10/11/2022
ক্রিকেটের প্রেমে পড়লাম বাংলাদেশ যেদিন থেকে আইসিসি টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হলো, সেদিন থেকে। বিশ্বকাপে প্রথমবার খেলতে গিয়েই বাংলাদেশ হারিয়ে দিল পাকিস্তানকে, সে কি ভাই যায়রে ভোলা! শচীন-সৌরভের ভারতকে বাংলাদেশের পুঁচকে সাকিব-তামিম-মুশফিক পিটিয়ে তুলোধুনো করেছিল আরেক বিশ্বকাপে। ভাষ্যকাররা বলছিলেন, ফিয়ারলেস ক্রিকেট। এখানেই আসে রবীন্দ্রনাথের কথা আর গান। বাংলাদেশ যেদিন ভয়হীন ক্রিকেট খেলে ভারত কিংবা ইংল্যান্ডকে হারায়, রবীন্দ্রনাথ তখন বলেন: ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য উচ্চ যেথা শির’।
বাংলাদেশ যখন বিশ্বকাপে খেলতে যায়, তখন রবীন্দ্রনাথ বলেন: ‘বিশ্বসাথে যোগে যেথায় বিহারো, সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারও...’ সাকিব আল হাসান যখন টি-টোয়েন্টির ক্যাপ্টেন হন এবং একাই লড়তে থাকেন, তখন এ কথা তাঁর মনে পড়েই: ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’। আর যখন সবাই মিলেই এক টিম হয়ে উঠে দারুণ ছন্দে খেলতে থাকেন, তখন রবিবাবুর গানে তাঁরা কণ্ঠ মেলান: ‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে, নইলে মোদের রাজার সাথে মিলব কী শর্তে’। তারপর সাকিব বা লিটন যখন দেখেন, তাঁদের পার্টনাররা একে একে চলে যাচ্ছেন, তাঁরা গেয়ে ওঠেন, ‘যেও না, যেও না ফিরে, দাঁড়াও বারেক দাঁড়াও হৃদয়-আসনে।’
কিন্তু ‘যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়।’ আর মোস্তাফিজ যখন মার খেতে থাকেন, ছক্কা দিতে থাকেন, তার জন্যও রবিবাবু লিখে রেখে যেতে ভোলেননি, ‘আমি মারের সাগর পাড়ি দিব রে, ভীষণ ঝড়ের রাতে।’ কিংবা আশরাফুলকে যখন নিষিদ্ধ করা হয়, তিনি গেয়ে ওঠেন, ‘আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী, আমি সকল দাগে হব দাগী!’ আর এদিকে যখন বাম হাতি ব্যাটসম্যানের বিপরীতে বাম হাতি বোলার না দেওয়ার সিদ্ধান্তে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ অটল থাকেন, তখন সাকিব গাইতে থাকেন রবীন্দ্রনাথের গান: ‘বল দাও মোরে বল দাও, প্রাণে দাও মোরে শকতি/ সকল হৃদয় লুটায়ে তোমারে করিতে প্রণতি।’ উইকেট পেলে সাকিব স্যালুট দেন, এখানে প্রণতি বলতে সেটাকেই বুঝিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ রসিক ছিলেন, তিনি যদি অ্যান্ড্রুজকে বলে থাকতে পারেন যে ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে ওগো বিদেশিনী’ গানের ইংরেজি হচ্ছে ‘আই অ্যাম সুগার...’ তিনি বলতেই পারতেন, ‘বল দাও মানে, গিভ মি দ্য বোল, আই উল হিট দ্য মিডল স্টাম্প অ্যান্ড দেন টেক আ বাও।’
বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে প্রকাশ করতে পারেন ক্রিকেট-মাঠের চড়াই-উতরাইয়ের অভিব্যক্তি। ভারতে এখন কোনো বাঙালি খেলোয়াড় নেই, বেচারা পশ্চিমবঙ্গবাসী, বেচারা রবীন্দ্রনাথ, বাংলাদেশিরাই আজ বিশ্বদরবারে রবীন্দ্রবার্তাবাহী! ইংরেজদের আছে শেক্সপিয়ার। তাদের দুই ব্যাটসম্যান যখন বলে, টু রান অর নট টু রান, দ্যাট ইজ দ্য কোশ্চেন, তখনই ঘটে যায় রানআউট। দুর্বল ব্যাটসম্যান আউট হয়ে যদি একজন ভালো ব্যাটসম্যানের আগমনের সুযোগ করে দেয়, শেক্সপিয়ারের রোমিও জুলিয়েটের সংলাপ চলতে পারে: পার্টিং ইজ সাচ সুইট সরো।
রবীন্দ্রনাথ নিজে ক্রিকেট খেলতে নেমেছিলেন। বল এসে তাঁকে আঘাত করেছিল। এরপর তিনি আর ক্রিকেট খেলেননি।
আমার ক্ষেত্রে হয়েছিল তার চেয়েও ভয়ংকর ব্যাপার। ব্যাটসম্যানের নাকের ডগায় দাঁড়িয়ে (শর্ট লেগ?) ফিল্ডিং করছিলাম, ব্যাটসম্যানের ব্যাট সোজা এসে পিঠ বরাবর কোপ বসাল। ভাগ্যিস পিঠ ব্যাটের কানায় লাগেনি, লেগেছে ব্যাটের মাঝবরাবর, তাই বেঁচে আছি এবং লিখছি।
পৃথিবীর বড় ক্রিকেটলেখকেরা যেমন বড় সাহিত্যিকের সম্মান পাবেন, তেমনি বড় সাহিত্যিকেরাও ক্রিকেট নিয়ে লিখেছেন। শামসুর রাহমান, শীর্ষেন্দু, নির্মলেন্দু গুণ, এমনকি হুমায়ূন আহমেদ পর্যন্ত। ক্রিকেট নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আছে—
‘তোমাদের গজগামিনীর দিনে;
কবির কল্পনা নেয়নি তো চিনে
কেনেনি ইসটিশনের টিকেট
হৃদয়ক্ষেত্রে খেলেনি ক্রিকেট।’
পাদটীকা: এবারের টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশকে নিয়ে আমার কোনো উত্তেজনা নেই। শঙ্কা আছে। হারাই হারাই সদা হয় ভয়। তবে আশাও আছে। শ্রীলঙ্কা যদি এশিয়া কাপ জিততে পারে, তাহলে বাংলাদেশ কেন এবারের বিশ্বকাপে ভালো করবে না। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলি,
মুহূর্ত তুলিয়া শির একত্র দাঁড়াও দেখি সবে,
যার ভয়ে তুমি ভীত সে অন্যায় ভীরু তোমা চেয়ে,
যখনি জাগিবে তুমি তখনই সে পলাইবে ধেয়ে।
সাকিব, ভয়হীন ক্রিকেট খেলুন। দায়িত্বহীন নয়। মাঠে শতভাগ দিন। দেড় শ ভাগ আদায় করেন সহখেলোয়াড়দের কাছে। নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়, খুলে যাবে এই (ফর্ম ফিরে পাওয়ার) দ্বার!
(আনিসুল হক। আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত লেখার অংশবিশেষ)
সংগৃহিত