07/11/2021
কে সে! (৫ম পর্ব)
"এই কি হয়ছে ওমন করছো কেন? এই আশিক,আশিক। কি হয়ছে তোমার?"
নীলার ধাক্কাধাক্কিতে ঘুম ভাঙ্গলো। চোখ মেলে তাকিয়ে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। তারমানে এতক্ষণ দুঃস্বপ্ন দেখছিলাম। দুঃস্বপ্ন এতোটা বিভৎস আর ভয়ংকর হয় জানা ছিলো না।
"কি হয়ছে,ওমনভাবে গোঙ্গানি দিচ্ছিলে কেন? কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখেছো কী?"
আমি খানিক্ষন চুপ থেকে পাশের থাকা বোতলটা হাতে নিয়ে পানি পান করার পর বললাম,"হুম,খুব ভয়ানক একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছি। কিন্তু কি দেখেছি সেটা মনে নেই। শুধু মনে আছে তুমি আমাকে টেনে হিচড়ে কোথায় যেন নিয়ে যাচ্ছিলে।"
নীলা চোখ দুটি গোলগোল করে বললো,"আমি! আমি তোমাকে টানছিলাম। যাক স্বপ্নের ভিতরেও তো তোমাকে টানার সৌভাগ্য হয়েছে আমার।"
"তুমি চায়লে বাস্তবেও ঠ্যাং ধরে টানতে পারো,কি টানবা নাকি?"
"আরে ধুর কি বলো, এ শেষরাতে এখন আমার কাজ নেই তোমাকে ধরে টানাটানি করতে যাবো আমি। ঘুমাও তো,একটু পরেই আবার ভোর হয়ে যাবে।"
নীলা আমার কাছ থেকে উঠে গিয়ে ওপাশে আবার শুয়ে পড়লো।আমি চুপচাপ ঘুমানোর ভান ধরে পড়ে থাকলাম বিছানার উপরে।
'হঠাৎ এমন স্বপ্ন দেখার কারণ কী? ওরা দু'জনে চায়ছে টা কি আমার কাছে? ঐ বাড়ির মালিক সম্পর্কে আমাকে জানতে হবে।নিশ্চয় এমন কোনো দূর্ঘটনা লুকিয়ে আছে লোকচক্ষুর আড়ালে যা কেউ জানে না।
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ভোরের আযান পড়লো। বিছানা ছেড়ে উঠে ফজরের নামাজ পড়ে আর ঘুম আসলো না। মাথার ভিতরে দুঃস্বপ্নটা চক্রাকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
সকালে অফিসে যাওয়ার পথে আবরারকে তার স্কুলে নামিয়ে দিয়ে আমি পিছনে মোড় নিলাম। সামনের মোড়ে আমাদের বাড়ির মালিকের বাসা,ওর সাথে কথা বলে যদি কোনো কিছু জানা যায়,সেই উদ্দ্যেশ্যে রওনা দিলাম।
বাড়ির সামনে যেতেই দেখলাম,বাড়ির মালিক বারান্দাতে বসে বসে খবরের কাগজ পড়ছে আর চা খাচ্ছে।
আমাকে গাড়ি থেকে নামতে দেখে পত্রিকা থেকে মুখে তুলে তাকালেন ভদ্রলোক।
তারপর বললেন,"আরে আশিক সকাল সকাল কি মনে করে? আসো আসো।
তারপর একজন মহিলার নাম ধরে ডেকে বললেন,চা দিতে।
আমি ভদ্রলোককে চা দিতে বারণ করে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলাম।
ভদ্রলোক হেসে বললেন,"তারপর নতুন বাড়িতে কেমন লাগছে,বাড়িওয়ালা হিসেবে তো আর তোমাদের কোনো খোঁজই নিতে পারলাম না। একা মানুষ তারউপরে আবার হাঁটুর ব্যাথাটা বেড়েছে নয়তো সময় করে গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে আসতাম তোমাদের।"
আমিও হেসে জবাব দিলাম,"না তেমন কোনো সমস্যা হচ্ছে না। এতো কম টাকা দিয়ে এতবড় একটা বাড়ি পেয়েছি,আর তাছাড়াও আমার স্ত্রী আর ছেলেরও বাড়িটা খুব পছন্দ হয়েছে।"
বাড়িওয়ালা কথাটা শুনে বেশ প্রফুল্ল মনে বললেন,"তা বেশ বেশ। তা বাবা কোনো দরকার ছিলো নাকি?"
আমি ইতস্ততভাবে বললাম, "হ্যা চাচা। আপনার কাছে কিছু জানার ছিলো।"
"হ্যা বলো,কি জানতে চাও?"
"আসলে আমাদের অপজিটে যে ডুপ্লেক্স বাড়িটা আছে। সেই বাড়িটার সম্পর্কেই কিছু জানার ছিলো?"
কথাটা শোনার পর দেখলাম বাড়িওয়ালার কপালে খানিকটা ভাজ পড়ে গিয়েছে।
বাড়িওয়ালা অনিচ্ছুক হয়ে বললেন,"তুমি কি ঐ পরিত্যক্ত বাড়িটার কথা বলছো?"
"হ্যা।"
"কি জানতে চাও বলো?"
"না তেমন কিছু না,আসলে এখানে আসার পর থেকে লোকমুখে নানান কথা শুনতে পাচ্ছি তো তাই।"
"কি কথা,ঐ বাড়িতে ভূত থাকে,বাড়িটা অভিশপ্ত এইসব তাই তো?"
"হ্যা। আপনি ঠিকি ধরেছেন। সেদিন আমার গাড়ির ড্রাইভারও একই কথা বলছিলো।"
"তা তোমার কি মনে হচ্ছে,তুমি তো বাড়িটার একদম কাছেই থাকো। রাস্তার এপার-ওপার। তোমার চোখে কি ওসব কিছু পড়েছে?"
"নাহ্ তেমন কিছু পড়েনি। আচ্ছা ঐ বাড়িটাতে কারা থাকতো,আর এখন থাকেনা কেন?"
বাড়িওয়ালা এবার পত্রিকার কাগজটা একপাশে সরিয়ে রেখে বললো," ঐ বাড়ির মালিক আসলে এখানকার না। লন্ডনে থাকতো তাঁরা সহপরিবারে। নাম জাফর চৌধুরী।
মাঝেমধ্যে কাজের ব্যস্ততা কাটাতেই ঐ বিলাসবহুল বাড়িটা বানিয়েছিলো বাড়ির মালিক।
দেশে আসলে যে কয়টাদিন থাকতো ঐ বাড়িতেই থাকতো।
তারপর আবার চলে যেতো,তবে ঐ বাড়ির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিলো ঐ বাড়ির কেয়ারটেকার সুমনকে।বেশ বিশ্বস্ত লোক ছিলো। তবে বিশ্বস্থ থাকলে কি, কথায় আছেনা সবকিছুর নষ্টের মূলে নারী। ওদের ক্ষেত্রেও ঠিক একই জিনিস ঘটেছিলো।
কেয়ারটেকারের নাম ছিলো সুমন,দেখতে বেশ সুঠাম আর শ্যামবর্ণের হলেও চেহারাতে একধরনের মায়া ছিলো। হয়তো সেই মায়াতে আচ্ছন্য হয়ে পড়েছিলো বাড়ির মালকীন।আর এভাবে আসা যাওয়ার এক পর্যায়ে নাকি বাড়ির মালকীনের সাথে সুমনের অবৈধ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো বলে শোনা যায়।
"তারপর?"
"তারপর আর কি ঐ বাড়ির মালকীন তাঁদের পাঁচ বছরের মেয়েকে নিয়ে নাকি সুমনের হাত ধরে পালিয়ে যায়।"
"বাড়ির মালিক তাঁদের খোঁজার চেষ্টা করেনি?"
"তা আবার করেনি,করেছিলো। এখানকার স্থানীয় থানাতে বলেছিলো,পুলশি কিছুদিন খোঁজার পর বিষয়টা ধিরে ধিরে চাপা পড়ে গিয়েছিলো।তারপর ভদ্রলোক একাই আবার লন্ডনে ফিরে গিয়েছিলো। আর কখনো এবাড়িতে আসেন নি। তারপর থেকেই এই বাড়িটা পরিত্যক্ত হিসাবেই পরিচিত সবার কাছে। এলাকার মানুষে নানান ধরনের কথা তুলেছে বাড়িটাকে নিয়ে।
তবে আমি কখনো ওসব বুঝতে পারিনি,এমনকি কখনো দৃষ্টিগোচরও হয়নি আমার।
বুঝতেই তো পারছো,সাধারণ মানুষ তিলকে তাল বানাতে এদের কোনো জুড়ি নেই।"
বাড়িওয়ালার থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসলাম। বাড়িওয়ালার কথামত যদি ঐ বাড়ির মালকীন কেয়ারটেকারের সাথে অন্যত্র চলে যায়,তাহলে আমাদের সাথে যেগুলো হচ্ছে তার ব্যাখা কে দিবে? আদৈও কি ঐ বাড়ির মালকীন চলে গিয়েছিলো, নাকি ঘটনার আঁড়ালেও অন্য কোনো ঘটনা লুকিয়ে আছে,যা সবার অজানা?
অফিসের ডেস্কে বসে আছি এমন সময় একজন ভারী কণ্ঠজড়িত লোক এসে বললো,"স্যার ভালা আছেন?"
একটা জরুরি ফাইল নিয়ে ঘাটাঘাটি করছিলাম,তাই সেদিকে না তাকিয়েই বললাম,"এখন চা খাবো না। পরে ইচ্ছে করলে ডেকে নিবো।"
সামনে থাকা লোকটা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ডেস্কের উপর একটা সাদা কাগজ রেখে চলে গেলো।
আমি ফাইল থেকে চোখ সরিয়ে সামনের দিকে তাকাতেই দেখলাম,আমাদের অফিসের চা বয় করিম চাচা দূরে দাঁড়িয়ে আছে।
কাগজটা হাতে নিয়ে দেখলাম তাতে একটা ফোন নাম্বার লিখা রয়েছে।
চা বয় চাচাকে ডাক দিলাম।
"করিম চাচা একটু এদিকে আসো তো।"
করিম চাচা সন্তপর্ণে ছুটে এসে বললো,"হ স্যার কিছু কইবেন,চা লাগবো নি?"
আমি হেসে বললাম,"না চাচা,এইটা কিসের কাগজ দিয়ে গেলে আমাকে? কার ফোন নাম্বার এইটা?"
করিম চাচা খানিকটা অবাক হয়ে বললো,"স্যার আমি তো আপনারে কিছু দেয় নাই।"
"একটু আগেই না আমার ডেস্কের সামনে এসে কাগজটা দিয়ে গেলে আমাকে?"
"নাতো স্যার,আমি তো আমার জায়গাতেই দাঁড়াইয়া ছিলাম। আপনি ডাকনের পর আইছি।"
"তুমি ছাড়া কি আর কোনো লোক এসেছিলো,বয়স্ক টাইপের? বা আমার ডেস্কের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছো কাউকে একটু আগে?"
"কোই নাতো,কাউরে তো দেখি নাই।"
দারোয়ানকে জিজ্ঞাসা করলে সেও জানালো,সে ওমন কোনো লোককে ভিতরে আসতে দেখেনি।
কাগজটা হাতে নিয়ে চেয়ারে ধপাস করে বসে পড়লাম।
একটু আগে তাহলে যে বয়স্ক লোকটা আমার ডেস্কের সামনে এসেছিলো সে কে ছিলো?
আর কেউ যদি না আসে,তাহলে কাগজটা কে দিয়ে গেলো?"
কোনোকিছু না ভেবেই কাগজে থাকা নাম্বারটা মোবাইলে টাইপ করে কল দিলাম। ল্যান্ড ফোনের নাম্বার।নাম্বারে রিং হচ্ছে। রিং শেষ হওয়ার মূহুর্তে একজন ভারী কণ্ঠে বলে উঠলো,"হ্যালো জাফর বলছি?"
আমি ফোনটা কানে নিয়ে কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে বসে রয়লাম,ওপাশ থেকে একনাগাড়ে ভদ্রলোক হ্যালো হ্যালো করেই চলেছে।
এই জাফর কি সকালে বাড়িওয়ালার বলা ঐ জাফর?
আমি বললাম,"হ্যালো। আমি কলাতলীর সাত নাম্বার রোডের বারো নাম্বার বাসার ভাড়াটিয়া বলছিলাম।"
ফোনের ওপাশটা কিছুক্ষণ নিরব থাকার পর বললো,"কলাতলী,কোন কলাতলী?"
"কুসুমপুর কলাতলী,আপনি তো জাফর চৌধুরী তাই না?"
লোকটা এবারো কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর বললো,"ওহ আচ্ছা,তা কে বলছেন আর কেন ফোন দিয়েছেন,নাম্বার কোথায় পেয়েছেন আমার?"
"আসলে সেসব বলতে গেলে অনেক সময় লাগবে। আসলে আপনার কাছে যে জন্য ফোন দিয়েছি, আপনার ফেলে রাখা ডুপ্লেক্স বাড়িটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে।
আর আমি একজন কর্পোরেট অফিসার,আপনার বাড়ির সামনের বাড়ির ভাড়াটিয়া।
আসলে আপনার বাড়িটা যেহেতু খালি পড়ে আছে,আমি চায়ছিলাম আপনার বাড়িটা ভাড়া নিতে।"
লোকটা এবার বেশ ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বললো,"আপনি কি আমাকে টাকার লোভ দেখাচ্ছেন,ঐ সামান্য কিছু ভাড়ার টাকা দিয়ে তো আমার একদিনও চলবে না।"
আমি নিজেকে শান্ত রেখে বললাম,"তা জানি,তবে আপনার বাড়িটা তো শুধু শুধু পড়ে নষ্ট হচ্ছে।
এতো বিলাসবহুল বাড়িটা পরিচর্যার অভাবে নষ্ট হচ্ছে দেখেই আপনাকে ফোন দিয়েছিলাম,আপনি যখন রাজি না তাহলে আর কি করার।"
কথাটা বলে ফোন রেখে দিচ্ছিলাম,তখনি ওপাশ থেকে ভেসে আসলো,"আপনার যখন বাড়িটা এতোই মনে ধরেছে,তাহলে আপনি চায়লে বাড়িটা একবারে কিনে নিতে পারেন,পারবেন?"
ভদ্রলোককে সামনা-সামনি যেহেতু দেখার ইচ্ছে ছিলো,তাই বললাম,"হ্যা পারবো। তারজন্য তো আপনাকে এখানে আসতে হবে।"
"আচ্ছা ঠিক আছে,আর তাছাড়া আমি এমনিতেও যেতাম। বাড়িটা বিক্রির জন্য,কয়েকজন বিল্ডারের সাথেও এ বিষয়ে কথা বলে রেখেছি। আপনার যেহেতু বাড়িটা এতোই পছন্দ হয়েছে,তাহলে আপনার সাথে একটাবার বসা যেতেই পারে। আমি কয়েকদিনের ভিতরে বাংলাদেশে যাচ্ছি। তখন কথা হবে।"
বলেই লোকটা লাইনটা কেটে দিলো।
আমি ফোনটা হাতে নিয়ে হতভম্ব হয়ে বসে ভাবতে লাগলাম,এই লোকটাকে যে আমি মনে খুঁজছি মনে খুঁজছি তা অন্যকেউ জানলো কিভাবে?
আমি তো কাউকে বলিও নি,আর যেই লোকটা আমাকে কাগজটা দিয়ে গেলো সেই বা কে ছিলো? ভদ্রলোক আসলেই সবকিছু পরিস্কার হয়ে যাবে।
চলবে....