22/09/2024
ভারতের সর্ববৃহত চলমান রেস্টুরেন্ট কি? পশ্চিমবঙ্গের লোকাল ট্রেন
যতই আপনারা পশ্চিমবঙ্গের লোকাল ট্রেনকে বাজে কথা বলুন, আমার মতে পশ্চিমবঙ্গের লোকাল ট্রেনই হল শ্রেষ্ঠ ও ভারতের সর্ববৃহত চলমান রেস্টুরেন্ট।
আমি সাধারণতঃ যেসব রুটে যাত্রা করি সেগুলো এই রকমঃ
শেয়ালদা - ডায়মণ্ডহারবার - শেয়ালদা, শেয়ালদা - শান্তিপুর - শেয়ালদা, হাওড়া - বর্ধমান - হাওড়া, ও হাওড়া - খড়্গপুর - হাওড়া,
শিয়ালদা-বনগাঁ-শিয়ালদা
এই অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে খাদ্যরসিকদের জন্য পশ্চিমবঙ্গের লোকাল ট্রেন কোন চলমান রেস্টুরেন্টের থেকে কম না।
আমি এই লোকাল ট্রেনে চলতে চলতে কি কি খাদ্যবস্তুর উপর মুখ চালিয়েছি তার তালিকা এই রকম।
১. লেবু লজেন্সঃ লোকাল ট্রেনে বাল্যকালে আমার প্রথম খাবার স্মৃতি হল লেবু লজেন্স। একটা বড় কাঁচের বয়াম হাতে নিয়ে হকার ভাই উচ্চস্বরে বলতেন, " এই গরমে চলেছেন, দাদারা, দিদিরা, ভাইরা, বোনেরা। গলা শুকিয়ে যাচ্ছে নিশ্চয়। গলা ভেজাতে খান লেবু লজেন্স। একটা পাঁচ, দুটো দশ। হ্যাঁ, সেসময় পাঁচ পয়সারও দাম ছিল। বর্তমানে যেসব কাগজে মোড়ানো লজেন্স দেখি তার থেকে একটু বড় আকারের হত কিন্তু কাগজ মোড়া হতনা।
২. নানা রকম ল্যাবেঞ্চুস, টফি ও চকলেটঃ লেবু লজেন্স ছাড়াও আরো নানা রকম টফি ও চকলেট খেয়েছি। আমার প্রিয় ছিল কমলালেবুর কোয়ার আকারের কমলা রঙের ল্যাবেঞ্চুস।
৩. আলুর চিপসঃ স্থানীয় কোন নির্মাতার বানানো আলুর চিপস যা কিনা স্বাদে ও পরিমাণে বর্তমানের মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির তৈরি একই দামের আলুর চিপস থেকে বেশ খানিকটা এগিয়ে।
৪. নানা রকম স্বাদের ঝালমুড়িঃ অনেকেই ভাবেন যে ঝালমুড়ির আবার স্বাদের ভিন্নতা কি হবে। কিন্তু যদি একটু মনোযোগ সহকারে খেয়ে দেখেন তাহলে দেখবেন যে আলাদা আলাদা হকারের বানানো ঝালমুড়িতে খুব সূক্ষ হলেও স্বাদের ভিন্নতা আছে।
৫. চিনেবাদাম ভাজাঃ অতি সুস্বাদু ও প্রিয় খাদ্য।
৬. ছোট ছোট প্যাকেট বন্দী কিশমিশঃ এটা আমার খুব একটা ভাল লাগেনি। মিষ্টি বেশি মনে হয়েছে। শুনেছি নাকি এগুলোতে কৃত্রিম ভাবে মিষ্টত্ব বাড়ানো হয়।
৭. নানা রকম ফলঃ কলা, পাণিফল, পেয়ারা, লিচু, কমলালেবু, শশা, জাম, আপেল, তালশাঁস, জামরুল ইত্যাদি। অবশ্য জামরুল আজ কাল আর চোখে পড়েনা। আমও দেখেছি। তবে আম ট্রেনে বসে খাওয়া একটু অসুবিধাজনক।
৮. আলুর চপ ও বেগুনিঃ খুব যে ভাল স্বাদ তা বলব না। কিন্তু চলন্ত ট্রেনে বসে পাওয়া যাচ্ছে সেকি কম কথা নাকি।
৯. চানাচুরঃ চানাচুরও খেয়েছি নানা রকম স্বাদের। ভালোই লেগেছে।
১০. লেবুর শরবতঃ মন্দ না খেতে থুড়ি পান করতে।
১১. প্লাস্টিকের সরু লম্বা প্যাকেট বন্দী নানা স্বাদের জমাট শরবতঃ এটার নামটা যে কি মনে করতে পারছি না। প্লাস্টিকের প্যাকেটর একদিকে দাঁত দিয়ে ফুটো করে চুষে চুষে খেতে হয়। গরমকালে খুব ভাল লাগে। গলা ভেজে।
১২. শোনপাপড়ি ও সন্দেশঃ সন্দেশ খুব কম পেয়েছি। তবে শোনপাপড়ি অনেক খেয়েছি। ভালোই খেতে।
১৩. বিস্কুটের প্যাকেটঃ আজকাল নানা রকম বিস্কুটের প্যাকেটও বিক্রি হতে দেখেছি। তবে এ আমি সাধারণত ট্রেনে বসে কিনে খাইনা।
১৪. ঘটি গরমঃ অনেক বার খেয়েছি। বেশ মুখরোচক।
১৫. ভেলপুরীঃ খুব কম চোখে পড়েছে। দু এক বার খেয়েছি। খুব একটা আহামরি কিছু মনে হয়নি।
১৬. সিঙ্গাড়াঃ পেয়েছি ও খেয়েছি কয়েকবার। মন্দ না।
১৭. ছোলাসেদ্ধঃ অতি চমতকার খেতে।
১৮. ঘুগনিঃ বেশ ভালোই লেগেছে।
১৯. ক্ষীরমোহনঃ চমতকার ও সুস্বাদু খেতে।
২০. দিলখুশঃ তুলনা নেই।
২১. খাস্তা কচুরিঃ ফাইভ স্টার হোটেলের শেফ হার মানবে।
২২. ডিম সেদ্ধঃ মশলা ছড়িয়ে খেতে অপূর্ব।
২৩. নানা রকম পাঁপড়ঃ এক ভাঁড় চায়ের সাথে জবাব নেই।
২৪. মাটির ভাঁড়ে চাঃ লোকাল ট্রেনের জানলার ধারে বসে আছি। বাইরে মেঘলা আকাশ। হু হু করে হাওয়া ঢুকছে জানলা দিয়ে হালকা বৃষ্টির ছাঁট সহ। আমার এক হাতে এক ভাঁড় চা আর এক হাতে ঝালমুড়ি বা চানাচুরের ঠোঙা। এর থেকে বড় সুখ আর কি আছে? সত্যিই, এই তো জীবন কালী দা।
২৫. মুখশুদ্ধি ও হজমি গুলিঃ যদি মনে করেন বদ হজম হবে তাহলে খান মুখশুদ্ধি ও হজমি গুলি। প্রচুর খেয়েছি।
এই তালিকায় অনেক কিছু বাদও পড়ে গেল। এত রকম খাদ্যের উপস্থিতি আমি কিন্তু অন্য কোন প্রদেশের লোকাল ট্রেনে দেখিনি। এখানে যে তালিকা দেওয়া হল তা সবই চলন্ত ট্রেনে বসে আস্বাদন করা। এর কোনটাই কিন্তু স্টেশনের দোকান থেকে কিনে খাওয়া নয়। আর এই সব খেয়ে আমার কিন্তু কোন কালে অম্বল, এসিডিটি কোনদিন কিছু হয়নি।
এই গ্রুপের মাননীয় সদস্যগণ ও মাননীয়া সদস্যাগণ আপনাদের কি মত - পশ্চিমবঙ্গের লোকাল ট্রেনকে কি চলমান রেস্টুরেন্ট বলা যায়?
আরেকটা অনুরোধ এই যে আপনারা কি কি আস্বাদন করেছেন লোকাল ট্রেনে যেতে যেতে তা যদি একটু শেয়ার করেন তাহলে কৃতজ্ঞ থাকব।