22/11/2025
অমর কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের আলোচিত উপন্যাস ** আজ চিত্রার বিয়ে ** এর ধারাবাহিক প্রকাশ 👇
🔯 ১১ 🔯
ফরিদাদের ফ্ল্যাটে বাতি জ্বলছে। লোকজনের কথা শোনা যাচ্ছে। রহমান সাহেব বললেন, তোর বাসায় মনে হয় অনেক লোকজন। ফরিদা ক্ষীণ গলায় বলল, ওর বন্ধুরা এসেছে। তাস খেলছে। ফরিদা কিছুটা নিশ্চিন্ত বোধ করছে। বন্ধুদের সামনে জহির নিশ্চয়ই খুব খারাপ ব্যবহার করবে না। তাছাড়া সঙ্গে তার বড়ভাই আছে। বাবুর জন্যেও ফরিদার একটু দুঃশ্চিন্তা হচ্ছে। বাবু কি বাসায় আছে? ঘুমিয়ে পড়েছে? না-কি জহির বাবুকে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিয়েছে?
ফরিদা ভয়ে ভয়ে কলিং বেল টিপল। একবার, দু'বার তিনবার। চতুর্থবার কলিং বেল টিপতেই জহির বের হয়ে এল। তার পরনে লুঙ্গি। খালি গা। ফরিদার বুক ধক করে উঠল। জহির মদ খেয়েছে। তার চোখ লাল। মদ খেলেই জহিরের চোখ লাল হয়ে যায়। ঠোঁট ফুলে ওঠে। নেশাগ্রস্ত মানুষ কোনো কিছুরই ধার ধারে না। সে কি করবে কে জানে। নোংরা গালি গালাজ না করলেই হয়। মদ খেলেই জহিরের মুখ থেকে কুৎসিত সব গালাগালি বের হয়। বস্তির লোকরা যে ভঙ্গিতে বলে- তোর মাকে এই করি। সেও ঠিক তাই বলে। তাদের চেয়েও খারাপ ভাবে বলে। ফরিদার হাত-পা কাঁপতে লাগল।
জহির কিছুক্ষণ তার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থেকে রহমান সাহেবের দিকে তাকাল। থমথমে গলায় বলল, ভাইজান আপনি এই হারামজাদীকে এখানে নিয়ে এসেছেন কেন?
রহমান সাহেব থতমত খেয়ে গেলেন। জহির বলল, এই কুত্তীকে আমি সজ্ঞানে সুস্থ মস্তিষ্কে তিন তালাক বলেছি। সে এটা আপনাকে বলে নাই?
রহমান সাহেব কি বলবেন বুঝতে পারছেন না। তার সব চিন্তা ভাবনা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। জহির বলল, একে নিয়ে চলে যান। যদি না যান, তাহলে আপনার সামনেই মাগীর পাছায় এক লাথি মেরে তাকে সিঁড়িতে ফেলে দেব।
রহমান সাহেব কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, জহির এইসব তুমি কি বলছ? যা সত্যি তাই বলছি। এক্ষুণি একে নিয়ে বিদায় হন।
রাগের মাথায় তালাক বললে তালাক হয় না।
আপনাকে এতক্ষণ কি বললাম আমি যা বলেছি ঠাণ্ডা মাথায় বলেছি। অনেক বিচার বিবেচনা করে বলেছি। এখন আপনি যান। নয়তো বোনের কারণে আপনি অপমান হবেন।
জহির ঘরে ঢুকে শব্দ করে দরজা বন্ধ করে দিল। রহমান সাহেব কি করবেন বুঝতে পারছেন না। ফরিদাকে নিয়ে নিজের বাড়িতে ফেরা যাবে না। আত্মীয়
স্বজন এমন কেউ নেই যার বাড়িতে তাকে নিয়ে তুলেন।
ফরিদা নিঃশব্দে কাঁদছে। রহমান সাহেবের খুবই মায়া লাগছে। তারচেয়েও বেশি লাগছে ভয়। ফরিদা বলল, ভাইজান এখন কি করব? রহমান সাহেব বললেন, বুঝতে পারছি না।
তোমার কাছে কি টাকা আছে ভাইজান। আমাকে একটা হোটেলে নিয়ে যাও। রাতটা কাটুক। DIN
সত্তর টাকা আছে।
তাহলে চল কমলাপুর রেল স্টেশনে যাই। রেলস্টেশনে রাতটা কাটাই।
আচ্ছা।
আচ্ছা বলে রহমান সাহেব সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করলেন। ফরিদা বলল, কোথায় যাচ্ছ? রহমান সাহেব বললেন, এক প্যাকেট সিগারেট কিনে আনি। তুই একটু দাঁড়া।
আমার খুব পানির পিপাসা হয়েছে। ভাইজান এক বোতল পানি নিয়ে এসো। গলা কেমন শুকিয়ে গেছে।
আচ্ছা পানিও নিয়ে আসব।
রহমান সাহেব সিগারেট কিনলেন। সিগারেট ধরালেন। বড় এক বোতল পানি কিনলেন। ফ্রিজের ঠাণ্ডা পানি। তারপর হাঁটতে শুরু করলেন নিজের বাড়ির দিকে। বোনের কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে না। খালি পেটে সিগারেট খাওয়ার জন্যে তাঁর সামান্য মাথা ঘুরছে। বমি বমি আসছে। তিনি পানির বোতলের মুখ খুলে বোতলের পানির অর্ধেকটা এক টানে শেষ করে ফেললেন। বমি ভাব আরো বাড়ল, তৃষ্ণা মিটল না। তিনি রাস্তার পাশে বসে বমি করলেন।
আগামীকাল মেয়ের এনগেজমেন্ট। সব খাবার দাবারই আসছে বাইরে থেকে। ঘরের কোনো আইটেম না থাকলে খারাপ দেখা যায় বলেই শায়লা কাওনের চালের পায়েস বসিয়েছেন। রান্না বান্নার ঝামেলা আগের রাতেই মিটিয়ে ফেলতে চান। আগামীকাল তিনি রান্না ঘরে ঢুকবেন না। তিনি চিত্রাকে এনে পাশে বসিয়েছেন। চিত্রার দায়িত্ব হল মাঝে মাঝে চামুচ দিয়ে পায়েস নেড়ে দেয়া। পায়েস যেন ধরে না যায়। শায়লা মেয়েকে দিয়ে এই কাজটা ইচ্ছা করেই করাচ্ছেন যাতে বরপক্ষের লোকদের বলতে পারেন- পায়েস রেঁধেছে চিত্রা। প্রসঙ্গ ছাড়া অবশ্যি কথাটা বলা যাবে না। প্রসঙ্গ উঠলে তবেই বলতে হবে। বর পক্ষের কেউ যদি পায়েস মুখে দিয়ে বলে- বাহ্ খেতে ভালো হয়েছে তো তাহলেই তিনি বলবেন, পায়েস রেঁধেছে চিত্রা।
চিত্রা বলল, মা ফুপুকে এত রাতে ফেরত পাঠানো ঠিক হয় নি। বেচারী বিপদে পড়ে তার ভাইয়ের কাছে এসেছে। আমার নিজের কোনো ভাই নেই, তারপরেও আমি বুঝতে পারছি যে কোনো বোনের অধিকার আছে বিপদে পড়লে তার ভাইয়ের কাছে আসা।
শায়লা বিরক্ত মুখে বললেন, এইসব সাজানো বিপদ। দু'দিন পর পর বিপদের কথা বলে উপস্থিত হয়। যখন চলে যায় তখন দেখা যায়- আমার গলার হার নেই, তোর কানের দুল নেই। এই যন্ত্রণা আমার আর সহ্য হয় না। তারচেয়েও বড় কথা তোর ফুপু যদি থেকে যায়- এনগেজমেন্টের অনুষ্ঠানে উল্টাপাল্টা কথা বলে সর্বনাশ করে দেবে। তোর শ্বশুরকেই হয়তো বলবে- জানেন আমার স্বামী আমাকে মাগী ডেকেছে আর গায়ে গরম চা ঢেলে দিয়েছে।
চিত্রা বলল তা অবশ্যি ঠিক। ফুপু ভয়ঙ্কর বোকা। কখন কি বলা উচিত। কাকে কি বলা যায় এর কোনো ধারণাই নেই। আমাকে কি বলছিল জান মা?
কি বলছিল?
না থাক।
মা'র সঙ্গে চিত্রার সব রকম কথা হয়। তারপরেও কিছু কিছু কথা না হওয়াই ভালো।
শায়লা তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, তোর ফুপু কি বলছিল?
এমন কোনো জরুরি কথা না। নারী পুরুষ সম্পর্কের বিষয়ে কিছু কথা যা একজন ফুপু তার ভাইস্তিকে বলতে পারেন না। এবং আমিও তোমাকে বলতে পারব না।
শায়লা রাগী গলায় বললেন, না বলতে চাইলে বলবি না।
চিত্রা বলল, মা তোমার সঙ্গে আরেকটা ব্যাপারে ক্লিয়ার করতে চাই। আমি কিন্তু আগামীকাল গান গাইব না।
তোকে তো গান গাইতে বলছি না।
এখন বলছ না। কিন্তু সময় মতো ঠিকই বলবে। তুমি তবলচিকে খবর দিয়েছ, নিশ্চয়ই দাওয়াত খাবার জন্যে খবর দাও নি।
ওরা শুনতে চাইলে একটা গান করবি। এতে অসুবিধা কি?
না। বিয়ের পর আমি গান ছেড়ে দেব।
কেন?
জানি না কেন? আমার মনে হচ্ছে বিয়ের পর আমার গান করতে ইচ্ছা করবে না।
এ রকম মনে হবার কারণ কি?
জানি না।
শায়লা হঠাৎ বললেন, চিত্রা তোর কি কোনো পছন্দের ছেলে আছে?
চিত্রা পায়েস নাড়া বন্ধ করে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, হ্যাঁ আছে।
শায়লা হতভম্ব হয়ে গেলেন। চিত্রা বলল, এ রকম হতাশ চোখে তাকাবার মতো কোনো কিছু না মা। আমার পছন্দের ছেলে আছে শুনে তোমাকে নার্ভাস হতে হবে না। বিয়ে করার মতো কোনো ছেলে না।
তার মানে কি?
চিত্রা সহজ গলায় বলল, কিছু ছেলে আছে যাদের পছন্দ করা যায় কিন্তু বিয়ে করা যায় না।
তোর কথা কিছুই বুঝতে পারছি না। ঐ ছেলে করে কি?
ঐ ছেলেকে নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না মা। আমি ঐ ছেলের বিষয়ে তোমাকে কোনো কিছু বলব না।
তোর সঙ্গে পড়ে?
চিত্রা জবাব না দিয়ে পায়েসের হাঁড়িতে চামচ নাড়া শুরু করল। শায়লা চিন্তিত মুখে বসে রইলেন। চিত্রাকে এখন কেমন যেন অচেনা লাগছে। কঠিন মেয়ে বলে মনে হচ্ছে।
শায়লা খানিকটা হতাশও বোধ করছেন। তাঁর মেয়ের পছন্দের একজন ছেলে থাকবে। তিনি কখনো তা জানতে পারবেন না, তা কেমন করে হয়?
মীরা রান্নাঘরে ঢুকেছে। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে যে কোনো কারণেই হোক ভয় পেয়েছে। রাত্রে সে হঠাৎ হঠাৎ ভয় পায়। ভূতের ভয়। ভয় পেলেই ছুটে যেখানে লোকজন আছে সেখানে চলে আসে। শায়লা ছোটমেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, কি হয়েছে?
মীরা বলল, বাবা ফিরেছে মা। কি রকম যেন করছে।
কি রকম করছে মানে? মনে হচ্ছে আমাকে চিনতে পারছে না। তুমি একটু আসতো মা।
শায়লা উঠে দাঁড়ালেন। চিত্রাও উঠে দাঁড়াল। শায়লা চুলা থেকে পায়েসের হাঁড়ি নামিয়ে রাখলেন। পায়েস যদি পুড়ে যায় তা হবে অলক্ষণ। বিয়ের পায়েস পুড়ে যাওয়া ভালো কথা না।
রহমান সাহেব তাঁর ঘরে খাটেই বসে আছেন। সিগারেট টানছেন। শায়লা ঘরে ঢুকে বললেন, কি হয়েছে?
রহমান সাহেব বললেন, কিছু হয় নি।
শায়লা বললেন, বোনকে তার বাসায় দিয়ে এসেছ?
রহমান সাহেব বললেন, হ্যাঁ।
কোনো সমস্যা হয় নি?
না।
ঘরের মধ্যে সিগারেটের ছাই ফেলছ কি জন্যে? এসট্রে চোখে পড়ছে না?
রহমান সাহেব উঠে টেবিলের উপর থেকে এসট্রে নিলেন। শায়লা বললেন, সিগারেট ফেলে হাত মুখ ধুয়ে এসে ভাত খাও।
রহমান সাহেব সঙ্গে সঙ্গে হাতের আধ-খাওয়া সিগারেট ফেলে দিলেন। তাঁর কাজ কর্ম খুবই স্বাভাবিক। মীরা এখন বাবার স্বাভাবিক আচার আচরণ দেখে অবাক হচ্ছে। অথচ বাবা একটু আগেই খুব অস্বাভাবিক আচরণ করছিলেন। কলিং বেল শুনে মীরা দরজা খুলল। রহমান সাহেব মেয়ের দিকে তাকিয়ে কাচুমাচু গলায় বললেন, ভেতরে আসব?
মীরা বিস্মিত হয়ে বলল, এইসব কি কথা বাবা? ভেতরে আস।
তিনি ভেতরে ঢুকে বললেন, কিছু মনে করবেন না। এই বাড়ির লোকজন সব কোথায়?
মীরা হতভম্ব গলায় বলল, বাবা তুমি কি বলছ?
তিনি শূন্য দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। মীরা ছুটে গেল রান্না ঘরে। এখন মনে হচ্ছে সবই স্বাভাবিক।
শায়লা রান্নাঘরের দিকে গেলেন। চিত্রা গেল মায়ের সঙ্গে। মীরা এসে বসল বাবার পাশে। মীরা বলল, বাবা সত্যি করে বল তুমি কি আমাকে চিনতে পারছ?
রহমান সাহেব বললেন, পারছি।
বলতো আমি কে?
রহমান সাহেব হাসিমুখে বললেন, তুই মীরা।
বাবা তুমি এমন অদ্ভুত ভাবে হাসছ কেন?
কই হাসছিনা তো।
রহমান সাহেব হাসতে শুরু করলেন। প্রথমে নিঃশব্দে। তারপর গা দুলিয়ে সশব্দে। তার হাসির দমকে খাট পর্যন্ত নড়তে শুরু করেছে। মীরা কাঁপতে কাঁপতে চেঁচিয়ে ডাকল, মা মা।
শায়লা বানু আবার ঘরে ঢুকলেন। বিরক্ত মুখে বললেন, কি হয়েছে?
মীরা বলল, বাবা যেন কি রকম করে হাসছে। শায়লা স্বামীর দিকে তাকালেন রহমান সাহেবের হাসি বন্ধ হয়েছে। তিনি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসে আছেন। শায়লা বললেন, বসে আছ কেন? তোমাকে হাত মুখ ধুয়ে খেতে আসতে বললাম না।
রহমান সাহেব বললেন, আসছি।
আসছি না। এখন আস।
রহমান সাহেব বাধ্য ছেলের মতো উঠে দাঁড়ালেন। শায়লা বললেন, আগামীকাল বিকেলে তোমার মেয়ের এনগেজমেন্ট এটা মনে আছে তো?
রহমান সাহেব বললেন, কার এনগেজমেন্ট?
কার এনগেজমেন্ট মানে? তুমি কি আমার সঙ্গে রসিকতা করার চেষ্টা করছ? আমি নানান যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে আছি। আর যন্ত্রণা বাড়াবে না। তোমার সমস্যা কি?
মাথা ব্যথা করছে।
ভাত খেয়ে মাথা ব্যথার দু'টা ট্যাবলেই খেয়ে ঘুমতে যাও।
আচ্ছা।
আগামীকাল অফিসে যাবার দরকার নেই। বাড়িতে নানান কাজকর্ম।
আচ্ছা।
বরপক্ষের লোকজনদের সঙ্গে তুমি আগবাড়িয়ে কথা বলতে যাবে না। চুপচাপ বসে থাকবে।
আচ্ছা।
ওরা কোনো প্রশ্ন করলে অল্প কথায় জবাব দেবে। দুনিয়ার ইতিহাস বলা শুরু করবে না।
আচ্ছা।
তোমার অফিসের কেউ কি আসবে?
রহমান সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, কোথায় আসবে?
শায়লা বানু তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইলেন। তিনি অনেক যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। বাড়তি যন্ত্রণা নিতে পারছেন না। তাঁর খুবই বিরক্ত লাগছে। তিনি