08/22/2026
সেলিম আল দীন এবং নাসিরউদ্দিন ইউসুফ দুই নামের দুজন ব্যক্তি। এই দুজন মিলে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের মঞ্চ নাটকের ধারায় এনেছেন ব্যাপক পরিবর্তন। সে পরিবর্তন শুধু নাটকে নয়, দর্শকের ভাবনার জগতকেও বদলে দিতে পেরেছিল।
সত্তুর দশকের শুরুর দিক থেকে একের পর সেলিম আল দীন যে সব বিষয় নিয়ে নাটক রচনা করেছেন, তাঁর ভাষা ও রচনাশৈলীতে অবিরত মুগ্ধ, বিস্মিত হয়েছেন দর্শক।
নতুন বিষয়, নিজস্ব ভাষারীতির কারণে ঢাকা থিয়েটার এবং সেলিম আল দীনের নাটক দর্শক আলাদা আগ্রহ নিয়ে একের অধিকবার দেখেছেন এবং দেখার পর নিজেদের কাছের মানুষদের বলেছেন, চমৎকার অভিজ্ঞতার জন্য অমুক দলের অমুক নাটকটি একবার হলেও দেখে আসা উচিত।
ঢাকা থিয়েটারের প্রায় প্রতিটি নাটক তখন দর্শকের আগ্রহে, ভালোবাসায় অনায়াসে শততম প্রদর্শনী ছুঁতে পেরেছে বা সে সংখ্যা অতিক্রম করে গেছে। তা অবাক হওয়ার মতো ঘটনা। যখন সেলিম আল দীন সংবাদ কার্টুন লিখেছেন, সে নাটক প্রচলিত গল্প বলার ভঙ্গিতে লেখা হয়নি। লিখলেন জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন। নাটকের নাম শুনেই মনে হবে এমন নাম কেনো?
নাসিরউদ্দিন ইউসুফের তো মনে হতে পারতো, সাধারণতঃ যেমন করে গল্প বলা হয়ে থাকে, জন্ডিস সে প্রকৃতির নয়। নয় তা হলে নতুন নতুন আগ্রহী হয়ে ওঠা নাটকের দর্শকের কাছে সে নাটক আবেদন সৃষ্টি করতে পারবে কি ভাবে! এমন প্রশ্ন মোটেও জাগেনি সেলিম আল দীন বা নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর মনে।
নাটক দুটি মঞ্চস্থ হয়েছিল। বিপুল পরিমান দর্শক নাটক দুটো দেখেছিলেন এবং বিদগ্ধ শ্রেণীর মানুষেরা প্রশংসা করে বলেছিলেন, অতি উচ্চমানের, অভিনব দুটি প্রযোজনা।
অভিনবত্বের যাত্রা শুরু হয়ে থেমে যায়নি। মুনতাসীর লেখা হলো। লেখা হলো শকুন্তলা, কীত্তনখোলা, কেরামতমঙ্গল, হাত হদাই।
সেলিম আল দীন তাঁর স্বল্পদৈর্ঘ্যের জীবনকালে কখনো দু দন্ডের জন্য থেমে থাকেননি। এক দৌড় শেষ হলে আর এক দৌড়ের বাঁশির ফুয়ের জন্য কেবল অপেক্ষা করেছেন।
একের পর এক লিখে গেছেন হাতহদাই, চাকা, যৈবতি কন্যার মন,
বনপাংশুল, প্রাচ্য, হরগজ, নিমজ্জন ও ধাবমান।
কোনো নাটকের বেলায় মনে হয়নি সেলিম আল দীন এমন ধরণের নাটক আগেও লিখেছেন। মনে হয়নি হাঁটা পথে আরো একবার হাঁটতে নেমেছেন।
অনেক রকম, এতগুলো নাটক, কোনো নাটকের নির্দেশনার রকম, প্রযোজনার ধরণ দেখে দর্শকেরও মনে হয়নি, দেখা আগের কোনো প্রযোজনার কথা মনে পড়ছে।
সেলিম আল দীন এবং নাসিরউদ্দিন ইউসুফ দুই নামের দুজন ব্যক্তি। লেখা এবং নির্দেশনার বিন্যাস, এ দুটোও তাঁদের নামের মতোই ধারে কাছের বিষয় নয় তবু কি এমন যাদু মন্ত্র বা বিশেষ কৌশল জানা ছিল দুজনের, দুই দিক থেকে এসে এক রেখায় মিলিত হয়ে এতো প্রবল হয়ে উঠতে পেরেছিলেন!
এ রহস্যের নেপথ্য কাহিনী জানবার আগ্রহ হলে কিভাবে আর তা জানা যাবে! সেলিম ভাই বেঁচে থাকলে অবশ্য বলে ফেলতেন, আমি আমার লেখা নিয়ে বহুকিছু বলতে পারবো। তা থিয়েটার, মঞ্চের হয়ে ওঠা নিয়ে বলতে পারার সাধ্য কেবল বাচ্চুরই আছে।
কি বলতেন নাসিরউদ্দিন ইউসুফ, বাচ্চু ভাই? অনুমান করে নেয়া যায়, হয়তো বলতেন, সেলিমের লেখা আমাকে অসংখ্যবার অপার এক স্থানে নিয়ে যেতে পেরেছে, সেখান থেকে নাটক, চরিত্ররাই আমাকে দিক দেখিয়েছে, হাঁটতে শুরু করো এইদিকে, ঐভাবে।
সেলিম আল দীন জন্মেছিলেন এই মাসে। আগস্টের ১৮ তারিখে। তারিখটা এলে আমরা, কাছের মানুষেরা উদযাপন করি। সে আনন্দ উদযাপনের মধ্যে মানুষটা নেই এই সত্যের বেদনাও জ্বলতে নিভতে থাকে।
নাসিরউদ্দিন ইউসুফ, সেলিম আল দীন।
একজন আছেন, একজন নেই।
লেখা: সংগ্রহ নেট থেকে