08/01/2026
#ভালো_থাকা
🍁ভরসা🍁
আমাদের মেয়ে আনন্দী যখন এক্কেবারে পুচকি ছিল, লম্বা দেশলাই বাক্সে তারজালি দেওয়া মুরগীর খাঁচার মতো গাড়িতে স্কুলে যাওয়া আসা করত, একদিন এসে বলল, কোন এক দুষ্টু ছেলে নাকি ওকে ধাক্কা দিয়েছে! সে নাকি খুব হাট্টাকাট্টা তাই মেয়ে ভয় পেয়েছে পালটা চাঁটি দিতে। মেয়ে আমাদের রোগাসোগা, তেমন পালোয়ান কারো আঙুলের তুড়িতেই উড়ে যেতে পারে সে তো জানিই। কিন্তু তাও ছোট থেকে আমি পই পই করে শেখাই, মানুষের আসল শক্তি তার শরীরে নয়, "মনে"। সামনে দাঁড়িয়ে কেউ দাপট দেখালে, অসভ্যতামো করলে চিৎকার চ্যাঁচামেচি না করে বা দু ঘা না দিয়ে বাড়ি ফিরবিনা। নরম মাটিতেই লোকে কোদাল চালাতে চায় সবার আগে। কিন্তু তাও, বাচ্চা মেয়ে তো, বুঝতে পারছিলাম ভয় পাচ্ছে। ঘুরে ফিরে বলছে, ছেলেটা খুব মারকুটে, অলিভিয়ার টিফিন ফেলে দিয়েছে, বনির চুল খুলে দিয়েছে এমনকি তুহিনার মতো মোটাসোটা মেয়েকেও ধাক্কা দিয়ে হেসেছে। বুঝতে পারছিলাম ও "ভরসা" চাইছে আমাদের কাছে, শুধু আমাদের "জ্ঞান" শুনতে চাইছেনা।
আমার বাবার কথা মনে পড়ল। মানুষটা ছিল একটা শক্তপোক্ত বটগাছের মতো। গাড়ির সামনের সিটটা বাবার জন্যই ছিল পারমানেন্ট। যেখানেই যাই আমরা, ড্রাইভারের বাঁ দিকে বসে বাবা 'গাইড' করে যাবেই, হাত দিয়ে দেখিয়ে দেখিয়ে নিয়ে যাবে (আমাদের সব চেনা, তাও!)। আমি চাকরি পাওয়ার পরেও বাড়ি থেকে ফেরার পথে হাতে কয়েকটা নোট দিয়ে বলত, পকেটে বেশি করে পয়সা রেখে দিতে হয় বাইরে বেরোলে, কখন কী কাজে লাগে! মনে আছে নিজের বিয়ের জন্য বাজার টাজার করতে বেরিয়েছি বাবাকে নিয়ে, বহরমপুরে। এটিএমে ঢুকে টাকা তুলছি। বাবা বাইরে দাঁড়িয়ে। বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের দুটো ষন্ডাগন্ডা লোক হাতে ইয়াব্বড় বন্দুক উঁচিয়ে বাবার পাশে দাঁড়াল। ওরাও টাকা তুলবে। আমার দেরী হচ্ছিল একটু। অনেকটা টাকা তুলছিলাম। সেপাই দুজন রেগেমেগে গালাগালি করতে লাগল, এটিএমের দরজা টেনে খুলে আমায় বাইরে আসতে বলল। রাস্তায় লোক দাঁড়িয়ে গেল। কেউ কেউ মজাও দেখছিল। খুব লজ্জা লাগছিল আমার। অপমান লাগছিল। কান গরম হয়ে যাচ্ছিল। কথাবার্তা বলে ম্যানেজ দেওয়ার চেষ্টা করার আগেই আগেই বাবার সে কি মেজাজ! বাঙালীসুলভ হিন্দীতে অবাঙালী সেপাইদুটোর ওপরে চিৎকার চ্যাঁচামেচি করে চোটপাট করতে শুরু করে দিল। "ক্যায়া সামঝা হ্যায় আপলোগ। জো ইচ্ছে ওহি কারোগে। ইয়ে মেরা জাগা হ্যায়। দাদাগিরি নেহি চালেগা"। ইত্যাদি বলে সেকি ঝগড়া! দেখি আশপাশের ভিড়ের কয়েকটা চ্যাংড়া বাবাকে সাপোর্ট করতে এগিয়ে এসেছে।" আরে দাদা এরা নিজেদের কি যে মনে করে, সব ব্যাপারে দাদাগিরি দেখায়"।
আমার ভালোও লাগছিল, আবার মনে হচ্ছিল সেপাই দুটো যদি রেগেমেগে বন্দুক চালিয়ে দেয়! কোনোমতে বাবাকে ওখান থেকে সরিয়ে আনলাম। বাড়িতে বলতেই মায়ের সে কি টেনশন। বাবাকে নিয়ে মা সারাজীবন এমন সব টেনশন করেছে যদিও! সিনেমাহলে লোকাল গুন্ডা সামনের সিটের মেয়েটার পেছনে খোঁচা দিচ্ছে, বাবা গিয়ে এক ঘুঁসি! সে কি ঝামেলা! আবার ছোটবেলায় দেখতাম পাড়ায় কোনো বাড়িতে স্বামীস্ত্রীর ঝগড়া হয়েছে, বাবাকে ডেকে আনা হলো সাক্ষী করে। বাবা দুদিকেই ধমক ধামক দিয়ে পরিস্থিতি কবলে আনল। আমার সঙ্গে বাবার চিন্তাভাবনার নানা বিষয়ে পার্থক্য থাকলেও একটা বিষয়ে আমি নিশ্চিত ছিলাম যে আমার বাবা মাথার ওপরে আছে, যে ভরসা যোগাবেই, বলবে "আগে কর না,তারপর যা হবে দেখা যাবে"।
মনে হলো মেয়ের সামনে সেই বাবাকেই দরকার। মেয়েকে বললাম, "কোনো চিন্তা করিস না, তোকে ধাক্কা দিলে তুইও দিবি। তবে গাড়িতে সাবধান, বেশি লাফালাফি নয়। আর এখানে গাড়ি থামলে আমি ছেলেটাকে বুঝে নেবো। ওর বাবা মায়ের সঙ্গেও কথা বলে নেবো। কোনো ভয় পাবিনা, আমি আছি তোর পাশে"।দেখলাম মেয়ে আত্মবিশ্বাসের আতিশয্যে ছটফট করছে!
আসলে এইটাই হয়। সন্তান বাবা মায়ের কাছে ভরসাই চায়। একবার যদি সেটা পেয়ে যায়, সামনের কোনো বাধাই আর বাধা হয়ে ওঠে না তাদের কাছে।
© অতনু প্রজ্ঞান