17/03/2024
মানবিকতা এক অনন্য সম্পদ
পাশ্চাত্যের বিখ্যাত হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি আর আমাদের ভারতের তাজমহল দুইটিই একই সময়ে নির্মিত। ১৬৩২ খৃষ্টাব্দে তাজমহল নির্মাণ শুরু হয়, ১৬৫৩ খৃষ্টাব্দে শেষ হয়। ১৬৩৬ খৃষ্টাব্দে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
পাশ্চাত্যের ধনকুবেররা যখন একের পর এক ইউনিভার্সিটি বানাতে ব্যস্ত ছিলেন, আমাদের দেশের শাসকরা তখন তাজমহল বা শৌখিন সব উদ্যান বানাতে ব্যস্ত ছিলেন।
তাও আবার জনগণের টাকা ব্যবহার করেই।
অথচ এক তাজমহলের খরচ দিয়ে কতগুলো ইউনিভার্সিটি করা যেত তার হিসাব নেই।
চারশো বছরের পরেও ঐ ধারাটা কেন জানিনা এখনও চলছে।
পাশ্চাত্যের বেশীর ভাগ ধনকুবেরদের একটা উদ্যোগ আমার খুব ভালো লাগে। এরা ধন সম্পদ বানান। তবে সেই সম্পদ দিয়ে এরা নায়ক নায়িকা নাচান না। এরা জীবিতকালের মধ্যেই তাদের সম্পদের সিংহভাগ সমাজের উন্নয়নের জন্য দান করে দিয়ে চলে যান।
আমাদের উপমহাদেশের ধনকুবেরদের মধ্যে এই প্রবণতা একেবারেই নাই।
এইজন্যই দেখবেন, আমেরিকার বহু ইউনিভার্সিটিই ব্যক্তির নামে। কিন্তু ভারতে এমন কোন ধনকুবের ব্যতিক্রমী দুয়েক জন ছাড়া খুব কমই দেখা যায়, যে নিজের সম্পত্তি দিয়ে একটা ইউনিভার্সিটি বা হাসপাতাল বানিয়ে দেশ বা জাতির নামে উৎসর্গ করেছে।
ভারত বা উপমহাদেশের কেউ ধনকুবের হলে আমরা খুশি হলেও, সত্যি কথা হলো, এই টাকাটা পাশ্চাত্যের কেউ উপার্জন করলে বরং আমাদের সমগ্র বিশ্ববাসীদের উপকারে আসলেও আসতে পারতো। অথচ ভারত উপমহাদেশের ধনকুবেরদের মানসিকতা এতোটাই স্থূল যে, এরা নিজের সন্তানদের সোনা জহরতে মুড়ে দেবে, একাধিক লিমিটেড এডিশন গাড়ি, বিলাসবহুল বাংলো কিনে দেবে, কিন্তু একটা ইউনিভার্সিটি বা হাসপাতাল কখনোই বানিয়ে দেবে না।
সম্প্রতি ২০২৪’এ এক বিলিয়নিয়ার মহিলা ‘রূথ গটেসম্যান’ (বয়স ৯৩) নিজের সমস্ত সম্পদ আইনস্টাইন মেডিকেল স্কুলে দান করে গেলেন। ফলাফল? ২০২৪ অগাস্ট থেকে ছাত্রছাত্রীদের আর শিক্ষা ঋণ নিয়ে পড়তে হবে না। ওরা বিনামূল্যে পড়তে পারবে।
মহিলা চাইলেই হলিউডের নায়ক নায়িকা এনে নাচাতে পারতেন, কিন্তু তাতে সমাজের কি উপকার হোতো বা কতজন তাকে সন্মানের সাথে মনে রাখতো? তাই তিনি এমন ব্যবস্থা করে গেলেন, এই ডাক্তার ছেলে মেয়েগুলা সারাজীবন এই মহিলার কাছে কৃতক্ষ থাকতে ও মনে রাখতেও বাধ্য হবে।
আমাদের উপমহাদেশের মানুষ এবং সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের অনেকের মধ্যেই এক ধরণের অহেতুক গর্ব আছে। আর পাশ্চাত্যের প্রতি আছে অহেতুক বিদ্বেষ।
অথচ সত্যি কথা হলো, আমাদের দেশে একশোটা ধনকুবের থাকলে বড়জোর সলমান, শাহরুখ বা দীপিকার লাভ হয়। আম জনতা আমার আপনার জন্য বিনামূল্যের শিক্ষা বা চিকিৎসার ব্যবস্থা শেষ মেশ ঐ ওয়ারেন বাফেট বা বিল গেটস’এর দান করা অর্থ থেকেই আসে। যদিও প্রকৃত পক্ষে তার অর্ধেক টাকাও দুস্থ জনগণের উপকারের জন্য খরচ হয়না, ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ও প্রশাসনের বিশিষ্ট কিছু মতলবী দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিবিশেষ সেই অর্থ নিজেদের পকেটস্থ করে।
বিশ্বের সর্বোচ্চ স্থানাধীকারী পরোপকারী লোকহিতৈষী (Top Philanthropist) একশো জনের তালিকার মধ্যে টাটা গোষ্ঠী আর আজিম প্রেমজী ব্যতীত কোনো নাম অন্তর্ভুক্ত নেই
আমাদের দেশের সকল ধনকুবের দেশের ছাত্রছাত্রীদের জন্য স্কলারশিপের ব্যবস্থা করেনা। বরং পাশ্চাত্যের কোন ধনকুবেরের দান করে যাওয়া অর্থতেই আমাদের সন্তানসন্ততিরা হয়তো একদিন উচ্চশিক্ষা লাভ করতে পারে।
পাশ্চাত্যের লোকজনের চিন্তা ভাবনা আর কর্ম নিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখেছি, তারা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি মানবিক, অনেক কম স্বার্থপর।।
আলফ্রেড নোবেল শেষবয়সে নিজের সম্পদের বৃহত্তর অংশ দিয়ে গেছেন বিজ্ঞান, সাহিত্য, অর্থনীতি, শান্তি, ইত্যাদির জন্য। সেই আলফ্রেড নোবেল যদি এই উপমহাদেশের হতেন, তাহলে ছেলের বিয়েতে খরচ করতেন অর্ধেক, মেয়ের বিয়েতে খরচ করতেন অর্ধেক। তারপর শেষ বয়সে এসে মন্দির বা মসজিদ বা গীর্জা নির্মাণ করে সমাজসেবক উপাধি নিয়ে ইহলোক ত্যাগ করতেন।
তারপর তার মৃত্যুর পর ছেলে, বৌমা, মেয়ে, মেয়ের জামাই আর ভাই-ভাইপো মিলে শুরু হতো সম্পদের ভাগ বাটোয়ারা। মামলা হতো, হামলা হতো। ভাইয়ে ভাইয়ে মারামারি লেগে শেষে মরা বাবাকে গালিগালাজ করতো। ভারতের বেশিরভাগ ধনকুবেরের মৃত্যুর পরের চিত্র কিন্তু এরকমই হয় দেখেছি।
তুলনা করছি না। কে কার টাকায় কী করবে, সেইটা অবশ্যই যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার।
কিন্তু পাশ্চাত্যের ধনকুবেরদের এই মানবিক দিকটা আমাদের কাছে খুবই শিক্ষনীয়।
আমাদের দেশের ধনকুবেরদের চিন্তাভাবনা ঐ পর্যায়ে উঠতে আর কত শত বছর লাগবে, সেটাই এখন দেখার।
সুখে থাকুন ওনারা, কিন্তু এই বার্তা যদি ওনাদের কারো কাছে পৌছাতে পারি, তাহলে আমাদের সাধারণ দেশবাসীর বিনীত আবেদন রইলো যে, আপনাদের জীবিতকালের মধ্যেই উপার্জিত অর্থের সিংহভাগ সমাজের উন্নয়ন প্রকল্পে খরচ করে যান - তাতে অন্তত সমগ্র সমাজবাসী আপনাদের দেবতুল্য সন্মান করবেন, আপনারা ঈশ্বরের আশীর্বাদ ধন্য হবেন - অন্যথা আপনার কষ্টার্জিত অর্থ ও সম্পদ আপনার পরিবারবর্গের মধ্যে অযথা বিবাদ ও বিস্বাদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে
হরে কৃষ্ণ 🙏