05/09/2024
ভাদ্র মাসে শুক্লপক্ষের বৃহস্পতিবারে যে রমণীরা লক্ষ্মী পুজো করে প্রসন্না হয়ে মা লক্ষ্মী তাদের গৃহে সর্বদা বাস করে।
এই নিয়ে একটি গল্পকথিত আছে।
এক দেশে এক বামণী (বামুনের স্ত্রী) ও তার এক ছেলে ছিল। তারা খুব গরীব। বামণী বিধবা। সুতো কেটে কোন প্রকারে এক মুঠো খাবার জোটে। বামনের কুঁড়ের সামনে একখানা বটগাছ ছিল। সেখানে তার ছেলে সকাল বিকেল বসে খেলা করত।একদিন সেখান দিয়ে একজন ক্ষীরওয়ালা যাচ্ছিল । তাই দেখে ছেলেটির ইচ্ছে হলো ক্ষীর খেতে। সে তার মাকে বলল ,মা একটা পয়সা দাও, আমি ক্ষীর খাব ।বামনি কেঁদে বলল 'বাছা পয়সা কোথায় পাবো ' আমরা যে গরিব ।তাই শুনে ছেলেটিও কাঁদতে লাগল। ক্ষীরওয়ালার এইসব দেখে একটু দয়া হলো পয়সা না নিয়েই সে এক ভাঁড় ক্ষীর দিয়ে চলে গেল। তখন ছেলের আহ্লাদ দেখে কে, সে সেই গাছতলায় গিয়ে ক্ষীর খেতে বসলো। সেই গাছে একটি লক্ষ্মীপেঁচা পেঁচির ছানা থাকতো।তারাও খিদের জ্বালায় চেঁচাতে লাগলো ।ছেলেটিও তাই দেখে তাদের নিয়ে নিচে এসে বসলো তাদের ক্ষীর খাইয়ে ,মুখ মুছে, আবার তাদের বাসায় রেখে দিল।এবং বাকিটুকু নিজে খেল।
সন্ধ্যেবেলা পেঁচা পেঁচি বাসায় ফিরে এলো ।ছানারা বেশ আরামে ঘুমাচ্ছে ।তাই দেখে পেঁচা বলল, আজ যে তোরা খিদের জন্য কাঁদিস নি? তখন পেঁচা পেঁচির ছানারা বলল,'না মা ওই যে গরিব বামুনের ছেলে আজ আমাদের পেট ভরে ক্ষীর খাইয়েছে '। জানো মা, ওরা বড্ড গরিব । তারা আরো বললো, বামুনের জিনিস খেয়ে থাকতে নেই ,ওদের অবস্থা ভালো করে দাও। সে কথা শুনে পেঁচি হাসতে হাসতে বললে, 'আচ্ছা ওদের যাতে ভালো হয় সেটা মা লক্ষ্মী কে বলব'।
এইভাবে রোজ রোজ পেঁচা পেঁচি চড়তে যায়, আর সন্ধ্যের আগে বাসায় ফেরে। ছেলেটিও সেইদিন থেকে যখন যা পায় তার অর্ধেক ছানা গুলিকে খেতে দেয়, ছানারাও খেয়ে বাবা মাকে সব বলতো। পেঁচির প্রাণ কেঁপে উঠলো,'আহা না খেয়ে আমার বাচ্চাদের খেতে দেয়, কত যত্ন করে 'তখন সে বাচ্চাদের বলল, মা লক্ষ্মী কে ওদের কথা কাল জানাবো ।
ভাদ্র মাসের বৃহস্পতিবারে ব্রাহ্মী অনেক কষ্টে মা লক্ষ্মীর পুজো করলো ।আর লক্ষ্মীর প্রসাদ ছেলেকে খেতে দিল । ছেলেটি তাই নিয়ে এসে অর্ধেকটা সেই ছানা দের খাইয়ে বাকিটা নিজে খেলো । পেঁচা পেঁচি বাসায় আসতে ছানারা অভিমান করে বললে, আজ আমরা তোমার কাছে খাব না ,কথাও কইবো না। আহা, ওরা কত গরিব, ছেলেটি না খেয়ে রোজ রোজ আমাদের খাওয়াই আর তুমি ওদের কিছুই করলে না। তখন উভয়ে ছানাগুলোকে বললে ,'ওদের ভাগ্য ফিরবে আজ ওরা ভক্তির সঙ্গে লক্ষীর পুজো করেছে' । নারায়নের দয়া হয়েছে।
সকালবেলায় ছেলেটি গাছ তলায় যেমনি এসেছে অমনি ওপর থেকে পেঁচি তাকে ডেকে বললে, দেখো বাবা তোমাদের এবার দুঃখ যাবে।তোমাকে আজ নিয়ে যাব ।তুমি যাবে তো ?ছেলেটি বললে, হ্যাঁ যাবো ।পেঁচি বললে আচ্ছা, তুমি চোখ বোজো আর আমার পিঠের ওপর চড়ে বসো, যেখানে নামিয়ে দেবো, সেখানে তোমাকে যদি কেউ ধন দৌলত দিতে চায়, তুমি নিও না। বলবে যে, তুমি তিলথুবড়ী চাও।তারপর তিনি যেখানে তোমাকে নিয়ে যাবে সেখানে যাবে ,দেখবে নানারকম ধন দৌলত সাজানো আছে। আর তার মাঝখানে তিল ধুবড়ী আছে ।তোমায় দিলে তুমি নিয়ে এসে আমার পিঠের ওপর বসবে আমি আবার তোমাকে তোমার বাড়িতে নিয়ে আসব। ছেলেটি পেঁচা ও পেঁচী কথা মত চোখ বুজে বসলো ।পেঁচা ও পেঁচি উড়তে উড়তে মা লক্ষ্মীর বাগানে এসে পৌঁছালো। আর বলল এবার চোখ খোলো। ছেলেটি লক্ষ্মীনারায়ণ কে দেখে গলায় কাপড় দিয়ে প্রণাম করল ।আর হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে রইল। ছেলেটিকে দেখে মা লক্ষ্মীর বড় দয়া হলো। মা লক্ষ্মী জিজ্ঞাসা করল, তুমি কে বাছা? ছেলেটি বলল, আমরা বড় গরীব। আপনার কাছে আমাদের দুঃখ কষ্ট দূর করতে এসেছি। লক্ষ্মী তাকে সঙ্গে করে যত ধন দৌলত আছে দেখিয়ে দিলেন। আর বললেন এইসব তুমি যত পারো নিয়ে যাও। ছেলেটি বলল ,না মা আমি এসব কিছুই নেব না। আমি তিল ধুবড়ী নিতে এসেছি ।দয়া করে আমাকে তিল ধুবড়ী দিন ।তখন মা লক্ষ্মী তাকে তিল ধুবড়ী দেখিয়ে দিলেন।এবং বললেন একে রোজ রোজ পুজো করবে। তাহলে তোমাদের সব দুঃখ কষ্ট দূর হবে। মা লক্ষ্মীকে প্রণাম করে, আবার পেঁচির পিঠে চড়ে বসলো, এবং পেঁচা ও পেঁচি ছেলেটিকে তার কুঁড়েঘরে নামিয়ে দিল। ছেলেটি কুঁড়ে ঘরের ভেতরে গিয়ে তার মাকে সমস্ত কথা বলল।
তখন তার মা ঘর দৌড় পরিষ্কার করে ঘট পেতে পিঁড়ি তে আলপনা দিয়ে তার ওপর তিল ধুবড়ী রেখে ভক্তি ভরে দুজনে পুজো করল।
এমনি করে রোজ রোজ ধূপধুনা, প্রদীপ জেলে এবং এক মুঠো আতপ চালের নৈবিদ্য নিবেদন করে পুজো করতে লাগলো।
দেখতে দেখতে মা লক্ষ্মীর কৃপায়, ঘোড়া, পালকি ,হাতি ,ধন- দৌলত হলো। ঠিক রাজার মতো। তারা এতটা বড়লোক হলো কি করে, জানবার জন্য সবাই কৌতুহল প্রকাশ করতো। একদিন টের পেল যে ,একটা পুটুলিকে তারা পুজো করে। শেষে রাজার কানেও কথাটি গেল ।রাজা ভাবল তারা যেহেতু এত বড়লোক হচ্ছে, তাই কোনদিন সে তার রাজ্যের দখল নিতে পারে। সেই কারণে রাজা একদিন হঠাৎ রাত্রিবেলা বামণীর বাড়ি লুট করল। এবং তিল ধুবড়ী নিয়ে চলে গেল।
একদিন মা লক্ষ্মী ছলনায় এল এবং সেই তিল ধুবড়ী লক্ষীর ভান্ডারেই আবার চলে গেল । মা এবং ছেলে আগের অবস্থায় ফিরে এল।
পেঁচার ছানা গুলি আবার মাকে বলল, ওদের কি দোষ মা ?রাজা এসে সব লুট করে নিয়ে গেছে তাই তো ওদের এত কষ্ট। তুমি আবার মাকে গিয়ে বল , আবার যাতে তিল ধুবড়ী ছেলেটিকে দেয় ।পেঁচি বলল না বাছা ওরা যেহেতু তিল ধুবড়ী একবার হাতে পেয়ে রাখতে পারল না ,তাই আর কিছু করার নেই। ছানারা মায়ের কথা শুনে খুব কান্নাকাটি করতে লাগলো। তাই দেখে পেঁচি আবার ছেলেটিকে নিয়ে মা লক্ষ্মীর কাছে গেল। ছেলেটি কাঁদতে কাঁদতে মা লক্ষ্মী এবং নারায়ণ কে প্রণাম করে সব কথা বলল ।মা লক্ষ্মী বলল, তোমাকে দিয়েছিলাম তুমি রাখতে পারো নি, তাই শুনে ছেলেটি বলল, আর একবার দিন আমি এবার খুব যত্ন করে রাখবো। কেউ টের পাবে না । নারায়ণের খুব দয়া হলো। নারায়ণ লক্ষ্মী কে বলল লক্ষ্মী ওকে আর একবার দাও, যদি এবার না রাখতে পারে তাহলে আর দিও না। তাই শুনে মা লক্ষ্মী ছেলেটিকে আবার তিলধুবড়ী দিলেন।
ছেলেটি উভয়কে প্রণাম করে ফিরে এলো।
ছেলেটি ফিরে এসে তার মাকে সব বলল এবং মা লুকিয়ে আবার তিল ধুবড়ীর পূজা করল। দেখতে দেখতে আবার আগের অবস্থায় ফিরে পেল।
বারো মাসে তেরো পার্বণ বামণীর বাড়িতে হতে থাকলো । তাই দেখে রাজা ভয় পেয়ে তার একমাত্র কন্যার সঙ্গে খুব ঘটা করে বামুনের ছেলে বিয়ে দিল ।আর সঙ্গে দিলেন হাতি ,ঘোড়া, হিরে, মানিক ,দাস- দাসী আরো কত কি। বামণী রোজ ভক্তি সহকারে পুজো করে ।এত ঐশ্বর্য তবুও একদিনও পুজো বাদ যায় না ।দেখতে দেখতে রাজ্যের পর রাজ্য সব অধিকার করে ছেলে টি ১৪ বছর বয়সে মস্ত বড় রাজা হল । কিন্তু পেঁচা পেঁচির ছানাদের নিত্য খাবারে ব্যবস্থা করে দিত । বামণীর বয়স হয়েছে, বৈকুন্ঠে যাবার সময় হল।
বামণী রথে চলার আগে তার বৌমাকে বলল বৌমা ,ভাদ্র মাস, কার্তিক মাস ,পৌষ মাস আর চৈত্র মাসে মা লক্ষ্মীর পুজো করবে। খুব শুদ্ধাচারে এবং খুব ঘটা করে। তিল ধুবড়ীর পূজা করবে আমি যেমন করতাম তেমনি করে । রোজ দুবেলা ঝড়া ,ঝাঁট, গঙ্গাজল দেবে। এইগুলো নিয়মমতো করলেই তোমাদের জীবনে আর কোন কষ্ট দুঃখ থাকবে না সৎ পথে থেকে জীবনযাপন করবে। এইসব কথা বলে বামণী স্বর্গে চলে গেলেন। ছেলে খুব ঘটা করে শ্রাদ্ধ করল। বউ শাশুড়ির কথা মত সব করতে লাগলো।এমনি করে তারাও কিছুকাল সুখ ভোগ করল। তারপর তাদের ছেলেমেয়ে নাতি পুতি ,বউ ,জামাই দের রেখে মায়ের মত উপদেশ দিয়ে পৃথিবীতে মা লক্ষ্মীর পূজা প্রচার করতে বললেন ।তারপর তাদের জন্য স্বর্গ থেকে রথ এলো এবং তাতে তারা চেপে স্বর্গে চলে গেল। তারপর থেকেই লক্ষীর ব্রত কথা প্রচার হলো।