06/10/2016
আমাদের বাংলা নাট্য-আন্দোলনে এমন কিছু লোক আছেন নেতৃস্থানে, যাঁরা জীবনে কোনোদিন থিয়েটার ছাড়বেন না, তাঁরা থাকবেনই। তাঁরাই বহু ত্যাগ স্বীকার করে নাট্য-আন্দোলনকে এতটা টেনে এনেছেন, কিন্তু একটি লিমিট পর্যন্ত আসে, তারপর আর আসতে পারে না, তারপর সঙ্কটের পর সঙ্কট আসতে শুরু করে। আমার ধারনা প্রধান কারণ হয়েছে, এই হঠাৎ ইন্টেলেকচুয়াল সাজার প্রচন্ড মোহ আমাদের নাট্য-আন্দোলনকে গ্রাস করছে। এটা পেটি বুর্জোয়ার চিরদিনের একটি বিপদ থাকে। সে ইন্টেলেকচুয়াল হবার লোভটা সামলাতে পারে না। কোনো ‘যাত্রা’র অভিনেতা কখনো স্বপ্নেও ভাবতে পারে না যে, সে জাঁ পল সার্ত্রের নাটক যাত্রায় অভিনয় করবে। কারণ, সে জানে, তাকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছতে হবে। প্রতি মুহূর্তে সাধারণ মানুষ যদি কিছ বুঝতে না পারে, তাহলে ‘পালা’ চাপা দিয়ে লোকে উঠে পড়বে। কিন্তু এরা কলকাতা শহরের আশ্রয়ে সব বিদেশী নাটকের অনুবাদ শুরু করলো। বাংলা নাটক নাকি নেই- তারা বলেন। এরকম বিদেশী নাটকের নির্বিচার অনুবাদ, অভিনয়, যার ঘটনা ভারতবর্ষের সঙ্গে মিলুক না মিলুক, তার কোনো রকম রেলেভেন্স, প্রাসঙ্গিকতা থাকুক বা না থাকুক, তারা অনুবাদ করে চললো। এর ফলে দর্শক সংখ্যা কমতে শুরু করলো। স্পষ্ট আমাদের চোখের সামনে ঘটনাটা ঘটলো। যাঁরা সিরিয়াসলি খাঁটি বাংলা নাটক করেছেন, তাঁরা কখনই দর্শকের অভাব বোধ করে নি। কিন্তু যাঁরা যথেচ্ছাভাবে বিদেশী নাটকের অনুবাদের জোয়ার বইয়ে দিলেন, তাঁদের হাউস ফাঁকা হয়ে গেল। এবং হবেই তো। লোকে বুঝতে পারছে না। এখন, টিকিট কিনে হাউসে ঢুকে মাথা ধরাতে তো কেউ চায় না। এ্যাসপিরিনের পয়সা তো দেবে না লোকটা! তো আমি বলছিলাম, অনুবাদ নাটক নিশ্চয় করবো, কিন্তু অনুবাদ নাটক কখনো দেশজ নাটকের বিকল্প হতে পারে না । অনুবাদ নাটক তো মাঝে মাঝে করতেই হবে। শ্রেষ্ঠ বিদেশী ক্ল্যাসিক। বেছে বেছে। শেক্সপীয়র করতে হবে, ভিক্টর হিউগো করতে হবে। ভিক্টর হিউগো আজ পর্যন্ত কেউ অভিনয় করে নি বাংলায়। কী লজ্জা! চেকভ করতে হবে। নিশ্চয়ই। কিন্তু শুধু ওইগ্রলোকে উপজীব্য করলে এ অবস্থা হবে, যা আজকে হয়েছে। এবং একাডেমিতে যদি যাও, তাহলে পরে ৭ দিনের মধ্যে একদিন থাকে ‘মাধব মালঞ্চী কইন্যা’ সেদিন হাউস ফুল। এবং আত্মশ্লাঘা না করে বলতে পারি, যদি পি. এল. টি-র নাটক থাকে, ‘আজকের শাজাহান’- তাহলে হাউস ফুল হবে। আর বাকি ৫ দিন দেখবে হাউস ফাঁকা। দোতালাটা বন্ধ করে দেয়। একাডেমির মতো ওইটুকুনি হাউস ভর্তি হয় না, দোতলাটা বন্ধ করে দিয়ে সবাইকে নিচে এনে বসায়, যদি হলটা ভরা দেখায়। তাও হয় না, গুনে গুনে ৩১ জন দর্শক বসে আছে। নাটক হচ্ছে একটা- মানে, বহু মানুষের সান্নিধ্যের ব্যাপার...
উৎপল দত্ত