21/03/2026
নীলার ডায়েরির পাতায় আজ তারিখের জায়গাটা শূন্য। সে মনে করতে পারছে না আজ কী বার, কিংবা মাসের কত তারিখ। উচ্চশিক্ষা অর্জন করলেও কুচক্রীদের কুচক্রের অন্তরালে সবকিছু ধুলো জমিয়ে পড়ে আছে, ঠিক যেমন নীলার অস্তিত্বটা এই বিশাল শৌখিন বাড়িতে ধুলোবালি আর অবহেলার নিচে চাপা পড়ে গেছে।
নীলা দেখতে মোটামুটি সুন্দর, কথা বলে গুছিয়ে। কিন্তু স্বামীর সংসারে পা রাখার পর থেকেই তার সেই গুণ যেন অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভাবী ঘরের মেয়ে বলে শ্বশুরবাড়ির প্রতিটি মানুষের চোখে সে ছিল স্রেফ একটা 'সস্তা পণ্য'।
বিভিন্ন সস্তা রীতিনীতি প্রথা পালন করতে নীলার পরিবার ব্যর্থ হলে সেই অপরাধে তাকে যে অমানুষিক বাক্যবাণ সহ্য করতে হয়েছে, তা তিলে তিলে তার আত্মাকে কুরে খেয়েছে।
নীলা বুঝতে পারল, এই চার দেয়ালের মানুষগুলো তাকে পাগল প্রমাণ করতে চায়। সে তারিখ ভুলে যাচ্ছে, জিনিস কোথায় রাখছে মনে করতে পারছে না—এটা তার স্মৃতিভ্রম নয়, এটা তাদের দেওয়া অসহ্য মানসিক চাপের ফল।
নীলা আয়নার সামনে দাঁড়াল। আজ সে কাঁদবে না। তার চোখের জলে এই অযোগ্য স্বামী বা পাষাণ পরিবারের কারও কিছু যায় আসে না।
স্বামী পাশে থেকেও নেই। রাতের আঁধারে যখন নীলার বালিশ চোখের জলে ভিজে যায়, পাশে থাকা মানুষটি তখন নিশ্চিন্তে নাক ডেকে ঘুমায়। নীলার মনে হয়, সে একাই এক মহাসমুদ্রে খড়কুটো ধরে ভেসে আছে।
মা মারা যাওয়ার পর সেই শেষ আশ্রয়টুকুও হারিয়ে গেছে। মাঝে মাঝে নীলার ইচ্ছা করে সব ছেড়ে কোথাও চলে যেতে। কিন্তু আড়ালে আড়ি পেতে থাকা দুই জোড়া ছোট ছোট চোখ তাকে থামিয়ে দেয়। তার দুই সন্তান। তাদের মুখের দিকে তাকালে নীলা বুঝতে পারে, সে মরে গেলে, এই নিষ্পাপ শিশু দুটিকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। সে এখন আর রক্ত-মাংসের মানুষ নেই, সে এক 'জীবন্ত লাশ'—যে শুধু সন্তানদের জন্য শ্বাস নেয়।
সেদিন বিকেলে জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে নীলার হঠাৎ মনে হলো, চারপাশের এই অন্ধকারের মাঝেও তার ভেতরে একটা প্রদীপ জ্বলছে। তার শিক্ষা। পরিবার তাকে 'বোঝা' মনে করেছে, কিন্তু তার মেধা তো কেউ কেড়ে নিতে পারেনি। সে বিড়বিড় করে নিজেকে বলল, "আমি হারবো না। আমার নাম নীলা, বিষ নীল হয়েও আমি নীলপদ্ম হয়ে টিকে থাকবো।"
ডায়েরির কলমটা হাতে তুলে নিয়ে সে কাঁপাকাঁপা হাতে লিখল— "আজ থেকে আমি আর কারো কটু কথার জবাব দেব না। আমার নীরবতাই হবে আমার ঢাল। আমি বাঁচবো, আমার সন্তানদের জন্য।"
........