14/04/2025
দুই হাঁটু উঠিয়ে কি খানা খাওয়া সুন্নত?
আসন করে বসে খাওয়া কি নাজায়েয?
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
لَا آكُلُ مُتَّكِئًا
আমি হেলান দিয়ে খাই না। -সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫৩৯৮
গোলাম ও বান্দা যেভাবে খায় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেভাবে খেতেন।
হাদীসে এসেছে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
آكل كما يأكل العبد، وأجلس كما يجلس العبد .
আমি খাই বান্দা যেভাবে খায়। এবং আমি বসি সেভাবে যেভাবে বান্দা বসে।–
তবাকাতু ইবনে সাআদ, মুসনাদে আবু ইয়ালা আল মাওসিলী-কাশফুল খফা ১/১৬, ইমাম আজলূনী রহ. এটিকে হাসান বলেছেন। আরো দেখুন; ফাইযুল কাদীর ১/১৩৭
হেলান দিয়ে খাওয়া যেহেতু মাকরূহ বা অনুত্তম সুতরাং হেলান না দিয়ে খাওয়া উত্তম ও মুস্তাহাব।
হেলান না দিয়ে খাওয়ার তরিকা হচ্ছে (নামাযের) তাশাহহুদের মতো করে বসে খাওয়া কিংবা এক হাঁটু বিছিয়ে আরেক হাঁটু উঠিয়ে খাওয়া।
হাফেজ ইবনে হাজার রহ. বলেন,
وإذا ثبت كونه مكروها أو خلاف الاولى فالمستحب في صفة الجلوس للاكل أن يكون جاثيا على ركبتيه وظهور قدميه أو ينصب الرجل اليمني ويجلس على اليسرى
যখন প্রমাণিত হলো যে, হেলান দিয়ে খাওয়া মাকরূহ বা অনুত্তম সুতরাং খানা খেতে বসার মুস্তাহাব তরিকা হচ্ছে দুই হাঁটু বিছিয়ে পায়ের উপর বসবে কিংবা ডান পা উঠিয়ে বাম পায়ের উপর বসবে। -ফাতহুল বারী ২৭/১৩
বদরুদ্দীন আইনী রহ. একই কথা বলেছেন।–উমদাতুল কারী ১০/৩৫৫
তার বক্তব্যের আরবি পাঠ;
وإذا ثبت كونه مكروها أو خلاف الأولى فاستحب في صفة الجلوس للأكل أن يكون جاثبا على ركبتيه وظهور قدميه أو ينصب الرجل اليمنى ويجلس على اليسرى
গাজালী রহ.ও এই দুইভাবে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বসার কথা উল্লেখ করেছেন। –ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন ২/৪
গাজালী রহ. এর বক্তব্যের আরবি পাঠ;
الرابع أن يحسن الجلسة على السفرة في أول جلوسه ويستديمها كذلك كان رسول الله صلى الله عليه و سلم ربما جثا للأكل على ركبتيه وجلس على ظهر قدميه وربما نصب رجله اليمنى وجلس على اليسرى
হাঁটু বিছিয়ে পায়ের উপর (তাশাহহুদের মতো করে) বসে খাওয়ার বর্ণনাটি এসেছে সুনানে আবু দাউদ ও সুনানে ইবনে মাজায়।
বর্ণনাটি এই;
قال ابن ماجه في سننه
3263 - حدثنا عمرو بن عثمان بن سعيد بن كثير بن دينار الحمصي . حدثنا أبي . أنبأنا محمد بن عبد الرحمن بن عرق . حدثنا عبد الله بن بسر قال أهديت للنبي صلى الله عليه و سلم شاة . فجثى رسول الله صلى الله عليه و سلم على ركبتيه يأكل . فقال أعرابي ماهذه الجلسة ؟ فقال ( إن الله جعلني عبدا كريما ولم يجعلني جبارا عنيدا )
في الزوائد إسناده صحيح رجاله ثقات
আব্দুল্লাহ ইবনে বুসর রা. বলেন, আমি রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একটি (ভুনা) ছাগল হাদিয়া দিলে তিনি দুই হাঁটু বিছিয়ে (পায়ের উপর) বসে খাচ্ছিলেন। তখন এক বেদুঈন বলল, এটা আবার কী ধরনের বসা। জবাবে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু বললেন, আল্লাহ তাআলা আমাকে সম্মানি বান্দা বানিয়েছেন। দুর্ধর্ষ অবাধ্য বানাননি।–সুনানে ইবনে মাজা, হাদীস ৩২৬৩,
আরো দেখুন সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ৩৭৭৫
হাফেজ ইবনে হাজার রহ. এ হাদীসকে হাসান বলেছেন। -ফাতহুল বারী ২৭/১৩, ইমাম বূসিরী রহ. এটিকে সহীহ বলেছেন।
ডান পা উঠিয়ে বাম পায়ের উপর বসার বর্ণনা ইরাকী রহ. আল মুগনীতে (২/৪)উল্লেখ করেছেন। সেটির সনদ যয়ীফ।
ইরাকী রহ. এর বক্তব্যের আরবি পাঠ;
قال العراقي في المغني 2\4
وروى أبو الحسن بن المقري في الشمائل من حديثه كان إذا قعد على الطعام استوفز على ركبته اليسرى وأقام اليمنى ثم قال إنما أنا عبد آكل كما يأكل العبد وأفعل كما يفعل العبد وإسناده ضعيف
এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, হেলান দিয়ে বসে খাওয়া মাকরূহ বা অনুত্তম। হেলান না দিয়ে বসে খাওয়া হচ্ছে মুস্তাহাব ও উত্তম। হেলান না দিয়ে বসে খাওয়ার দুটি তরিকা হাফেজ ইবনে হাজার এবং আইনী রহ. দেখিয়েছেন।গাজালী রহ. সেই দুই তরিকা হাদীসে থাকার কথা বলেছেন। (যা আমরা উপরে উল্লেখ করেছি।)
যদি হেলান না দিয়ে খাওয়া উত্তম বা মুস্তাহাব হয় যেমনটি ইবনে হাজার ও আইনী রহ. বলেছেন তাহলে হেলান না দিয়ে খাওয়ার শুধু দুই তরিকা হবে না বরং আরো তরিকা ও পদ্ধতি হবে। যেমন ডান পা উঠিয়ে বাম পা বিছিয়ে নিতম্বের উপরে বসা। বা বাম পা উঠিয়ে ডান পায়ের উপরে বসা। কিংবা বাম পা উঠিয়ে ডান পা বিছিয়ে নিতম্বের উপর বসা। এই সকল বসার তরিকা মুস্তাহাব ও উত্তম হবে।
আসন করে বসা
আসন করে (দুই পা বিছিয়ে নিতম্বের উপর) বসাও যেহেতু হেলান দিয়ে বসার মধ্যে পড়ে না তাই এটিও নাজায়েয তরিকা হবে না।
কারো কারো মতে আসন করে বসা “ইত্তিকা” এর অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এ মত সঠিক মনে হয় না।
কুরআন-হাদীসে مُتَّكِئًا শব্দ অনেক জায়গায় এসেছে।সব জায়গায় অথ হচ্ছে হেলান দিয়ে বসা। সুতরাং এ হাদীসেও হেলান দেওয়াই উদ্দেশ্য হবে। আসন করে বসা উদ্দেশ্য হবে না। হাদীসে এসেছে,
وَكَانَ مُتَّكِئًا فَجَلَسَ
তিনি হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। তখন তিনি উঠে বসলেন। -সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫৯৭৬
দুই পা উঠিয়ে বসা
আনাস রা. বলেন,
رَأَيْتُ النَّبِىَّ -صلى الله عليه وسلم- مُقْعِيًا يَأْكُلُ تَمْرًا.
আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দুই পা উঠিয়ে নিতম্বের উপর বসে খেজুর খেতে দেখেছি। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৫৪৫২
এটি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খাবার খাওয়ার স্বাভাবিক অবস্থা নয়। বরং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্ষুধার কারণে এভাবে খেজুর খেয়েছেন। ইমাম তিরমিজী রহ. শামায়েলে (১৪২) সেটি স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন।
ইমাম তিরমিজীর বর্ণনা
142 - حدثنا أحمد بن منيع قال : حدثنا الفضل بن دكين قال : حدثنا مصعب بن سليم قال : سمعت أنس بن مالك يقول : « أتي رسول الله صلى الله عليه وسلم بتمر فرأيته يأكل وهو مقع من الجوع »
(আনাস রা. বলেন,) আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ক্ষুধার কারণে দুই পা উঠিয়ে নিতম্বের উপর বসে খেজুর খেতে দেখেছি।–শামায়েলে তিরমিজী, হাদীস: ১৪২ (সহীহ)
সুতরাং এভাবে বসাকে খানা খাওয়ার আদব বলা যায় না। এজন্যই হাফেজ ইবনে হাজার রহ. এভাবে বসাকে খানা খাওয়ার আদব হিসেবে উল্লেখ করেননি। যদিও তিনি এ হাদীস পূর্বে উল্লেখ করেছেন।
যদি মেনেও নেওয়া হয় এটি খানা খাওয়ার আদব তাহলেও খানা খাওয়ার আদবের মধ্যে বসার অন্যান্য মুস্তাহাব তরিকা উল্লেখ না করে শুধু এটি উল্লেখ করা ঠিক নয়। কেননা তখন খানা খেতে বসার অন্যান্য মূল মুস্তাহাব তরিকাগুলো অস্বীকার করার মতো হয়ে যায়। তাই মক্তবের বইয়ে দুই হাঁটু উঠাইয়া খাওয়ার সময় সুন্নত বা আদব হিসেবে পড়ানো ঠিক নয়।