বানপ্রস্থ 'পরবর্তী বৈদিক যুগ' এর চতুরাশ্রমের তৃতীয় আশ্রম তথা আশ্রয়। গার্হস্থ জীবন পল্লবিত হওয়ার পর পঞ্চাশোর্ধে ব্রাহ্মণগণ একাকী বা স্ত্রীর সম্মতিতে
তাঁকে সঙ্গে নিয়ে বনবাসী হতেন। এই সময় বনে কুটির নির্মাণ ক'রে চুল দাড়ি জটাযুক্ত হয়ে দিনান্তে একবার কেবলমাত্র বনজ ফলমূল, শস্যাদি, শাকসবজি গ্রহণ ক'রে বেদপাঠ,তর্পণ, ত্রিসন্ধ্যা, পূজা, তপস্যা ইত্যাদি ধর্মাচরণের মাধ্যমে জীবন অতিবাহিত করতেন। এই সময় আরও কিছু কর্তব্য
পালন করতে হতো, যেমন.... অতিথিসেবা, ভিক্ষাদান,বনরক্ষণ ইত্যাদি। চর্ম, কুশ বা কাশ দ্বারা প্রস্তুত বস্ত্রই ছিল সমস্ত ঋতুর জন্য নির্দ্দিষ্ট। শয়ন করতে হতো মৃত্তিকায়। বনের মধু ও মাংস গ্রহণ ছিল নিষিদ্ধ। আত্মীয় পরিজন হতে বিচ্ছিন্ন এই জীবনের
একমাত্র লক্ষ্য ছিল... পরবর্তী সন্ন্যাস জীবনে প্রবেশ ক'রে পার্থিব সমস্ত কাম্য বস্তু,জীবনের যত মোহ, রিপু, প্রবৃত্তিকে জয় ক'রে মুক্তি লাভ তথা মোক্ষ লাভ।
গ্রহণ -বর্জনের মাধ্যমে পরিবর্তন জীবনের অন্যতম
ধর্ম। কালের নিয়মে চতুরাশ্রমের অস্তিত্ব লুপ্ত। বর্তমানে বিদ্যালয় জীবনে অভ্যস্ত ছাত্রদের অনেকের বাড়িতেই শিক্ষক বা গুরুরা আসেন পরীক্ষা নামক চরম ঈপ্সিত লক্ষ্য অতিক্রমে
সাহায্য করতে। বিবাহ চতুরাশ্রমের গার্হস্থ জীবনের মতো পঁচিশ বৎসরের আশেপাশে আরম্ভ হলেও বানপ্রস্থের কাল পর্যন্ত চলতে থাকে, বিশেষতঃ বিপত্নীকদের ক্ষেত্রে দ্বিতীয়বার পানিগ্রহণের সময়তো ঘটেই থাকে। অথচ মজার কথা হ'লো
তথাকথিত বর্ণশ্রেষ্ঠ বিপ্রকুল মাত্র শত বৎসর পূর্বেও
কৌলিন্যের মাহাত্ম্যে কৈশোর থেকে বার্ধক্য এমনকি সন্ন্যাস নেওয়ার সময় পর্য্যন্ত গণ্ডা গণ্ডা কুমারীকে
পত্নীত্ব দান ক'রে পুণ্য অর্জন করতেন। বর্তমানে এই কুপ্রথা দূর হ'লেও বৈবাহিক সম্পর্কের বহুরূপতা
দেখা যাচ্ছে, যা আবার আভিজাত্যের পরিচায়কও হয়।
একবিংশ শতকের এক ক্ষুদ্র পর্যবেক্ষক হিসাবে
একটি প্রশ্ন মনে আসে..... কি কারণে বৈদিক ঋষিগণ কর্তৃক প্রবর্তিত চতুরাশ্রম প্রথা ত্যক্ত হলো? উত্তরে বলা যায়..... বর্তমানে পঞ্চাশ বৎসর বয়স কাল পর্যন্ত নাতি নাতনিদের মুখদর্শন আরম্ভ হয় মাত্র। সুতরাং, এই সময় কালেই গৃহকে স্বর্গ এবং নাতি নাতনিদের অমৃতফল মন হয়। অর্থাৎ পারিবারিক সুখ উপভোগের গোধূলিলগ্ন তো এই সময়ই! তাই বানপ্রস্থকে আপদ ব'লে মনে হ'তে আরম্ভ করে। এবং সুতরাং, বানপ্রস্থে গমন "নৈবচ নৈবচ"। তাছাড়া, ক্ষত্রিয়,বৈশ্য এমনকি শূদ্রগণও যেখানে সাধ্যমত সামাজিক ও পারিবারিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য কানায় কানায় ভোগ করছে, সেখানে কেবলমাত্র ব্রাহ্মণকুল কেন এই কৃচ্ছসাধনের পথ বেছে নেবেন! অবশ্য পরবর্তী কালের বিজ্ঞ ঋষিগণ বা বিশেষ ব্যাক্তিত্বগণ হয়ত এটিও বুঝেছিলেন যে.... বর্ণভেদ প্রথা মানুষের বিশেষতঃ বিপ্রগণ কর্তৃক প্রণীত, ঈশ্বরসৃষ্ট নয়। তাছাড়া ঈশ্বরের পৃথক অস্তিত্ব অন্ততঃ মানুষের অজানা, তর্কের মাধ্যমে তাঁকে ধরা যায়না। মনুষ্যকুলে যাঁরা সৎ সত্যনিষ্ঠ, সৎ চিন্তা যাঁর মধ্যে থাকে..... তিনিই ঈশ্বর।আর সেই ঈশ্বরকে দেখার জন্য, তাঁর কৃপা লাভের জন্য, মোহ ত্যাগের মাধ্যমে মুক্তি তথা মোক্ষ লাভের জন্য বানপ্রস্থে গমনের বা সন্ন্যাস নেওয়ার প্রয়োজন নাই; গৃহপ্রাঙ্গণেই তা সম্ভব।
বৈদিক ঋষিগণ প্রোক্ত 'সন্ন্যাস' আশ্রমের নির্দ্দিষ্ট বয়সের বহির্দ্বারে এসে সমাজ সংসার মনুষ্য জীবনের কিছু অনুভূত সত্য আমি ' বানপ্রস্থ থেকে বলছি'....
এই পাতায় বণ্টন করতে চাই। এই উদ্দেশ্যে সকলের( জাতিধর্মনির্বিশেষে) সুবিধার জন্য নিয়মিতভাবে সপ্তাহের প্রতি বৃহস্পতিবার শুভ প্রাতে
একটি দুইটি কথা 'ফেসবুকে ' নিবেদন করে সমভাবে আস্বাদন করতে চাই।
নিবেদনান্তে....
সবিতারঞ্জন গঙ্গোপাধ্যায়
বোলপুর, শান্তিনিকেতন,
বীরভূম।