24/01/2026
"বনমালী তুমি পরজনমে হইও রাধা"
বহুদিন ধরে, বহু ক্রোশ দূরে,
বহু ব্যয় ক'রি, বহুদেশ ঘুরে,
দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা,
দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু
দেখা হয়না ই চক্ষু মেলিয়া,
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া,
একটি ধানের শিষের ডগায় একটি শিশির বিন্দু।।
প্রাপ্তি ঠিক কি? অ প্রাপ্তি দিয়ে সেটা define করা যায়। ঠিক যেরকমটা মন্দ ভালো, আঁধার আলো র রসায়ন! মন্দ আছে বলেই ভাল র মাহাত্ম্য। আঁধার আছে বলে আলোর কদর! প্রাপ্তির ভাঁড়ার সদাই পূর্ণ থাকবে, তা হয়না। কারো জীবনে 'না পাওয়া' র বসবাস কেই আজন্ম নীরবে বহন করে চলতে হয়। ওই অনাকাঙ্খিত 'ছুটে আসা না পাওয়া' ই তার 'পাওয়া' হয়ে দাঁড়ায়
অপ্রাপ্তি কে আপন করে নিয়ে প্রাপ্তি কে ভুলতে হয়, না পাবার যন্ত্রণা কে, শূন্যতা কে ঢাকতে হয়, সেটা বিনোদিনী র থেকে ভাল আর কেউ জানে না। হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন, রবিঠাকুরের বিনোদিনী, মহেন্দ্রর বিনোদ! তার যন্ত্রণার শূন্যতার কথাই ব্যক্ত করতে বসেছি আজ!
সেই রিক্ত মেয়েটি কি চেয়েছিল? খুব বেশি কিছু কি?
না তো!
চেয়েছিল শুধু একটু খানি সমতা। ঋতুপর্ণ বের করে এনেছেন কিছু সূক্ষ্ম মানব প্রবৃত্তি, যেটা আদিম, যেটা মননের খুব গহীনে সুপ্ত অবস্থায় থাকে, সহসা জাগে না। তবে জাগে কখনও খুব কষ্ট হলে, অপ্রাপ্তির, অবহেলার শিকার হয়ে, প্রতিশোধ মনস্কতায়, স্পৃহায়! মনস্তত্ত্ব তাই বলে।
Sequence টা কি? কোন ফ্রেম রিলেটেড লক্ষ্য করেছেন কি কেউ?
শারদীয়া র অন্তে বিজয়া দশমীর দিন। আশালতা সিঁদুর এ মাখামাখি মুখ ধুয়ে নিচ্ছে, পাশেই বিনোদিনী জলের ঘটি হাতে দাঁড়ানো। আশালতা র চোখ জ্বলছে সাবান এ, বিনোদিনী এগিয়ে দিতে গিয়েও পেছনে সরিয়ে নিল চট করে। কেনো নিল, প্রতিশোধ স্পৃহা, না পাবার যন্ত্রণা তে? আমিও জ্বলছি, তুই ও জ্বলে দেখ সই কয়েক সেকেন্ড, কষ্ট কাকে বলে? আশালতা চাইছে জল - বালি ও বালি, কোথায় জল! জল টা দে বালি, পারছি না আর। তাও বালি র কানে যাচ্ছেনা সে আকুতি! তক্ষুনি অন্দর থেকে ডাক আসে, ও নতুন বৌ, গিন্নী মা ডাকছেন, আজ যে একাদশী। চমক ভাঙ্গে বিনোদিনী র ওই 'একাদশী' কথাটার অমোঘ অভিঘাত এ! এটাও যে তার এক অলংকার, বৈধব্যের উপহার স্বরূপ। এরকম উপহার তো সে অনেক পেয়েছে, এতে শুধু তারই অধিকার, এত সুখ রাখবে কোথায়! হুঁশ ফেরে বাস্তবে, ঘটি এগিয়ে দেয়।
এটাও মনে হয়েছে, একজনের সিঁদুরে মাখা মুখ মাথা, আরেকজনের শূন্য সিঁথি, সাদা থান। একজন সালংকারা, আরেকজন নিরাভরণ, কোনদিনও অলংকার উঠবে না তার গায়ে, সিঁদুর এর ছোঁয়া লাগলে পাপিষ্ঠা বলে দাগিয়ে দেয়া হবে তাকে। এ এক অদ্ভুত সমাপতন!
চরিত্রের মনের অতলান্ত গতিবিধি এরকম সূক্ষ্মতায় তুলে আনতে পারতেন ঋতুপর্ণ।
এই সমতা র তালিকায় আরো এক গভীর স্পর্শকাতর ফ্রেম! মহেন্দ্র আর বিনোদিনী র। জীবনের না থাকা স্বামীর নামে পূজো দেয়ার অজুহাত এ মহেন্দ্র র সাথে ঘোড়ার গাড়িতে সওয়ার বিনোদিনী। মহেন্দ্র র আদরে সোহাগে বাহুলগ্না হয়ে অসতর্ক মুহূর্তে আচমকাই সিঁদুর লেগে যায় বিনোদিনী র, মহেন্দ্র র কাছ থেকে। তখন তাদের কথোপকথন:
মহেন্দ্র - এই যাহ! সিঁদুর লেগে গেলো, মুছে ফেলো।
বিনোদিনী সিঁদুর মুখ এনে মুছে ফেললো সেই সিঁদুর মহেন্দ্রর পরনের পোশাকেই।
মহেন্দ্র - একি !
বিনোদিনী - মুছে ফেললাম।
মহেন্দ্র - ইশ, কি যে করো না বিনোদ! এই নিয়ে এখন বাড়ি ফিরব কি করে!
বিনোদিনী - সঙ্গ করবে, চিহ্ন রাখবে না, তাই কি হয় বলো!
আমি সেই কবে কার সঙ্গ করেছি কোন কালে ম'বে ভূত হয়ে গেছে, এত বছর পরও তার চিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছি।
কোন চিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছে বিনোদ এখনও! সাদা থান, গলায় তুলসীর মালা! লাল আলতা, লাল ব্লাউজ, সিঁদুর, ঋতুরক্ত - লালের ছড়াছড়ির পাশে বৈধব্যের ফিকে শুভ্রতা কনট্রাস্ট করেছিলেন। সাক্ষাতকার এ বলেন, ওই এত এত লাল রঙের ওপর বিনোদ এর কোন অধিকার ছিল না, সেটাই দেখানোর ছিল।
মিলনে সমাজবোধ আসে না। তবে মিলন অন্তে! সমাজবোধ এর নিগড় মনে ফিরে আসে সেই মুহূর্তেই! তাই মহেন্দ্র বিনোদ কে বলে সিঁদুর মুছে ফেলতে! বুঝিয়ে দেয়,
আমি তোমাকে সামাজিক ভাবে কখনোই সিঁদুর স্বীকৃতি দেবো না।
সত্যিই তো সম্ভোগ এর বেলায়, শারীরিক সুখভোগ করার মুহূর্তে কোনো সমাজবোধ থাকে না, দায়ও থাকেনা। তবে সম্ভোগ পূর্ণ হয়ে গেলে, বোধ জাগ্রত হয়! আর ঠিক
এখানেই বিনোদিনী র revolution স্পষ্ট হয়।
সমতার বিচার! ওই যে মহেন্দ্রর আক্ষেপ ভরা উক্তি -
এই যাহ! সিঁদুর লেগে গেলো, মুছে ফেলো। সত্যিই তো, বিনোদ এর মতো ব্যক্তিত্ব কে শারীরিক চাহিদায় ব্যবহার করা যায়, সিঁদুর স্বীকৃতির কথাই ওঠে না।
আর সেই পড়ন্ত বেলায়, আধো অন্ধকার বদ্ধ ঘোড়ার গাড়ির জানলা দিয়ে এসে পড়া একফালি রোদের দিকে তাকিয়ে বিনোদিনী র বলা - ওই একজনের চিহ্ন আজন্ম বয়ে চলেছি। বুকে, মনে হাতুড়ির ঘা দেয়। চিহ্ন, বলতে বৈধব্য বেশ, কৃচ্ছসাধন। বিনোদ সমতা চাইছে। সঙ্গ করবে, চিহ্ন রাখবে না, তাই কি হয় বলো! চিহ্নের ভাগও নিতে হবে সমান দুজনকেই। মিলনের ফলাফল ও ভাগ করে নিতে হবে।
তাই সে ইচ্ছে করেই সিঁদুরের ভাগ মহেন্দ্র কে দিয়েছে!
ব্যক্তিগত জীবনে মায়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন ঋতুপর্ণ। মা চলে যাবার পর তাঁর চলচ্চিত্রেও, একাকিত্বের সংজ্ঞা গুলোও পাল্টাতে থাকে। ব্যক্ত হয়েছে সেটা তাঁর কাজের ধরণে।
মা চলে যাবার পর, লন্ডনের ওয়েস্টমিনিস্টার ইউনিভার্সিটি আয়োজিত এক কনফারেন্স এ তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, তাঁর চলচ্চিত্রের সাম্প্রতিক বিষয়ভাবনা ঠিক কিরকম? তিনি কোন দৃষ্টিভঙ্গি তে ভাবছেন? মায়ের স্মৃতি অনুষঙ্গ নিয়ে এসে ঋতু উত্তর দেন ''creating a friendship with depth''.
''মা চলে যাবার পর মায়ের সঙ্গে নতুন করে আরেকটা বন্ধুত্ব তৈরি হল। মা যখন ছিলেন আর যখন রোগ শয্যায়, তখন সেই বন্ধুত্ব টা আলাদা করে আমার পাতানোর প্রয়োজন হয়নি। পরে দেখলাম, মায়ের না থাকাটা মনেই হচ্ছেনা আর আমার। আগে যখন কিছু খুঁজে না পেলে মা কে বলতাম একটু খুঁজে দাও মা। এখন তেমন হারানো কিছু খুঁজে পেলে বলি থ্যাংক ইউ গো মা''
- দেশ পত্রিকায় তাঁর আত্মকথা