04/07/2026
৪ঠা জুলাই : স্বামী বিবেকানন্দের তিরোধান — এক মহাজীবনের শেষ প্রহরের ইতিহাস
ভারতবর্ষের ইতিহাসে এমন কিছু দিন আছে , যা কেবল একটি তারিখ নয় — এক একটি যুগের সমাপ্তি , এবং নতুন যুগের সূচনার প্রতীক। ১৯০২ সালের ৪ জুলাই ছিল তেমনই একটি দিন।
সেদিন সন্ধ্যায় বেলুড় মঠের গঙ্গাতীরে নিভে গিয়েছিল এক উজ্জ্বল প্রদীপ। মাত্র ঊনচল্লিশ বছর বয়সে মহাসমাধিতে লীন হন স্বামী বিবেকানন্দ। কিন্তু তাঁর দেহাবসান কোনো সমাপ্তি নয় — বরং তাঁর ভাবনা, আদর্শ এবং কর্মের এক নতুন অভিযাত্রার সূচনা।
স্বামীজী বহুবার ঘনিষ্ঠ শিষ্যদের কাছে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে তিনি দীর্ঘ জীবন লাভ করবেন না। তাঁর একটি বিশেষ বিখ্যাত উক্তি— " আমি চল্লিশ বছর পার করব না . ." তখন অনেকে একে কেবল ভবিষ্যদ্বাণী ভেবেছিলেন। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় , তিনি সত্যিই ৩৯ বছর ৫ মাস ২৪ দিন বয়সে দেহত্যাগ করেন।
১৯০২ সালের ৪ জুলাই সকালটি ছিল অত্যন্ত শান্ত। বেলুড় মঠে তিনি স্বাভাবিক নিয়মেই দিন শুরু করেন। ধ্যান ও প্রার্থনার পর শিষ্যদের সঙ্গে সংস্কৃত ব্যাকরণ এবং বেদান্ত নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে জানা যায় , সেদিন তাঁর কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত প্রশান্তি এবং মুখে এক অনাবিল দীপ্তি। দুপুরে তিনি সন্ন্যাসী ও ব্রহ্মচারীদের সঙ্গে আহার করেন এবং মঠের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েও কথা বলেন।
বিকেলে তিনি বেলুড় মঠ প্রাঙ্গণে কিছুক্ষণ হেঁটে বেড়ান। গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে তিনি নীরবে প্রকৃতিকে দেখছিলেন। যেন এক দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষে অন্তরের গভীরে প্রস্তুত হচ্ছিলেন এক মহাযাত্রার জন্য।
সন্ধ্যার আগে তিনি নিজের কক্ষে প্রবেশ করেন। ধ্যানে বসেন। উপস্থিত সন্ন্যাসীদের বর্ণনায় জানা যায় , ধ্যানের এক পর্যায়ে তিনি শয্যায় শায়িত হন। কিছুক্ষণ পর একটি গভীর নিশ্বাস নেন , তারপর আরেকটি। এরপর সমস্ত শরীর নিস্তব্ধ হয়ে যায়। সময় তখন প্রায় রাত ৯টা ১০ মিনিট। চিকিৎসকদের ধারণা ছিল , মস্তিষ্কের একটি রক্তনালী ফেটে যাওয়ায় তাঁর মৃত্যু ঘটে। তবে রামকৃষ্ণ পরম্পরায় বিশ্বাস করা হয় যে তিনি গভীর যোগসাধনার মাধ্যমে সচেতনভাবেই মহাসমাধি লাভ করেছিলেন।
পরদিন তাঁর দেহ গঙ্গাতীরে চন্দনকাঠের চিতায় দাহ করা হয়। আজ সেই স্থানেই বেলুড় মঠে তাঁর স্মৃতিমন্দির প্রতিষ্ঠিত , যেখানে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসেন।
ঐতিহাসিক গবেষণায় দেখা যায় , স্বামী বিবেকানন্দের জীবনের শেষ কয়েক বছর ছিল শারীরিকভাবে অত্যন্ত কষ্টকর। ডায়াবেটিস , হাঁপানি , স্নায়বিক সমস্যা এবং অনিদ্রায় তিনি ভুগছিলেন। তবুও তিনি দেশ-বিদেশে বক্তৃতা , শিক্ষা , সমাজসেবা এবং রামকৃষ্ণ মিশনের সাংগঠনিক কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখেননি। তাঁর কাছে ব্যক্তিগত কষ্টের চেয়ে জাতির জাগরণ ছিল অনেক বড়।
তাঁর তিরোধানের তাৎপর্য কেবল ধর্মীয় নয় ; এটি ভারতীয় নবজাগরণের ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি ভারতবাসীকে আত্মবিশ্বাস , মানবসেবা , শিক্ষা , বিজ্ঞানমনস্কতা এবং ধর্মীয় সহিষ্ণুতার শিক্ষা দিয়েছিলেন। তাঁর সেই আহ্বান— " উঠো , জাগো , এবং লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত থেমো না ! "—আজও লক্ষ লক্ষ তরুণের প্রেরণার উৎস।
৪ জুলাইয়ের একটি আশ্চর্য ঐতিহাসিক তাৎপর্যও রয়েছে। যে দিনে আমেরিকা স্বাধীনতা লাভ করেছিল , সেই দিনেই আমেরিকায় ভারতীয় দর্শনের অন্যতম প্রধান দূত স্বামী বিবেকানন্দ দেহত্যাগ করেন। অনেক গবেষক এটিকে নিছক কাকতালীয় ঘটনা হিসেবে দেখলেও , অনেকে এর মধ্যে প্রতীকী অর্থ খুঁজে পান — বিশেষ করে পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে যে সেতুবন্ধন তিনি নির্মাণ করেছিলেন, তারই এক গভীর স্মারক যেন এই তারিখ।
আজ , তাঁর তিরোধান দিবসে আমরা কেবল এক মহান সন্ন্যাসীকে স্মরণ করি না ; স্মরণ করি এক দার্শনিক , এক দেশপ্রেমিক , এক মানবতাবাদী এবং এক বিশ্বনাগরিক’কে। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় — মানুষের প্রকৃত শক্তি তার আত্মবিশ্বাসে , তার সেবায় এবং তার চরিত্রে।
স্বামী বিবেকানন্দের দেহ একদিন বিলীন হয়েছে , কিন্তু তাঁর আদর্শ আজও জীবন্ত। গঙ্গার ঢেউ যেমন অবিরাম বহমান , তেমনি তাঁর বাণীও যুগে যুগে নতুন প্রজন্মকে জাগিয়ে তুলবে। তাই ৪ঠা জুলাই কোনো শোকের দিন নয় , বরং এটি আত্মজাগরণ , কর্ম এবং মানবসেবার এক অনন্ত আহ্বানের দিন।
© বেণুদার বৈঠকখানা - Benudar Boithawk’khana