20/05/2026
…এই ভিডিওতে যে ছেলেটিকে দেখছেন, এটাই আমি — সাইদুল মোল্লা। একজন ভাঙড় কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী।
কলেজ শুধু একটা ভবন নয়; কলেজ মানে এক টুকরো জীবন।
একটা সময়, যেখানে মানুষ শুধু বই পড়তে শেখে না — মানুষ চিনতে শেখে, নিজেকে আবিষ্কার করতে শেখে। ভুল করতে শেখে, আবার সেই ভুল থেকেই উঠে দাঁড়ানোর সাহস অর্জন করে।
প্রথম দিন যখন কলেজে গিয়েছিলাম, সত্যি বলতে আমি ভীষণ অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল — “এখানে কি সত্যিই পড়াশোনা হয়?”
চারদিকে মানুষের ভিড়, কোলাহল, অসংখ্য বিচিত্র চরিত্রের আনাগোনা।
কেউ মাঠে বসে আড্ডা দিচ্ছে, কেউ মোবাইলে ভিডিও বানাচ্ছে, কেউ রাজনীতি নিয়ে তর্ক করছে, কেউ আবার ক্যান্টিনের এক কাপ চায়ের মধ্যে জীবনের দর্শন খুঁজছে।
সেই ভিড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি যেন খুঁজছিলাম “শিক্ষা” নামের শব্দটাকে।
কিন্তু সময় আমাকে শিখিয়েছে —
শিক্ষা সবসময় শ্রেণিকক্ষের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
কখনও কখনও জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা আসে মানুষের ভিড় থেকে, অভিজ্ঞতার ধাক্কা থেকে, অপমান থেকে, কিংবা নীরব পর্যবেক্ষণ থেকে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন —
“শিক্ষার ফল মানুষকে মুক্তি দান।” আর সত্যিই, কলেজ আমাকে শুধু বইয়ের জ্ঞান দেয়নি; দিয়েছে মানুষ বোঝার ক্ষমতা, সমাজকে দেখার চোখ, আর নিজের ভিতরের মানুষটাকে চিনে নেওয়ার সুযোগ।
কলেজে নানা ধরনের ছাত্র থাকে।
কেউ আসে শুধুই উপস্থিতির খাতা পূরণ করতে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে, কেউ প্রেম খুঁজতে, কেউ রাজনীতির ব্যানার ধরতে।
আবার এমনও কিছু মানুষ থাকে, যারা নীরবে লাইব্রেরির কোণে বসে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার যুদ্ধ চালিয়ে যায়।
কেউ পরিবারের দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়ে পড়াশোনা করে, কেউ হাজার ব্যর্থতার মাঝেও স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে থাকে।
কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন —
“বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর,অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”
আমি বলি, সেই মহান সৃষ্টির আরেকটি অংশ গড়ে ওঠে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভিতরে — যেখানে মানুষ ধীরে ধীরে সত্যিকারের মানুষ হয়ে ওঠে।
আমরা প্রায়ই বলি — “কলেজে রাজনীতি কেন হবে?”
আমি বলব — অবশ্যই হবে।
কারণ যেখানে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ানো হয়, যেখানে সংবিধানের কথা বলা হয়, অধিকার ও কর্তব্য শেখানো হয়, যেখানে সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে আলোচনা হয় — সেখানে রাজনীতি থাকবে, এটাই স্বাভাবিক।
তবে রাজনীতি মানেই হিংসা নয়।
রাজনীতি মানে শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়।
রাজনীতি মানে আদর্শ, নৈতিকতা, প্রতিবাদ করার সাহস, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি।
Nelson Mandela বলেছিলেন —
“Education is the most powerful weapon which you can use to change the world.”
অর্থাৎ, শিক্ষা পৃথিবী বদলে দেওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।
কিন্তু আজ খুব কষ্ট হয়, যখন দেখি সেই শিক্ষাঙ্গনেই কখনও কখনও স্বার্থের রাজনীতি ঢুকে পড়ে।
ভিন্ন দলের ভিন্ন সৈনিকেরা শিক্ষার পরিবেশকে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ বানাতে চায়।
যেখানে বইয়ের গন্ধ থাকার কথা, সেখানে কখনও কখনও ভেসে আসে ক্ষমতার অহংকার।
তবুও আমি বিশ্বাস করি —
একটা ভালো কলেজ শুধু ডিগ্রি দেয় না, মানুষ তৈরি করে।
কারণ শেষ পর্যন্ত সিজিপিএ নয়, মানুষ হিসেবে তুমি কতটা বড় হয়ে উঠলে — সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কলেজ জীবন শেষ হয়ে গেছে।
ক্লাসরুম ছেড়েছি, ক্যাম্পাস ছেড়েছি, অনেক মানুষও হারিয়ে গেছে সময়ের ভিড়ে।
তবুও কিছু বিকেল, কিছু করিডোর, কিছু অসমাপ্ত কথা, কিছু বন্ধুত্ব, কিছু স্বপ্ন — আজও হৃদয়ের ভিতর জীবন্ত হয়ে আছে।
জীবনের অনেক পথ হয়তো এখনো বাকি।
তবুও একটা কথা আমি গর্ব করে বলতে পারি —
আমার শিক্ষা জীবনে কখনও কাউকে অপমান করিনি, কাউকে খারাপ কথা বলিনি।
বরং অনেক সময় কিছু অপদার্থ মানুষের খারাপ ব্যবহার সহ্য করেছি, শুধু কলেজটাকে ভালোবেসেছিলাম বলে। কিন্তু কখনও সেই ভালোবাসাকে প্রকাশের জন্য উচ্চস্বরে চিৎকার করতে হয়নি।
কলেজের গেটম্যান থেকে প্রিন্সিপাল পর্যন্ত সবার সঙ্গে আমার ছিল এক আন্তরিক সম্পর্ক।
প্রতিটি বিভাগের ছাত্র-ছাত্রী, অধ্যাপক-অধ্যাপিকার সঙ্গে ছিল এক আত্মিক বন্ধন। ক্যাম্পাস আমাকে ভালোবাসত — আর এটাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় অর্জন।
আমি শুধু একটা কলেজে পড়িনি, আমি একটা সময়কে বেঁচে এসেছি।
আর সেই সময়ের নাম — “কলেজ জীবন”।
তবে আজকের রাজনৈতিক সমীকরণ দেখে মাঝে মাঝে কলেজের জন্য খুব কষ্ট হয়। কারণ শিক্ষাঙ্গন হোক জ্ঞানের, মানবতার ও সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্থান — ক্ষমতার অহংকারের নয়।
বিঃ দ্রঃ — এই ভিডিওটি ছিল একটি শিক্ষামূলক প্রেজেন্টেশনের অংশ, যেখানে আমার সহপাঠী এবং সম্মানিত অধ্যাপক-অধ্যাপিকাদের সামনে “শিক্ষা ও নারী”-র পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা উপস্থাপন করা হয়েছিল।