিয়ে জীবনানন্দ খুব ভাবিত ছিলেন। তিনি নিজেই স্বীয় রচনার অর্থায়ন করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন যদিও শেষাবধি তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তবে কবি নিজেই নিজ রচনার কড়া সমালোচক ছিলেন। তাই সাড়ে আট শত কবিতার বেশী কবিতা লিখলেও তিনি জীবদ্দশায় মাত্র ২৬২টি কবিতা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ও কাব্যসংকলনে প্রকাশ করতে দিয়েছিলেন। এমনকি রূপসী বাংলার সম্পূর্ণ প্রস্তুত পাণ্ডুলিপি তোরঙ্গে মজুদ থাকলেও তা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি জীবনানন্দ দাশ। তবে তিনি এ কাব্যগ্রন্থটির নাম দিয়েছিলেন বাংলার ত্রস্ত নীলিমা যা তার মৃত্যুর পর আবিষ্কৃত এবং রূপসী বাংলা প্রচ্ছদনামে প্রকাশিত হয়। আরেকটি পাণ্ডুলিপি আবিষ্কৃত হয় মৃত্যু পরবর্তীকালে যা বেলা অবেলা কালবেলা নামে প্রকাশিত হয়। জীবদ্দশায় তার একমাত্র পরিচয় ছিল কবি। অর্থের প্রয়োজনে তিনি কিছু প্রবন্ধ লিখেছিলেন ও প্রকাশ করেছিলেন। তবে নিভৃতে গল্প এবং উপন্যাস লিখেছিলেন প্রচুর যার একটিও প্রকাশের ব্যবস্থা নেননি। এছাড়া ষাট-পয়ষটিট্টিরও বেশি খাতায় "লিটেরেরী নোটস" লিখেছিলেন যার অধিকাংশ এখনও (২০০৯) প্রকাশিত হয়নি।
……………….
তথ্য সংগৃহীত - প্রতাপ সাহা। ধন্যবাদ।.........

পুরস্কার ও স্বীকৃতি
নিখিলবঙ্গ রবীন্দ্রসাহিত্য সম্মেলন ১৯৫২ খৃস্টাব্দে পরিবর্ধিত সিগনেট সংস্করণ বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থটি বাংলা ১৩৫৯-এর শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ বিবেচনায় পুরস্কৃত করা হয়। কবির মৃত্যুর পর ১৯৫৫ খৃস্টাব্দের ফেব্রুয়ারী মাসে জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৫৪) সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করে।

সমালোচনা
জীবদ্দশায় অসাধারণ কবি হিসেবে পরিচিতি থাকলেও তিনি খ্যাতি অর্জন করে উঠতে পারেননি। এর জন্য তার প্রচারবিমুখতাও দায়ী; তিনি ছিলেন বিবরবাসী মানুষ। তবে মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই তিনি বাংলা ভাষায় আধুনিক কবিতার পথিকৃতদের একজন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। জীবনানন্দ দাশের জীবন এবং কবিতার উপর প্রচুর গ্রন্থ লেখা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে, বাংলা ভাষায়। এর বাইরে ইংরেজিতে তার ওপর লিখেছেন ক্লিনটন বি সিলি, আ পোয়েট আর্পাট‌‌ নামের একটি গ্রন্থে। ইংরেজি ছাড়াও ফরাসিসহ কয়েকটি ইউরোপীয় ভাষায় তাঁর কবিতা অনূদিত হয়েছে। তিনি যদিও কবি হিসেবেই সমধিক পরিচিত কিন্তু মৃত্যুর পর থেকে ২০০৯ খ্রিস্টাব্দ অবধি তাঁর যে বিপুল পাণ্ডুলিপিরাশি উদ্ঘাটিত হয়েছে তার মধ্যে উপন্যাসের সংখ্যা ১৪ এবং গল্পের সংখ্যা শতাধিক।

মৃত্যু
১৪ই অক্টোবর, ১৯৫৪ তারিখে কলকাতার বালিগঞ্জে এক ট্রাম দূর্ঘটনায় তিনি আহত হন। ট্রামের ক্যাচারে আটকে তার শরীর দলিত হয়ে গিয়েছিল। ভেঙ্গে গিয়েছিল কণ্ঠা, ঊরু এবং পাঁজরের হাড়।
গুরুতরভাবে আহত জীবনানন্দের চিৎকার শুনে ছুটে এসে নিকটস্থ চায়ের দোকানের মালিক চূণীলাল এবং অন্যান্যরা তাঁকে উদ্ধার করে। তাঁকে ভর্তি করা হয় শম্ভূনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে। এ সময় ডাঃ ভূমেন্দ্র গুহ-সহ অনেক তরুণ কবি জীবনানন্দের সুচিকিৎসার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন। কবি-সাহিত্যিক সজনীকান্ত দাস এ ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর অনুরোধেই পশ্চিমবঙ্গের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় কবিকে দেখতে এসেছিলেন এবং আহত কবির সুচিকিৎসার নির্দেশ দিয়েছিলেন যদিও এতে চিকিৎসার তেমন উন্নতি কিছু হয়নি।

তবে জীবনানন্দের অবস্থা ক্রমশঃ জটিল হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন কবি। চিকিৎসক ও সেবিকাদের সকল প্রচেষ্টা বিফলে দিয়ে ২২শে অক্টোবর, ১৯৫৪ তারিখে রাত্রি ১১টা ৩৫ মিনিটে কলকাতার শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
…………….
কথাসাহিত্য
জীবদ্দশায় কথাসাহিত্যিক হিসাবে জীবনানন্দের কোনোও পরিচিতি ছিল না। তাঁর রচিত উপন্যাসের সংখ্যা ১৪ এবং ছোটগল্পের সংখ্যা শতাধিক। তিনি সম্পূর্ণ নিভৃতে উপন্যাস-ছোটগল্প লিখেছিলেন জীবনানন্দ এবং জীবদ্দশায় একটিও প্রকাশ করে যান নি। তাঁর মৃত্যুর পর উপন্যাস-গল্পের পাণ্ডুলিপির খাতাগুলো আবিষ্কার হয়। কবিতায় যেমনি, কথাসাহিত্যেও তিনি তাঁর পূর্বসুরীদের থেকে আলাদা, তাঁর সমসাময়িকদের থেকেও তিনি সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁর গল্প-উপন্যাসে আত্মজৈবনিক উপদানের ভিত লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু তাই বলে এই রচনাগুলো আত্মজৈবনিক নয়। তার সর্বাধিক পরিচিত উপন্যাস মাল্যবান, তবে "মাল্যবান" তাঁর বিরচিত প্রথম উপন্যাস নয়।
………………….
প্রবন্ধ
জীবনানন্দ দাশের প্রাবন্ধিক পরিচয় অদ্যাবধি বিশেষ কোন মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয় নি। তবে তিনি বেশ কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধ-আলোচনা লিখেছিলেন যার প্রতিটি অত্যনত্ম মৌলিক চিনত্মা-ভাবনার স্বাক্ষর বহন করে। তাঁর প্রবন্ধের সংকলন কবিতার কথা বেরিয়েছিল তাঁর মৃত্যুর পর - ১৩৬২ তে। এতে তাঁর জীবদ্দশায় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় মুদ্রিত পনেরটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছিল। এই প্রবন্ধগুলি বহুল পঠিত। এই বিখ্যাত পনেরটি প্রবন্ধের বাইরেও জীবনানন্দের আরো কিছু প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সমালোচনা রয়েছে। এই রচনাসমষ্টির সংখ্যা খুব বেশী নয়। হিসেব করলে দেখা যায় তাঁর সাহিত্য-সমাজ-শিক্ষা বিষয়ক রচনার সংখ্যা ৩০, গ্রন'ভূমিকা ও গ্রন'ালোচনা জাতীয় রচনার সংখ্যা ৯, স্মৃতি তর্পনমূলক রচনার সংখ্যা ৩ এবং বিবিধ প্রবন্ধ-নিবন্ধের সংখ্যা ৭। তদুপরি আরো ৭টি খসড়া প্রবন্ধের হদিশ করা গেছে।

বুদ্ধদেব বসু কবিতা পত্রিকার একটি প্রবন্ধ সংখ্যার (১৩৪৫, বৈশাখ) পরিকল্পনা করেছিলেন মূলত: কবিদের গদ্য প্রকাশের উদ্দেশ্য নিয়ে। এরই সূত্রে জীবনানন্দ তাঁর প্রথম গুরম্নত্বপূর্ণ প্রবন্ধটি লিখেছিলেন যার নাম ‘কবিতার কথা’। এ প্রবন্ধের শুরম্ন এই ভাবে -

“সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি ; কবি - কেননা তাদের হৃদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিনত্মা ও অভিজ্ঞতার সারবত্তা রয়েছে, এবং তাদের পশ্চাতে অনেক বিগত শতাব্দী ধরে এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক জগতের নব নব কাব্যবিকীরণ তাদের সাহায্য করেছে। কিন' সকলকে সাহায্য করতে পারে না ; যাদের হৃদয়ে কল্পনা ও কল্পনার ভিতরে অভিজ্ঞতা ও চিনত্মার সারবত্তা রয়েছে তারাই সাহায্যপ্রাপ্ত হয় ; নানারকম চরাচরের সম্পর্কে এসে তারা কবিতা সৃষ্টি করবার অবসর পায়। ”
তাঁর গদ্য ভাষারীতিও বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। প্রারম্ভিক বাক্যটি হ্রস্ব হলেও অব্যবহিত পরেই তিনি দীর্ঘ বাক্যের ঘন বুনোট গড়ে তুলেছেন। ‘এবং, ‘ও’ ইত্যাদি অন্বয়মূলক পদ এবং ’কমা’, ‘সেমিকোলন‘, ‘ড্যাশ‘ প্রভৃতি যতিচিহ্নের সম্বনয়ে গড়ে উঠেছে এমন একটি গদ্যভাষা যার সঙ্গে সমকালীন বাঙ্গালী লেখক-পাঠকের আদৌ পরিচয় ছিল না। বস্তুত: তাঁর প্রবন্ধগুলোর বাক্য গঠনরীতি সমসাময়িককালে সুপরিচিত ছিল না। এমনকী মনোযোগী পাঠকের কাছেও তা জটিল প্রতীয়মান হতে পারে। জীবনানন্দের অধিকাংশ গদ্য রচনাই ফরমায়েশী। সাহিত্য, শিক্ষা, সমাজ, এই তিনটি পরিক্ষেত্রে জীবনানন্দ প্রবন্ধ-নিবন্ধগুলো লিখেছেন। তাঁর বিশিষ্ট প্রবন্ধগুলোর শিরোনাম এরকম - ‘কবিতার কথা’, ‘রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক বাংলা কবিতা’, ‘মাত্রাচেতনা’, ‘উত্তররৈবিক বংলা কাব্য’, ‘কবিতার আত্মা ও শরীর’, ‘কি হিসাবে কবিতা শ্বাশত’, ‘কবিতাপাঠ’, ‘দেশকাল ও কবিতা’, ‘সত্যবিশ্বাস ও কবিতা’, ‘রুচি, বিচার ও অন্যান্য কথা’, ‘কবিতার আলোচনা’, ‘আধুনিক কবিতা’, ‘বাংলা কবিতার ভবিষ্যৎ’, ‘কেন লিখি’, ‘রবীন্দ্রনাথ’, ‘শরৎচন্দ্র’, ‘কঙ্কাবতী ও অন্যান্য কবিতা’, ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভবিষ্যৎ’, ‘পৃথিবী ও সময়’, ‘যুক্তি, জিজ্ঞাসা ও বাঙালি’, 'অর্থনৈতিক দিক’, ‘শিক্ষা ও ইংরেজি’, ‘শিক্ষা-দীক্ষা-শিক্ষকতা’, ‘শিক্ষার কথা’, ‘শিক্ষা সাহিত্যে ইংরেজী’ এবং ‘শিক্ষা-দীক্ষা’। বলা যায় যে সাহিত্য, বিশেষ ক’রে কবিতা নিয়ে জীবনানন্দ বেশ কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধ উপহার দিয়েছেন।

কাব্যগ্রন্থ
জীবনানন্দের কাব্যগ্রন্থসমূহের প্রকাশকাল সম্পর্কে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য যে, কয়েকটি কাব্যগ্রন্থের একাধিক পরিবর্ধিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল। নিচে কেবল প্রথম প্রকাশনার বৎসর উল্লিখিত। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরা পালক প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে। এর দীর্ঘ কাল পর ১৯৩৬-এ প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ধূসর পান্ডুলিপি। ] ইত্যবসরে কবির মনোজগতে যেমন পরিবর্তন হয়েছে তেমনি রচনা কৌশলও অর্জন করেছে সংহতি এবং পরিপক্কতা। তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ বনলতা সেন প্রকাশিত হয় ১৯৪২-এ। এটি "কবিতাভবন সংস্করণ" নামে অভিহিত। সিগনেট প্রেস বনলতা সেন প্রকাশ করে ১৯৫২-তে। বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থের কবিতাসমূহ সহ পরবর্তী কবিতাগ্রন্থ মহাপৃথিবী ১৯৪৪-এ প্রকাশিত। জীবনানন্দর জীবদ্দশায় সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থ সাতটি তারার তিমির (১৯৪৮)। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুর কিছু আগে প্রকাশিত হয় জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা।

কবির মৃত্যু-পরবর্তী প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ হলো ১৯৫৭-তে প্রকাশিত রূপসী বাংলা এবং ১৯৬১-তে প্রকাশিত বেলা অবেলা কালবেলা। জীবনানন্দ দাশ রূপসী বাংলা'র পাণ্ডুলিপি তৈরী করে থাকলেও জীবদ্দশায় এর প্রকাশের উদ্যোগ নেন নি। তিনি গ্রন্থটির প্রচ্ছদ নাম নির্ধারণ করেছিলেন বাংলার ত্রস্ত নীলিমা। ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশকালে এর নামাকরণ করা হয় "রূপসী বাংলা।" তাঁর অগ্রন্থিত কবিতাবলী নিয়ে প্রকাশিত কবিতা সংকলনগুলো হলো: সুদর্শনা (১৯৭৩), আলো পৃথিবী (১৯৮১), মনোবিহঙ্গম, হে প্রেম তোমার কথা ভেবে (১৯৯৮), অপ্রকাশিত একান্ন (১৯৯৯) এবং আবছায়া (২০০৪)।

কবির প্রকাশিত-অপ্রকাশিত গ্রন্থিত-অগ্রন্থিত সকল কবিতার আঁকড় দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের কাব্যসংগ্রহ সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে। অব্যবহিত পরে গ্রন্থিত-অগ্রন্থিত সকল কবিতার পরিবর্ধিত সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে আব্দুল মান্নান সৈয়দের উদ্যোগে। পরবর্তী কালে আবিষ্কৃত আরো কবিতা অন্তর্ভুক্ত করে ক্ষেত্র গুপ্ত ২০০১-এপ্রকাশ করেন জীবনানন্দ দাশের কাব্য সমগ্র। ২০১০ খ্রিস্টাব্দে ভূমেন্দ্র গুহ প্রকাশ করেন জীবনানন্দ দাশের প্রকাশিত-অপ্রকাশিত-গ্রন্থিত-অগ্রন্থিত সকল কবিতার আঁকড় গ্রন্থ পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ।

গল্পগ্রন্থ ও উপন্যাস
তাঁর মৃত্যুর পর আবিষ্কৃত হয় অজস্র গল্প ও উপন্যাস। এ গুলোর প্রথম সংকলন জীবনানন্দ দাশের গল্প (১৯৭২, সম্পাদনা: সুকুমার ঘোষ ও সুবিনয় মুস্তাফী)। বেশ কিছুকাল পর প্রকাশিত হয় জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৮৯, সম্পাদনা: আবদুল মান্নান সৈয়দ।

প্রকাশিত ১৪টি উপন্যাস হলো উপন্যাস: মাল্যবান (১৯৭৩), সুতীর্থ (১৯৭৭), চারজন (২০০৪: সম্পাদকঃ ভূমেন্দ্র গুহ ও ফয়সাল শাহরিয়ার)।

পত্র
দীপেনকুমার রায়-এর উদ্যোগে ও সম্পাদনায় জীবনানন্দ দাশের পত্রাবলী প্রকাশিত হয় বাংলা ১৩৮৫ সনে। পরবর্তী কালে আবদুল মান্নান সৈয়দ জীবনানন্দ দাশের পত্রাবলী প্রকাশ করেন ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে। জীবনানন্দ দাশের প্রকাশিত-অপ্রকাশিত পত্রাবলী প্রকাশিত হয় ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে।

লিট্যারেরি নোটস
১৯২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে বাঁধানো এক্সারসাইজ খাতায় ধারাবাহিকভাবে কিছু টুকরো-টাকরা কথা, টীকা-টিপ্পনী লিখতে শুরু করেছিলেন যা তিনি লিটের্যাবরি নোটস নামে চিহ্নিত করেছিলেন। ৫৬টি বাঁধানো এক্সারসাইজ খাতায় লেখা, তারিখ ধরে লেখা। উদ্ধারকৃত পাণ্ডুলিপি সমগ্র কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত থাকলেও দিনলিপির খাতাগুলো অসামান্য জীবনানন্দ-গবেষক ভূমেন্দ্র গুহের কাছে সংরক্ষিত। লিট্যারেরি নোটস-এর খাতাগুলোর পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪,২৭২ এবং শব্দ সংখ্যা ৬,৬২,১৬০-এর আশপাশে।
দিনলিপি প্রায় ধাঁধার মতো, পাঠোদ্ধারের প্রধান সমস্যা হল প্রায়শ ক্ষুদ্রায়তন অনুচ্ছেদে অসম্পূর্ণ বাক্যে লেখা, কখনও ব্যবহার করেছেন সংকেত। প্রায়ই ব্যবহার করেছেন 1 সংখ্যাটি যেমন— ১৪ আগস্ট ১৯৩১-এর পাতায় লেখা নিচে উদ্ধৃত অনুচ্ছেদটিতে :

“ “A wonder: How 1 ashtmatic Achin & others of 1 type with apparently less means & planks than me stand where they stand”।

লিখতে গিয়ে কবি the লিখতে 1 ব্যবহার করেছেন সময় বাঁচানোর স্বার্থে। এ রকম আরও বোঝা যায় : Wd = would; Sh/shd = should; Acc = According; Re = Regarding, ?= because ইত্যাদি। তাতে পঠন সহজতর হলেও অর্থনির্মলতা খুব একটি বৃদ্ধি পায় না। নিছকই নিজের জন্য দিনলিপির খাতায় কিছু টীকা-টিপ্পনী লিখেছিলেন জীবনানন্দ, প্রকাশের জন্য নয়।

অলীক আশার, দূর-দুরশার দুয়ার ভাঙার তরে
যৌবন মোর উঠল নেচে রক্তমুঠি, ঝড়ের ঝুঁটির পরে!
পিছে ফেলে টিকে থাকার ফাটকে কারাগারে
ভেঙে শিকল ধ্বসিয়ে ফাঁড়ির দ্বার
চলল সে যে ছুটে!
শৃঙ্খল কে বাধল তাহার পায়ে-
চুলের ঝুটি ধরল কে তার মুঠে!
বর্শা আমার উঠল ক্ষেপে খুনে,
হুমকি আমার উঠল বুকে রুখে!
দুশমন কে পথের সুমুখে
-কোথায় কে বা!
এ কোন মায়া
মোহ এমন কার!
বুকে আমার বাঘের মতো গর্জাল হুঙ্কার!

মনে হয় একদিন আকাশে শুকতারা দেখিব না আর ;
দেখিব না হেলেঞ্চার ঝোপ থেকে একঝাড় জোনাকি কখন
নিভে যায় – দেখিব না আর আমি এই পরিচিত বাঁশবন ,
শুঁকনো বাঁশের পাতা -ছাওয়া মাটি হয়ে যাবে গভীর আঁধার
আমার চোখের কাছে – লক্ষ্মীপূর্ণিমার রাতে সে কবে আবার
পেঁচা ডাকে জোছনায় – হিজলের বাকা ডাল করে গুঞ্জরন ;
সারা রাত কিশোরীর লাল পাড় চাঁদে ভাসে – হাতের কাঁকন
বেজে ওঠে : বুঝিব না – গঙ্গাজল ,নারকোলনাড়ুগুলো তার
জানি না সে কারে দেবে – জানি না সে চিনি আর সাদা তালশাঁস
হাতে লয়ে পলাশের দিকে চেয়ে দুয়ারে দাড়ায়ে রবে কি না …
আবার কাহার সাথে ভালবাসা হবে তার – আমি তা জানি না;
মৃত্যুরে কে মনে রাখে ?… কীর্তিনাশা খুঁড়ে খুঁড়ে চলে বারো মাস
নতুন ডাঙার দিকে – পিছনের অবিরল মৃত চর বিনা
দিন তার কেটে যায় – শুকতারা নিভে গেলে কাঁদে কি আকাশ ??
………………………..
তথ্য সংগৃহীত - প্রতাপ সাহা। ধন্যবাদ।.........

অবিস্মরণীয় কণ্ঠশিল্পী ও সুরকারঅখিলবন্ধু ঘোষ (জন্মঃ- ২০ অক্টোবর, ১৯২০ – মৃত্যুঃ- ২০ মার্চ, ১৯৮৮)অসাধারণ সুরেলা কণ্ঠের জন্...
21/10/2025

অবিস্মরণীয় কণ্ঠশিল্পী ও সুরকার
অখিলবন্ধু ঘোষ (জন্মঃ- ২০ অক্টোবর, ১৯২০ – মৃত্যুঃ- ২০ মার্চ, ১৯৮৮)

অসাধারণ সুরেলা কণ্ঠের জন্যে তাঁকে 'মেলোডি কিং' বলা হতো। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, রাগপ্রধান সঙ্গীত ও নজরুল গীতিতে স্বচ্ছন্দ ছিলেন। বাংলা আধুনিক গানকে রাগাশ্রয়ী করে তোলার পিছনে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল। তাঁর জনপ্রিয় গানের মধ্যে তোমার ভুবনে ফুলের মেলা, ও দয়াল বিচার কর, কবে আছি কবে নেই, যেন কিছু মনে করোনা কেউ যদি কিছু বলে, ঐ যে আকাশের গায় দূরের বলাকারা ভেসে যায়, সেসিন চাঁদের আলো চেয়েছিলো জানতে, পিয়াল শাখার ফাঁকে ওঠে, কেন তুমি বদলে গেছ, ‘শিপ্রা নদীর বুকে সন্ধ্যা নামিল হায়, আজি চাঁদিনি রাতি গো ইত্যাদি আজও সমানভাবে জনপ্রিয়। প্রথম সঙ্গীতশিক্ষক মামা কালিদাস গুহ। কলকাতায় এসে তালিম পেলেন একে একে নিরাপদ মুখোপাধ্যায়, সঙ্গীতাচার্য তারাপদ চক্রবর্তী, পণ্ডিত চিন্ময় লাহিড়ীর মতো গুণিজনদের কাছে। সম্ভবত কিছু দিনের জন্য পণ্ডিত কে জি ঢেকনের কাছেও তালিম নিয়েছিলেন অখিলবন্ধু। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে গভীর দক্ষতা অর্জন করেছিলেন, কিন্তু পরিবেশনায় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত তাঁর ছায়াসঙ্গীই হয়ে রইল, আলোয় প্রকাশ পেল না। নিজস্ব ধরনের আধুনিক বাংলা গানে তিনি হয়ে উঠলেন অনন্য। কিন্তু ১৯৮৮ সালে যখন অখিলবন্ধু মারা যান, সমকাল তাঁকে সরিয়ে দিয়েছিল বিস্মৃতির অন্তরালে। তাঁর রেকর্ডিং পাওয়া যেত না তখন। অবিশ্বাস্য কণ্ঠসম্পদের এই মানুষটি যেন ‘নেই’ হয়ে গিয়েছিলেন গানের জগৎ থেকে। ১৯৯০ দশক নাগাদ রিমেক-এর দৌলতে আবার জেগে ওঠেন অখিলবন্ধু। আকাশবাণী এফএম-এর প্রাকপর্বে তিনি হয়ে ওঠেন প্রধানতম শিল্পীদের একজন।

শচীন দেব বর্মণের গানে পাগল ছিলেন তিনি। বহু গুণিজনের কাছে গান শিখেছিলেন, মনে মনে শচীন দেব বর্মণকেও দিয়েছিলেন গুরুর আসন। গাইতে গেলে কখনও বাদ পড়ত না শচীনকর্তার গান। এক বার রেকর্ডে গাওয়া তাঁর নিজের একটি গান ওই শিল্পীর গলায় শুনে মুগ্ধ হলেন শচীন দেব স্বয়ং। ওই একই গান সেই গায়ককে নতুন করে রেকর্ড করার অনুমতি দিলেন তিনি। গানটি ছিল, ‘বধূ গো এই মধুমাস...’। গাইলেনও তিনি। বাংলা গানের ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল। মরমি শিল্পী অখিলবন্ধু ঘোষ তাঁর গানে স্পর্শ করেছিলেন গুরুপ্রতিম শিল্পীকেও।

১৯৪৪-৪৫ সাল থেকে কলকাতা বেতারে গান গাওয়ার মাধ্যমে শুরু হল অখিলবন্ধু ঘোষের যাত্রা। ১৯৪৭ সালে প্রথম রেকর্ড। সন্তোষ মুখোপাধ্যায়ের সুরে গানদু’টি ছিল— ‘একটি কুসুম যবে’ এবং ‘আমার কাননে ফুটেছিল ফুল’। প্রথমটির গীতিকার অখিলবন্ধু নিজেই, দ্বিতীয়টি ব্যোমকেশ লাহিড়ীর লেখা। এর পর কয়েকটি রেকর্ড পেরিয়ে ছ’নম্বর রেকর্ডে (১৯৫৩) ঝলসে উঠলেন অখিলবন্ধু। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায় গাইলেন, ‘মায়ামৃগ সম’ এবং ‘কেন প্রহর না যেতে’। সুরকার যথাক্রমে দুর্গা সেন ও দিলীপ সরকার। প্রথম গানটি যে শুদ্ধ ও কোমল ধৈবত-এর এক অদ্ভুত সংমিশ্রণে শুরু হয়, তা অখিলবন্ধুর কণ্ঠে অপূর্ব মায়া তৈরি করে। ‘শিপ্রা নদীর তীরে’, ‘কবে আছি কবে নেই’, ‘এমনি দিনে মা যে আমার’, ‘তোমার ভুবনে ফুলের মেলা, আমি কাঁদি সাহারায়’... প্রতিটি জনপ্রিয় গানই তাঁর নিজের সুর করা। ‘তোমার ভুবনে...’ গানটি মাঝ-খাম্বাজ রাগিণী নির্ভর। গানের মাঝে টুকরো তানকারিও করেছিলেন, কিন্তু সমস্ত কসরত ছাপিয়ে শ্রোতাকে ছুঁয়ে গেছে বিরহী মনের হাহাকার। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে যিনি শিক্ষিত, ঠুংরি, কাজরী বা চৈতি-র সূক্ষ্ম কাজ যাঁর গলায় অনায়াস, সেই তিনি কয়েকটি গানের সুরনির্মাণ ও গায়কিতে এমন এক অভিনবত্ব এনেছিলেনন, যা তাঁর আধুনিকমনস্কতা ও নিজস্বতার পরিচায়ক। যেমন— ‘পিয়ালশাখার ফাঁকে ওঠে’, ‘ওই যে আকাশের গায়’, ‘যেন কিছু মনে কোরো না’ (সুর: সহধর্মিণী দীপালি ঘোষ), ‘ঐ যাঃ! আমি বলতে ভুলে গেছি’ ইত্যাদি গান অদ্ভুত সংলাপধর্মী কাটা কাটা ভঙ্গিতে গেয়েছেন অখিলবন্ধু। লোকসঙ্গীতের আঙ্গিকে সন্তোষ মুখোপাধ্যায়ের সুরে অখিলবন্ধুর গাওয়া ‘কোয়েলিয়া জানে’ গানটিও শচীন দেব বর্মণকে মনে করায়।

বাংলা রাগপ্রধান গানের জগতে অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র তিনি। ‘আজি চাঁদিনি রাতি গো’ (কেদার), ‘জাগো জাগো প্রিয়’ (ভাটিয়ার), ‘বরষার মেঘ ভেসে যায়’ (সুরদাসী মল্লার), ‘আমার সহেলী ঘুমায়’ (মারু বেহাগ)— এ রকম আরও অনেক রাগপ্রধান গান অপরূপ হয়েছে শিল্পীর কণ্ঠে। রাগরাগিণীর প্রকাশ যে কতখানি ভাবের পথে হতে পারে, অখিলবন্ধুর গাওয়া রাগপ্রধান গান তার অন্যতম দৃষ্টান্ত! বেশ কিছু নজরুলগীতিতেও তিনি নিজস্ব ভাবমাধুর্যে ভাস্বর, এ প্রসঙ্গে তাঁর গাওয়া শ্যামকল্যাণ রাগে কাজিসাহেবের ‘রসঘন শ্যাম’ গানটির উল্লেখই যথেষ্ট। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে প্রশ্নাতীত দক্ষতা থাকলেও, রেকর্ডে খেয়াল-ঠুংরি বা গীত-ভজন তেমন শোনা যায়নি তাঁর কণ্ঠে। তবে বেতারে গেয়েছিলেন। যেমন, ১৯৪৯ সালে বেতারে সম্প্রচারিত অখিলবন্ধু ঘোষের গাওয়া দু’টি অসাধারণ ভজন— ‘ফরিয়াদ মেরি সুনলে ও ভগওয়ান’ (কথা: মুন্সি জাকির হোসেন, সুর: দুর্গা সেন) এবং ‘তুম মুরলী শ্যাম বাজাও’ (কথা: সুরদাস, সুর: অখিলবন্ধু ঘোষ)।

নিজের বেশির ভাগ গানে বৈচিত্রময় সুরারোপ করলেও, অন্যের কণ্ঠে অখিলবন্ধুর সুর দেওয়া গান পাওয়া যায় মাত্র দু’টি রেকর্ডে। একটি রেকর্ডে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় দু’টি গান, ‘যমুনা কিনারে’ ও ‘মনে নেই মন’ এবং আর একটি লং প্লেয়িং রেকর্ডের সঙ্কলনে কয়েকটি গানের মধ্যে একটি ভজন ‘গুরু মোহে দে গ্যয়ে’ (গীতিকার: কবীর দাস) অখিলবন্ধু ঘোষের সুরে গেয়েছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। ছায়াছবির জগতেও সুরকার হিসেবে কাজ করেননি তিনি। শুধুমাত্র ‘শ্রীতুলসীদাস’ (১৯৫০), ‘মেঘমুক্তি’ (১৯৫২) ও ‘বৃন্দাবনলীলা’ (১৯৫৮) ছবিতে অখিলবন্ধু ঘোষের নেপথ্য কণ্ঠ শোনা গেছে, যে ছবিগুলির সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন যথাক্রমে অনুপম ঘটক, উমাপতি শীল ও রথীন ঘোষ।
…………………….
অখিলবন্ধুর আদি বাড়ি নদিয়ার রানাঘাটের কাছে হলেও আসলে তাঁরা বালির বিখ্যাত ঘোষ পরিবারের বংশধর, যে বংশের উজ্জ্বল নক্ষত্র ঋষি অরবিন্দ। অখিলবন্ধুর বড় হওয়া চাকদার মামাবাড়িতে। মামা কালিদাস গুহ-র জন্যেই সঙ্গীতের প্রতি ঝোঁক। কয়েক বছর পর, কলকাতার ভবানীপুরে চলে আসা। সেখান থেকেই শিল্পী অখিলবন্ধুর গড়ে ওঠার সূচনা।

দত্তবাগানের মোড়ে একটি বিরাট কালিপুজো করতেন নিমাই সামন্ত এবং তার দলবল। তখন কলকাতার নামী তিনটে কালিপুজোর একটা ছিল সেই পুজো। কলকাতার সব নামকরা শিল্পীদের দেখা যেত ওই পুজোর ফাংশনে। সেইখানেই অখিলবন্ধু ঘোষ গাইবেন । আশেপাশের এলাকাগুলো থেকে প্রচুর মানুষ আসতেন এবং তারা আসতেন মুলত মহঃ আজিজ, তিলক চক্রবর্তী দের গান শুনতে। রফিসাহেব আর কিশোরকুমারের গান করতেন এরা দুজন। অখিলবাবুকে দেখেই তাদের অসন্তোষ প্রকাশ পেল। অখিলবাবু মনে হয় এসবের জন্যে প্রস্তুতই থাকতেন। হারমোনিয়াম নিয়ে বসে প্রথমেই ধরলেন ” ও দয়াল, বিচার করো। সবাই যেন কেমন হয়ে গেল। মন্ত্রমুগ্ধ। তারপর এক এক করে গাইলেন – ওই যে আকাশের গায়/দুরের বলাকা ভেসে যায়, পিয়াল শাখার ফাঁকে ওঠে, অন্তত দশ খানা গান গেয়ে যখন উঠলেন সবাই তখন ভুলে গেছে মহঃ আজিজ বা তিলকের কথা।
ভবানীপুরের কাছে একটা গলিতে থাকতেন উনি। গলিটার নাম সম্ভবত টার্ফ লেন। একটা মাঝারী সাইজের ঘরে সাধারণভাবে বাস করতেন। দীর্ঘকায় মানুষ ছিলেন। অত্যন্ত সাধারণ দেখতে নিরহংকারী। কণ্ঠে ছিল এক আশ্চর্য্য তারুণ্য! ..................
তথ্য সংগৃহীত - প্রতাপ সাহা। ধন্যবাদ।.........

Address

Kolkata
700011

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Kalatan Cultural Academy posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Establishment

Send a message to Kalatan Cultural Academy:

Share