Bangla Natok

Bangla Natok বাংলাদেশের জনপ্রিয় নাটকের মজার ক্লিপ ও বিভিন্ন ফানি ভিডিও এই পেইজে পাওয়া যাবে। ফলো করে পাশেই থাকুন ।

29/08/2026

হুমায়ূন আহমেদের আত্মজীবনী মূলক লেখা ''হোটেল গ্রেভার ইন'' বই থেকে মজার মজার স্মৃতিচারণ
****************************************************

''ডানবার হলের জীবন''
-----------------------
নর্থ ডাকোটা ইউনিভার্সিটির ক্লাসগুলো যেখানে হয় তার নাম ডানবার হল। ডানবার হলের তেত্রিশ নম্বর কক্ষে ক্লাস শুরু হল। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ক্লাস।
কোর্স নাম্বার ৫২৯।
কোর্স নাম্বারগুলি সম্পর্কে সামান্য ধারণা দিয়ে নেই। টু হানড্রেড লেভেলের কোর্স হচ্ছে আণ্ডার-গ্রাজুয়েটের নিচের দিকের ছাত্রদের জন্যে। খ্রী হানড্রেড লেভেল হচ্ছে আণ্ডার-গ্রাজুয়েটের উপরের দিকের ছাত্রদের জন্যে। ফোর হানড্রেড এবং ফাইভ হানড্রেড লেভেল হচ্ছে গ্রাজুয়েট লেভেল।
ফাইভ হানড্রেড লেভেলের যে কোর্সটি আমি নিলাম সে সম্পর্কে আমার তেমন কোন ধারণা ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অল্প কিছু কোয়ান্টাম মেকানিক্স পড়েছি। একেবারে কিছুই যে জানি না তাও না। তবে এই বিষয়ে আমার বিদ্যা খুবই ভাসাভাসা। জলের উপর ওড়াউড়ি, জল স্পর্শ করা নয়।
একাডেমিক বিষয়ে নিজের মেধা এবং বুদ্ধির উপর আমার আস্থাও ছিল সীমাহীন। রসায়নের একটি বিষয় আমি পড়ে বুঝতে পারব না, তা হতেই পারে না।
আমাদের কোর্স কো-অর্ডিনেটর আমাকে বললেন, ফাইভ হানড্রেড লেভেলের এই কোর্সটি যে তুমি নিচ্ছ, ভুল করছ না তো? পারবে?
আমি বললাম, ইয়েস।
তখনো ইয়েস এবং নো-র বাইরে তেমন কিছু বলা রপ্ত হয়নি। কোর্স কো-অর্ডিনেটর বললেন, এই কোর্সে ঢুকবার আগে কিন্তু ফোর হানড্রেড লেভেলের কোর্স শেষ করনি। ভাল করে ভেবে দেখ, পারবে?
: ইয়েস।
কোর্স কো-অর্ডিনেটরের মুখ দেখে মনে হল তিনি আমার ইয়েস শুনেও বিশেষ ভরসা পাচ্ছেন না।
ক্লাস শুরু হল। ছাত্র সংখ্যা পনেরো। বিদেশী বলতে আমি এবং ইণ্ডিয়ান এক মেয়ে-কান্তা। ছাত্রদের মধ্যে, একজন অন্ধ ছাত্রকে দেখে চমকে উঠলাম। সে তার ব্রেইলি টাইপ রাইটার নিয়ে এসেছে। ক্লাসে ঢুকেই সে বিনীত ভঙ্গিতে বলল, আমি বক্তৃতা টাইপ করব। খটখট শব্দ হবে, এ জন্যে আমি ক্ষমা চাচ্ছি। আমি হতভম্ব। অন্ধ ছাত্রর। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে এটা আমি জানি। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও কিছু অন্ধ ছাত্র-ছাত্রী আছে, তবে তাদের বিষয় হচ্ছে সাহিত্য, ইতিহাস, সমাজবিদ্যা বা দর্শন। কিন্তু থিওরিটিক্যাল কেমিস্ট্রিও কেউ পড়তে আসে আমার জানা ছিল না।
আমাদের কোর্স টিচারের নাম, মার্ক গর্ডন। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মস্তান লোক। থিওরিটিক্যাল কেমিস্ট্রির লোকজন তাঁর নাম শুনলে চোখ কপালে তুলে ফেলে। তাঁর খ্যাতি প্রবাদের পর্যায়ে চলে গেছে।
লোকটি অসম্ভব রোগা এবং তালগাছের মত লম্বা। মুখ ভর্তি প্রকাণ্ড গোঁফ। ইউনিভার্সিটিতে আসেন ভালুকের মত বড় একটা কুকুরকে সঙ্গে নিয়ে। তিনি যখন ক্লাসে যান কুকুরটা তাঁর চেয়ারে পা তুলে বসে থাকে।
মার্ক গর্ডন ক্লাসে ঢুকলেন একটা টি শার্ট গায়ে দিয়ে। সেই টি শার্টে যা লেখা, তার বঙ্গানুবাদ হল, সুন্দরী মেয়েরা আমাকে ভালবাসা দাও।
ক্লাসে ঢুকেই সবার নামধাম জিজ্ঞেস করলেন। সবাই বসে বসে উত্তর দিল। একমাত্র আমি দাঁড়িয়ে জবাব দিলাম। মার্ক গর্ডন বিস্মিত হয়ে বললেন, তুমি দাঁড়িয়ে কথা বলছ কেন? বসে কথা বলতে কি তোমার অসুবিধা হয়?
আমি জবাব দেবার আগেই কান্তা বলল, এটা হচ্ছে ভারতীয় ভদ্রতা।
মার্ক গর্ডন বললেন, হুমায়ূন তুমি কি ভারতীয়?
: না। আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি।
: ও আচ্ছা, আচ্ছা। বাংলাদেশ। বস। এর পর থেকে বসে বসে কথা বলবে।
আমি বসলাম। মানুষটাকে ভাল লাগল এই কারণে যে সে শুদ্ধভাবে আমার নাম উচ্চারণ করেছে। অধিকাংশ আমেরিকান যা পারে না কিংবা শুদ্ধ উচ্চারণের চেষ্টা করে না। আমাকে যে সব নামে ডাকা হয় তার কয়েকটি হচ্ছে: হামায়ান, হিউমেন, হেমীন।
মার্ক গর্ডন টেবিলে পা তুলে বসলেন এবং বললেন, ক্লাস শুরু করার আগে একটা জোক বলা যাক। আমি আবার ডাটি জোক ছাড়া অন্য কিছু জানি না। যারা ডার্টি জোক শুনতে চাও না, তারা দয়া করে কান বন্ধ করে ফেল।
গল্পটি হচ্ছে এক ফরাসী তরুণীকে নিয়ে যার একটি স্তন বড় অন্যটি ছোট। বিয়ের রাতে তার স্বামী ...
গল্পটি চমৎকার, তবে এ দেশে তা আমার পক্ষে লেখা সম্ভব না বলে শুধু শুরুটা বললাম। গল্প শেষ হবার পর হাসি থামতে পাঁচ মিনিটের মত লাগল। শুধু কান্তা হাসল না, মুখ লাল করে বসে রইল। যেন পুরো রসিকতাটা তাকে নিয়েই করা হয়েছে।
মার্ক গর্ডন লেকচার শুরু করলেন। ক্লাসের উপর দিয়ে একটা ঝড় বয়ে গেল। বক্তৃতার শেষে তিনি বললেন, সহজ ব্যাপারগুলি নিয়ে আজ কথা বললাম, প্রথম ক্লাস তো তাই।
আমি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাম। কিচ্ছু বুঝতে পারিনি। তিনি ব্যবহার করছেন গ্রুপ থিওরী, যে গ্রুপ থিওরীর আমি কিছুই জানি না।
আমি আমার পাশে বসে থাকা আমেরিকান ছাত্রটিকে বললাম, তুমি কি কিছু বুঝতে পারলে?
সে বিস্মিত হয়ে বলল, কেন বুঝব না, এসব তো খুবই এলিমেন্টারি ব্যাপার।
এক সপ্তাহ চলে গেল। ক্লাসে যাই, মার্ক গর্ডনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। কিচ্ছু বুঝতে পারি না। নিজের মেধা এবং বুদ্ধির উপর যে আস্থা ছিল তা ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। কোয়ান্টাম মেকানিক্স-এ প্রচুর বই জোগাড় করলাম। রাত দিন। পড়ি। কোন লাভ হয় না। এই জিনিস বোঝার জন্য ক্যালকুলাসের যে জ্ঞান দরকার তা আমার নেই। আমার ইনসমনিয়ার মত হয়ে গেল। ঘুমুতে পারি না। গ্রেভার ইনের লবিতে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকি। মনে মনে বলি-কী সর্বনাশ!
আমার পাশের ঘরের বৃদ্ধা আমাকে প্রায়ই জিজ্ঞেস করে, তোমার কি হয়েছে বলতো? তুমি কি অসুস্থ? স্ত্রীর চিঠি পাচ্ছ না?
দেখতে দেখতে মিড-টার্ম পরীক্ষা এসে গেল। পরীক্ষার পর পর যে লজ্জার সম্মুখীন হতে হবে তা ভেবে হাত-পা পেটের ভেতর ঢুকে যাবার জোগাড় হল। মার্ক গর্ডন যখন দেখবে বাংলাদেশের এই ছেলে পরীক্ষার খাতায় কিছুই লেখেনি তখন তিনি কি ভাববেন? ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যানই বা কী ভাববেন?
এই চেয়ারম্যানকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সভাপতি প্রফেসর আলি নওয়াব আমার প্রসঙ্গে একটি চিঠিতে লিখেছেন-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ যে অল্প সংখ্যক অসাধারণ মেধাবী ছাত্র তেরি করেছে, হুমায়ূন আহমেদ তাদের অন্যতম।
অসাধারণ মেধাবী ছাত্রটি যখন শূন্য পাবে তখন কী হবে? রাতে ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম।
মিড-টার্ম পরীক্ষায় বসলাম। সব মিলিয়ে দশটি প্রশ্ন।
এক ঘন্টা সময়ে প্রতিটির উত্তর করতে হবে। আমি দেখলাম একটি প্রশ্নের অংশবিশেষের উত্তর আমি জানি, আর কিছুই জানি না। অংশবিশেষের উত্তর। লেখার কোন মানে হয় না। আমি মাথা নিচু করে বসে রইলাম। এক ঘন্টা পর সাদা খাতা জমা দিয়ে বের হয়ে এলাম।
পরদিনই রেজাল্ট হল। এ-তো আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয় যে পনেরোটি খাতা দেখতে পনেরো মাস লাগবে।
তিনজন এ পেয়েছে। ছ'জন বি। বাকি সব সি। বাংলাদেশের হুমায়ূন আহমেদ পেয়েছে শূন্য। সবচে বেশি নম্বর পেয়েছে অন্ধ ছাত্রটি। [এ ছেলেটির নাম আমার মনে পড়ছে না। তার নামটা মনে রাখা উচিত ছিল।]
মার্ক গর্ডন আমাকে ডেকে পাঠালেন। বিস্মিত গলায় বললেন, ব্যাপারটা কী বলতো?
আমি বললাম, কোয়ান্টাম মেকানিক্সে আমার কোন ব্যাকগ্রাউণ্ড ছিল না। এই হায়ার লেভেলের কোর্স আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
: বুঝতে পারছ না তাহলে ছেড়ে দিচ্ছ না কেন? ঝুলে থাকার মানে কি?
: আমি ছাড়তে চাই না।
: তুমি বোকামি করছ। তোমরা গ্রেড যদি খারাপ হয়, যদি গড় গ্রেড সি চলে আসে তাহলে তোমাকে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে যেতে হবে। গ্রাজুয়েট কোর্সের এ-ই নিয়ম।
: এই নিয়ম আমি জানি।
: জেনেও তুমি এই কোর্সটা চালিয়ে যাবে?
: হ্যাঁ।
: তুমি খুবই নির্বোধের মত কথা বলছ।
: হয়ত বলছি। কিন্তু আমি কোর্সটা ছাড়ব না।
: কারণটা বল।
: একজন অন্ধ ছাত্র যদি এই কোর্সে সবচে বেশি নম্বর পেতে পারে আমি পারব না কেন? আমার তো চোখ আছে।
তুমি আবারো নির্বোধের মত কথা বলছ। সে অন্ধ হতে পারে কিন্তু তার এই বিষয়ে চমৎকার ব্যাকগ্রাউণ্ড আছে। সে আগের কোর্স সবগুলি করেছে। তুমি করনি। তুমি আমার উপদেশ শোন। এই কোর্স ছেড়ে দাও।
ঃ না।
আমি ছাড়লাম না। নিজে নিজে অংক শিখলাম। গ্রুপ থিওরী শিখলাম, অপারেটর এলজেব্রা শিখলাম। মানুষের অসাধ্য কিছু নেই এই প্রবাদটি সম্ভবত ভুল নয়। এক সময় অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম কোয়ান্টাম মেকানিক্স বুঝতে শুরু করেছি।
ফাইন্যাল পরীক্ষায় যখন বসলাম তখন আমি জানি আমাকে আটকানোর কোন পথ নেই। পরীক্ষা হয়ে গেল। পরদিন মার্ক গর্ডন একটি চিঠি লিখে আমার মেইল বক্সে রেখে দিলেন। টাইপ করা একটা সংক্ষিপ্ত চিঠি, যার বিষয়বস্তু হচ্ছে:
-তুমি যদি আমার সঙ্গে থিওরিটিক্যাল কেমিস্ট্রিতে কাজ কর তাহলে আমি আনন্দিত হব এবং তোমার জন্যে আমি একটি ফেলোশীপ ব্যবস্থা করে দেব।
তোমাকে আর কষ্ট করে টিচিং অ্যাসিসটেন্টশীপ করতে হবে না।
একটি পরীক্ষা দিয়েই আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচিত হয়ে গেলাম।
বিভাগীয় চেয়ারম্যান নিজের উদ্যোগে ব্যবস্থা করে দিলেন যেন আমি আমার স্ত্রীকে আমেরিকায় নিয়ে আসতে পারি।
পরীক্ষায় কত পেয়েছিলাম তা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। পাঠক-পাঠিকারা আমার এই লোভ ক্ষমার চোখে দেখবেন বলে আশা করি। আমি পেয়েছিলাম ১০০তে ১০০।
বর্তমানে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রি। পড়াই। ক্লাসের শুরুতে ছাত্রদের এই গল্পটি বলি। শ্রদ্ধা নিবেদন করি ঐ অন্ধ ছাত্রটির প্রতি, যার কারণে আমার পক্ষে এই অসম্ভব সম্ভব হয়েছিল।
আরেকটি কথা, আমি কিন্তু মার্ক গর্ডনের সঙ্গে কাজ করতে রাজি হইনি। এই বিষয়টি নিয়ে আর কষ্ট করতে ইচ্ছা করছিল না, তাছাড়া আমার খানিকটা কুকুর-ভীতি আছে। মার্ক গর্ডনের ভালুকের মত কুকুরটিকে পাশে নিয়ে কাজ করার প্রশ্নই উঠে না।

22/11/2025

অমর কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের আলোচিত উপন্যাস ** আজ চিত্রার বিয়ে ** এর ধারাবাহিক প্রকাশ 👇
🔯 ১১ 🔯

ফরিদাদের ফ্ল্যাটে বাতি জ্বলছে। লোকজনের কথা শোনা যাচ্ছে। রহমান সাহেব বললেন, তোর বাসায় মনে হয় অনেক লোকজন। ফরিদা ক্ষীণ গলায় বলল, ওর বন্ধুরা এসেছে। তাস খেলছে। ফরিদা কিছুটা নিশ্চিন্ত বোধ করছে। বন্ধুদের সামনে জহির নিশ্চয়ই খুব খারাপ ব্যবহার করবে না। তাছাড়া সঙ্গে তার বড়ভাই আছে। বাবুর জন্যেও ফরিদার একটু দুঃশ্চিন্তা হচ্ছে। বাবু কি বাসায় আছে? ঘুমিয়ে পড়েছে? না-কি জহির বাবুকে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিয়েছে?
ফরিদা ভয়ে ভয়ে কলিং বেল টিপল। একবার, দু'বার তিনবার। চতুর্থবার কলিং বেল টিপতেই জহির বের হয়ে এল। তার পরনে লুঙ্গি। খালি গা। ফরিদার বুক ধক করে উঠল। জহির মদ খেয়েছে। তার চোখ লাল। মদ খেলেই জহিরের চোখ লাল হয়ে যায়। ঠোঁট ফুলে ওঠে। নেশাগ্রস্ত মানুষ কোনো কিছুরই ধার ধারে না। সে কি করবে কে জানে। নোংরা গালি গালাজ না করলেই হয়। মদ খেলেই জহিরের মুখ থেকে কুৎসিত সব গালাগালি বের হয়। বস্তির লোকরা যে ভঙ্গিতে বলে- তোর মাকে এই করি। সেও ঠিক তাই বলে। তাদের চেয়েও খারাপ ভাবে বলে। ফরিদার হাত-পা কাঁপতে লাগল।
জহির কিছুক্ষণ তার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থেকে রহমান সাহেবের দিকে তাকাল। থমথমে গলায় বলল, ভাইজান আপনি এই হারামজাদীকে এখানে নিয়ে এসেছেন কেন?
রহমান সাহেব থতমত খেয়ে গেলেন। জহির বলল, এই কুত্তীকে আমি সজ্ঞানে সুস্থ মস্তিষ্কে তিন তালাক বলেছি। সে এটা আপনাকে বলে নাই?
রহমান সাহেব কি বলবেন বুঝতে পারছেন না। তার সব চিন্তা ভাবনা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। জহির বলল, একে নিয়ে চলে যান। যদি না যান, তাহলে আপনার সামনেই মাগীর পাছায় এক লাথি মেরে তাকে সিঁড়িতে ফেলে দেব।
রহমান সাহেব কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, জহির এইসব তুমি কি বলছ? যা সত্যি তাই বলছি। এক্ষুণি একে নিয়ে বিদায় হন।
রাগের মাথায় তালাক বললে তালাক হয় না।
আপনাকে এতক্ষণ কি বললাম আমি যা বলেছি ঠাণ্ডা মাথায় বলেছি। অনেক বিচার বিবেচনা করে বলেছি। এখন আপনি যান। নয়তো বোনের কারণে আপনি অপমান হবেন।
জহির ঘরে ঢুকে শব্দ করে দরজা বন্ধ করে দিল। রহমান সাহেব কি করবেন বুঝতে পারছেন না। ফরিদাকে নিয়ে নিজের বাড়িতে ফেরা যাবে না। আত্মীয়
স্বজন এমন কেউ নেই যার বাড়িতে তাকে নিয়ে তুলেন।
ফরিদা নিঃশব্দে কাঁদছে। রহমান সাহেবের খুবই মায়া লাগছে। তারচেয়েও বেশি লাগছে ভয়। ফরিদা বলল, ভাইজান এখন কি করব? রহমান সাহেব বললেন, বুঝতে পারছি না।
তোমার কাছে কি টাকা আছে ভাইজান। আমাকে একটা হোটেলে নিয়ে যাও। রাতটা কাটুক। DIN
সত্তর টাকা আছে।
তাহলে চল কমলাপুর রেল স্টেশনে যাই। রেলস্টেশনে রাতটা কাটাই।
আচ্ছা।
আচ্ছা বলে রহমান সাহেব সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করলেন। ফরিদা বলল, কোথায় যাচ্ছ? রহমান সাহেব বললেন, এক প্যাকেট সিগারেট কিনে আনি। তুই একটু দাঁড়া।
আমার খুব পানির পিপাসা হয়েছে। ভাইজান এক বোতল পানি নিয়ে এসো। গলা কেমন শুকিয়ে গেছে।
আচ্ছা পানিও নিয়ে আসব।
রহমান সাহেব সিগারেট কিনলেন। সিগারেট ধরালেন। বড় এক বোতল পানি কিনলেন। ফ্রিজের ঠাণ্ডা পানি। তারপর হাঁটতে শুরু করলেন নিজের বাড়ির দিকে। বোনের কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে না। খালি পেটে সিগারেট খাওয়ার জন্যে তাঁর সামান্য মাথা ঘুরছে। বমি বমি আসছে। তিনি পানির বোতলের মুখ খুলে বোতলের পানির অর্ধেকটা এক টানে শেষ করে ফেললেন। বমি ভাব আরো বাড়ল, তৃষ্ণা মিটল না। তিনি রাস্তার পাশে বসে বমি করলেন।
আগামীকাল মেয়ের এনগেজমেন্ট। সব খাবার দাবারই আসছে বাইরে থেকে। ঘরের কোনো আইটেম না থাকলে খারাপ দেখা যায় বলেই শায়লা কাওনের চালের পায়েস বসিয়েছেন। রান্না বান্নার ঝামেলা আগের রাতেই মিটিয়ে ফেলতে চান। আগামীকাল তিনি রান্না ঘরে ঢুকবেন না। তিনি চিত্রাকে এনে পাশে বসিয়েছেন। চিত্রার দায়িত্ব হল মাঝে মাঝে চামুচ দিয়ে পায়েস নেড়ে দেয়া। পায়েস যেন ধরে না যায়। শায়লা মেয়েকে দিয়ে এই কাজটা ইচ্ছা করেই করাচ্ছেন যাতে বরপক্ষের লোকদের বলতে পারেন- পায়েস রেঁধেছে চিত্রা। প্রসঙ্গ ছাড়া অবশ্যি কথাটা বলা যাবে না। প্রসঙ্গ উঠলে তবেই বলতে হবে। বর পক্ষের কেউ যদি পায়েস মুখে দিয়ে বলে- বাহ্ খেতে ভালো হয়েছে তো তাহলেই তিনি বলবেন, পায়েস রেঁধেছে চিত্রা।
চিত্রা বলল, মা ফুপুকে এত রাতে ফেরত পাঠানো ঠিক হয় নি। বেচারী বিপদে পড়ে তার ভাইয়ের কাছে এসেছে। আমার নিজের কোনো ভাই নেই, তারপরেও আমি বুঝতে পারছি যে কোনো বোনের অধিকার আছে বিপদে পড়লে তার ভাইয়ের কাছে আসা।
শায়লা বিরক্ত মুখে বললেন, এইসব সাজানো বিপদ। দু'দিন পর পর বিপদের কথা বলে উপস্থিত হয়। যখন চলে যায় তখন দেখা যায়- আমার গলার হার নেই, তোর কানের দুল নেই। এই যন্ত্রণা আমার আর সহ্য হয় না। তারচেয়েও বড় কথা তোর ফুপু যদি থেকে যায়- এনগেজমেন্টের অনুষ্ঠানে উল্টাপাল্টা কথা বলে সর্বনাশ করে দেবে। তোর শ্বশুরকেই হয়তো বলবে- জানেন আমার স্বামী আমাকে মাগী ডেকেছে আর গায়ে গরম চা ঢেলে দিয়েছে।
চিত্রা বলল তা অবশ্যি ঠিক। ফুপু ভয়ঙ্কর বোকা। কখন কি বলা উচিত। কাকে কি বলা যায় এর কোনো ধারণাই নেই। আমাকে কি বলছিল জান মা?
কি বলছিল?
না থাক।
মা'র সঙ্গে চিত্রার সব রকম কথা হয়। তারপরেও কিছু কিছু কথা না হওয়াই ভালো।
শায়লা তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, তোর ফুপু কি বলছিল?
এমন কোনো জরুরি কথা না। নারী পুরুষ সম্পর্কের বিষয়ে কিছু কথা যা একজন ফুপু তার ভাইস্তিকে বলতে পারেন না। এবং আমিও তোমাকে বলতে পারব না।
শায়লা রাগী গলায় বললেন, না বলতে চাইলে বলবি না।
চিত্রা বলল, মা তোমার সঙ্গে আরেকটা ব্যাপারে ক্লিয়ার করতে চাই। আমি কিন্তু আগামীকাল গান গাইব না।
তোকে তো গান গাইতে বলছি না।
এখন বলছ না। কিন্তু সময় মতো ঠিকই বলবে। তুমি তবলচিকে খবর দিয়েছ, নিশ্চয়ই দাওয়াত খাবার জন্যে খবর দাও নি।
ওরা শুনতে চাইলে একটা গান করবি। এতে অসুবিধা কি?
না। বিয়ের পর আমি গান ছেড়ে দেব।
কেন?
জানি না কেন? আমার মনে হচ্ছে বিয়ের পর আমার গান করতে ইচ্ছা করবে না।
এ রকম মনে হবার কারণ কি?
জানি না।
শায়লা হঠাৎ বললেন, চিত্রা তোর কি কোনো পছন্দের ছেলে আছে?
চিত্রা পায়েস নাড়া বন্ধ করে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, হ্যাঁ আছে।
শায়লা হতভম্ব হয়ে গেলেন। চিত্রা বলল, এ রকম হতাশ চোখে তাকাবার মতো কোনো কিছু না মা। আমার পছন্দের ছেলে আছে শুনে তোমাকে নার্ভাস হতে হবে না। বিয়ে করার মতো কোনো ছেলে না।
তার মানে কি?
চিত্রা সহজ গলায় বলল, কিছু ছেলে আছে যাদের পছন্দ করা যায় কিন্তু বিয়ে করা যায় না।
তোর কথা কিছুই বুঝতে পারছি না। ঐ ছেলে করে কি?
ঐ ছেলেকে নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না মা। আমি ঐ ছেলের বিষয়ে তোমাকে কোনো কিছু বলব না।
তোর সঙ্গে পড়ে?
চিত্রা জবাব না দিয়ে পায়েসের হাঁড়িতে চামচ নাড়া শুরু করল। শায়লা চিন্তিত মুখে বসে রইলেন। চিত্রাকে এখন কেমন যেন অচেনা লাগছে। কঠিন মেয়ে বলে মনে হচ্ছে।
শায়লা খানিকটা হতাশও বোধ করছেন। তাঁর মেয়ের পছন্দের একজন ছেলে থাকবে। তিনি কখনো তা জানতে পারবেন না, তা কেমন করে হয়?
মীরা রান্নাঘরে ঢুকেছে। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে যে কোনো কারণেই হোক ভয় পেয়েছে। রাত্রে সে হঠাৎ হঠাৎ ভয় পায়। ভূতের ভয়। ভয় পেলেই ছুটে যেখানে লোকজন আছে সেখানে চলে আসে। শায়লা ছোটমেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, কি হয়েছে?
মীরা বলল, বাবা ফিরেছে মা। কি রকম যেন করছে।
কি রকম করছে মানে? মনে হচ্ছে আমাকে চিনতে পারছে না। তুমি একটু আসতো মা।
শায়লা উঠে দাঁড়ালেন। চিত্রাও উঠে দাঁড়াল। শায়লা চুলা থেকে পায়েসের হাঁড়ি নামিয়ে রাখলেন। পায়েস যদি পুড়ে যায় তা হবে অলক্ষণ। বিয়ের পায়েস পুড়ে যাওয়া ভালো কথা না।
রহমান সাহেব তাঁর ঘরে খাটেই বসে আছেন। সিগারেট টানছেন। শায়লা ঘরে ঢুকে বললেন, কি হয়েছে?
রহমান সাহেব বললেন, কিছু হয় নি।
শায়লা বললেন, বোনকে তার বাসায় দিয়ে এসেছ?
রহমান সাহেব বললেন, হ্যাঁ।
কোনো সমস্যা হয় নি?
না।
ঘরের মধ্যে সিগারেটের ছাই ফেলছ কি জন্যে? এসট্রে চোখে পড়ছে না?
রহমান সাহেব উঠে টেবিলের উপর থেকে এসট্রে নিলেন। শায়লা বললেন, সিগারেট ফেলে হাত মুখ ধুয়ে এসে ভাত খাও।
রহমান সাহেব সঙ্গে সঙ্গে হাতের আধ-খাওয়া সিগারেট ফেলে দিলেন। তাঁর কাজ কর্ম খুবই স্বাভাবিক। মীরা এখন বাবার স্বাভাবিক আচার আচরণ দেখে অবাক হচ্ছে। অথচ বাবা একটু আগেই খুব অস্বাভাবিক আচরণ করছিলেন। কলিং বেল শুনে মীরা দরজা খুলল। রহমান সাহেব মেয়ের দিকে তাকিয়ে কাচুমাচু গলায় বললেন, ভেতরে আসব?
মীরা বিস্মিত হয়ে বলল, এইসব কি কথা বাবা? ভেতরে আস।
তিনি ভেতরে ঢুকে বললেন, কিছু মনে করবেন না। এই বাড়ির লোকজন সব কোথায়?
মীরা হতভম্ব গলায় বলল, বাবা তুমি কি বলছ?
তিনি শূন্য দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। মীরা ছুটে গেল রান্না ঘরে। এখন মনে হচ্ছে সবই স্বাভাবিক।
শায়লা রান্নাঘরের দিকে গেলেন। চিত্রা গেল মায়ের সঙ্গে। মীরা এসে বসল বাবার পাশে। মীরা বলল, বাবা সত্যি করে বল তুমি কি আমাকে চিনতে পারছ?
রহমান সাহেব বললেন, পারছি।
বলতো আমি কে?
রহমান সাহেব হাসিমুখে বললেন, তুই মীরা।
বাবা তুমি এমন অদ্ভুত ভাবে হাসছ কেন?
কই হাসছিনা তো।
রহমান সাহেব হাসতে শুরু করলেন। প্রথমে নিঃশব্দে। তারপর গা দুলিয়ে সশব্দে। তার হাসির দমকে খাট পর্যন্ত নড়তে শুরু করেছে। মীরা কাঁপতে কাঁপতে চেঁচিয়ে ডাকল, মা মা।
শায়লা বানু আবার ঘরে ঢুকলেন। বিরক্ত মুখে বললেন, কি হয়েছে?
মীরা বলল, বাবা যেন কি রকম করে হাসছে। শায়লা স্বামীর দিকে তাকালেন রহমান সাহেবের হাসি বন্ধ হয়েছে। তিনি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসে আছেন। শায়লা বললেন, বসে আছ কেন? তোমাকে হাত মুখ ধুয়ে খেতে আসতে বললাম না।
রহমান সাহেব বললেন, আসছি।
আসছি না। এখন আস।
রহমান সাহেব বাধ্য ছেলের মতো উঠে দাঁড়ালেন। শায়লা বললেন, আগামীকাল বিকেলে তোমার মেয়ের এনগেজমেন্ট এটা মনে আছে তো?
রহমান সাহেব বললেন, কার এনগেজমেন্ট?
কার এনগেজমেন্ট মানে? তুমি কি আমার সঙ্গে রসিকতা করার চেষ্টা করছ? আমি নানান যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে আছি। আর যন্ত্রণা বাড়াবে না। তোমার সমস্যা কি?
মাথা ব্যথা করছে।
ভাত খেয়ে মাথা ব্যথার দু'টা ট্যাবলেই খেয়ে ঘুমতে যাও।
আচ্ছা।
আগামীকাল অফিসে যাবার দরকার নেই। বাড়িতে নানান কাজকর্ম।
আচ্ছা।
বরপক্ষের লোকজনদের সঙ্গে তুমি আগবাড়িয়ে কথা বলতে যাবে না। চুপচাপ বসে থাকবে।
আচ্ছা।
ওরা কোনো প্রশ্ন করলে অল্প কথায় জবাব দেবে। দুনিয়ার ইতিহাস বলা শুরু করবে না।
আচ্ছা।
তোমার অফিসের কেউ কি আসবে?
রহমান সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, কোথায় আসবে?
শায়লা বানু তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইলেন। তিনি অনেক যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। বাড়তি যন্ত্রণা নিতে পারছেন না। তাঁর খুবই বিরক্ত লাগছে। তিনি

আজ চিত্রার বিয়ে 💜
14/11/2025

আজ চিত্রার বিয়ে 💜

অমর কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের আলোচিত উপন্যাস ** আজ চিত্রার বিয়ে ** এর ধারাবাহিক প্রকাশ 👇
🔯 ৯ 🔯

চিন্তায় হিসাব রাখতে পারল না। ফরিদা বলতে গেলে তার চোখের সামনে থেকে কানের টব সরিয়ে ফেলল, লোকটা বুঝতেই পারল না।
দু' হাজার টাকা ফরিদা অতি দ্রুত খরচ করে ফেলল। এনগেজমেন্টের দিন চিত্রাকে উপহার দেবার জন্যে সাতশ টাকা দিয়ে হালকা গোলাপি রঙের একটা শাড়ি কিনল। একটা টি সেট কিনল। জহিরের জন্যে দু'টা স্ট্রাইপ দেয়া সার্ট কিনল। বাবুর জন্যে ফুটবল। বাবু কয়েকদিন ধরেই পোলাও খেতে চাচ্ছিল। ফরিদা কাঁচাবাজার থেকে পোলাও-এর চাল, মুরগি, কিনল। তারপরও তার হাতে দেড়শ টাকা রইল। এই টাকাটাও সে খরচ করে ফেলত কিন্তু বাবুর স্কুল ছুটি হয়ে যাবে। তাকে আনতে যেতে হবে।
বিকেল পর্যন্ত ফরিদার সময় খুব ভালো কাটল। সকালবেলা জোড়া শালিক দেখায় তেমন কিছু হল না। ফরিদার মনে হল আজকের দিনটা সে ভালো ভাবেই পার করে দিতে পারবে।
জহির অফিস থেকে ফিরল পাঁচটায়। তার মুখ অত্যন্ত গম্ভীর। ভুরু কুঁচকে আছে। দেখেই মনে হচ্ছে সে রাগ চেপে আছে। বেশিক্ষণ রাগ চেপে রাখলে চোখ লালচে হয়ে থাকে। জহিরের চোখ লাল।
ফরিদা বলল, তোমার কি শরীর খারাপ করেছে?
জহির বলল, না।
চোখ মুখ শক্ত করে আছ। অফিসে কিছু ঘটেছে?
জহির বলল, না।
ফরিদা চা আনতে গেলে। নতুন টি পটে করে চা এনে জহিরের সামনে রাখল। টি পটটা এত সুন্দর যে দেখবে তারই মন ভালো হয়ে যাবে। টি পটের সঙ্গে দু'টা কাপ। দু'জন এক সঙ্গে বসে চা খাওয়া। ফরিদা বলল, চায়ের সঙ্গে কি খাবে? চিড়া ভেজে দেব?
জহির বলল, চিড়া পরে ভাজবে। আগে বল তুমি কি আমার কোটের পকেটে হাত দিয়ে ছিলে?
কোটের পকেটে হাত দেব কেন?
কোটের পকেটে তিনটা পাঁচশ টাকার নোট ছিল। নোট দু'টা নেই।
তোমার কাছ থেকে আমি টাকা চুরি করব?
আগে তো অনেকবারই করেছে। আমার পকেট থেকে টাকা নেয়া তো
নতুন কিছু না।
আমি তোমার কোটের পকেটে হাত দেই নি। টাকাও নেই নি।
সত্যি কথা বল।
সত্যি কথাই বলছি।
এই টি পটটা নতুন কিনেছ না?
हूँ।
কবে কিনেছ?
আজ কিনেছি।
টাকা কোথায় পেয়েছ?
আমার কাছে কিছু টাকা ছিল। ভাইজান কয়েকদিন আগে যে এসেছিলেন ইলিশ মাছ নিয়ে তখন দিয়ে গেছেন।
জহির থমথম গলায় বলল, এখনো সময় আছে সত্যি কথা বল।
সত্যি কথাই তো বলছি।
তোমার ভাই এসে হাতে টাকা ধরিয়ে দিয়ে গেল। ফাজলামী করছ। দিনের পর দিন যে ভাইয়ের কোন খোঁজ নাই, সেই ভাই হয়ে গেল হাজী মোহাম্মদ মহসিন?
ভাইজান সম্পর্কে এইভাবে কথা বলবে না।
তোমার ভাইজান সম্পর্কে কি ভাবে কথা বলতে হবে নিল ডাউন হয়ে?
ফরিদার চোখে পানি এসে গেল। জহির কঠিন গলায় বলল, চোখের পানি
মুছ। এক্ষুণি মুছ। আর কাপড় পর।
ফরিদা কাঁদতে কাঁদতে বলল, কাপড় পরব কেন?
জহির কঠিন গলায় বলল, হাতেনাতে চোর ধরব। তোমার ভাইজানকে জিজ্ঞেস করব- ইলিশ মাছের সঙ্গে কত টাকা দিয়েছেন? আজ আমি হেস্ত নেস্ত করব। ধান কুটে বের করে ফেলব কত ধানে কত চাল।
ফরিদা হতাশ বোধ করছে। জহিরের কোটের পকেট থেকে সে কোনো টাকা নেয় নি। কিন্তু অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে মনে হচ্ছে অপরাধ না করেও অপরাধ স্বীকার করে নেয়াটা মঙ্গলজনক হবে। সে আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বলল, তোমার কোটের পকেট থেকে আমি টাকা নিয়েছি। এখন কি করবে? আমাকে মারবে? গায়ে গরম চা ঢেলে দেবে?
জহির কিছু বলছে না। চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে। তার ভাব ভঙ্গি শান্ত। এই শান্ত ভঙ্গিটাকেই ফরিদার ভয়। ভয়ঙ্কর কিছু করার আগে আগে মানুষ শান্ত হয়ে যায়।
জহির কি করতে পারে ফরিদা দ্রুত চিন্তা করছে। চড় থাপড় দিতে পারে। দিলে খারাপ না, বাবু বাসায় নেই সে দেখবে না। ঘরে কোনো কাজের লোকও নেই। কেউ জানবে না। (এই জাতীয় দৃশ্য কাজের লোকদের দেখা মানে ভয়ঙ্কর ব্যাপার। প্রতিটি ফ্ল্যাটের লোকজন জেনে যাবে।) গায়ে গরম চা ঢেলে দিতে পারে। আগে একবার দিয়েছে। ভাগ্যিস মুখে পড়ে নি। কাঁধে আর বুকে পড়ে ছিল। ফুসকা পড়ে ঘা হয়ে বিশ্রী অবস্থা। ডাক্তারের কাছে গিয়ে ব্লাউজ খুলে বুক দেখাতে হয়েছে। চোখ দিয়ে দেখলেই বুঝা যায় কতটুক পুড়েছে কিন্তু সেই বদ ডাক্তার আবার নানান ভঙ্গিমায় হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখেছে। ওষুধ দিয়ে বলেছে-"কাল আবার আসবেন। ড্রেসিং করে দেব। বুকের সেনসেটিভ স্কিন পুড়েছে তো এই জন্যেই চিন্তা।" কথা শেষ করে ব্যাটা আবার বুকে হাত দিয়েছে।
জহির যদি আজ গায়ে চা ঢেলে দেয় তেমন কোনো সমস্যা হবে না। চা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। শরীর পুড়ে গেলেও ডাক্তারের কাছে যেতে হবে না। আগের বারের মলমটা এখনো আছে। ফরিদা যত্ন করে তুলে রেখেছে। একবার চা ফেলে দিয়েছে, অভ্যাস হয়ে গেছে। আবারো ফেলবে।
জহির তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারে। এর আগেও কয়েকবার বের করেছে। বের করে দিলে খুবই খারাপ হবে। ফরিদার ভয়ঙ্কর কষ্ট হবে। বাসা থেকে বের করে দিলেই ফরিদার মনে হয় এই পৃথিবীতে তার কেউ নেই। তার তখন ইচ্ছা করে কোনো চলন্ত ট্রাকের নিচে ঝাঁপ দিয়ে পড়তে। সাহসে কুলায় না। তার সাহস খুব কম।
রহমান সাহেব বাসায় ফিরলেন রাত আটটায়। ঘরে ঢুকতেই শায়লায় সঙ্গে দেখা। শায়লা গম্ভীর মুখে বললেন, পেছনের বারন্দায় এসো তোমার সঙ্গে কথা আছে।
রহমান সাহেবের বুক ধক করে উঠল। খারাপ কিছু কি ঘটেছে? সময় ভালো না। সবার জন্যে দুঃসময়। চারদিকে খারাপ খারাপ ঘটনা ঘটছে। তার বাড়িতেও যে ঘটবে এটা বিচিত্র কিছু না। তাঁর কোনো মেয়ের মুখে কি কেউ এসিড মেরেছে? মাইক্রোবাসে করে একদল যুবক এসে উঠিয়ে নিয়ে গেছে চিত্রাকে? রহমান সাহেবের বুক ধক ধক করছে। তিনি ক্ষীণ গলায় বললেন, কি হয়েছে?
শায়লা গলা নামিয়ে বললেন, তোমার বোন বিছানা বালিশ নিয়ে চলে এসেছে। এখন থেকে না-কি আমাদের সঙ্গেই থাকবে।
রহমান সাহেব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, ও আচ্ছা।
শায়লা বললেন, ও আচ্ছা মানে? তুমি এক্ষুণি তাকে তার বাসায় রেখে আসবে। কাল আমার মেয়ের এনগেজমেন্ট এই সময় আমি বাড়িতে কোনো ঝামেলা রাখব না।
ঝামেলা কেন?
অবশ্যই ঝামেলা। তোমার এই বোনকে আমার খুবই অপছন্দ। শুধু আমার না, বাড়ির সবারই। সে সুযোগ পেলেই জিনিসপত্র সরায়। চিত্রার মামা আমেরিকা থেকে চিত্রার জন্যে ফ্লেক্সিবল কলম পাঠিয়েছিল। চিত্রার কত শখের জিনিস। সেই জিনিস সরিয়ে ফেলল। তোমার বোনের বাসায় যখন সেই কলম পাওয়া গেল, সে বলল চিত্রার কলমটা দেখে তার খুবই পছন্দ হয়েছে। সে গুলশান বনানীর মার্কেট ঘুরে ঘুরে অবিকল চিত্রার কলমের মতো একটা কলম কিনেছে।
রহমান সাহেব বললেন, বিদেশী সব জিনিসই এখন দেশে পাওয়া যায়।
শায়লা কঠিন গলায় বললেন, বোনের পক্ষে কোন ওকালতি করবে না। তোমার বোনকে তুমি চেন না। আমি হাড়ে হাড়ে চিনি। আমার মুক্তা বসানো গলায় হার সে যে নিয়েছে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত।
রহমান সাহেব ক্লান্ত গলায় বললেন, ও থাকতে এসেছে কেন?
সেটা তাকেই জিজ্ঞেস কর। হেন তেন নানান কথা বলছে। তার গায়ে নাকি গরম চা ফেলে দিয়েছে। বাসা থেকে বের হয়ে যেতে বলেছে। কুৎসিত গালাগালি করেছে। মাগী ডেকেছে। সেটা তাদের ব্যাপার। আমি তাতে নাক গলাব না। তুমি তোমার গুণবতী বোনকে তার বাসায় রেখে আস। তা যদি না পার শেরাটন হোটেলে স্যুট ভাড়া করে সেখানে রাখ। আমার এখানে রাখতে পারবে না।
আচ্ছা দেখি।
আচ্ছা দেখি না। এক্ষুণি যাও। রিকশা ডেকে নিয়ে এস। তারপর বোনকে নিয়ে রিকশায় উঠ।
আজকের রাতটা থাকুক। কাল সকালে আমি দিয়ে আসব।
অবশ্যই না। যাও রিকশা আন।
রিকশায় উঠতে উঠতে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ভাইজান আমরা কোথায় যাচ্ছি? তোর বাসায় তোকে দিয়ে আসি। জহিরের সঙ্গে মিটমাট করিয়ে দেই। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হয়- আবার ঝগড়া মিটেও যায়।
ঐ বাড়িতে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না ভাইজান।
ঐ বাড়ি ছাড়া যাবি কোথায়?
তোমার কাছে কয়েকদিন থাকতে পারব না?
রহমান সাহেব চুপ করে রইলেন। ফরিদা বলল, ভাইজান তুমি বুঝতে পারছ না। বাবুর বাবা তোমাকে খুবই অপমান করবে। তুমি সোজা সরল মানুষ। তোমাকে অপমান করলে আমার খারাপ লাগবে।
রহমান সাহেব বোনের পিঠে হাত রেখে নরম গলায় বললেন, আত্মীয়স্বজনের মধ্যে আবার মান অপমান কি? রাগের সময় জহির কিছু উল্টা পাল্টা কাজ করেছে। এখন নিশ্চয়ই রাগ পড়ে গেছে। এখন সে লজ্জিত। দেখবি আমি সব ঠিক ঠিক করে দিয়ে আসব। রাতে তোদের সঙ্গে ভাত খাব। দরকার হলে রাতটা তোদের সঙ্গে থাকব।
ভালো সময়ে কত থাকতে বলেছি- তুমি থাক নি। আজ থাকবে।
তুই কাঁদিস না। বেশি কাঁদা হার্টের জন্যে খারাপ। হার্টে প্রেসার পড়ে। আমি পত্রিকায় পড়েছি। তুই বরং এক কাজ কর, মনে মনে ওয়াস্তাগফিরুল্লাহ ওয়াস্তাগফিরুল্লাহ পড়তে থাক। এতে বিপদ কাটা যায়। আমি নিজেও পড়ছি।
ফরিদা বড়ভাই-এর কথা অনুযায়ী মনে মনে ওয়াস্তাগাফরুল্লাহ পড়ছে এবং তার মনে হচ্ছে- এতে কাজ দিবে। বাসায় গিয়ে দেখবে জহিরের রাগ পড়ে গেছে। সে ভালো মানুষের মতো বসে আছে। ফরিদাকে দেখে যেন কিছুই হয় নি এমন ভঙ্গিতে বলবে- তাড়াতাড়ি খাবার দাও তো ক্ষিধে লেগেছে। বাবু না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে ওকে ঘুম থেকে তোল।
মুরগির কোরমা রান্না করাই আছে। পোলাও রেঁধে ফেলতে হবে। ভাইজান খাবে বলেছে তার জন্যে ঝাল তরকারি একটা থাকলে ভালো হত। ঘরে বেগুন আছে। বেগুন ভেজে দিলে হয়। বেগুনটা আজ অন্য রকম ভাবে ভাজি করবে। বেগুন কুচি কুচি করে তার সঙ্গে নারকেল। ভাইজান রাতে থাকবে। পরিষ্কার চাদর আছে কি-না কে জানে। মনে হচ্ছে নেই। বিছানার চাদর ফরিদা নিজে ধুতে পারে না। লন্ড্রিতে ধোয়াতে হয়। লন্ড্রিতে পাঠানোর কাপড়ে সে এক জায়গায় করে রেখেছে। পাঠানো হয় নি। এর পর থেকে গেস্টরুমের জন্যে এক সেট চাদর, বালিশের ওয়ার ধুয়ে তুলে রাখতে হবে।
ভাইজান।
কি রে?
মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, তোমার কেমন লাগছে?
কোনো রকম লাগছে না।
আমার অদ্ভুত লাগছে। মেয়েটা বড় হয়েছে আমার কাছে মনেই হয় না। ছেলেবেলায় ও যে দাড়িওয়ালা মানুষ দেখলেই কাঁদত এটা কি তোমার মনে আছে?
না।
কি আশ্চর্য! তোমার মনে থাকার তো কথা। দাড়িওয়ালা কাউকে দেখলেই ও ভয়ে সিঁটিয়ে যেত। চিৎকার করে কান্না। তখন আমি তাকে বলতাম- দেখিস তোর বিয়ে হবে দাড়িওয়ালা বরের সঙ্গে। ভাইজান ওর বরের কি দাড়ি আছে? আমি সাধারণ দাড়ির কথা বলছি না, ফ্রেঞ্চকাট টাইপ স্টাইলের দাড়ি।
জানি না তো।
সে কি তুমি ওর বরকে এখনো দেখ নি?
না।
ওর বরের নাম কি?
জানি না।
সত্যি জান না।
জানতাম এখন ভুলে গেছি।
তুমি তো ভাইজান খুবই আশ্চর্য মানুষ।
ऐ।
তুমি অবশ্যি আগে থেকেই আশ্চর্য ছিলে- এখন যত দিন যাচ্ছে ততই বেশি আশ্চর্য মানুষ হচ্ছ। তোমাকে যে ওষুধগুলি খেতে দিয়েছিলাম সেগুলি খাচ্ছ?
ई।
তোমার চেহারা ভয়ংকর খারাপ হয়ে গেছে। চেহারার মধ্যে ভিখিরী ভিখিরী ভাব এসে গেছে। মাথার সব চুল পাকা। তোমার পাশে ভাবীকে দেখলে মনে হয় ভাবী তোমার মেয়ে। তুমি চুলে কলপ দিও তো।
আচ্ছা।
তুমি মুখে বলবে আচ্ছা। কিন্তু আসলে দেবে না। আমি ব্যবস্থা করব। রাতে তুমি তো আমার এখানে থাকবে আমি দোকান থেকে বাবুর বাবাকে দিয়ে একটা কলপ আনিয়ে সকালে চুলে কলপ দিয়ে দেব।
আচ্ছা।
Page Bangladeshi Bangla Natok Rokomari-রকমারি Mir Moshiul

10/11/2025

অমর কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের আলোচিত উপন্যাস ** আজ চিত্রার বিয়ে ** এর ধারাবাহিক প্রকাশ 👇
🔯 ৭ 🔯

বোবার হাত থেকে বাঁচার জন্যে একা বিছানায় শোয়া যাবে না। অন্য কাউকে নিয়ে ঘুমুতে হবে। আপার সঙ্গে ঘুমানো যায়। চিত্রার সঙ্গে ঘুমুতে যাবার একটাই সমস্যা চিত্রা গুটুর গুটুর করে সারারাতই গল্প করবে। হয়তো মীরা ঘুমিয়ে পড়েছে-চিত্রা খিলখিল করে হেসে ওঠে বলবে, এই মীরা আজ কি হয়েছে শোন।
আপা ঘুমে আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে।
ঘুমঘুম চোখেই শোন।
প্লিজ।
না শুনলে না শুনবি। আমি বলে যাচ্ছি। তুই দুই হাতে কান চেপে পড়ে থাক। হয়েছে কি আমাদের সঙ্গে একটা ছেলে পড়ে তার নাম- কামরুল হুদা। আমরা সবাই তাকে ডাকি কামরুল বেহুদা। স্মার্ট ছেলে, কাজের ছেলে, পড়াশোনাতেও ভালো। টাটুবাল্টু টাইপ না। সে একদিন আমার কাছে এসে বলল- "চিত্রা সবাই আমাকে বেহুদা ডাকে। খুব ভালো কথা। তুমি বেহুদা ডাকবে কেন?" আমি বললাম, সবাই ডাকলে যদি দোষ না হয়, আমি ডাকলেইবা দোষ হবে কেন? এই মীরা গল্পটা শুনছিস না ঘুমিয়ে পড়ছিস। আচ্ছা তারপর কি হয়েছে শোন- আমার কথা শুনে কামরুল বেহুদা কেমন যেন হয়ে গেল। তারপর আমাকে হতভম্ব করে দিয়ে ফট করে আমার হাত ধরে গদগদ গলায় বলল, চিত্রা
তুমি এটা কি বললে?
মীরার ততক্ষণে ঘুম সম্পূর্ণ কেটে গেছে। সে ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বলেছে- কি সর্বনাশ। তারপর?
তোর ঘুম কেটেছে?
হ্যাঁ। তারপর কি হয়েছে?
চিত্রা হাই তুলতে তুলতে বলল, কিছুই হয় নি। তোর ঘুম ভাঙাবার জন্যে এই গল্পটা বানালাম। কামরুল বেহুদা নামে আমাদের ক্লাসে একজন ছাত্র সত্যিই আছে। বেহুদা ডাকলে সে খুশিই হয়। দাঁত বের করে হাসে। তার প্রধান কাজ হলো ক্লাসের মেয়েদের বাসায় টেলিফোন করা এবং গম্ভীর ভঙ্গিতে বলা- আমি বেহুদা বলছি।
একটা মিথ্যা গল্প বলে আমার ঘুম ভাঙালে?
হ্যাঁ। সত্যি গল্প শুনলে কখনো কারো ঘুম ভাঙে না। উল্টা আরো ঘুম পায়। ঘুম ভাঙে মিথ্যা গল্প শুনলে। ঘুম ভাঙানোয় তোর মেজাজ খারাপ হয়েছে তো? এখন কেন ঘুম ভাঙিয়েছি সেই কারণ জানলে মেজাজ আরো খারাপ হবে।
কেন ঘুম ভাঙিয়েছ?
গান গাইতে ইচ্ছা করছে। আমি গান গাইব তুই শুনবি।
অসম্ভব।
কিন্নর কণ্ঠের একজন শিল্পী নিজের ইচ্ছায় তোকে গান শুনাতে চাচ্ছে তুই শুনবি না? বল তো তুই কেমন মেয়ে? একদিন যখন সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে আমি খুবই বিখ্যাত হয়ে যাব তুই তো পড়বি মহাবিপদে।
কি বিপদে?
আমি একটা বই লিখব- আমার সঙ্গীত জীবন। সেখানে এই ঘটনার উল্লেখ থাকবে। বই পড়ে তোর ছেলে-মেয়েরা রাগ করে তোকে বলবে, মা তুমি বড় খালার সঙ্গে এরকম করতে পারলে? ছিঃ মা ছিঃ।
মীরাকে বাধ্য হয়ে গান শুনতে হবে। চিত্রা তার প্রিয় গান গাইবে। একটাই গান- রবীন্দ্র সঙ্গীত। নজরুল গীতির শিল্পীর প্রিয় গান হল রবীন্দ্র সঙ্গীত-
বধূ কোন আলো লাগল চোখে
বুঝি দীপ্তিরূপে ছিলে সূর্যলোকে। ছিল মন তোমারি প্রতীক্ষা করি
যুগে যুগে দিন রাত্রি ধরি
রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদার গান। চিত্রাঙ্গদা গিয়েছে বনে হরিণ শিকারে। সেখানে দেখা হলো অর্জুনের সঙ্গে। তখনি এই গান। এই গান গাইবার সময় চিত্রার চোখে সব সময় পানি আসে। মীরার সমস্যা হলো বোনের চোখে পানি দেখলে তার চোখেও পানি আসে। গান শুনতে গিয়ে যদি কাঁদতে হয় তাহলে সেই গান শোনার দরকার কি?
মীরার ইচ্ছা করছে বোনের সঙ্গে গিয়ে ঘুমুতে, আবার মনে হচ্ছে থাক দরকার নেই। সেখানে যাওয়া মানেই রাত জাগা। ঘুম পাচ্ছে। মীরা জানে ঘুমিয়ে পড়লে আজ তাকে বোবায় ধরবেই। ধরলে ধরুক। বোবা তাকে গলা টিপে মেরে ফেলুক। তাহলেই তার উচিত শিক্ষা হবে। কি লজ্জা কি ঘেন্না। চাকর শ্রেণীর একজনের সঙ্গে গভীর আবেগে সে প্রেমের কথা বলে যাচ্ছে। তুমি তুমি করছে। মীরার বুদ্ধি কম বলে সে বুঝতে পারে নি। অন্য যে কোনো মেয়ে ব্যাপারটা চট করে ধরে ফেলত। যখন টেলিফোন নাম্বার দিচ্ছে না তখনই সন্দেহ করা উচিত ছিল। ছেলেরা এইসব ব্যাপারে আগ বাড়িয়ে টেলিফোন নাম্বার দেয়। অথচ এই ছেলে দিচ্ছিল না। আর মীরা বাড়ির ঠিকানা পর্যন্ত দিয়ে বসে আছে।
মীরা ঘুমুচ্ছিস?
মা দরজায় টোকা দিচ্ছেন। মীরা জবাব না দিয়ে মটকা মেরে পড়ে থাকতে পারে। এটা ঠিক হবে না। কোনো না কোনো ভাবে মা ধরে ফেলবেন যে মীরা জেগে আছে। তার চেয়ে উত্তর দেয়া ভালো।
কি রে কথা বলছিস না কেন?
মীরা বিছানা থেকে দরজা খুলে বের হয়ে এল। শায়লা শান্ত গলায় বললেন, চুপি চুপি একটু বারান্দায় যা তো।
মীরা বলল, কেন?
শুয়েছিলাম ঘুম আসছিল না। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি তোর বাবা মাছের চৌবাচ্চার পাশে বসে আছে। বিড়বিড় করে কি যেন বলছে। চুপি চুপি তোর বাবার পেছনে গিয়ে দাঁড়া, তারপর শুনতো সে কি বলে।
মীরা বলল, থাক না মা শোনার দরকার কি? সব মানুষই যখন একা থাকে তখন নিজের মনে কথা বলে। বাবাও তাই করছে।
তোকে জ্ঞানী হতে হবে না। যা করতে বলছি কর। বিড়বিড় করে কি বলছে শুনে আয়। নিঃশব্দে যাবি। আমি দরজা খুলে রেখেছি। তুই পা টিপে টিপে যাবি।
তুমি দাঁড়িয়ে থাকবে?
না আমি শুয়ে পড়ব। ঘুমের ওষুধ খেয়েছি। এখন আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। তোর বাবা কি বলে শুনে রাখ। সকালে আমাকে বলবি।
মীরা পা টিপে টিপে গেল। সে তেমন কিছু দেখল না। তার বাবা চুপচাপ বসে আছেন। বিড়বিড় করছেন না। নিজের মনে কথা বলছেন না। দীর্ঘ নিঃশ্বাসও ফেলছেন না। মীরা ডাকল, বাবা।
রহমান সাহেব মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসলেন।
মীরা বলল, কি করছ?
রহমান সাহেব বললেন, বসে আছি রে মা। কিছু করছি না।
সিগারেট খাচ্ছ? আবার চৌবাচ্চায় ফেলবে। মা রাগারাগি করবেন। এরপর থেকে চৌবাচ্চার পাশে যখন বসেব একটা এসট্রে নিয়ে বসবে। তুমি এসট্রে খুঁজে না পেলে আমাকে বলবে।
আচ্ছা।
মীরার হঠাৎ তার বাবার জন্যে খুব মমতা লাগল। এই বাড়িতে মানুষটা খুবই একা। কারো সঙ্গেই তার যোগ নেই। কেউ তার সঙ্গে বসে সুখ-দুঃখের কোনো কথাও বলে না। কিছু কিছু মানুষ হঠাৎ ছায়া হয়ে যায়। মানুষটার অস্তিত্ব থাকে না। শুধু ছায়া ঘুরে বেড়ায়। মানুষের সঙ্গে মানুষের ভাব হয়। ছায়া মানুষের সঙ্গে ভাব হয় ছায়া মানুষের। এ বাড়িতে আরেকজন ছায়া মানুষ থাকলে ভালো হত। দু'জন ছায়া মানুষ গল্প করত।
বাবা!
কি?
একটা গল্প বল তো।
রহমান সাহেব খুবই অবাক হয়ে বললেন, কি গল্প?
মীরা বলল, যে কোনো গল্প। তোমার ছেলেবেলার গল্প, কিংবা তোমার অফিসের গল্প। শৈশবের একটা স্মৃতির গল্প বল শুনি। ইন্টারেস্টিং কোনো স্মৃতি। তুমি তোমারটা বলবে। আমি বলব আমারটা।
তোরটা আগে বল।
মীরা খুব আগ্রহের সঙ্গে হাত-পা নেড়ে গল্প শুরু করল। বাবা আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। ফোর্থ পিরিয়ড চলছে। অঙ্ক মিস ক্লাস নিচ্ছেন। হঠাৎ স্কুলের দপ্তরি এসে বলল, মীরা রোল ২৬ বড় আপা ডাকেন। বড় আপা হলেন আমাদের হেড মিসট্রেস। আমরা সবাই তাঁকে যমের মতো ভয় পাই। ভয়ে আমার হাত পা কাঁপতে লাগল। আমি ভয়ে অস্থির হয়ে উনার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। গিয়ে দেখি আপা খুব খুশি। আমাকে দেখে আহ্লাদী গলায় বললেন, কি রে তোর নাম মীরা। কেমন আছিস?
আমি ফিসফিস করে বললাম, ভালো।
দাঁড়িয়ে আছিস কেন? বোস।
আমি আপার সামনের চেয়ারে বসলাম। আপা আরো আহ্লাদী করে বললেন,
পড়াশোনা কেমন হচ্ছে রে?
আমি বললাম, ভালো।
কোন সমস্যা হলে আমাকে বলবি।
আমি বললাম, জ্বি আচ্ছা।
তোর জন্যে চকলেট আনিয়ে রেখেছি। নে খা। চকলেট খেয়ে কিন্তু কুলি করে দাঁত পরিষ্কার করতে হয়। নয়তো দাঁতে মিষ্টি লেগে থাকবে। সেখান থেকে ক্যারিজ হবে। ক্যারিজ কি জানিস তো? দাঁতের পোকা। ভয়ে ভয়ে চকলেট হাতে নিলাম। তখন আপা বললেন, তোর এক চাচা যে পূর্তমন্ত্রী সালেহ সাহেব সেই কথা তো তুই কখনো বলিস নি।
আমি চুপ করে আছি। আমার কোনো চাচা পূর্তমন্ত্রী না। কিন্তু আপাকে সেই কথা বলার সাহস নেই। আপা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করলেন। কপালে চুমু দিয়ে বললেন, যা ক্লাসে যা। তোকে দেখেই মনে হচ্ছে তুই খুব লক্ষ্মী মেয়ে।
আমি ক্লাসে চলে এলাম। এরপর স্কুলে আমার খুব খাতির হলো। সব আপারা আমাকে চেনে। সবাই আদর করে। পড়া না পারলেও কেউ কোনো দিন বকা দেয় নি। আমিও কখনো তাদের ভুল ভাঙাই নি। দেখলে বাবা কি অদ্ভুত ব্যাপার। আমি ক্লাসের কোনো বান্ধবীকে এখনো বলি নি যে পুরো ঘটনা মিথ্যা। সালেহ সাহেব বলে কোনো পূর্তমন্ত্রী আমার চাচা হওয়া দূরে থাকুক। আমি চিনিও না। পূর্তমন্ত্রী যে গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যাপার তাও জানি না।
রহমান সাহেব বললেন, সালুকে তুই চিনবি না কেন? আমার সঙ্গে স্কুলে পড়ত। বখাটে টাইপ ছিল। মন্ত্রী হবার আগে কয়েকবার এসেছে। তোকে তো খুবই আদর করত। মন্ত্রী হবার পরেও অফিসে টেলিফোন করে তোর খোঁজ করেছে। কোন ক্লাসে পড়িস এইসব জানেতে চেয়েছে। আমাকে বলেছিল হঠাৎ একদিন পুলিশ টুলিশ নিয়ে তোদের স্কুলে উপস্থিত হবে। তোকে চমকে দেবে।
মীরা অবাক হয়ে বলল, কই আমাকে তো কিছু বল নি।
বলার কি আছে?
আপার বিয়ের এনগেজমেন্টে তাঁকে দাওয়াত করেছ?
না।
কর নি কেন?
তোর মা বলেছে শুধু অফিসের দু-একজনকে বলতে। আমি একজনকে বলেছি।
বাবা তুমি অবশ্যই পূর্তমন্ত্রীকে বলবে। আমাদের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ দু-একজন তো থাকা দরকার। মা কি জানে পূর্তমন্ত্রীকে তুমি চেন?
না তাকে কিছু বলি নি।
অফিসের কাকে নিমন্ত্রণ করেছ? তোমাদের বড় সাহেবকে?
না। রতনকে বলেছি। অত্যন্ত ভালো মানুষ। আমার পিওন।
মীরা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। তার হাসি পাচ্ছে, কিন্তু সে হাসতে পারছে না। তার কাছে মনে হচ্ছে বাবার কোনো একটা সমস্যা হচ্ছে।
বাবা ঠিক স্বাভাবিক না। তাঁর তাকানো, বসে থাকা, কথাবার্তা বলা সব কিছুর মধ্যে সামান্য হলেও অস্বাভাবিকতা আছে। মীরা বলল, রাত অনেক হয়েছে বাবা চল ঘুমুতে যাই।
রহমান সাহেব অবাক হয়ে বললেন, তুই না বললি তুই একটা গল্প বলবি। তারপর আমি একটা বলব। আমারটা তো বললাম না।
মীরা বলল, বেশ তো বল।
মাছের একটা ব্যাপার, বুঝলি।
মাছের ব্যাপার মানে-কি?
রাতের বেলায় চৌবাচ্চার কাছে বসেছিলাম। তোর মা তো রাতের বেলা মাছ ঘরে নিয়ে যায়। সেই রাতে নেয় নি। হয়তো নিতে ভুলে গেছে। কিংবা মনে করেছে রোজ রাতে মাছদের নাড়াচাড়া করা ঠিক না। কিছু একটা সে ভেবেছে। মাছগুলি নেয় নি। আমি ওদের পাশে বসে সিগারেট খাচ্ছি, হঠাৎ চৌবাচ্চার ভিতরে মাছ একটা ঘাই দিল। আমি তাকালাম। তারপর দেখি একটা মাছ উপরে উঠে এসে আমাকে বলল "আজ আমাদের খাবার দেয়া হয় নি।" মাছদের মতোই বিজবিজ করে বলল, তবে আমি স্পষ্ট শুনলাম এবং বুঝতে পারলাম। এই হলো আমার গল্প।
মীরা অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। রহমান সাহেব নির্বিকার ভঙ্গিতে সিগারেট ধরিয়েছেন। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে ঘটনাটা বলে ফেলতে পেরে তিনি স্বস্তি পাচ্ছেন।
বাবা মাছ তোমার সঙ্গে কথা বলল?
হুঁ। তোর মা'কে আবার বলিস না। তোর মা শুনলে ভেবে বসবে আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। দুঃশ্চিন্তা করবে। মেয়েরা আবার দুঃশ্চিন্তা করতে খুবই পছন্দ করে। দুঃশ্চিন্তা করার কোনো বিষয়ই না, এমন সব নিয়েও তারা দুঃশ্চিন্তা করে। আমার নিজের মাকে দেখেছি তো বেচারী মারাই গেছেন দুঃশ্চিন্তা করতে করতে।
তোমার মা খুব দুঃশ্চিন্তা করতেন?
অতিরিক্ত করতেন। দুঃশ্চিন্তার কারণে তিনি স্থির হয়ে এক জায়গায় বসেও থাকতে পারতেন না। ছটফট করতেন। মনে কর আমি বাথরুমে গেছি। বাথরুম থেকে বের হতে দেরি হচ্ছে। মা ভাববে আমি অজ্ঞান হয়ে বাথরুমে পড়ে আছি। তখন ছুটে এসে বাথরুমের দরজায় ধাক্কা দিতে দিতে বলবে- ও রহমান তোর শরীর ঠিক আছে? একটু কথা বল বাবা। ঘুমুতে এসো বাবা।
তুই যা আমি বসি আরো কিছুক্ষণ। আমার ঘুম পায় নাই। রাত তিনটার আগে আমার ঘুম পায় না। বিছানায় শুয়ে জেগে থাকার চেয়ে এখানে বসে জেগে থাকা ভালো।
মীরা চিন্তিত মুখে ঘরে ঢুকল।
রহমান সাহেবের মনে হলো গল্প বলতে গিয়ে তিনি ভুল করেছেন। শৈশবের গল্প বলার কথা, তিনি সেটা না করে এই বয়সের একটা কথা বলেছেন। মোটামুটি চুক্তি ভঙ্গ করা হয়েছে। শৈশবের তাঁর অনেক গল্প আছে। ইদারার গল্পটা বললে মীরা মজা পেত। গল্পটা সামান্য ভয়ের। তবে মীরার বয়সের ছেলেমেয়েরা ভয়ের গল্প শুনলে মজা পায়। মেয়েটাকে কোনো একদিন সময় করে গল্পটা বলতে হবে। সবচে ভালো হত যদি রোজ রাতে একটা করে গল্প বলতে পারতেন। রাতের খাওয়া দাওয়ার পর তিনি চৌবাচ্চার পাশে এসে বসলেন, কিছুক্ষণ পর মেয়েরা এসে পাশে বসল। তিনি গল্প শুরু করলেন।
বুঝলি মায়েরা, আমি তখন ছোট। কত আর বয়স ছয় সাত। তখন আমাদের বাড়িতে পেত্নীর উপদ্রপ হল। একটা খারাপ স্বভাবের পেত্নী খুব যন্ত্রণা শুরু করল...
Page Bangladeshi Bangla Natok Rokomari-রকমারি Mir Moshiul Bangla golpo-বাংলা গল্প

Dirección

Calle Palomares
Madrid
28021

Notificaciones

Sé el primero en enterarse y déjanos enviarle un correo electrónico cuando Bangla Natok publique noticias y promociones. Su dirección de correo electrónico no se utilizará para ningún otro fin, y puede darse de baja en cualquier momento.

Contacto La Empresa

Enviar un mensaje a Bangla Natok:

Atajos

Compartir