01/10/2019
বিরহী বন্দুক নিয়ে চার কথা
- দুলাল চক্রবর্তী
নাটক বিরহী বন্দুক। প্রযোজনা কালিকাপুর বাংলা প্রসেনিয়াম। নাটক এবং নির্দেশনা এ. কে. এম. সাইফুল্লা। মূল গল্প চিত্রা মুখোপাধ্যায়। আলো রাজর্ষী চক্রবর্তী। আবহ সুমন ও চিরন্তন। মঞ্চ ভাবনায় অজয়। সাদা ছাতার এক নিপুন বিন্যাসের সাথে মুখোশ পড়িয়ে চরিত্র দাঁড় করিয়ে অভিনব চেষ্টা এই নাটকের গভীর কথা বলার এক উপায় হয়েছিল। সুন্দর প্রয়োগ। সাথে দাতা গ্রহীতা দুই বিশাল হাত ঝুলছিল। এক অবসাদ আর এক উল্লাসের দুই দূরত্বের অবস্থানে। বাপ্পা মন্ডল বাবা নবারুণ মুখার্জীর ভুমিকা এই হাতের ফাঁসে হাস পাস করা একটি দ্বন্দ্বের দ্যোতনা।
কালিকাপুর বাংলা প্রসেনিয়াম সংস্থা গত ২৮শে আগষ্ট কলকাতা তপন থিয়েটারে মঞ্চস্থ করেছিল নাটক "বিরহী বন্দুক"। চারিদিকে যে অস্থির রাজনৈতিক বাতাবরণ আমাদের ঘিরে ধরেছে। যে অসাধু প্রবণতার প্রভাবে আমরা দূর্নীতিবাজ হয়ে উঠছি। সমাজের চারিদিকে মাকড়সার জালের মত এক সুক্ষ জালে মানুষের সার্বিক বিকাশ আটকে গেছে। অন্ধ অন্ধকারে অসহিষ্ণু এক সভ্যতায় আমরা এসে পৌঁছেছি। উত্তর আধুনিকতার দুঃসাহস আমাদের মনের ঘরে এসে ঢুকে পড়েছে। হারিয়ে গেছে সেই সমাজকে নতুন করে সাজাবার সংকল্প। দিন বদলের আর কোন সম্ভাবনাই নেই দেখে, বিপ্লবাত্মক বন্দুক সংগ্রাম বিমুখ হয়ে বিরহী অবস্থায় ফুঁপিয়ে কাঁদছে। নাকি আর একবার গর্জে উঠে ভয়ংকর ভাবে এই অরাজকতার বাস্তবতাকে ভেঙ্গে চুরমার করবে। করতে পারে। তারই অশনি সংকেত উঠে এসেছে বিরহী বন্দুক নাটকের প্রতিটি ভাঁজে।
কালিকাপুর দক্ষিণ ২৪ পরগণার একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল। এখানকার নাটকের স্বপ্ন, সামর্থ্যের বিশিষ্ট উপমা হতে পারে এই নাটকের প্রয়োগ থেকে অভিনয়। সবই, বেশ ভেবে চিন্তে নাটকে এসেছে।মা, সরলা চরিত্রে চিত্রা মুখোপাধ্যায়, বোন/মেয়ে অদিতির ভুমিকায় জয়শ্রী অধিকারী খুব দামি দুটি উপস্থিতি। পাগল দাদা আনন্দ মুখার্জী চরিত্রে দিব্যেন্দু বিশ্বাস সাবলীল হতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আরো স্মার্ট হবার দাবি রেখে যায়। ঝকঝকে মিডিয়া সাংবাদিক মহমদ আলি উল্লাহ,নিউজ রিডার সুচরিতা, সুমাইয়া তারান্নুম এই নাটককে বারবার ছেঁড়া কাটা করেছেন, সফল ভাবেই। যথেষ্ট ভিড়ের এই মঞ্চায়নে সকলেই কালিকাপুর বাংলা প্রসেনিয়াম সংস্থাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। উৎসাহ দিয়েছেন। তবে নাটকের গতি, কিছু অভিনয়ের আরষ্ঠতা নিয়ে নতুন ভাবে ভাবার প্রসঙ্গ আছে।এই সময় আমরা কি চাইছি। কোথায় চলেছি। কি ভবিষ্যৎ। কেউ জানি না। আগামীকাল কি হবে আমাদের। সংসার সমাজের এখন গন্তব্য কোথায়। সব অজানার মধ্যেই চলছে এক স্থিতাবস্থা। তাই অবাক পৃথিবী বলতে এক অনীহা। সবই জ্যান্ত বাস্তব। রাষ্ট্র ব্যবস্থার হালে জোতা বলদ হয়েছে মানুষ। ব্যবস্থার চাবুক যেমন পিঠে পড়বে। সময় আর মানুষ সেইমতই চলবে। তাই এই সময়ের চলনে কোন ঘটনাতেই বিস্ময় নেই। যার মধ্যেই অরাজনৈতিক এক মন নিজের কবর নিজেই খুঁড়ছে। প্রতিদিন মৃত্যু দেখছি। নিজের গন্ডিতে বাঁচার জন্যে তবুও শান্তি খুঁজে চলেছি।
এখানেই আটকে গেছিল বিরহী বন্দুক নাটকের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার আনন্দ মুখার্জীর চিন্তার সব সূত্র। তাই জীবন থেকে পালাতেই পাগল হয়ে ভুলে যাওয়া। বাবার আদর্শবাদী রাজনৈতিক দর্শনের পথে আজকের এই পৃথিবী তার কাছে দুঃসহ ঠেকেছিল হয়ত বা। বোনের প্রেমও কিনে নিচ্ছে বাজার ব্যবস্থা। কোন মহাকাশে বসে সেই দানব ঈগল, ----মানুষের দেওয়া ক্ষমতায় এক সক্ষম ঈশ্বর,--- মহাকালের ভবিতব্য লিখছেন। নাকি আমাদের জীবনের নাটক। কেউ বল্যে পারছি না, একটু সুখের খোঁজে কোন অন্ধকারে তলিয়ে গেছে আমাদের ভাল লাগা মিষ্টি এই সময়। তার উপরই আধারিত নাটক। সমাজের আলোচ্য সব প্রসঙ্গের কিছু আলোকপাত ভিড় নিয়েই গড়েছে এই বিরহী বন্দুক নাটক। অনেক কোলাজ কোলাহলে সময়ের কথাই তুলে এনেছে সংবাদমাধ্যম এর চেহারাকে পাশে নিয়ে। গঠনের চেহারায় গড়ে যেতে। গড়িয়ে পড়েছে আমাদের ক্ষয়িষ্ণু অসহায় মনের নিভৃতে। তবে কোথাও তাল কাটা এক বেসুরো বাদ্য কি নাটকে আছে? খুঁজে দেখতে হবে।
ইন্দ্রজিৎ, সে কি এই সময়ের সবার ইন্দ্রিয় নিয়ে খেয়াল খুশি মত বাজার বসিয়েছে? কেনা বেচার? এতটা সহজ কি সময়ের ভাষার শেষ কথা? কত অর্থ তার আছে? এত কিনে নেবার ইচ্ছার দাস কি সময়ের মানুষ?
রাজা ঘরামী, তার অদ্ভুত বাচিকে ভালো নেগেটিভ ক্যারেক্টর। ছোট অদিতি বড় অদিতির কষ্টে উঠে এসেছে,মিহিক সম্প্রতির শিশু আবেদনে। সব মিলিয়ে মানুষের ভালো লাগায় চলে যায় তবুও বিরহী বন্দুক নাটক।
তপন থিয়েটারে হাল্কা বৃষ্টির মধ্যেই এ. কে. এম. সাইফুল্লা এবং কালিকাপুর বাংলা প্রসেনিয়াম এর শিল্পীদের আন্তরিক ইচ্ছায় উঠে আসা নাটক, বিরহী বন্দুক দেখে গেছিলেন অনেক পরিচিত অপরিচিত নাটকের মানুষ। আমিও এসেছিলাম দূর থেকে। নাটক এবং নির্দেশনায় এ. কে. এম সাইফুল্লা। তাঁর দল, তাঁর কব্জিতে কত বল, হয়ত তাও বুঝতেই চেয়েছিলাম। নিরাশ হই নি। প্রত্যাশিত আনন্দই পেয়েছিলাম। কারণ অনেক অবান্তর বক্তব্য বিষয়ের চলমান থিয়েটারের বাজারের মাঝেই, বিরহী বন্দুক নাটক সময়ের কথার উল্লেখে একটি চেতনার প্রবাহে দুলিয়ে দিতে পেরেছিল। কাজেই এই নাটক যেহেতু সময়ের সাথেই আছে। তাই একটি বড় পাওয়া।তবে এই নাটকের প্রতিটি দৃশ্য শুরুতেই দ্রুতগামী আবেদন প্রতিষ্ঠা করা দরকার। অনেক আগে রান করা ট্রেনের রানিং ঝল্কানিতেই অনেক বেশি মুগ্ধতার সংবাদ থাকলে, নাটকটি খ্যাত হতে পারে।
খুব ভাল আবহের সংযোজন হয়েছে। সংবাদ মিডিয়া অফিস, নবারুণ এর বাড়ি, প্রেমের মাঠ, সবই যুক্ত হতে পারে ঝোড়ো ভাবে। এ শুধুই নিজের একমাস ধরে চিন্তা করে পাওয়া।
লেখক নিজে চার কিস্তিতে লিখেছেন। হুবহু একই তুলে দেওয়া হল