15/09/2026
✒️শমীক লাহিড়ী
বিরিঞ্চিবাবার ডবল-ইঞ্জিন দর্শন
কলিকাতায় সম্প্রতি এক অভিনব হুলস্থুল উপস্থিত হইয়াছে।
শোনা গেল, রাজশেখর বসুর কৃপায় খ্যাতনামা মহাপুরুষ বিরিঞ্চিবাবা পুনরায় মর্ত্যে অবতীর্ণ হইয়াছেন। প্রায় নব্বই কোটি বৎসর পূর্বে যিনি সূর্যমণ্ডলে বসবাস করিতেন, ব্রহ্মার সহিত যিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নকশা করিয়াছেন, যিনি অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ একই সঙ্গে দেখিতে পান - সেই বিরিঞ্চিবাবা এবার আবির্ভূত হইয়াছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকট।
তাঁহার সঙ্গে আছেন চিরন্তন প্রধান শিষ্য পরমহংস এবং একদল নাগা সন্ন্যাসী। নাগা সন্ন্যাসীদের অবশ্য বিষয়টি খুব একটা ভালো লাগিতেছে না। পাহাড়ের ঠান্ডা ছাড়িয়া এই ভ্যাপসা গরমে পিচের রাস্তায় দাঁড় করাইয়া রাখিবার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য তাঁহারা বুঝিয়া উঠিতে পারেন নাই।
কিন্তু বিরিঞ্চিবাবা সব জানেন। তিনি শুধু ত্রিকালজ্ঞ নন - বর্তমান যুগে ‘ডবল-ইঞ্জিন’দর্শনের একমাত্র অনুমোদিত সোল ডিস্ট্রিবিউটার, অর্থাৎ আধ্যাত্মিক শক্তির একমাত্র বৈধ পরিবেশক।
সংবাদ পাইয়া রাম ভক্ত গুরুপদবাবু তাঁহার কন্যা বুঁচি এবং সন্দিগ্ধচিত্ত যুবক সত্যচরণকে লইয়া হন্তদন্ত হইয়া সেই স্থলে উপস্থিত হইলেন।
দেখা গেল, প্রকাণ্ড এক সিংহচর্মের উপর বিরিঞ্চিবাবা অর্ধনিমীলিত নয়নে বসিয়া আছেন। চারিদিকে ধূপ, ধুনো, ঘণ্টা, মাইক এবং কিছু অত্যন্ত উৎসাহী মোবাইল ক্যামেরা। পার্শ্বে নব্য-সনাতনী মুখ্যমন্ত্রী হস্তজোড় করিয়া দাঁড়াইয়া আছেন। তাঁহার মুখে এমন এক ভক্তিভাব, যেন রাজ্যের বাজেট, বেকারত্ব এবং দ্রব্যমূল্যের যাবতীয় সমাধান এখনই অলৌকিকভাবে হইয়া যাইবে।
গুরুপদবাবু সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করিয়া কাঁদিয়া ফেলিলেন। ‘বাবা! রাজ্যে এ কী ঘোর বিপদ! আলু-পটলের দর অগ্নিমূল্য। আপনার কৃপায় মধুমেহ রোগের কারণে দুর্মূল্য চিনি খাইতে হয় না, ইহা বাঁচাইয়া দিয়াছে। যুবকদের হাতে চাকরি নাই। শ্রমিকের মজুরি তলানিতে। বাজারে গেলেই পকেট কাঁদে, বাড়ি ফিরিলে সংসার কাঁদে। তাহার উপর ডবল-ইঞ্জিনের এমন দৌড় - সাধারণ প্রজার প্রাণ ওষ্ঠাগত। আমাদের উদ্ধার করুন, প্রভু!’
বিরিঞ্চিবাবা দাড়িতে হাত বুলাইয়া মৃদু হাসিলেন। ‘গুরুপদ, তুই মূর্খ ও প্রাকৃত জন। তুই যাহাকে অর্থনৈতিক সংকট বলিতেছিস, তাহা বস্তুত আধ্যাত্মিক পুনর্গঠন।’
গুরুপদবাবু হাঁ। ‘আজ্ঞে?’
‘হ্যাঁ। মানুষের দুঃখ না থাকিলে মানুষ ঈশ্বরকে স্মরণ করে না। অতএব দুঃখ যত বাড়িবে, ঈশ্বরস্মরণ তত বাড়িবে। ইহাই উন্নয়ন।’
সত্যচরণ এতক্ষণ চুপ করিয়া ছিল। সে চশমাটি জামার খুঁটে মুছিয়া মৃদুস্বরে কহিল – ‘বাবা, দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি আর আধ্যাত্মিক উন্নতির মধ্যে বৈজ্ঞানিক সম্পর্কটি কী?’
বিরিঞ্চিবাবা প্রসন্ন হইলেন। অতি গভীর, বৎস। ধর, তুই বাজারে গেলি। দেখিলি চালের দাম বাড়িয়াছে। তুই কম চাল কিনিবি। কম খাইবি। শরীর হালকা হইবে। ধ্যান সহজ হইবে। অর্থাৎ মূল্যবৃদ্ধি তোকে সরাসরি মোক্ষের পথে ঠেলিয়া দিতেছে।’
সত্যচরণ কহিল – ‘আলুর দাম?’
‘আলু? তাহা আরও মহৎ ব্যবস্থা। আলু সস্তা না থাকিলে আলুর প্রতি আসক্তি কমিবে।’
‘ডালের দাম?’
‘প্রোটিনের মোহ ছাড়িতে পারিতেছো না, সেই জন্যই তো মূল্যবৃদ্ধির এই মহার্ঘ্য আয়োজন।’
‘তেলের দাম?’
‘ওটা ভোগবিলাসের মোহ।’
‘গ্যাসের দাম?’
বিরিঞ্চিবাবা এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করিয়া গভীর ধ্যানে গেলেন। ‘অগ্নিতত্ত্বের সঙ্গে সরাসরি যোগ।’
পরমহংস তখনই ‘ব্যোম ব্যোম’ করিয়া উঠিল। চারিদিকের শিষ্যরাও তাহার সঙ্গে গলা মেলাইল।
নব-সনাতনী অধিকারি বিরক্ত হইয়া কহিলেন – ‘আহা, ব্যোম ব্যোম আবার কী? শ্রাবণ মাস তো কাটিয়া গিয়াছে। এখন জয় শ্রীরাম বলুন। উপরের নির্দেশ।’
বিরিঞ্চিবাবা মাথা নাড়িয়া কহিলেন – ‘ঠিক, ঠিক। আধ্যাত্মিকতাতেও সময়ের সঙ্গে ব্র্যান্ডিং বদলাইতে হয়।’
সত্যচরণ আবার প্রশ্ন করিল – ‘কিন্তু বাবা, চাকরি?’
‘চাকরি?’ বিরিঞ্চিবাবা এমনভাবে তাকাইলেন, যেন সত্যচরণ পৃথিবীর সবচেয়ে অশ্লীল শব্দটি উচ্চারণ করিয়াছে। ‘তা, চাকরি কেন চাইছিস?’
‘জীবনধারণের জন্য।’
‘জীবনধারণ! এই তো তোদের আসল সমস্যা। তোরা জীবনধারণ করিতে চাস, অথচ সরকার তোদের জীবন উৎসর্গ করাইতে চায়।’
সত্যচরণ কিছু বুঝিল না।
বিরিঞ্চিবাবা ব্যাখ্যা করিলেন – ‘ বাবা, চাকরি না থাকিলে মানুষ কী করে?’
‘বসে থাকে।’
‘ভুল। ধ্যান করে।’
‘চাকরি না থাকিলে সংসার কীভাবে চলবে?’
‘সংসার মায়া।’
‘টাকা না থাকিলে?’
টাকাও মায়া বাছা।’
‘তাহলে বাজারে গিয়ে কী কিনব?’
‘কিছুই না।’
‘তাহলে বাঁচব কীভাবে?’
বিরিঞ্চিবাবা হাসিয়া কহিলেন – ‘এই প্রশ্নটিই তোদের এখনও দূষিত ভোগবাদী মানসিকতার প্রমাণ।’
পার্শ্ববর্তী এক নাগা সন্ন্যাসী হঠাৎ কাশিয়া উঠিলেন। মনে হইল, তিনি এই দর্শনের বাস্তব প্রয়োগ সম্বন্ধে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা রাখেন।
বিরিঞ্চিবাবা তখন আরও উৎসাহিত হইয়া কহিলেন – ‘তোদের বস্ত্রের প্রয়োজন কী? এই যে নাগা মহাপুরুষেরা দাঁড়াইয়া আছেন, ইঁহাদের অবলোকন কর। বস্ত্রহীনতা মানেই মুক্তি। তোদের তো আমরা জন্মের সময় কিছু পরাইয়াই পাঠাই নাই। সরকার এখন আবার তোদের সেই প্রাকৃতিক অবস্থায় ফিরাইয়া লইয়া যাইতেছে।’
গুরুপদবাবুর চোখ চকচক করিয়া উঠিল। ‘বুঁচি! শুনছিস? এতদিন আমরা ভুল বুঝিয়াছিলাম। সরকার আমাদের গরিব করে নাই - মুক্ত করিতেছে!’ বুঁচি চুপ করিয়া রহিল।
সত্যচরণ কহিল – ‘কিন্তু বাবা, যাঁহাদের হাতে টাকা আছে, তাঁহারা?’
বিরিঞ্চিবাবা কহিলেন – ‘তাঁহাদের জন্য অন্য দর্শন।’
‘কী দর্শন?’
‘সঞ্চয় দর্শন।’
‘আর যাঁহাদের টাকা নাই?’
‘কেন! বৈরাগ্য দর্শন।’
‘এর অর্থ?’
‘যাহাদের টাকা আছে, তাহারা সম্পদ রাখিবে। যাহাদের নাই, তাহারা সম্পদের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করিবে।’
সত্যচরণ কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিল। তারপর কহিল – ‘বাবা, এই দর্শনটা বড় সুবিধার।’
বিরিঞ্চিবাবা খুশি হইয়া কহিলেন – ‘দেখলি? বুদ্ধি বিকশিত হইতেছে।’
সত্যচরণ কহিল – ‘না, আমি ভাবিতেছিলাম, এই দর্শন যাঁহারা বানাইয়াছেন, তাঁহারা নিজেরাই যদি একটু বৈরাগ্য পালন করিতেন, তবে দেশের কত মানুষের উপকার হইত!’
চারিদিকে হঠাৎ নীরবতা। একটি মাইক বন্ধ হইয়া গেল। দুইজন শিষ্য পরস্পরের মুখের দিকে চাহিল। মুখ্যমন্ত্রী কাশিতে লাগিলেন। বিরিঞ্চিবাবার কপালে প্রথমবারের মতো ভাঁজ পড়িল।
তিনি রুষ্ট হইয়া কহিলেন - ‘ওরে সেকু-মাকু! তুই বড় বেয়াড়া প্রশ্ন করিস।’
সত্যচরণ বিনীতভাবে কহিল – ‘শেষ একটি প্রশ্ন, বাবা।’
‘কর।’
‘ডবল-ইঞ্জিনের চালকদেরও কি কৌপিন পরাইবার ব্যবস্থা হইতেছে, নাকি এই বৈরাগ্য কেবল প্রজা, শিক্ষার্থী, ইহাদিগকের জন্য?’
এইবার বিরিঞ্চিবাবা ভয়ানক রুষ্ট হইলেন। ষাট কোটি বছর বিশ্বব্রহ্মাণ্ড পরিচালনার সময় এমন প্রশ্ন তাঁহার সম্মুখে আসে নাই।
তিনি বজ্রকণ্ঠে কহিলেন – ‘মূর্খ! তুই জানিস না- রাজা আর প্রজার জীবন কখনও এক হয় না!’
সত্যচরণ মাথা নত করিয়া কহিল – ‘কেন, বাবা?’
বিরিঞ্চিবাবা কহিলেন – ‘কারণ রাজা জন্মায় শাসন করিবার জন্য, প্রজা জন্মায় শাসিত হইবার জন্য।’
সত্যচরণ কহিল – ‘কিন্তু এই নিয়ম কে বানাইলেন?’
বিরিঞ্চিবাবা কহিলেন – ‘আমি।’
‘আপনি কার কথা শুনিয়া বানাইলেন?’
বিরিঞ্চিবাবা থমকালেন।
সত্যচরণ আবার কহিল – ‘এইটুকু জানিবার অধিকার কি প্রজার নাই?’
বিরিঞ্চিবাবার মুখ এবার সম্পূর্ণ রক্তবর্ণ। তিনি হাত তুলিয়া অভিশাপ দিলেন – ‘ওরে পাষণ্ড! তোর স্থান নরকেও হইবে না।’
সত্যচরণ কাঁপিয়া উঠিল। বিরিঞ্চিবাবা বজ্রস্বরে কহিলেন – ‘তোর উপযুক্ত স্থান হইল -যাদবকুলের নামাঙ্কিত বিশ্ববিদ্যালয়!’
সত্যচরণ প্রথমে স্তব্ধ হইয়া গেল। তারপর অদ্ভুতভাবে হাসিতে লাগিল। ‘বাবা, এ তো অভিশাপ নয়!’
বিরিঞ্চিবাবা থতমত। ‘তবে কী?’
সত্যচরণ কহিল – ‘এ তো আশীর্বাদ।’
এই বলিয়া সে ৪ নম্বর গেটের ভিতর দিয়া আনন্দে অন্তর্ধান করিল।
এবার গুরুপদবাবুও বিরিঞ্চিবাবার পদযুগল জড়াইয়া বলিতে লাগিলেন – ‘আমার বুঁচিকেও এমন একটা অভিশাপ দিন বাবা’ । বুঁচি মুখ নিচু করিয়া হাসিতেছে।
অধিকারি প্রচণ্ড রুষ্ট হইয়া চারশত সিপাহির ঘেরাটোপে রাখা গাড়ির দিকে রওনা হইলেন। উঠিবার আগে তিনি পিছন ফিরিয়া কহিলেন - ‘পরেরদিন এখানে হনুমান চালিশা পাঠের ব্যবস্থা করো।’
কেহ জিজ্ঞাসা করিল – ‘কেন, মহাশয়?’
তিনি কহিলেন – ‘প্রশ্ন করার অভ্যাসটা খুব বাড়িয়া গিয়াছে।’
গাড়ি চলিয়া গেল। বিরিঞ্চিবাবা কিছুক্ষণ স্থির বসিয়া রহিলেন। তারপর পরমহংসের দিকে তাকাইয়া কহিলেন - ‘চলো।’
‘কোথায়, বাবা?’
‘হিমালয়ে।’
‘কেন?’
বিরিঞ্চিবাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলিইয়া কহিলেন, ‘এই শহরে এখন আমারও নিরাপত্তা নাই। মানুষ যদি প্রশ্ন করিতে শিখিয়া যায়, তবে অলৌকিক ব্যবসার কী হইবে?’
নাগা সন্ন্যাসীরা ইতিমধ্যে বাসের খোঁজ করিতেছে। পাহাড়ের ঠান্ডায় ফিরিবার জন্য তাহাদের আর তর সইতেছে না। কিন্তু যাওয়ার আগে একজন বৃদ্ধ নাগা সন্ন্যাসী পাশের জনকে ফিসফিস করিয়া কহিলেন – ‘ভাই, একটা কথা বুঝিলাম।’
‘কী?’
‘বৈরাগ্য প্রচার করা খুব সহজ।’
‘কীভাবে?’
‘নিজেরটা বাদ দিয়ে।’
এই বলিয়া তাঁহারা হিমালয়ের পথ ধরিলেন।
আর ৪ নম্বর গেটের সামনে তখনও একটি পোস্টার বাতাসে দুলিতেছিল - প্রশ্ন করা নিষেধ।
তার নীচে কেহ পেন্সিল দিয়ে লিখিয়া দিয়াছে - প্রশ্নহীন প্রজা, নিশ্চিন্ত শাসক - তা হবে না।