01/05/2025
"বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে নিয়ে" নাটকটি দেখে রায়গঞ্জ ইনস্টিটিউটের নাট্যকর্মী শ্রীমতি দেবস্মিতা দে বিশ্লেষণ করেছেন।
কালিয়াগঞ্জের নজমু থিয়েটার হলে অনুষ্ঠিত হল "যাত্রিক নাট্যগোষ্ঠী " পরিচালিত নাটক "বুকের পাজর জ্বালিয়ে নিয়ে" ।
নাটকের প্রেক্ষাপট স্বাধীনতা আন্দোলনকে ঘিরে বিপ্লবীদের লড়াই, বীর বিপ্লবী যতীন দাসের জীবনকে কেন্দ্র করে নাটকের আবর্তন।১৯২৯ সাল, তরুন বিপ্লবীদের দল শুরু করেছিল তাদের আন্দোলন,গণ আন্দোলনের জন্য হাজত বাস এবং দেশবাসীর আবেগের প্রকাশরূপে দেশ জুড়ে অসহযোগ আন্দোলনের সাড়া পড়লেও সেটা তুলে নেওয়া হয় চৌরিচৌরা থানা জ্বালিয়ে দেওয়ার হিংসাত্মক পদক্ষেপের কারণে। কংগ্রেস দুইভাগে বিভক্ত হলে রামপ্রসাদ বিসমিল ও আসফাকুল্লার উদ্যোগে শচীন্দ্রনাথ সান্যালের নেতৃত্বে তৈরী হয় হিন্দুস্তান রিপাবলিকান আর্মি ( HRA) । এদিকে যতীন দাসের বাবার অনেক স্বপ্ন যে ছেলে তার ব্যাবসা দেখাশুনো করবে কিন্তু মাত্র ১৭ বছর বয়স থেকেই যতীন দাসের মনে দেশপ্রেম জাগ্রত হয়ে ওঠে, দেশকে স্বাধীন করার নেশা তাকে ঘরছাড়া করে, এই পথে চলতে গিয়ে ভগৎ সিং, আশফাকুল্লা খান, রামপ্রসাদ বিসমিল,বটুকেশ্বর দত্তের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন তিনি। শচীন্দ্রনাথ সান্যাল এর মাধ্যমে প্রাপ্ত "রবীন" ছদ্মনাম নিয়ে যতীন দাস বোমা তৈরী শেখেন নিজের ইচ্ছেতে,তারপর কেন্দ্রীয় আইনসভায় সেই বোমার বিস্ফোরন ঘটান ভগৎ সিং। সেই ঘটনায় ক্ষতি হয়নি কোনো মানুষের কারন সেটি আসল বোমা ছিলো না, শুধু ব্রিটিশদের ভয় দেখানোর একটি পন্থা ছিলো। কিন্তু তাও যতীন দাসকে লাহোর জেলে বন্দি করে রাখা হয়, সাথে ছিলেন ভগৎ সিং, রাজগুরুর মতো মানুষেরা। চলতে থাকে অকথ্য অত্যাচার , অপরিচ্ছন্ন,আলো বাতাসহীন অস্বাস্থ্যকর ঘরে দিনের পর দিন রাখা হয় তাদের ,খাবার এর মান ছিলো ভীষন নিম্নমানের, বিপ্লবীরা অনশন করেন কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন ঘটে না বিন্দুমাত্র, অবশেষে ৬৩ দিন অনশন করার পর মৃত্যবরন করেন " বিপ্লবী যতীন দাস"। তার নাম হয়তো আমরা অনেকেই জানি কিন্তু দেশের প্রতি তার প্রেম, আত্মত্যাগের এই সত্যি গল্প হয়তো অনেকেরই জানা নেই। অনেক বিপ্লবীই আছেন যাদের নাম ইতিহাস বই এর একটি বাক্য ছাড়া আর কোথাও সেভাবে স্থান পায়না, কিন্তু তাদের আত্মত্যাগ,দেশপ্রেম,জীবন কাহিনী এতটাই দীর্ঘ এবং হৃদয় বিদারক যে তাদের নামে পুরো বই লিখেও হয়তো শেষ করা যাবেনা। সেই সমস্ত বিপ্লবীদের জীবন কাহিনী এইরকম ভাবেই তুলে ধরা উচিৎ মানুষের সামনে।
শুভাশীষ চক্রবর্তী মহাশয় এর নির্দেশনায় " বুকের পাজর জ্বালিয়ে নিয়ে" নাটকটি দেখতে দেখতে হারিয়ে গিয়েছিলাম প্রাক স্বাধীনতার দিনগুলিতে, যা বই এ পড়েছি সেগুলো যেন প্রতিটি মুহূর্তে চোখের সামনে ঘটে চলেছিল। যতীন দাসের চরিত্রে গৌরাঙ্গ পালের অভিনয় ভালো লেগেছে, ভগৎ সিং এর ভূমিকায় সৌমেন পাল যথেষ্ট সুন্দর অভিনয় করেছেন, কেয়া দাসের অভিনয়, কোরিওগ্রাফি নজর কেড়েছে, গৌরাঙ্গ সাহার কন্ঠে ঘটনার বিবরন সাথে তার অভিনয় সত্যিই ভীষন ভালো। নিখাদ নির্দেশনা, লাইট, সাউন্ড দিয়ে যে এরকম ভাব, দেশপ্রেমের পরিবেশ গড়ে তোলা যায় তা হয়তো নাটকটি না দেখলে এভাবে অনুভব করা যেত না। নাটকের চরম উত্তেজনামূলক মুহূর্তগুলোতে প্রতেকের সমবেত অভিনয় ভীষন ভাবে মন কেড়েছে। সর্বোপরি সকলের চরম পরিশ্রমের ফসল এই নাটকটি। চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে দৃশ্যবদল, একের পর এক প্রতিটি মুহূর্ত যেন জীবন্ত হয়ে উঠছিল চোখের সামনে। অনেক অভিনন্দন যাত্রিক নাট্যগোষ্ঠীকে আমাদের এত সুন্দর একটি নাটক উপহার দেওয়ার জন্য।
🖋দেবস্মিতা দে(রায়গঞ্জ ইন্সটিটিউট )