31/10/2025
রাতের ভয়াল অন্ধকার দূর করতে যেমন আকাশের অমৃতকুম্ভ থেকে হিরণ্ময় আলো ঠিকরে নেমে আসে পৃথিবীর বুকে, ঠিক যেমন ঝড়ের পরে নিস্তব্ধতা আসে, আর কান্নার পর চোখ বুজে আসে প্রশান্তিতে—তেমনই আজ মহিলা ক্রিকেট বিশ্বকাপের ময়দানে অবতীর্ণ হলেন তিনি ভারতীয় জার্সি গায়ে। সেঞ্চুরি করলেন।তবে সেলিব্রেট করলেন না।কেবল ব্যাটটা হাতে ধরে উবু হয়ে বসলেন। হেলমেট থেকে ঘাম ঝরছে অনবরত। গ্যালারির আলো তখন নিঃশব্দে কেঁপে উঠছে, ড্রেসিংরুমে শ্বাসরুদ্ধ নীরবতা। কমেন্ট্রেটর বললেন—“জেমিমা জানেন, খেলা এখনও শেষ হয়নি।”সেলিব্রেশনটা বাঁচিয়ে রাখলেন তিনি। মাঠের ভেতরে তাঁর শরীর ক্লান্ত, চোখে কঠোর শপথ—ফিনিশিং লাইনটা না ছোঁয়া অবধি লড়াই শেষ হয় না।তাই এখন কোন উদযাপন নয়।
এ যেন একশো বিয়াল্লিশ কোটি আত্মসম্মানের গল্প।এক অপরাজিত মেয়ে, এক ক্রিকেট ইতিহাসের দিগন্ত-ছোঁয়া সাহসের কাহিনি।ভারত মহিলা দল অস্ট্রেলিয়াকে ৫ উইকেটে হারিয়ে ফাইনালে প্রবেশ করেছে।অস্ট্রেলিয়ার মেয়েরা তুলেছিল ৩৩৮ রান (৪৯.৫)। ভারতের অগ্নিকন্যারা তা অর্জন করলো মাত্র ৪৮ ওভারেই ; ৩৪১/৫ (৪৮.৩)।
তৃতীয় উইকেটে নামার পর থেকেই খেলার গতি যেন বদলে গেল। চাপ, প্রত্যাশা, প্রতিপক্ষ—সবকিছুকে পাশে সরিয়ে রেখে তিনি গড়ে তুললেন এক অনবদ্য সিম্ফনি।১৩৪ বল খেলে অপরাজিত ১২৭ রান—এর মধ্যে ১১টি চারের ঝলক, ২টি ছক্কার উচ্চারণ।স্ট্রাইক রেট প্রায় ৯৪.৭৮।শতক এল ইনিংসের ৪২তম ওভারে, যখন ম্যাচের হিসেব তখনও অগোছালো।লং-অন দিয়ে এক রান নিয়ে শতক পূর্ণ হতেই মাঠজুড়ে শোরগোল, অথচ তিনি নতজানু হয়ে বসে পড়লেন। হেলমেটের ভিতর দিয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে, মুখে নেই কোনো হাসি—শুধু এক অদৃশ্য দায়িত্বের ছায়া।
হারমানপ্রীত কৌরের সঙ্গে ১৬৭ রানের অংশীদারি ভারতের ইতিহাসে সোনালি অক্ষরে লেখা থাকবে।তাদের ব্যাটের সুরে একে একে ঝরে গেল অস্ট্রেলিয়ার আশা।আর ভারত গড়ে ফেলল এক অবিশ্বাস্য অধ্যায়—মহিলা ওয়ানডে বিশ্বকাপের ইতিহাসে নকআউট পর্বে সর্বোচ্চ রানের চেজ।
এই ইনিংস এক আদর্শের প্রতীক।যে দেশে আজও মেয়েদের নিরাপত্তা একটি বিতর্কের বিষয়, যে দেশে সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় প্রতিদিন কোনো না কোনো নির্যাতনের খবর ছাপা হয়—সেই দেশের এক মেয়ে মাঠে দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষের বোলিং আক্রমণ ভেঙে ঘোষণা করল, “আমিও পারি।”জেমিমা জানেন—এদেশে মেয়েদের বেঁচে থাকাটাই যেখানে প্রতিদিনের লড়াই, সেখানে ক্রিকেট খেলে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার দায় অনেক গভীর।তাঁর ইনিংস ছিল সেই দায়েরই প্রতিফলন—নিঃশব্দে, অবিচলিত, অনমনীয়।
যে মুহূর্তে শতক এল, তাতে হয়তো তিনি জানতেন—“খেলা এখনও বাকি।”তাই উদযাপন নয়, বরং আত্মসমর্পণ। নিজের প্রতিশ্রুতির প্রতি, নিজের দলের প্রতি, নিজের দেশের প্রতি।কারণ তিনি জানেন, ফিনিশিং লাইন না ছোঁয়া পর্যন্ত কোনো লড়াই শেষ হয় না।
কাল সকালেই দেশের প্রতিটি পত্রিকার প্রথম পাতায় থাকবে জেমিমার হাসিমুখ—হয়তো “ভারতের কন্যার ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি” শিরোনামে।আর ঠিক পাশের কলামে থাকবে আরেকটি খবর—কোথাও কোনো কিশোরীকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, কোথাও ধর্ষণের বিচার পায়নি কোন নারী।এই দেশই একদিকে জেমিমাদের সেঞ্চুরি উদযাপন করে, আর অন্যদিকে মেয়েদের লড়াইকে নিত্যদিনের পরিসংখ্যানে নামিয়ে আনে।অথচ এই দ্বন্দ্বের দেশেই এক মেয়ে আজ বিশ্বকে মনে করিয়ে দিল—সাহসই আসল প্রতিবাদ। ধৈর্য্যই প্রকৃত স্পর্ধা।
এই অভয়া–আসিফার দেশেই, যেখানে বিদেশি মহিলা ক্রিকেটারকে নিগ্রহ করা হলে ক্ষমতাসীন শাসক “বিচ্ছিন্ন ঘটনা” বলে এড়িয়ে যান—সেই দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ইনিংসটি আজ একজন মেয়েই খেলল। তার নাম—জেমিমা রড্রিগেজ।এই দেশের সব ব্যর্থতার মধ্যেও সে আজ আশার প্রতীক।ক্রিকেট মাঠের বাইরে, সমাজের প্রতিটি মেয়ে আজ একটু একটু করে বুক ফুলিয়ে বলতে পারে—“আমিও পারি।”এই ইনিংস কেবল বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল নয়;এটি এক প্রজন্মের আত্মসম্মানের লড়াই,এক জাতির বিবেকের পুনর্জন্ম। এই আমার দেশের সর্বোচ্চ অহংকার।কুর্নিশ অপরাজেয় এই লড়াইকে ; Jemimah Rodrigues তোমাকে সেলাম :