17/08/2024
: লংপোষ্ট এলার্ট : মলেস্টেশন :
আর জি করের ঘটনার প্রতিবাদে আমরা সবাই এখন জাস্টিস চেয়ে পথে নেমেছি। মিছিলে হাঁটছি আমরা সবাই। আর সেই হাঁটতে গিয়েই আমাদের বড্ডো গিল্ট ফিল হচ্ছে। কারণ, আমরা বাইরে ঘটে যাওয়া এক অন্যায়ের প্রতিবাদ করছি কিন্তু আমাদের ঘরে, আমাদের দলে ঘটে যাওয়া মলেস্টেশনের বিরুদ্ধে আমরা এতদিন ধরে কোনো স্টেপ নিতে পারিনি। মিছিলে হাঁটবার সময় আমাদের লজ্জায় মাথা নেমে যাচ্ছিলো বারবার। তাই শিরদাঁড়া সোজা রাখতে, বহু সাহস যুগিয়ে এই পোস্ট করতে আমরা বাধ্য হচ্ছি।
বছর দুয়েক আগে, বীরভূমের দুবরাজপুরে, দুবরাজপুর সেঁজুতির আমন্ত্রণে আমরা মছলী দলের গপ্পোগাথা নাটকের শো করতে গিয়েছিলাম। ওইদিন, দুপুর বেলায় আমাদের এই নাটকের নির্দেশক অনির্বাণ ঘোষ (বাপ্পা দা) আমাদের একজন অভিনেত্রীর শরীরের বিভিন্ন গোপন জায়গায় হাত দেয় এবং মলেস্ট করে। আমরা এই ঘটনা জানতে পারি প্রায় ছ সাত মাস পর। মেয়েটি ভয়ে কাউকে বলতে পারেনি। কারণ, অনির্বাণ ঘোষ বা বাপ্পাদার ভাবমূর্তি ছিলো অন্যরকম। আমরা আমাদের ডিরেক্টর কে ভীষণ ভালবাসতাম। ভীষণ সম্মান করে মাথায় বসিয়েছিলাম। মেয়েটি ভেবেছিলো বাপ্পাদা ওকে মলেস্ট করেছে, এই কথা কেউ হয়তো বিশ্বাস করবে না। কিন্তু আমরা যখন জানতে পারি (ততদিনে মেয়েটি আমাদের দল ছেড়ে দিয়েছে), আমরা তারপর বারংবার মুখোমুখি বসতে চাই সবাই মিলে। কিন্তু শুরুর দিকে বাপ্পাদা বহু টালবাহানা করে বসতে রাজি হয়না। এবং জানায় যে সে এরকম কিছুই নাকি করেনি। কিন্তু আমরা সেই মেয়েটিকেই সম্পূর্ণ বিশ্বাস করেছি , কারণ আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, বাপ্পা দা বহু জায়গায় এরকম বহু ঘটনা ঘটিয়েছে। আমরা তারপরেও যখন বসতে চাই সবাই মিলে তখন মেয়েটি জানায় সে এসবের মধ্যে আর থাকতে চায় না। আমরা তার সিদ্ধান্তকে সেইসময় সম্মান জানিয়েছিলাম সম্পূর্ণ ভাবে।
কিন্তু গত দুবছর ধরে আমরা মছলীর শো করা কমিয়ে দিই একেবারেই। কারণ,একজন মলেস্টারের সাথে মঞ্চে উঠতে আমাদের গা ঘিন ঘিন করতো। কিন্তু আমরা কখনোই সবাইকে জানাবার সাহস দেখিয়ে উঠতে পারিনি বহুচেষ্টা করেও। পরবর্তী রিহার্সাল বা শো তে আমরা নিজেদের বাঁচিয়ে চলতাম। বাপ্পা দাকে রাতে আলাদা করে ঘুমাতে দেওয়া সত্ত্বেও আমরা পাশের ঘরে ঘুমাতে পারতাম না ভালোভাবে। বারবার ঘুম ভেঙে যেত এবং মনে হতো এই বুঝি বাপ্পা দা এসে আবার আমাদের কারোর বুকে হাত দিলো। এক অদ্ভুত ট্রমার মধ্যে কাটাচ্ছিলাম আমরা সবাই। বুঝতে পারছিলাম না কী করা উচিত!
তাই আজ , প্রায় দু বছর পর বাপ্পা দার করা এই মলেস্টেশন এর ঘটনা আমরা সবার সামনে আনতে চাইছি। আমরা চাইনা, আরো কোনো দলে থিয়েটার করতে গিয়ে বাপ্পা দার হাতে অন্য কেউ মলেস্ট হোক। আমরা বিশ্বাস করি, উইদাউট কনসেন্ট কাউকে টাচ করা ক্রাইম। আমাদের মনে হয়, বাপ্পা দারও এবার এটা বোঝা উচিত । বাসে, ট্রেনে, রিহার্সাল রুমে যে মলেস্টশনের ঘটনা ঘটে চলেছে দীর্ঘদিন ধরে, আমরা চাই এবার সেটা বন্ধ হোক।
মাচার মানুষের আমন্ত্রণে আজ আমরা "মছলী দলের গপ্পোগাথা" -র ৩৮তম শো করলাম। এবং আজ থেকে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, অনির্বাণ ঘোষ (বাপ্পা দা)র সাথে আমরা আর মঞ্চ শেয়ার করবো না। আমরা আজও বাপ্পা দার সাথে মঞ্চ শেয়ার করিনি। আমরা শোয়ের আগে 'মাচার মানুষ'কে সবটা জানিয়েছি। অনির্বাণ ঘোষের নির্দেশনায় মছলীর আজ শেষ অভিনয় হলো। আমরা, মছলী নিয়ে আবার অন্য ভাবে ফিরে আসবো।
পুনশ্চ: এই পোষ্টটি, সম্পূর্ণ ভাবে ওই অভিনেত্রীর (যার সাথে এই নোংরা ঘটনা ঘটেছে) কনসেন্ট নিয়েই করা হচ্ছে। মেয়েটি আপাতত তার নাম জানাতে চায়না। আশা করি, আপনারা সবাই মেয়েটির সেই প্রাইভেসির সম্মানটুকু দেবেন।
এবং, আমাদের প্রিয় অভিনেত্রী, প্রিয় বন্ধু ,প্লিজ তুমি আমাদের ক্ষমা কোরো। একসাথে কাজ করতে গিয়ে তোমাকে যে অবস্থার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে, যে ট্রমা তুমি ফিল করেছো রোজ, আমরা তার জন্য সত্যিই লজ্জিত। তোমার সেই খারাপ মুহূর্ত আমরা ঠিক করে দিতে পারবো না কখনো, কিন্তু আমরা চেষ্টা করবো, যে তোমাকে মলেস্ট করেছে সে যেন আর কখনো কোনো মেয়েকে খারাপ উদ্দ্যেশ্য নিয়ে ছুঁতে না পারে। এরপর এরকম যে কোনো ঘটনা যদি ঘটে, যে কেউ যেকোনো কারোর সাথে যদি এরকম নোংরা ঘটনা ঘটায়, আমরা রুখে দাঁড়াবো।
আর বাপ্পা দা,
আমরা আমাদের সবটা দিয়ে তোমাকে ভালবেসেছি। এইটা তুমিও ভালো করেই জানো। আমরা কখনো চাইনি তোমার ক্যারিয়ারের কোনো ক্ষতি হোক। এখনো চাইনা। তোমার ক্যারিয়ারের ক্ষতি হতে পারে, এই ভয়ে এতদিন আমরা চুপও ছিলাম। কিন্তু ক্ষমা কোরো, এখনো যদি এই বিষয়টা সবাইকে না জানাই, তাহলে আর কখনো আয়নার সামনে গিয়ে নিজেরা দাঁড়াতে পারবো না। এখনো যদি সবাইকে না জানাই, তাহলে আর কারোর সাথে কখনো অন্যায় হতে দেখলেও, মাথা উঁচু করে প্রতিবাদ করার অধিকার থাকবে না আমাদের।