13/03/2026
আমি কেউ নই
বন্যেরা বনে সুন্দর,
শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।
আবারও হঠাৎ করেই যেন এই কথার সারমর্ম উপলব্ধি করলাম।
ঘটনার বিবরণ :-
দৃশ্য : ১
স্থান :- স্টেশন প্ল্যাটফর্ম।
বসে আছি কাঙ্ক্ষিত ট্রেনের অপেক্ষায়। আকস্মিক দেখি অশ্রাব্য ভাষায় চিৎকার। আর তারপরেই বিদ্যুতের গতিতে দুমদাম মার, তার সঙ্গে মনকেমন-করা একটা মায়ামাখা মুখ কান্নায় ফেটে পড়ল। কিছুক্ষণ এই একইভাবে চেঁচামেচির পরে খেয়াল করলাম, এই সমস্ত ঘটনার যে মুখ্য চরিত্র, সে অনায়াসেই কান্না থামিয়ে হাঁটতে লাগল।
জানি, কিছুই বোঝা গেল না।
আসলে প্রথমটা আমিও বুঝতে পারিনি।
কিন্তু তারপরে যখন বুঝলাম, বোঝাটা বোঝা হয়েই রয়ে গেল। JioSaavn বা Spotify পর্যন্ত পারল না মন ভালো করতে। বরং অভ্যাসবশত ইয়ারফোনও আর ইচ্ছা করল না কানেক্ট করতে।
সহজ করে বলি :
দেখতে পেলাম একটি বাচ্চা ছেলে। সে ঠোঁট ফুলিয়ে কান্নাকাটি করছে, আর ওপার থেকে চিৎকার আসছে। দেখে যেন মনে হলো সম্পর্কে তার দিদা বা ঠাকুমা এরকম কেউ হবে। ফোনটা ছুড়ে ফেলে দিল। ফোন এদিক-ওদিক খুলে গিয়ে সমস্ত পার্ট বেরিয়ে গেল।
উচ্চস্বরে রাগান্বিতভাবে মন্তব্য এল—
“এত বড় হয়ে গেলি, আস্তে আস্তে খাসি হয়ে গেলি! একটা ন্যাকড়া জড়িয়ে মানুষ করলাম। ফোন, ফোন, ফোন— আমাকে শেষ করে ফেলবে, আমাকে খেয়ে ফেলবে। আর পারছি না আমি এত চাপ নিতে।”
“থাকবেই ফোন তিন মাস বন্ধ। এখন আমি সারাব না, ঠিকও করব না। করব না কাজ, কোনো কাজে যাব না, কাজ পাব না।”
একজন উৎকণ্ঠার স্বরে বলে উঠল—
“আহা! বাচ্চা ছেলেটাকে এভাবে মারছেন কেন?”
প্রত্যুত্তরে আবারও দ্বিগুণ ঝাঁঝালো উত্তর এল—
“একদিন দেখছে না, সেখানে বলছে!”
ভেতরে একটা অদ্ভুত ছটফটানি অনুভব করলাম। এমন একটা মুহূর্ত, যেখানে চুপ করে বসে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। চারপাশে ঘটনাগুলো শুধু নীরব দর্শক হয়ে, বা বলা ভালো বোবা দর্শক হয়ে চুপ করে দেখে যেতে হয়। হাঁ করে দেখে যেতে হয়, করার কিছুই থাকে না!
বোধহয় এই মুহূর্তটাতেই মনে হয় নিজেকে বড্ড বেশি নিঃস্ব, অসহায়, সহায়হীন, অশক্ত— এক কথায় যাকে বলে হেল্পলেস।
ভাবনায় ডুবে থাকতে থাকতে দুঃখটাকে আরও বাড়িয়ে দিল বাচ্চাটার অপুর মতো ডাগর -চোখ, মায়াভরা মুখ আর তার কান্না।
প্রকৃতি হয়তো তাকে এভাবেই তৈরি করে দিয়েছে।
কাঁদতে কাঁদতে একসময় সে নিজে থেকেই থেমে গেল।
আলাদা করে ভোলানোর জন্য কোনো বন্দোবস্ত—ব্যবস্থা—প্ল্যান—প্রোগ্রাম কিছুই করতে হলো না।
জানি, কিছুজন শুনলে বলবে—
“এরা এভাবেই অভ্যস্ত।”
অনেকক্ষণ একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ার পরে কাছে গিয়ে উনার সঙ্গে কথা বলে যেটুকু জানতে পারলাম—
বাচ্চাটির মায়ের বিয়ে হয়েছিল চন্দননগরে। হঠাৎ একদিন ফোন আসে—
“মা, শরীরটা ভালো নেই। বাড়ি আসব। আর পারছি না। পরশু আসব বাড়ি।”
মা কোনো কিছু বলার আগেই ফোন কেটে গেল।
কথায় বলে মায়ের মন। পরশু, অর্থাৎ শনিবার ভোর থেকেই মায়ের মন ছটফট করতে লাগল। নিজেই চলে গেলেন মেয়েকে আনতে। গিয়ে দেখেন মেয়ের বিকৃত দেহ টাঙানো। বলা হল সে নাকি আত্মহত্যা করেছে।
পুলিশ, কোর্ট-কাছারি করে জানা গেল— মেরে টাঙিয়ে দিয়েছে।
আর তারপর থেকেই সেই ছোট্ট চার মাসের শিশুকে নিয়ে চলে এলেন।
সেই তখন থেকে বাচ্চাটি তার দিদার কাছেই। যদিও বাচ্চাটির দিদা তাকে নিজের নাতি পরিচয় দিতে নারাজ। সারা প্ল্যাটফর্ম যখন জিজ্ঞাসা করল—
“কে হয় আপনার?”
একটাই উত্তর—
“আমার কেউ নয়, আর তাই এত জ্বালা।”
বলল— ছেলে হয়েছে তাই বাপ নেয়নি। মেয়ে হলে মুম্বাই নিয়ে গিয়ে হোটেলে নাচাত, তাই নেয়নি।
এই প্রথম শুনলাম— পুত্র সন্তানও অবহেলার শিকার হয়। প্রত্যাখ্যাত হয় তার অভিপ্রেত স্নেহ থেকে।
বলল—
“যা, তোর গুষ্টির ভালোবাসার লোকজনের কাছে যা!”
ছেলেটি চলে গেল।
আবার ফিরে এল খেলতে খেলতে।
কাছে ডেকে একটু আদর করলাম।
জানি, এই খারাপ লাগা, এই ভাবনা— সবই ক্ষণিকের। আমরা আধুনিক প্রগতিশীল মানুষ। একটু পরেই আবার নিজের দৈনন্দিন কার্যকলাপে মুখ বুজে যাপন শুরু করব। আবার হাসব, ছবি তুলব, খাব-দাব। সব ফেড আউট হয়ে যাবে।
কিন্তু থেকে যাবে শুধু সেই মুচকি হাসি, আর অবাক করা চাওনি। আর একটা মায়াভরা মুখ খুঁজছে অলীক সুখ— জানি না পাবে কিনা কোনোদিন।
বেঁচে থাকুক এমন সমস্ত কর্মঠ দিদারা, মায়েরা— ভালোবাসা ও আশ্রয় দেওয়ার মানুষেরা।
জানি, লেখার ক্যাপশনের সঙ্গে ঘটনার মিল এখনও সঠিক পাওয়া গেল না।
এরপরের দৃশ্য : ২
ট্রেনের ভেতরে উঠেই দেখি একই রকম আরও একটি শিশু মায়ের কোলে বসে অতি আনন্দে বাড়ি থেকে আনা স্টিলের বাটিতে পরম নিশ্চিন্তে চালভাজা খাচ্ছে। আদর মাখা মুখ। মায়ের কোলে পা দোলাচ্ছে। আহা! কী সুখ! কী আরাম! কী স্বস্তি!
আর এই বৈষম্য!!!
থেকে যাবে,
অনির্দিষ্টকাল ধরে।
বিভেদের রচয়িতা এক্ষেত্রে অবশ্য প্রকৃতি।
চিন্তা নেই— এতে সমাজ বা মানুষের কোনো দোষ নেই।
------- গার্গী