16/12/2022
ডোমিংগো আন্ড দ্যা মিস্ট
এরিয়াল এসকালান্তে, কোস্টারিকা, ৮৬ মিনিট, ২০২২
সিনেমা ইন্টারন্যাশনাল, ২৮তম কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব.........................................................................
এই গল্প কোস্টারিকার..এক যে ছিল বুড়ো আর তার ছিল এক বাড়ি।
বুড়োটা থুত্থুড়ে, আর বাড়িটা হতশ্রী। জল-কাদাভরা পাহাড়ি ঘাসজমির মাঝখানে আর ঘরগুলো স্যাতস্যাতে। নোনাধরা দেওয়ালের ফাক দিয়ে সবসময় শোনা যায় ঝিঝি পোকার ডাক...আর বুড়ো ভয় পায় কুয়াশাকে...এই কুয়াশা যা ধীড়ে ধীড়ে গিলে নিচ্ছে আসেপাশের পাহাড়, ঘাসজমি, বৃষ্টির শব্দ, চাঁদ - এমনকি বুড়ো আর তার সাধের ছোট্ট কামড়াটাকেও!
নিঝুম রাতে একলা রাস্তায় জমাট বাধা অন্ধকার আর কুয়াশা - বুড়ো ডমিংগোর ধারনা এই কুয়াশার মধ্যে থেকেই একদিন ধেয়ে আসবে ফিংগে মার্কা ওই মোটরসাইকেলগুলোর গর্জন আর উজি লাইটমেশিনগানের ট্র্যাট ট্র্যাট ট্র্যাট...কিন্তু ডমিংগো থুত্থুড়ে বুড়ো হলেও তার ছিল সার্জেন্টদের মত একজোড়া ভাল গামবুট যা তার পা কে জলে-কাদায় কখনো টলমল হতে দেয়নি, আর একটা হলদে বর্ষাতি যা তার আগুনকে অবিরতভাবে ভাবে বাচিয়ে রেখেছিল এই স্যাতস্যাতে অভিশপ্ত বৃষ্টি থেকে। যখন সে এগুলোর সাথে চলত রাস্তায়, আত্মপ্রত্যয়ের ভাব ফুটে উঠত তার সাদা দাড়িতে। মনে হত যেন একসেট বর্ম পড়ে আমৃত্যু এই ভুতুড়ে লুয়াশার বিরুদ্ধে লড়ছে সে...
এছাড়া তার ছিল একটা পুরোনো রাইফেল, যেটার নিশানায় খুব ভাল দখল ছিল তার।... হয়ত এই হালের উজি লাইট সাবমেশিনগানের সামনে এটা কিছুই নয়, যতক্ষনে তারটা একটা কথা বলবে ততক্ষনে উজি বলে ফেলবে একহাজার, তবু...সে জানত এটা বলবে ঠিক সেটাই যেটা বুড়ো বলতে চায়।..ধোকাবাজি এ জিনিসটার রক্তে নেই...
আসলে....বেশ কিছুদিন ধরেই এ এলাকায় চলছে চরম প্রস্তুতি...আসবে উন্নয়ন...হাইওয়ে যাবে এ অঞ্চলের বুক চিরে...কিন্তু তার রাস্তাতেই বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বুড়ো ডমিংগো আর তার হতকুচ্ছিত কুড়েটা - কাজে কাজেই, প্রথমে ভালয় ভালয় তাকে বুঝানো হয়..আর তারপরে রাখা হয় ভাল দাম যাতে তার বেশ কিছুদিনের মদের খরচ চলে যেতে পারে, কিন্তু বুড়ো নাছোড়! এই ঘরখানা সে আর তার বউ পেয়েছিল তার শবশুড়মশাইয়ের কাছে থেকে আর সাজিয়েছিল তাদের নিজেদের হাতে। কত সন্ধ্যেয় এখানে বসেই মাল খেয়েছে সে শবসুড়মশাইয়ের সাথে, আর তার বউ..আজ তারা নেই বটে আর এখানের গোয়ালেও বেশিরভাগ গরুগুলো মরে গেছে - কিন্তু, একটা এখনো বেচে আছে। এতকাল এরা প্রতিপালন করে এসেছে তাদের, আর এর দুধ দুয়ে এই দূর্দিনেও বুড়ো কোনমতে টিকিয়ে রেখেছে তার কখানা হাড়ের এই খাচাটাকে - নীল কুয়াসগার অন্ধকারাচ্ছন জগতের জীবরা কখনো বুঝবে কি? তারা বরং ঠান্ডাভাবে বুড়োকে বুঝায় যে হাইওয়েটা গুরুত্বপূর্ণ, তার বস্তাপচা আবেগ বা এই স্যাতস্যাতে কুড়ের থেকে অনেক অনেক বেশি, আর আরেকটু ভাল দামের কথা বলে। তার কুড়েঘরে এসে পদধূলি দেয় নিজেরা - এগিয়ে দেয় চুক্তিপত্র আর কলম..আর ঠোংগাভরা দিস্তে দিস্তে টাকার বান্ডিল। বুড়ো রাজি না হলেও এ টাকা তারা ফেরত নেয় না..বরং টাকার মধ্যে বুড়ো খুজে পায় একখানা উজি বুলেট - যেরকম একটা হয়ত তার বুকেই বিধবে একদিন...কিন্তু তবুও...বুড়ো নাছোড়। ঘরটা ছাড়ার কথা সে কল্পনাও করতে পারে না। অতএব...তাকে ঘিরে নীল কুয়াশারা জমাট বাধে। আরও গাঢ় হয়। পায়েচলা পথ, ল্যাম্পপোস্টের হলদে আলো, সামনের ঝোপটা পার হয়ে ঢুকে পড়ে তার একচিলতে বেডরুমে..তার খাটের তলায়...জমাট বাধা কুয়াশার মধ্যে থেকে আরো ঘনঘন শোনা যায় মটোরসাইকেলের গর্জন..উজি লোড করার শব্দ...
ঢালু টুপি মাথায় আড্ডার বন্ধুরা কিংবা যে চাষিটার আলুর ক্ষেতে এবছর ধসা রোগ লেগেছে কিংবা দুচাকা গ্যারেজের মিস্ত্রীটা - তারাও তাদের জমি ছাড়তে অনিচ্ছুক, কিন্তু নাছোড় নয়। তারা জানে যে একদিন না একদিন এসব জমি তাদের ছাড়তেই হবে। তারা বোঝায় তাকে, ডমিংগো কি পাগল হয়ে গ্যাছো? কি হবে জেদ করে? ওই আদ্যিকালের গাদাবন্দুক নিয়ে কি আমরা লড়তে পারব উজি সাবমেশিনগানের সাথে? আর তার নিজের মেয়েও - তার শবসুড়বাড়ি থেকে বুড়ো বাপকে সে ওষুধপত্তর আর টুকিটাকি এটাওটা যোগান দিলেও তার এমন বেয়াড়া খেয়ালকে প্রশ্রয় দেয়না একেবারেই। সোয়া কিলোমিটার দূরের চোলাইওয়ালাও তো ভালই বাসত বুড়োকে, তার চোলাইয়ের দাম বাবদ দিতে আসা বহুদিনের জমানো চিজ দেখে খিস্তি দিত সে, বুড়ো ডমিংগো, ওটা বরং তুমি নিজের ফাটা পোদেই লাগিও - কিন্তু কুয়াশার বিরুদ্ধে সেও তাকে কোনো সাহস যোগাতে পারে না। চোলাইওয়ালা..তার সাথেই শেষ পর্যন্ত বুড়োর অন্তরঙতাটা দেখা যায় সবচেয়ে বেশি..বিশাল চেহাড়ার ইন্ডিয়ানটাকে সে গাল পাড়ে বিশবাসঘাতক বলে..এ অসম লড়াইয়ে যে সে একা হয়ে পড়ছে, তাদের সবাইকে যে ভিষন দরকার, বুঝছে না কি তারা?!
কিন্তু, আদতে কোনো উত্তর আসে না...
বুড়োর আত্মপ্রত্যয়, তার গামবুট, তার রেনকোট আর রাইফেলটা...বুড়ো গরু আর দুধ দুইবার বালতি..পুরোনো টেবিলটা...আচ্ছা,সে কি ভাগ্যে বিশবাস করে? ভাগ্যে?
ভাগ্য তো নিশ্চিতভাবেই বলে দেয় যে কে কবে মড়বে, না?...আর কিভাবে...কিন্তু তারা কে কি কবিতা লিখবে তাদের জীবনের সাথে বা মৃত্যুর, ভাগ্য কি সেটা ঠিক করে দিতে পারে কখনো? কিছু কিছু মানুষ বেচে থাকে সবকিছু হারিয়েও পুরোনো দিনের স্মৃতি বুকে নিয়ে, আর দিনবদলের দুরাশা যদিও জমি একটু একটু করে সরে যেতে চায় তাদের পায়ের তলা থেকে - আর কিছু কিছু মানুষ একেবারে নিবে যাওয়ার আগে হটাত জবলে ওঠে দপ করে...সর্বশক্তি দিয়ে...তারা ফিরে আসে গান হয়ে। কে জানে, জ্ঞানী-গুনী বিদ্দবতজনেরা বলতে পারবেন, আর তাত্তিকরা, তাদের এত কিছু বলার আছে পরবর্তী প্রজন্মকে যে স্রেফ জিভটুকুকে সম্বল করেই তারা বেচে থাকতে পারেন কয়েক হাজার বছর, কিন্তু আমাদের ডমিংগো সেরকম নয়...সে যে জাতে একজন গোয়ালা - জানে স্রেফ দুধটুকু দুইতে...
রহস্যময় কুয়াশাটা তার বুকভরা মোটরসাইকেলের শব্দ নিয়ে একদিন রাতে যখন সত্যিসত্যিই উঠে এল তার উঠোনে আর উজির ট্র্যাট ট্র্যাট ট্র্যাটের মধ্যে দিয়ে সে শুনতে পেল আরেকটা মোটরসাইকেলের গুমরানোর শব্দ তার ঘরেরই নীচে - হা ভগবান, মোটরসাইকেল নয়, তার এতকালের সংগী বুড়ো গরুটা কাতরাচ্ছে গুলি খেয়ে..রক্ত রক্ত আর রক্ত...ডমিংগো...সে তার রাইফেলটার বাটে রাখল হাত আর অনুভব করল তার শীতলতা তার সমস্ত সত্তা দিয়ে...
এককালের বীরত্ত আর আক্রোশকে এক কাধ ঝুকিয়ে হ্যাচকা টানে ফের জাগিয়ে তুলল সে..আর এগিয়ে চলল কুয়াশার ঠিক মাঝখান লক্ষ্য করে...আজ তবে হয়েযাক পরীক্ষা...ওখানে ঠিক কতখানি ভয় আছে আজ তাকে দেখতেই হবে....আর তারপরে বেশ খানিক্ষনের একটা ঘোরের মধ্যে দিয়ে সে কুয়াসার রঙ হয়ে উঠলে লাল টকটকে....
পটপট করে খুলে যাচ্ছিল রাধা স্টুডিওর দুদিকের এক্সিটের দরজাগুলো আর আলো জবলে উঠছিল আসেপাশের মোবাইল স্ক্রীনগুলোতে...একরাশ চেয়ারের শব্দের মাঝে সব বিহবলতা কাটিয়ে উঠে দাড়ালাম আমি, আর তারপর হাততালি দিলাম সর্বশক্তি দিয়ে....সেই হারানো থার্ড ওয়েভের ফল্গুধারা মূলধারার লাতিন আমেরিকা থেকে দূরে...বাংগালি জাতির তরফ থেকে তোমাদের অভিবাদন....
© সৌম্য দাশগুপ্ত
১৬ই ডিসেম্বর, ২০২২