19/09/2025
ছোটগল্প
মালতী দেবী
Purabi Ganguly
18/09/25
==============
আমার নাম মালতী দেবী। বয়স এখন পঁচাত্তরের কাছাকাছি। কপালে দাগ পড়েছে, হাঁটুতে ব্যথা নিয়ে হাঁটি, হাঁপানি মাঝে মাঝে পেয়ে বসে। তবু সকাল হলেই আমি এখনও ঘুম ভাঙি ভোর পাঁচটায়। নাতি-নাতনিদের জন্য টিফিন বানাতে বসে যাই। ছেলে-বৌমা দুজনেই ব্যস্ত মানুষ। ছেলে রাহুল বড় ইঞ্জিনিয়ার, নামডাক আছে শহরে। বৌমা ডাক্তার, শহরের নামকরা নার্সিংহোমে কাজ করে। সংসারে তাদের সবার ঈর্ষণীয় পরিচিতি।
আমি? আমি যেন ছায়া। সংসারে থেকেও কেউ আমার দিকে খুব একটা তাকায় না। তবু মনে মনে ভাবি—ভাগ্যিস ছেলে আমায় বৃদ্ধাশ্রমে পাঠায়নি। নিজের ঘরেই রেখেছে, এটুকুই বা কম কী!
আমার স্বামী নির্মল ছিল একেবারে অন্য ধাঁচের মানুষ। ছোট্ট এক প্রাইভেট স্কুলে মাস্টারি করত। খুব বেশি রোজগার ছিল না, কিন্তু সংসার চলত শান্তিতে। আমি তখন কচি বয়সের বউ, স্বপ্নে ভরা জীবন। আমাদের দুটো সন্তান—ছেলে রাহুল, মেয়ে সীমা।
কিন্তু সেই সুখ বেশিদিন টিকল না। এক বর্ষার দিনে স্কুল থেকে ফেরার পথে বজ্রপাত পড়ে গেল নির্মলের ওপরে। সবাই বলল, “অল্পে বেঁচে গেছে।” কিন্তু আস্তে আস্তে শারীরিক সমস্যা দেখা দিল। তিন মাসের মধ্যেই একরকম হঠাৎ করেই চলে গেল মানুষটা। আমি তখন মাত্র তিরিশ।
ওই মুহূর্তটা আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না। শেষ সময়ে নির্মল আমার হাত ধরে বলেছিল—
“মালতী, আমাদের ছেলে-মেয়েদের দেখো। ওদের মানুষ করো। আমি কিছু রেখে যেতে পারলাম না, শুধু এই কথাটা রেখে যাচ্ছি।”
তারপর থেকেই আমার যুদ্ধ শুরু।
আমি তখন একেবারে শূন্য হাতে দাঁড়ালাম। শ্বশুরবাড়ির লোকজন মুখ ফিরিয়ে নিল। সবাই বলল, “এই দুটো সন্তান নিয়ে কতদিন টানবে? আবার বিয়ে করে নাও।”
কিন্তু আমার মন মানল না। নির্মলের মুখ যেন সবসময় চোখে ভেসে বেড়াত। ওর সেই শেষ অনুরোধই আমার বাঁচার লক্ষ্য হয়ে গেল।
পেটের দায়ে শুরু করলাম সেলাইয়ের কাজ। লোকজন কাপড় আনত, আমি রাত জেগে সেলাই করতাম। পরে এক পাড়ার স্কুলে টিউশন নিতে শুরু করি। ভোরে মানুষজনের বাসন মাজতাম, দুপুরে সেলাই, বিকেলে টিউশন। ঘুম ছিল কম, কষ্ট ছিল প্রচুর, কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি।
আমার ছেলেটা খুব মেধাবী ছিল। আমি যতই খেটে খাই, ওর পড়াশোনার খরচটা জোগাড় করতাম। অনেক সময় নিজের জন্য নতুন শাড়ি কিনিনি, কিন্তু ওর বই-খাতা কখনো বন্ধ হয়নি। মেয়ে সীমাকেও স্কুলে রেখেছিলাম।
রাহুল পড়াশোনায় সবসময় প্রথম হতো। মাস্টারমশাইরা বলতেন, “এই ছেলেটা একদিন অনেক বড় হবে।” তখনই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম—আমার ছেলেকে আমি বড় মানুষ বানাবো।
বছরের পর বছর কেটে গেল। আমি দিনে দিনে বুড়ো হতে লাগলাম, আর ছেলে দিনে দিনে বড় হতে লাগল। রাহুল বৃত্তি পেয়ে পড়াশোনা করল। কলেজে উঠল, তারপর ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেল। আমি প্রতিদিনের খরচ সামলাতাম হিসেব কষে।
মাঝে মাঝে পাড়া-প্রতিবেশীরা বিদ্রুপ করত—
“এত কষ্ট করে কী হবে? এক ছেলে মানুষ করলে কী আর সংসার হয়?”
“ছেলেকে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বানালে মা-কে তো কেউ দেখে না।”
কথাগুলো কানে যেত, মনে ব্যথা দিত। তবু আমি থামিনি।
একদিন শুনলাম, রাহুল বিদেশে চাকরির অফার পেয়েছে। আমার বুক কেঁপে উঠল। আমি তো কখনো দেশ ছেড়ে যাইনি, একা একা কী করে থাকব! কিন্তু ও বলল, “মা, তুমি চিন্তা করো না। আমি সব সামলে নেব।”
সত্যিই সামলে নিল। বিদেশ না গিয়ে দেশেই থেকে গেল ছেলে। বলল, “তুমি একা হয়ে যাবে মা, আমি তোকে ফেলে যেতে পারব না।” সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল—আমার এত বছরের কষ্ট বৃথা যায়নি।
আজ আমার ছেলে নামকরা ইঞ্জিনিয়ার। বড় ফ্ল্যাট কিনেছে, গাড়ি কিনেছে। সমাজে তার অনেক সম্মান। সবাই বলে, “মালতী দেবী ভাগ্যবতী—এমন ছেলে পেয়েছেন।”
কিন্তু মনের ভেতরে সবসময় একটা হাহাকার থাকে। ছেলে-বৌমা কাজের চাপে আমার সঙ্গে খুব একটা কথা বলে না। ঘরে থাকলেও আমি যেন অদৃশ্য।
বৌমা বেশ ভালো, খারাপ কিছু বলে না। তবে মাঝেমাঝে আড়ালে কটাক্ষ করে—
“মা, আপনার আর কাজ করার বয়স নেই, বিশ্রাম নিন।”
কিন্তু সেই ‘বিশ্রাম’ মানে আসলে—আমার আর কাজে লাগি না।
রাতে ছেলে ফেরে দেরি করে। একদিন সাহস করে বললাম,
“রাহুল, আমার হাঁটুর ব্যথা খুব বাড়ছে।”
সে হেসে বলল, “আরে মা, এগুলো তো বয়সের রোগ। একটু ওষুধ খেলে ঠিক হয়ে যাবে।”
সেই হাসির আড়ালে আমি বুঝে যাই—আমার কষ্টের কথা বললে হয়তো বিরক্ত হবে। তাই আর বলি না। ফার্মেসি থেকে সাধারণ ওষুধ কিনে খাই।
তবু এক গোপন তৃপ্তি আছে। আমি অন্তত নিজের ছেলের ঘরেই আছি। অনেককে দেখি—বৃদ্ধাশ্রমে দিন কাটাচ্ছে। আমার পাড়ার বান্ধবী শেফালী তো বলে,
“তুই ভাগ্যবতী মালতী। তোর ছেলে তোকে রেখেছে। আমার মেয়েরা আমায় রাখতে চায়নি। আমি একাই আশ্রমে আছি।”
তখন মনে হয়—হ্যাঁ, ভাগ্যবতীই তো আমি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা প্রশ্ন থেকে যায়—
ভাগ্য কি সত্যিই ভালো, নাকি আমি কেবল ভাগ্যকে মানতে শিখেছি বলে এভাবেই মেনে নিচ্ছি?
প্রতিদিন রাতে আমি নিজের ছোট ঘরে একা বসে থাকি। জানালার বাইরে আলো ঝলমল করে। ছেলে, বৌমা, নাতি-নাতনির হাসি-আনন্দের শব্দ ভেসে আসে দূর থেকে। আমি চুপ করে শুনি।
মাঝে মাঝে মনে পড়ে যায়—নির্মল সেই শেষ রাতে কী বলেছিল, “আমাদের সন্তানদের মানুষ করো।”
আমি সে কথা রেখেছি। সন্তান মানুষ করেছি, বড় করেছি, সম্মানিত করেছি।
আজ আমি মালতী দেবী—বয়সের ভারে নুয়ে পড়া, শরীরের যন্ত্রণা সয়ে চলা এক মা। আমার ছেলে আমাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠায়নি, এটাই আমার বড় প্রাপ্তি।
তবু মনে মনে ভাবি—এ কি সত্যিই প্রাপ্তি, নাকি কেবল বেঁচে থাকার আরেকটা নাম?
কেমন লাগলো কমেন্টে জানাবেন।