15/07/2025
#ইচ্ছেডানা……
বিকেল গরিয়ে সন্ধ্যে হতে আর অল্প সময় বাকি। রাত ৮ টায় বিকানির এক্সপ্রেস ট্রেনে টিকিট কাটা আছে সবার। সবাই আজ ফিরে যাবে তাদের নিজ বাসস্থানে। সকাল থেকেই বৃষ্টি পরছে। এখন আর বৃষ্টি নেই। আকাশ পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। এই শীতের রাতে বৃষ্টির জন্য ঠাণ্ডা আজ একটু বেশি। রেল স্টেশনে সবাই যথা সময়ে পৌঁছে গেছে, ট্রেন এখনো প্ল্যাটফর্মে আসেনি। সবুজ আজ একাই দারিয়ে আছে লাগেজ নিয়ে, বাকিরা একসঙ্গে একটু দূরে দারিয়ে অপেক্ষা করছে ট্রেনের জন্য। পাখি আজ আর সবুজের কাছে আসেনি একবারও, একটি বার কথাও বলার চেষ্টা করেনি। বাকি সহপাঠীরাও কেও সবুজের আজ খোজ নেয়নি, অথছ একি বাসে সবাই স্টেশনে এসেছে ট্রেন ধরার জন্য। নির্ধারিত সময়ে সবাই ট্রেনে চেপে বসল। সবুজের সিট আলাদা বার্থে থাকার জন্য সে নিজেকে একটু আরাল করেই রাখল। দুরন্ত গতিতে ট্রেন ছুটছে যেন আজ ট্রেনেরও গতি চঞ্ছল সবুজের মনের মত। হঠাৎ অসিমের আগমন সবুজের পাশেই ওর বার্থ কনফার্ম হয়েছে আর এ সি থেকে।
আসিম ঃ- কি রে সবুজ তুই আজ একা , সবাই তো ওদিকে আছে, খুব মজা করছে একসঙ্গে ।
সবুজ ঃ- (একটু মুচকি হেঁসে), হ্যাঁয় আজ মজা করার দিন, তাই করছে।
আসিম ঃ- তোর বেপারটা কি বল তো, পাখির সঙ্গে কি কোন ঝগড়া হয়েছে?
সবুজ ঃ- না তেমন কিছু না তবে একটা কবিতার লাইন খুব মনে পরছে “ পারলে বরং ঝগড়া করো, কথায় বারুক কথা,/ তর্ক থেকেও কঠিন জেনো ঠাণ্ডা নীরবতা” ।
আসিম ঃ- বুজলাম, মনের গভীরে অসুখ দানা বেধেছে, রাত হয়েছে অনেক শুয়ে পর। কাল সকালে কথা হবে।
ট্রেন হু হু করে দুরুন্ত গতিতে ছুতে চলছে। ট্রেনের কামরার লাইটও সবাই নিভিয়ে দিয়েছে, শুধু জেগে আছে দুই চঞ্চল মন, না হয়তবা একটি চঞ্ছল মন। কিছুক্ষণ পর ট্রেন এলাহাবাদ স্টেশনে থামল। রাত ১:০০ হবে, খুব কম লোকজন ট্রেনে চেপে বসল, হুইসেল দিয়ে ট্রেন আবার চলতে শুরু করল।
“ ইয়ে রাম পিয়ারি কা চায়, আচ্ছা না লাগে তো পায়সা বাপস” হকারের এই আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে গেল। যারা দিল্লি রুটে যাতায়াত করেন, তাদের কাছে হকারের এই মার্কেটিং স্টাইলে চা বিক্রি করা নতুন কিছু নয়। ট্রেন পাটনা স্টেশনে প্রবেশ করেছে। মুখ হাত ধুয়ে সবুজ এবং অসিম প্রাতরাশ সেরে নিল।
আসিম ঃ- আছা সবুজ একটা কথা বল তো, কিছুদিন থেকে লক্ষ করছি , তুই একা একা থাকছিস, সবার থেকে দূরে কি ব্যাপার?
সবুজ ঃ- না তেমন কিছু নয়।
আসিম ঃ- বুজলাম, কিছু বলতে চাইছিস না, কিছুটা অবশই আন্দাজ করতে পারছি। শোন, এখন আমরা সবাই এখানে এসেছি একটা লক্ষ পূরণ করতে, তাই আমাদের ফোকাস সেদিকেই থাকা উচিৎ।
সবুজ ঃ- সেই ফোকাসটাই তো রাখার চেষ্টা করছি, কিন্তু মন কে নিয়ন্ত্রন করা টা কি এত সহজ?
আসিম ঃ- তোকে একটা কথা বলি, পাখি কিন্তু নিজের ফোকাস ঠিক রাখার জন্যই তোর সঙ্গে আর সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়নি। তাই কোন না কোন ছুতো ওর প্রয়োজন ছিল, তোর থেকে দূরে সরে যাওয়ার জন্য, আর সেটাই সে করেছে। তুই যত তারাতারি বুজবি ততই তোর মঙ্গল।
সবুজ ঃ- আমার তো এরকম মনে হছে না।
আসিম ঃ- (একটু মুচকি হেসে), ভালবাসা এরকম জিনিস যে প্রিয়জনের দোষ চোখে পরে না। আমি তোকে বলছি, পাখি নিজের পায়ে দাড়িয়ে তার লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে কিন্তু তুই যদি এখন না বুঝিস , তবে তোকে এর ফল ভুগতে হবে একদিন, তখন আর তোর কছুই করার থাকবে না।
সন্ধে গড়িয়ে রাত হল। হঠাৎ রিয়া এসে হাজির। সে সবুজ কে তার সঙ্গে নিয়ে যেতে চাইল সেই কামরায়, যেখানে পাখি এবং অনান্য বান্ধুরা মিলে একসঙ্গ বসে গল্প করছে। সবুজ রিয়ার সঙ্গে গেল না। ওদিকে পাখি সবার সঙ্গে বসে আনান্দ করছে। ও এই ভেবে সস্তি পাচ্ছে যে, সবুজের সঙ্গে আর কোন সম্পর্কে আবদ্ধ থাকতে হবে না। পাখি খুব ভাল করে বুজতে শিখেছে যে, ওর বাবার স্বপ্ন পুরনে, সবুজের সঙ্গে সম্পর্ক বাঁধা হয়ে দারাতে পারে। তাই সে একপ্রকার ইচ্ছে করেই সবুজের সঙ্গে সম্পর্কের ইতি টেনেছে। ওদিকে সবুজের মনে হতে লাগল যে পাখি ওর সঙ্গে যে ব্যবহার করেছে তা তার কোন মতে প্রাপ্য নয়। তাই সে ঠিক করল, পাখির সঙ্গে গিয়ে ওর সঙ্গে একতরফা সম্পর্ক ভাঙ্গার জবাব চাইবে। সে একাই বুন্ধুদের কাছে গিয়ে হাজির হল। সবুজকে দেখে সব বন্ধুরাই তাদের গল্প হঠাৎ থামিয়ে দিল। যেন মনে হল সবুজ বহিরাগত। সবুজের এই আচরণ খুব ভাল ভাবে নিল না, তা সে পাসের বার্থে গিয়ে বসল। ঠিক ওই সময়, সুবুজের আরেক সহপাঠী দীপক এসে বলল, পাখি তোর সঙ্গে কথা বলতে চায়। আবার পাখি কে গিয়েও দীপক বলল সবুজ তোর সঙ্গে কথা বলতে চায়। দীপকের চেষ্টা করল যে সবুজ আর পাখি যদি নিজেরদের মধ্য ভুল বোঝাবুঝি কথা বলে মিটিয়ে নেয়, তবে একটা সুন্দর সম্পর্ক অটুট থাকে। যাইহোক পাখি এবং সবুজ একসঙ্গে মুখোমুখি বসল। অনেক্ষন কেও কারও সঙ্গে কথা না বলেই কাটিয়ে দেল। সবুজের মনে হল যাই হোক না কেন, আজ পাখির সঙ্গে একটা বোঝাপড়ায় আস্তেই হবে।
সবুজ ঃ- আমি জানি তুই আমার সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখতে ইছুক নোস, তবুও যেহেতু সম্পর্ক তা তুই শুরি করেছিলে এবং শেষ তাও তুই নিজের মর্জিতেই করছিস, আমার একটাই প্রশ্ন, তুই কেন আমার সঙ্গে এই কাজ করলি।
পাখি ঃ- আমার কিছু করার নেই, আমাদের সম্পর্ক বাবা মেনে নেবেন না, আমাকে নিয়ে বাবার অনেক স্বপ্ন, তাই তোর সঙ্গে সম্পর্ক রাখলে আমার অনেক অসুবিধা আছে। আমি জানি যে আমার দিক থেকেই এই সম্পর্কটা শুরু করেছিলাম, কিন্তু আমার এখন মনে হয়েছে, এই সম্পর্ক এখানেই শেষ করা উচিৎ। আমি আমার বাবার কথা ছারা কোন কাজ করিনি, আগামিদিনেও করব না।
সবুজ ঃ- হুম বুজলাম, মানে বিয়ে করবি বাবার কথায়, যে তোর বর হবে তার সঙ্গে কথাও বলবি বাবা বললে, বিয়ের রাতেও বাবার কথায়……………, তাই তো?
পাখি ঃ- (সবুজের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে), কিছুকন চুপ করে থেক, তুই এভাবে আমাকে এই কথা বলতে পারলি?
সবুজ ঃ- বলতে বাধ্য হলাম। আর যাই হোক আমার তোকে বিশ্বাস করাটা খুব ভুল হয়েছে। আমারি ভুল। আর কিছু বলব না , শুধু এই কথাই বলব, তুই সারা জীবন ভাল থাকিস।
সবুজ আর কোন কথা না বারিয়ে অন্য কামরায় চলে গেল। পাখি কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে সবুজের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকল। কিছু সময় পরে, প্রায় ৩৬ ঘণ্টার জার্নি করে ট্রেন গন্তব্যে এসে পোঁছাল। রাত ১০ বেজে ২৫ মিনিট। একে একে সবাই স্টেশনে লাগেজ নিয়ে নামল। সবার বাড়ির লোক এসে অপেক্ষা করছে , সবাই একে একে তাদের বাড়ির লোক দের সঙ্গে চলে গেল। শুধু সবুজ তার লাগেজ নিয়ে একাই তার বাড়ির উদ্দেশ্য পারি দিল মিশ্র মনের অবস্থা নিয়ে যেখানে, একদিকে বাড়ির সবার সঙ্গে অনেকদিন পরে দেখা হবে এই খুশিতে, অন্য দিকে মনের এক অগভীর ব্যথা এবং নিরাশা নেয়ে যেখানে তার প্রিয় “পাখি” বেছে নেল অন্য কোন বাসা।
দূর থেকে একটি গানের কলি ভেসে আসছে…
“বুকের এ খাঁচায় জ্বলুক আগুন,
ভালবাসা সর্বনাশা হায় !
এতদিনে বুঝতে পারি ভাষা,
তোর্ এবার নতুন বাসা চাই।
যা, যা পাখি উড়তে দিলাম তোকে,
যা যা যা, খুঁজে নে অন্য কোনো বাসা।
খুঁজে নে অন্য কোনো মন,
ভুলে যা বন্য ভালবাসা।
যা, যা পাখি উড়তে দিলাম তোকে !”
( ক্রমশ)