24/08/2026
ঘুরিয়ে উত্তর, যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রশ্নে স্পষ্ট করলেন না পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে আলোচনা নতুন করে সামনে এসেছে। তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, সোমবার সাংবাদিকদের সরাসরি এমন প্রশ্ন করা হলেও তিনি নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি স্পষ্ট করে জানাননি। বরং নিজের দেশপ্রেম ও বাংলাদেশের প্রতি অবস্থানের কথা তুলে ধরে প্রশ্নটির উত্তর এড়িয়ে যান।
সোমবার (২৪ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় এ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, “আমি বাংলাদেশি, এখানে এসেছি বাংলাদেশের মিনিস্টার হিসেবে। আমার মনে আমার দেশপ্রেম, আমার অবস্থান নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলবে না।”
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে এসে দেশের জন্য কাজ করছেন এবং কোনো সুবিধাভোগী ব্যক্তি এমন অবস্থান নেবেন না।
তবে সাংবাদিকদের মূল প্রশ্ন ছিল অন্য জায়গায়। তিনি বিদেশি নাগরিকত্ব, বিশেষ করে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব, আনুষ্ঠানিকভাবে ত্যাগ করেছেন কি না, সেটি জানতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়ে ‘ত্যাগ করেছি’ বা ‘ত্যাগ করিনি’ এমন কোনো সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে হুমায়ুন কবিরের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, তিনি শৈশবেই পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাজ্যে যান এবং সেখানেই বড় হয়েছেন। যুক্তরাজ্য বিএনপির কয়েকজন নেতার বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে তাকে ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, তিনি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার আগে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে ত্যাগ করেছেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সোমবারের সংবাদ সম্মেলনে একজন সাংবাদিক বিষয়টি আবার তুললে হুমায়ুন কবির কিছুটা রসিকতার সুরে বলেন, “আমি তো সিটিজেন নিয়ে আসি, আপনি বলেন নেটিজেন।” পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে এবং এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে জানালে তিনি প্রশ্ন করেন, কোন সংবাদপত্রে তা প্রকাশিত হয়েছে।
একপর্যায়ে তিনি সিলেটি আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, “কার এত জ্বালা কাজ-কর্ম বাদ দিয়া?” এরপর ২০০৮ এবং মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দিনের সময়কার প্রসঙ্গও টেনে আনেন।
তবে পুরো বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়নি: তিনি বর্তমানে ব্রিটিশ নাগরিক কি না, অথবা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার আগে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে পরিত্যাগ করেছেন কি না।
এখানেই মূল প্রশ্নটি থেকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকত্বের বিষয়ে নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। তবে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে বিদেশি নাগরিকত্বের বিষয়টি কীভাবে প্রযোজ্য হবে, তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট আইনি ও সাংবিধানিক বিধানের ব্যাখ্যার ওপর। ফলে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য বা দেশপ্রেমের দাবি দিয়ে নাগরিকত্বের আইনি অবস্থান নির্ধারণ করা যায় না।
এ প্রসঙ্গে দ্বৈত নাগরিকত্বের আইনগত কাঠামোও জটিল। বাংলাদেশ নির্দিষ্ট কিছু দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ দেয় এবং যুক্তরাজ্য সেই তালিকাভুক্ত দেশগুলোর একটি। অতীতে সরকারি তথ্যেও বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব গ্রহণ করলেও কেউ বাংলাদেশি নাগরিকত্ব পরিত্যাগ না করলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তার বাংলাদেশি নাগরিকত্ব বহাল থাকতে পারে।
তাই হুমায়ুন কবিরের ক্ষেত্রে আসল প্রশ্ন শুধু তিনি ‘বাংলাদেশি’ কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ধরে রেখেছেন কি না এবং যদি রেখে থাকেন, তাহলে বর্তমান রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের ক্ষেত্রে তার আইনগত অবস্থান কী।
সোমবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি দেশের প্রতি নিজের আনুগত্য ও দেশপ্রেমের বিষয়টি জোর দিয়ে তুলে ধরেছেন। কিন্তু বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রশ্নে সরাসরি উত্তর না দেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা আরও বাড়তে পারে।
এখন বিষয়টির সবচেয়ে পরিষ্কার সমাধান হতে পারে প্রতিমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সরাসরি জানানো যে তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না এবং করে থাকলে কবে ও কীভাবে তা করেছেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি বা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে বিতর্কেরও অবসান ঘটতে পারে।
বর্তমানে পাওয়া বক্তব্যের ভিত্তিতে তাই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না যে হুমায়ুন কবির ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন। বরং তার নিজের বক্তব্যে সেই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর এখনো অনুল্লেখিতই রয়ে গেছে।