14/08/2021
লিভ টুগেদার নাকি বিয়ে?
প্রদীপ্তা গোস্বামী
"Its better to have a live-in relationship rather than having a divorced life". - বর্তমানে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত যুবক-যুবতীদের মত এমনই। এখন সামাজিক মানুষ প্রকৃতপক্ষে হয়ে উঠেছে প্রযুক্তি মানব।সকাল থেকে রাত আমদের বিচরণ চলে প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে। তাই সামাজিক বিধি -নিষেধ নস্যাৎ করে নিজের শর্তে বাঁচার তাগিদ অনুভব করছি আমরা যারা আধুনিক এবং শহুরে শিক্ষিত মানুষ। সেই তাগিদ থেকেই নারী-পুরুষের সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, লিভ-ইন রিলেশনশিপ; অর্থাৎ বিয়ে না করেও একসাথে থাকা।
আশ্চর্যের বিষয় হল, প্রাচীনকালে মুনি-ঋষিদের মধ্যে বিয়ে না করে নারী-পুরুষ একসাথে থাকার রীতি-নীতি
প্রচলিত ছিল। বৈদিক মতে এই রীতিকে গান্ধর্ব বিবাহ আখ্যা দেওয়া হয়। এমনকি তারা বংশরক্ষার দরুণ সন্তানাদি নিত এভাবেই। বিবাহ প্রথার সম্পর্কে তাদের কোনো ধ্যান-ধারণাই ছিল না। কিন্তু কিছুসময় পরে যখন মানুষ আদিম বন্য জীবনযাপন ছেড়ে সভ্য হতে শুরু করলো, তখন শিথিল পারিবারিক ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনতে এবং সমাজগঠনের তাগিদে বিবাহ প্রথার প্রচলন করেন একজন ঋষি, তার নাম শ্বেতকেতু।
উদ্দালক ঋষির পুত্র শ্বেতকেতুর আসলে কৈশোরে কিছু ঘৃণ্য ঘটনার অভিজ্ঞতা হয় তার মাকে ঘিরে। কিশোর শ্বেতকেতু নিজের চোখের সামনে দেখে তার মাকে একজন উগ্র ব্রাহ্মণ জোর করে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ভোগ করবার উদ্দেশ্যে, শ্বেতকেতুর বাবার চোখের সামনে দিয়ে। অথচ উদ্দালক নির্বিকার। তাঁর মতে, পৃথিবীতে সব প্রাণীই বন্ধনহীন আর সনাতন ধর্মানুযায়ী নারীরা গরুর মতই অরক্ষিত। উদ্দালক শ্বেতকেতুকে বলেন যে, তার মায়ের ওপর উদ্দালকের কোনো অধিকার নেই। এমনকি এও জানা যায় যে, শ্বেতকেতু নাকি উদ্দালকের ক্ষেত্রজ সন্তান।
যাইহোক, বাবার তার স্ত্রীর প্রতি এহেন উদাসীন আচরণে শ্বেতকেতু অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন এবং এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেন। চব্বিশ বছর বয়সে বেদজ্ঞ পন্ডিত হয়ে ফিরে এসে শ্বেতকেতু বিবাহ প্রথার প্রচলন করেন। বিবাহ ব্যতীত নারী-পুরুষের একসাথে বসবাস করাকে অবৈধ বলে ঘোষণা করেন শ্বেতকেতু। তার উদ্যোগে এই প্রথম নারী-পুরুষের সম্পর্ক সামাজিক বৈধতা পায়৷ আসলে কৈশোরে নিজের মায়ের অসম্মান -নিরাপত্তাহীনতা এবং তার বাবার উদাসীন আচরণ শ্বেতকেতুর মনে দাগ কেটেছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে নারী-পুরুষের সম্পর্ককে বিশ্বাস, নিরাপত্তা এবং মর্যাদা দিয়ে আবদ্ধ না করলে পরিবার গড়ে উঠবে না। তাই নারী-পুরুষকে বিবাহের বন্ধনে বাঁধতে হবে, যাতে তাদের সন্তানেরাও নিরাপদ বোধ করে এবং তাদের সম্পর্কের ভিত মজবুত হয়।
বর্তমানে এই বিয়ে না করে একসাথে নারী-পুরুষের সহবাস পদ্ধতিই আবার ফিরে এসেছে নতুন প্রজন্মের হাত ধরে। বলা যায়, বৈদিক যুগের সেই গান্ধর্ব বিবাহের পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত রূপ হল লিভ-ইন রিলেশনশিপ। পাশ্চাত্য সমাজে লিভ-ইন করা জলভাত। কিন্তু আমাদের সমাজে আজও এই ধরনের সম্পর্ক তেমনভাবে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। যদিও আদালতের বেশ কিছু রায় এর সপক্ষে, তবু্ও কোনো নির্দিষ্ট আইন এখনও স্থান পায়নি ভারতীয় সংবিধানে।
তবে হ্যাঁ, ২০১০ সালের আগস্ট মাসে সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে, কোনো নারী-পুরুষ যদি দীর্ঘদিন একসাথে বসবাস করে স্বামী-স্ত্রীর মতো, তবে তাদের সম্পর্ক বিবাহ বলেই গণ্য হবে এবং তাদের সন্তান জন্মালে সেও বৈধতা পাবে সাধারণ বিবাহিত দম্পতির সন্তানের মতই।
সেইসব সন্তানদের 'অবৈধ' বা 'বেশ্যার বাচ্চা' - এসব বলা বেআইনি; ২০০৮ সালেই সুপ্রিম কোর্ট বেঞ্চ এই রায় দেয় বিচারপতি অরিজিত পাসায়েতের নেতৃত্বে। কেরালার এক মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্ট যুগান্তকারী নির্দেশ দেয় যে, বিয়ে না করেও একত্রে বসবাস করতে পারেন প্রাপ্তবয়স্ক যুগল।
এছাড়াও, ভারতীয় সংবিধানে 'গার্হস্থ্য হিংসা আইন- ২০০৫' যেসব মহিলারা লিভ-ইন রিলেশনে রয়েছেন তাদের সুরক্ষা দেয়, অর্থাৎ তারা কোনোভাবে গার্হস্থ্য হিংসার শিকার হলে তারা আইনের সাহায্য নিতে পারে; যেহেতু এই আইনের দ্বিতীয় ধারায় বলা হয়েছে যে, দুজন ব্যক্তি একসাথে বিবাহিত দম্পতির মত বসবাস করছে বা আগে করত, তাদের সম্পর্ক গার্হস্থ্য সম্পর্ক বলেই বিবেচিত হবে। এমনকি, IPC ৪৯৮ ধারায় বলা হয়েছে, যেসব মহিলারা লিভ-ইন সম্পর্কে রয়েছেন, তারা শারীরিক বা মানসিক ভাবে নিগৃহীত হলে পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন এবং সুরক্ষা, ক্ষতিপূরণও দাবি করতে পারেন 'গার্হস্থ্য হিংসা আইন' এর ১৮ থেকে ২৩ ধারার আওতায়। তাছাড়াও, কোনো মেয়ে যদি লিভ-ইন রিলেশনের দরুণ কোনো প্রতারকের পাল্লায় পড়ে শোষিত হয়, সেক্ষেত্রেও আইন তাকে সুরক্ষা দেবে।
তবে এত কিছু সত্ত্বেও আমাদের সমাজ কি আজও মেনে নিতে পারছে এধরনের সম্পর্ক! উত্তর হল, না! বেশিরভাগই মনে করেন, এজাতীয় সম্পর্ক আমাদের সংস্কৃতির পরিপন্থী। তাই তো আজও অবিবাহিত যুগলকে বাড়ি ভাড়া দিতে চায় না অনেকেই। বাইরে ঘুরতে গিয়েও নিজেদের বিবাহিত দেখিয়ে তবে হোটেলে রুম পাওয়া যায়। অধিকাংশ লিভ-ইন সম্পর্কে থাকা ছেলে-মেয়েরা বাড়িতে জানাতে পারে না। যারা জানায় তাদের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ থাকে না অনেকক্ষেত্রে। তবুও লিভ-ইন রিলেশনশিপের সংখ্যা বাড়ছে বৈ কমছে না। সামাজিক বিধিনিষেধকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে যুবক-যুবতীরা দেদার লিভ-ইন করছে। ব্যবসার তাগিদে আর টাকার লোভে বড় বড় শহরে এইসব যুবক-যুবতীদের পেয়িং গেস্ট রাখতে বা বাড়ি ভাড়া দিতে কুনঠা বোধ করছেন না অনেকেই। কলকাতা শহরের কিছু জায়গা তো লিভ-ইন করা যুবক-যুবতীদের একচেটিয়া বাসস্থান হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেসব জায়গায় বয়স্ক লোকেরা নিজেদের বাড়িতে এদের পেয়িং গেস্ট রাখছে, সংকীর্ণতাকে তুচ্ছ করে নিজেদের সুবিধা ও সুরক্ষার কথা ভেবে। তারা জানেন, বৃদ্ধ বয়সে ছেলে-মেয়েরা যেখানে সাথে নেই, সেখানে এই তথাকথিত অসামাজিক ছেলে-মেয়ে গুলোই দুঃসময়ে পাশে দাঁড়াবে। মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে।
অনেক ক্ষেত্রেই লিভ-ইন করতে আসা ছেলেমেয়েদের অনেকেই বাড়ি ভাড়া তো দিয়ে দেন, কিন্তু সময়ে-অসময়ে আড়ি পাততে বা নীতিপুলিশি করতেও ছাড়েন না। এইসব ছেলেমেয়েদের লিভ-টুগেটহার করতে গিয়ে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় রোজ, সাহায্য পাওয়া তো দূর, তাদের ব্যক্তিগত জীবনকে প্রকাশ্যে এনেও (অন্তরঙ্গ মুহূর্তের অশ্লীল ভিডিও বানিয়ে) অনেকে ব্যবসা করে। ব্ল্যাকমেলের শিকারও হতে হয় অনেকসময়, পাবলিক শেমিং-এর ভয় দেখিয়ে প্রতারণা করে, ঠকায়। ছেলেমেয়েগুলোর দোষ এটাই যে, তারা প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে একসাথে থাকছে, স্বাধীন যৌন জীবনযাপন করছে, একসাথে লড়ছে প্রতিদিন। এত সমস্যা -উপেক্ষা-লজ্জা-নিরাপত্তাহীনতা সত্ত্বেও কেন আধুনিক ছেলেমেয়েরা বিয়ের পরিবর্তে লিভ-ইন রিলেশনকে বেছে নিচ্ছে ব্যাপক হারে, তার কারণ কি শুধুই দায়িত্ব নেবার ভয় বা স্বাধীনতা পাবার নেশা, নাকি অন্য কিছু! আসলে আজকালকার যুবক-যুবতীরা বিয়ের পর বিচ্ছেদ বা ডিভোর্স কে এড়াতে লিভ-ইন করে। যাতে আগে থেকে দুজনের একটা সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে কিংবা দুজন দুজনকে পরিপূর্ণ ভাবে চেনা যায়। যৌন আকর্ষণ চলে যাবার পরও যদি সম্পর্ক টিকে যায়, তবে পরবর্তীকালে অনেকেই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়, কেউ কেউ আবার এভাবেই সারাজীবন একসাথে থেকে যায় সমাজের পরোয়া না করে। আসলে, বিবাহ পরবর্তী ডিভোর্সের -এর থেকে বিয়ের আগে বিচ্ছেদটা বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে আধুনিক যুগের ছেলেমেয়েদের কাছে। বিয়ে না করেও আরামদায়ক নিরাপদ হোটেলে রুম ভাড়া পাওয়াও এখন সহজ হয়েছে 'Oyo'- র মাধ্যমে।
অন্যদিকে দেখা যায়, অনেক পরিবারও সামাজিক বেড়াজাল ছিঁড়ে তাদের লিভ-ইন রিলেশনকে মেনে নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেয়েরা দীর্ঘদিন এধরনের সম্পর্কে থাকার পর বিয়ের করার দাবি করতে থাকে, যেখানে ছেলেটির এব্যাপারে আদৌ কোন আগ্রহ থাকেনা। তখনই শুরু হয় মতানৈক্য, দ্বন্দ্ব, সন্দেহ ; শেষে বিচ্ছেদ। মেয়েদের বাড়ি থেকে একটা বয়সের পর বিয়ের চাপ আসতে থাকে, তা সে যতই স্বনির্ভর হোক। তাই তারা বেশিদিন এ ধরনের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে পারে না। ফলস্বরূপ কেউ নেশার কবলে পড়ে'কবীর সিং' হয়ে যায়, কেউ বা নতুন সম্পর্কে জড়ায়। বাড়িতে মানাতে না পেরে অনেক যুগল আআত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। তাই বলা যায়, সমাজে এর কুফল রয়েছে। সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ার পাশে নারী-পুরুষের সম্পর্ক স্থিতিশীলতা হারাচ্ছে, দিনের শেষে নিজেদের অসামাজিক মনে হচ্ছে, গ্লানিবোধ হচ্ছে, হতাশা বাড়ছে।
সবশেষে বলা যায়, আইনের সাথে আজ সমাজও বদলাচ্ছে, তাই সেলিব্রিটি থেকে শুরু করে আমজনতা অনেকেই বিয়ের পরিবর্তে লিভ-ইন কে বেছে নিচ্ছেন। বিয়ে করে বাধ্য হয়ে সম্পর্কের দায়ভার না নিয়ে স্বাধীন ভাবে সম্পর্কের উদযাপনকেই তারা প্রাধান্য দিচ্ছেন।
©প্রদীপ্তা গোস্বামী
কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ সম্বৃতা দাস রায় Sambrita Rumki এবং আমার ক্লাসমেট দেবাঙ্গনা ঘোষ দস্তিদার Debangana Ghosh Dastider