29/07/2026
১.
বলটা জালে জড়িয়ে যাওয়ার সাথে সাথে গুমোট নিস্তব্ধতা নেমে এলো দর্শকদের মাঝে, সেই সঙ্গে যেন থমকে গেলেন ইস্পাত-কঠিন মনোবলের শিবদাস ভাদুড়ীও।
গ্যালারিতে বসে রুমাল নেড়ে উল্লাস শুরু করেছেন ইংরেজ মেমসাহেবরা। আকাশে উড়ছে কালো ঘুড়ি। ম্রিয়মাণ আশি হাজার বাঙালির দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠেছে কলকাতার বাতাস।
খেলার তখন আর মাত্র মিনিট দশেক মতো বাকি। সময়ের কাঁটা নিষ্ঠুরভাবে এগিয়ে চলেছে তার চূড়ান্ত গন্তব্যের দিকে। সেন্টার সার্কেলের দিকে এগোতে এগোতে শিবদাস ভাবলেন, তবে কি এবারও হলো না? আইএফএ শিল্ড শুরু হওয়ার পরে, গত আঠারো বছর ধরে কোনো ভারতীয় দল এই শিল্ড ছুঁতে পারেনি। এতটা পথ পেরিয়ে এসে, গোটা একটা জাতির স্বপ্ন কাঁধে নিয়ে, আবারও কি তবে হার নিয়েই ফিরতে হবে?
কিন্তু শিবদাস ভাদুড়ী মাথা নোয়ানোর মানুষ নন। তাই পরের দশ মিনিটে যা ঘটলো, তা বদলে দিলো গোটা এক জাতির ইতিহাস। আর ইতিহাস ওই এগারোজনকে মনে রাখবে একটাই নামেঃ অমর একাদশ।
২.
এই ম্যাচের গুরুত্ব বুঝতে হলে তখনকার বাঙালিকে ইংরেজরা ঠিক কোন চোখে দেখতো, তা বোঝাটা খুব জরুরী।
ঔপনিবেশিক শাসকদের একটা প্রিয় তত্ত্ব ছিল, যাকে বলা যায় ‘মেয়েলি বাঙালি’ তত্ত্ব। সরকারি ফাইলে, ইংরেজি পত্রিকায়, এমনকি পাঠ্যবইয়েও লেখা হতো যে বাঙালি জাতটা শারীরিকভাবে দুর্বল, ভীরু, যুদ্ধের অযোগ্য। শুধু কেরানিগিরির জন্যই তারা উপযুক্ত।
এই তত্ত্বটা নিছক অপমান ছিল না, ছিল শাসনের হাতিয়ার। যে জাতকে শারীরিকভাবে অক্ষম প্রমাণ করা যায়, তাকে রাজনৈতিকভাবে অযোগ্য প্রমাণ করাও সহজ।
আর ঠিক এই কারণেই খেলাধুলা তখন বাঙালির কাছে নিছক বিনোদন ছিল না। সেই সময় ভারতের রাজধানী ছিল কলকাতা। ব্রিটিশদের দম্ভ আর বাঙালির অবদমিত ক্ষোভের মধ্যে ফুটবল ছিল একমাত্র জায়গা, যেখানে সাহেবদের চোখে চোখ রেখে লড়াই করা যেত। ১৯১১ সালের আগে কোনো ভারতীয় দল আইএফএ শিল্ড জেতার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। শিল্ড জেতা তো দূরের কথা, সাদা চামড়ার দলগুলোর বিরুদ্ধে পাল্লা দেওয়াই ছিল তখন আকাশকুসুম কল্পনা।
তার ওপর সময়টা ছিল বিশেষ। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন বাংলাকে দুই ভাগে ভাগ করে দিয়েছেন। গোটা বাংলা তখন ফুঁসছে। স্বদেশি আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে ঘরে ঘরে, বিলিতি পণ্য বর্জনের ডাক উঠেছে, আর একদল তরুণ বেছে নিয়েছে সশস্ত্র বিপ্লবের পথ।
এমন এক উত্তপ্ত সময়ে খেলার মাঠে সাহেবদের হারানো মানে কী, তা আলাদা করে বলে দিতে হয় না।
৩.
১৮৮৯ সালের ১৫ আগস্ট প্রতিষ্ঠিত হয় মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাব। কলকাতার তিনটি অভিজাত পরিবার; মিত্র, সেন আর বসু মিলে গড়ে তোলেন এই ক্লাব। মজার ব্যাপার হলো, ঠিক আটান্ন বছর পর এই একই তারিখে ভারত স্বাধীন হবে এবং তিন টুকরো হয়ে যাবে।
তৎকালীন ভারতবর্ষের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ফুটবল প্রতিযোগিতা আইএফএ শিল্ড চালু হয় ১৮৯৩ সাল থেকে। ভারতীয় দলগুলো এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারতো বটে, কিন্তু আঠারো বছরে একটিবারের জন্যও কোনো দেশীয় দল শিরোপা জেতেনি। জেতার কথাও নয়। সাহেবদের রেজিমেন্ট দলগুলোর পেছনে ছিল সেনাবাহিনীর পুরো পরিকাঠামো, নিয়মিত অনুশীলন, উন্নত সরঞ্জাম আর ইউরোপীয় প্রশিক্ষণ। আর ভারতীয় ক্লাবগুলোর ছিল কেবল ইচ্ছাশক্তি।
এমনকি কলকাতা ফুটবল লিগেও তখন দেশীয় দলের প্রবেশাধিকার ছিল না। অর্থাৎ, মোহনবাগানের ফুটবলাররা নিয়মিত প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলই খেলতে পারতেন না।
১৯১১ সালের দলটির পেছনে ছিলেন ক্লাব সেক্রেটারি শৈলেন বসু, যিনি নিজে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর সুবেদার ছিলেন। দলগঠন আর কৌশলে তিনি এনেছিলেন বেশ কিছু পরিবর্তন।
মোহনবাগানের এই দলে ছিলেনঃ হীরালাল মুখার্জী, ভূতি সুকল, সুধীর চ্যাটার্জি, নীলমাধব ভট্টাচার্য, রাজেন সেনগুপ্ত, মনমোহন মুখার্জি, কানু রায়, হাবুল সরকার, বিজয়দাস ভাদুড়ী, শিবদাস ভাদুড়ী এবং অভিলাষ ঘোষ। ব্রিটিশদের শক্ত, শারীরিক ফুটবলের বিপরীতে তারা খেলতেন ছোট ছোট পাসে, গতির সাথে কৌশলের মিশেলে। একের পর এক ব্রিটিশ দলকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠার পর গোটা ভারত যেন এক অদৃশ্য সুতোয় গেঁথে গিয়েছিল। মুসলিম, হিন্দু, শিখ; সব ভেদাভেদ সেদিন গলে জল হয়ে গিয়েছিলো মোহনবাগানের সবুজ-মেরুন রঙের ছোঁয়ায়।
৪.
১৯১১ সালের আইএফএ শিল্ডে মোহনবাগানের যাত্রাটা শুরু থেকেই ছিল নাটকীয়।
প্রথম ম্যাচে প্রতিপক্ষ ছিল সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ, ব্রিটিশ ছাত্ররা সেই দলের হয়ে খেলতো। শারীরিক ফুটবলের কৌশল নিলো তারা, যাতে খালি পায়ের বাঙালি ফুটবলাররা সুবিধা করতে না পারেন। চোরাগুপ্তা আক্রমণে পেনাল্টি যখন মোহনবাগানের পাওয়ার কথা, উল্টো সেই ম্যাচে জেভিয়ার্স পেলো তিন-তিনটে পেনাল্টি।
আর সেই তিনটিই রুখে দিলেন মোহনবাগানের গোলরক্ষক হীরালাল মুখার্জি!
এক ম্যাচে তিনটি পেনাল্টি বাঁচানো, ফুটবল ইতিহাসেই যা বিরল। সেই ম্যাচ মোহনবাগান জিতলো ৩-০ গোলে।
এরপর সবুজ-মেরুন দলের কাছে একে একে পরাজিত হলো কলকাতা রেঞ্জার্স ক্লাব, রাইফেল ব্রিগেড আর মিডলসেক্স রেজিমেন্ট। রেঞ্জার্সের বিরুদ্ধে ম্যাচটা ছিল বিশেষভাবে কঠিন, কারণ সেদিন বৃষ্টি হয়েছিলো। কাদা মাঠে বুটপরা খেলোয়াড়রা যতটা সুবিধা পান, খালি পায়ের খেলোয়াড়রা ঠিক ততটাই অসুবিধার সম্মুখীন হন।
তবু মোহনবাগান জিতলো। আর পৌঁছে গেলো ফাইনালে, যেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলো ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্ট।
৫.
ফাইনালের আগের কয়েকটা দিন গোটা বাংলায় আর কোনো আলোচনা ছিল না। মানুষ আসতে শুরু করলো চারদিক থেকে। ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ে সেদিন বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করেছিলো শুধুমাত্র দর্শকদের কলকাতায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য। রায়গঞ্জ আর বরাহনগর থেকে মানুষ আনার জন্য চললো বিশেষ স্টিমার। হাইকোর্ট আর স্ট্র্যান্ড রোডের কাছে তৈরি হলো যানজট।
আর সম্ভবত ভারতীয় ক্রীড়া-ইতিহাসে সেই প্রথম, টিকিট বিক্রি হলো কালোবাজারে।
*****
২৯শে জুলাই, ১৯১১। কলকাতা ফুটবল গ্রাউন্ডের চারপাশে তিল ধারণের জায়গা নেই। গ্যালারিতে মানুষের মাথার সমুদ্র। টিকিট না পেয়ে হাজার হাজার মানুষ মাঠের চারপাশের গাছে চড়ে বসেছে, কেউ দাঁড়িয়ে আছে পাশের বাড়ির ছাদে। এমনকি শিয়ালদহ স্টেশনে ট্রেন থেকে নামা মানুষের ঢল দেখে মনে হচ্ছিলো, আজ বুঝি সারা দেশটাই কলকাতায় এসে জড়ো হয়েছে।
মাঠের বাইরে তখন জমা হয়েছে আশি হাজার মানুষ, কারো কারো হিসেবে সংখ্যাটা লাখ ছুঁয়েছে। তাদের অনেকে এসেছেন পাটনা থেকে, পূর্ণিয়া থেকে, আসাম থেকে। আর অনেকে এসেছেন নদী পেরিয়ে, ঢাকা থেকে।
মাঠের ভেতরে জায়গা না পেয়ে মানুষ উঠে পড়লেন আশপাশের গাছে, ঘোড়ার গাড়ির ছাদে, দেয়ালের ওপর। যারা মাঠে ঢুকতে পারলেন না, তারা দাঁড়িয়ে রইলেন বাইরে; ভেতরের চিৎকার শুনে ফলাফল বোঝার আশায়।
একটা চমৎকার ব্যবস্থাও হয়েছিলো সেদিন। খেলার ফল জানানোর জন্য ঘুড়ি ওড়ানোর বন্দোবস্ত। মোহনবাগান এগিয়ে গেলে উড়বে সবুজ-মেরুন ঘুড়ি, আর পিছিয়ে পড়লে কালো।
৬.
বিকেল সাড়ে পাঁচটা। মাঠে নামলো বাইশজন মানুষ। কিন্তু মাঠে নামার সেই মুহূর্তে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো জিনিসটা ছিল তাদের পা।
এক দিকে ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টের এগারোজন ব্রিটিশ সৈনিক। তাদের পায়ে চামড়ার বুট, বুটের তলায় ধাতব স্টাড। গায়ে নিখুঁত জার্সি, পায়ে মোজা, পায়ে শিনগার্ড। পেশাদার সেনাবাহিনীর মানুষ এরা, শরীরচর্চা যাদের রোজকার রুটিন।.
আর অন্যদিকে মোহনবাগানের এগারোজন বাঙালি তরুণ। পরনে গুটিয়ে নেওয়া ধুতি বা হাফপ্যান্ট। আর পা? খালি! একমাত্র সুধীর চ্যাটার্জির পায়ে বুট, বাকি দশজনই খেলতে নেমেছেন পাড়ার মাঠের মতো, পুরোপুরি খালি পায়ে।
সেদিনের ম্যাচের রেফারি ছিলেন এইচ. জি. পুলার। ম্যাচ হয়েছিলো টোটাল ২৫ + ২৫ = ৫০ মিনিটের, মাঝে ছিল ৫ মিনিটের বিরতি।
টসে হারলো মোহনবাগান। তাদের ভাগে পড়লো ইডেন গার্ডেনসের দিক, আর ইস্ট ইয়র্কশায়ার পেলো ফোর্ট উইলিয়ামের দিক।
শুরু থেকেই ঝাঁপিয়ে পড়লো মোহনবাগান, কিন্তু গোল এলো না। ফার্স্ট হাফের ২৫ মিনিট শেষ হলো। শেষ হলো ৫ মিনিটের বিরতি। শুরু হলো সেকেন্ড হাফের ২৫ মিনিট।
৫ মিনিট… ১০ মিনিট… ১৫ মিনিটও চলে গেলো।
আর তখনই একটা ফ্রি-কিক পেলো ইস্ট ইয়র্কশায়ার। হীরালাল তখনও তাঁর রক্ষণদেয়াল সাজাতে পারেননি। তার আগেই দ্রুত শট নিলেন ইয়র্কশায়ারের সার্জেন্ট জ্যাকসন। বিপদ আঁচ করতে পেরে ট্যাকল করতে গেলেন ভূতি সুকল।
লাভের চেয়ে ক্ষতি হয়ে গেলো। সুকলের পায়ে লেগে দিক বদল করলো বল, শেষ আশ্রয় হিসেবে খুঁজে নিলো জাল।
মোহনবাগান ০ - ১ ইস্ট ইয়র্কশায়ার
এরপরের ঘটনা বলা হয়েছে লেখার শুরুতেই। মাঠে নেমে এলো স্তব্ধতা। আকাশে উড়তে লাগলো কালো ঘুড়ি। গ্যালারিতে বসা ইংরেজ মেমসাহেবরা রুমাল নেড়ে উল্লাস শুরু করলেন। খেলা বাকি আর মোটে দশ মিনিট। খালি পায়ের এগারোজন বাঙালি পিছিয়ে বুট পরা এক ব্রিটিশ রেজিমেন্টের কাছে।
কিন্তু বাঙালির জেদ বড় বালাই। হারার আগে হার না মানার সেই আদিম প্রবৃত্তি জেগে উঠলো শিবদাস ভাদুড়ীদের রক্তে। অধিনায়ক শিবদাস ভাদুড়ী এক অদ্ভুত কৌশল খাটালেন। প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করতে তিনি ভাই বিজয়দাসের সঙ্গে জায়গা বদল করলেন।
এক মুহূর্তের জন্য থমকালো ইয়র্কশায়ার ডিফেন্স। কে কাকে মার্ক করবে?
সেই এক মুহূর্তই যথেষ্ট ছিল।
খেলার তখন ৪৫ মিনিট। বল পায়ে এগোলেন শিবদাস। একজনকে ড্রিবল করে কাটালেন। শরীরের ঝটকায় পেছনে ফেলে দিলেন দ্বিতীয়জনকে। বীরদর্পে বক্সে ঢুকে পড়লেন। তারপর নিলেন জোরালো শট।
গো-ও-ও-ও-ল!
মোহনবাগান ১ - ১ ইস্ট ইয়র্কশায়ার
এবার আকাশ ঢেকে গেলো সবুজ-মেরুন ঘুড়িতে। আশি হাজার কণ্ঠের গর্জনে কেঁপে উঠলো স্টেডিয়াম। রক্তের গন্ধ পেয়ে গেছে মোহনবাগান। কিন্তু সময় যে ফুরিয়ে আসছে! মিনিট গোনা শুরু। ড্র মানেও তো ইতিহাস। কিন্তু ১৮ বছরের অপেক্ষার তেষ্টা কি আর ড্রয়ে মেটে?
মরিয়া হয়ে উঠলো ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টও। কোনোভাবেই হার মানতে চায় না তারা। দুই দলই তখন ক্লান্ত, মরিয়া।
খেলার ৪৮ মিনিট। আর দুই মিনিট পরেই শেষ বাঁশি বাজিয়ে দেবেন রেফারি।
আর ঠিক তখনই বল পেয়ে গেলেন শিবদাস।
গোটা স্টেডিয়ামের নিঃশ্বাস যেন আটকে গেলো।
শিবদাস সামনের দিকে এক ঝলক তাকালেন। তারপর মাপা একটা ক্রস দিলেন সামনে ছুটতে থাকা এক ছায়ার দিকে।
ওদিকে অধিনায়কের পায়ে বল যাওয়ামাত্র দৌড় শুরু করলেন সেই ছায়ার মালিক, যার আসল নাম অভিলাষ ঘোষ। ক্রস থেকে আসা বলটাকে সিঙ্গেল টাচে সামনে নামিয়ে নিলেন তিনি। তারপর খালি পায়ে নিলেন এক বুলেটগতির শট।
‘অ-ভি-ই-ই-লা-আ-আ-ষ ঘো-ও-ও-ষ!’
সময় যেন স্লো হয়ে গেলো। আশি হাজার জোড়া চোখ দেখলো, ফুটবল নামের চর্মগোলকটা ব্রিটিশ দম্ভ, আঠারো বছরের অপেক্ষা, দুর্বল জাতের অপবাদ; সবকিছু ভেদ করে ঢুকে যাচ্ছে ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টের জালে।
গো-ও-ও-ও-ল!'
মোহনবাগান ২ - ১ ইস্ট ইয়র্কশায়ার
৭.
ম্যাচ শেষ হওয়ার পর এক অভাবনীয় দৃশ্য দেখা গেলো। গ্যালারি থেকে মানুষ পাগলের মতো মাঠে নেমে এলো। ফুটবলারদের কাঁধে তুলে নিলো তারা, তাদের ধুলোমাখা পায়ের ধুলো মাথায় ঠেকালো। মানুষের চোখের জলে নাকি সেদিন কলকাতা মাঠের ধুলো কাদা হয়ে গিয়েছিলো। সত্যি? কী যায় আসে! মোহনবাগানের খেলোয়াড়দের ব্যবহৃত গেঞ্জিগুলো ছিঁড়ে কুচিকুচি করে স্মারক হিসেবে নিয়ে গিয়েছিলো দর্শকরা। মানুষ নিজেদের জামা খুলে মাথার ওপর ঘোরাতে লাগলো। আকাশ ঢেকে গেল সবুজ-মেরুন ঘুড়িতে। ফাটলো পটকা। চারদিকে উঠলো দুটো ধ্বনিঃ ‘বন্দে মাতরম’ আর ‘মোহনবাগান কি জয়’।
আর সেই মোহনবাগান দলের একাদশ পরিচিতি পেলো ‘অমর একাদশ’ হিসেবে।
রয়টার্স ৩০ জুলাই ইংল্যান্ডে যে তারবার্তা পাঠালো; তার মর্মার্থ ছিলঃ দৃশ্যটা বর্ণনার অতীত, বাঙালিরা নিজেদের জামা খুলে ওড়াচ্ছে।
‘মুসলমান’ পত্রিকা লিখলো, মুসলিম স্পোর্টিং ক্লাবের সদস্যরা তাদের হিন্দু ভাইদের জয়ে আনন্দে প্রায় পাগল হয়ে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছেন।
সুদূর ইংল্যান্ডে, ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান পত্রিকা মন্তব্য করলো যে, আশি হাজার দেশবাসীর সামনে একদল বাঙালি তিনটি ব্রিটিশ রেজিমেন্টকে হারিয়ে শিল্ড জিতেছে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ফুটবলে জয় পায় সেই দল; যাদের শারীরিক সক্ষমতা, ক্ষিপ্র দৃষ্টি আর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি বেশি।
বাণিজ্যজগতও পিছিয়ে থাকলো না। হ্যারিসন রোডের স্ট্যান্ডার্ড সাইকেল কোম্পানি অমৃতবাজার পত্রিকার সঙ্গে মিলে বিজয়ী দলের ছবি বিলি করলো ৩১ জুলাই। আহিরিটোলা স্ট্রিটের এক বাদ্যযন্ত্রের দোকান ঘোষণা করলো, ভারতীয় দলের এই জয় উপলক্ষে আগামী দুই মাস হারমোনিয়ামে দশ শতাংশ ছাড়!
আর সবচেয়ে বিখ্যাত গল্পটা হলো এই। বলা হয়, শিল্ড নিয়ে দল যখন ক্লাবে ফিরছে, তখন ফোর্ট উইলিয়ামের মাথায় ওড়া ইউনিয়ন জ্যাকের দিকে আঙুল তুলে কাঁপাকাঁপা গলায় প্রশ্ন করেছিলেন এক বৃদ্ধ, ‘বাবা, ওটা কবে নামবে?’
অমর একাদশের একজন উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আবার যখন আমরা শিল্ড জিতবো।’
বিস্ময়করভাবে, মোহনবাগান আবার শিল্ড জেতে ১৯৪৭ সালে, আর সে বছরই ভারত স্বাধীন হয় এবং ফোর্ট উইলিয়াম থেকে ইউনিয়ন জ্যাক নেমে যায় চিরদিনের জন্য। কাকতালীয়? সম্ভবত না। হয়তো ওটাই ছিল নিয়তি।
৮.
অমর একাদশের এগারোজনের মধ্যে কয়েকজনের গল্প আলাদা করে বলার মতো।
১/ শিবদাস ভাদুড়ী। অধিনায়ক আর সেদিনের নায়ক। তাঁর জন্ম ১৮৮৭ সালের ৬ নভেম্বর, বরিশালে। হ্যাঁ, আমাদের আজকের বাংলাদেশে। এক গোল, এক এসিস্ট করে একাই সেদিন ব্রিটিশদেরকে যিনি হারিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন আমাদের বরিশালের সন্তান। মারা যান ১৯৩২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি, পুরীতে। বয়স হয়েছিলো মাত্র চুয়াল্লিশ।
২/ সুধীর চ্যাটার্জ। দলের একমাত্র বুটধারী। জন্ম ১৮৮৩ সালে, মোহনবাগানে যোগ দেন ১৯০৪ সালে। পেশায় ছিলেন শিক্ষক, কলকাতার লন্ডন মিশনারি সোসাইটি কলেজে পড়াতেন। দলের সবচেয়ে শিক্ষিত মানুষ ছিলেন, এমএ পাশ। ১৯১৪ সালে গুরুতর চোটে তাঁর খেলোয়াড়ি জীবন শেষ হয়ে যায়। পরে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে যান, ট্রিনিটি কলেজে প্রভাষকের পদও পান। দেশে ফিরে গড়ে তোলেন একটি আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দলের মধ্যে সবচেয়ে বেশিদিন জীবিত ছিলেন। ১৯৬৪ সালে মোহনবাগান যখন তাদের প্লাটিনাম জুবিলি উদযাপন করে, তখন সেই অমর একাদশের একমাত্র জীবিত সদস্য ছিলেন তিনিই। মারা যান ১৯৬৬ সালের ১২ এপ্রিল।
৩/ ভূতি সুকল। দলের একমাত্র অবাঙালি সদস্য। উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা এই পরিবারের পদবি আসলে ছিল ‘শুক্লা’, যা বাংলা উচ্চারণে হয়ে গিয়েছিলো সুকল। লম্বা গড়নের এই ডিফেন্ডার হেড আর ট্যাকলে ছিলেন দুর্দান্ত। মোহনবাগানে খেলে গেছেন ১৯১৮ সাল পর্যন্ত, মারা যান ১৯৪৩ সালে।
আর একটা কথা মনে রাখা দরকার। এই ফুটবলাররা কেউ ধনীঘরের সন্তান ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের তরুণ, যাদের অনেকেই একজোড়া বুট কেনার সামর্থ্য রাখতেন না। খালি পায়ে খেলাটা তাঁদের কাছে বীরত্ব প্রদর্শন ছিল না, ছিল বাধ্যবাধকতা।
৯.
জয়ের উন্মাদনা থেমে যাওয়ার পর বাস্তবতা ফিরে এলো। মোহনবাগানের এই জয় একটা অস্বস্তিকর প্রশ্নের সম্মুখীন করলো আয়োজকদের। শিল্ড জেতা একটা দলকে কলকাতা ফুটবল লিগের বাইরে রাখা যায় কীভাবে? সেই দরজা খুলতে অবশ্য আরও সময় লেগেছিলো।
সেই ম্যাচের প্রায় পাঁচ মাস পরে, নিখুঁত হিসেব করে বললে ঠিক ১৩৬ দিন পর; ১৯১১ সালের ডিসেম্বরে সম্রাট পঞ্চম জর্জ দুটো সিদ্ধান্তের ঘোষণা দিলেন। বঙ্গভঙ্গ রদ করা হলো, আর ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে সরিয়ে নেওয়া হলো দিল্লিতে।
অর্থাৎ, যে বছর ইংরেজদের হারালো বাঙালিরা, সে বছরই সাম্রাজ্য তার রাজধানী সরিয়ে নিলো কলকাতা থেকে। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, মোহনবাগানের এই জয় বাঙালি জাতীয়তাবাদের আগুনে যে ঘি ঢেলেছিলো, তার উত্তাপ ব্রিটিশরা সহ্য করতে পারছিলো না। কলকাতা তখন আর নিরাপদ ছিল না তাদের জন্য।
১০.
আজও প্রতি বছর ২৯ জুলাই পালিত হয় ‘মোহনবাগান দিবস’।
২০১১ সালে, ঘটনার শতবর্ষে, পরিচালক অরুণ রায় নির্মাণ করেন ‘এগারো’ নামের একটি বাংলা চলচ্চিত্র। এটিই সেই অমর একাদশকে নিয়ে প্রথম পূর্ণাঙ্গ ছবি। ছবিটি কেবল ম্যাচ নয়, দেখিয়েছে সেই কয়েকটা দিনের সামাজিক উত্তেজনাও। অভিলাষ ঘোষের পরিবার ভয় পেতো, ছেলে জিতলে ইংরেজদের রোষে পড়তে হবে। আর সুধীর চ্যাটার্জিকে তাঁর কর্মস্থলে সহ্য করতে হয়েছিলো ব্রিটিশ সহকর্মীদের বিদ্রূপ।
এই ছোট ছোট বিবরণগুলোই মনে করিয়ে দেয়, সেদিন মাঠে নামাটা কেবল খেলা ছিল না। প্রতিটি খেলোয়াড়কে ব্যক্তিগত ঝুঁকিও নিতে হয়েছিলো।
১১.
ফুটবলের ইতিহাসে এর চেয়ে বড় জয় বা কামব্যাকের অসংখ্য গল্প আছে। বিশ্বকাপে আছে, ইউরোতে আছে, চ্যাম্পিয়নস লিগে তো হরহামেশাই কামব্যাকের গল্প লেখে কোনো না কোনো ক্লাব।
কিন্তু ১৯১১ সালের ২৯ জুলাই কলকাতার সেই মাঠে যা ঘটেছিলো, তার তুলনা খুঁজে পাওয়া কঠিন। কারণ সেদিন দুটো দল কেবল একটা ট্রফির জন্য লড়েনি। এক দিকে ছিল সাম্রাজ্য, আর অন্য দিকে সাম্রাজ্যের শাসিত মানুষ। একদিকে বুট, আর অন্যদিকে খালি পা। একদিকে দেড়শো বছরের রাজত্ব, আর অন্যদিকে একটা জাতির জমে থাকা অপমান।
সেদিন সেই অপমানের জবাব কোনো বক্তৃতা বা কোনো বো মা র মাধ্যমে দেয়া হয়নি। জবাবটা এসেছিলো ফুটবলের মাধ্যমে। খালি পায়ের এগারোজন সেদিন প্রমাণ করে দিয়েছিলেন, বুটের চেয়ে জরুরি জিনিসটা পায়ে থাকে না, থাকে বুকের ভেতরে। ইয়োহান ক্রুইফ বলেছিলেন, ‘যারা বলে, ফুটবল পা দিয়ে খেলতে হয়, তারা ভুল বলে। ফুটবল আসলে খেলতে হয় মাথা দিয়ে, পা’জোড়া তো অনুষঙ্গ মাত্র।’
আর সেই মাথার সাথে যখন বুকের ভেতরের বারুদ যুক্ত হয়; তখনই রচিত হয় ইতিহাস!
১২.
মোহনবাগানের আইএফএ শিল্ড জয়ের ৩৯ বছর পরে। ভারতের কলকাতা থেকে সুদূর ব্রাজিলের মারাকানা। আইএফএ শিল্ডের ফাইনাল থেকে বিশ্বকাপের ফাইনাল। সেই জুলাই মাস। তারিখটা শুধু আলাদা। ২৯ জুলাই, আর ১৬ জুলাই।
সার্জেন্ট জ্যাকসনের গোলে এগিয়ে গিয়েছিলো ইস্ট ইয়র্কশায়ার। ফ্রিয়াকার গোলে এগিয়ে গিয়েছিলো ব্রাজিল। ব্রাজিলে তখন বিশ্বজয়ের উৎসব শুরু হয়েই গেছে। কিন্তু পিছিয়ে পড়েও হার মানেনি উরুগুয়ে, ঠিক যেমন হার মানেনি মোহনবাগান। শিয়াফিনোকে দিয়ে গোল করালেন অ্যালসিডেস ঘিঘিয়া, উরুগুয়ে ফিরলো সমতায়। নিজে গোল করে মোহনবাগানকে সমতায় ফেরালেন শিবদাস ভাদুড়ী। সতীর্থকে দিয়ে গোল করানোর পরে এবার নিজে গোল করলেন ঘিঘিয়া, উরুগুয়ে এগিয়ে গেলো, ব্রাজিলকে কাঁদিয়ে জিতে নিলো বিশ্বকাপ। আর নিজে গোল করার পরে সতীর্থকে দিয়ে গোল করালেন শিবদাস, মোহনবাগান প্রথমবারের মতো জিতে গেলো আইএফএ শিল্ড।
ইতিহাস কখনো বিদায় বলে না। ইতিহাস বলে, ‘আবার দেখা হবে।’
#চর্মগোলকের_ইতিকথা
লেখার শিরোনাম: অমর একাদশ
লেখা: ইমতিয়াজ আজাদ