02/01/2026
#শকুনের হাড়ের কবচ
লেখক: অনির্বাণ সান্যাল
অন্ধকারের বুক চিরে যখন পচাগলা লাশের কটু গন্ধ নাকে আসে, তখন বুঝবেন যমদূত আপনার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সেই যমদূত যদি আপনার পরমাত্মীয় কেউ হয়? হাড়ের ভেতর লুকিয়ে থাকা আদিম ক্ষুধা যখন মানুষের বিবেক আর রুচিকে ছিঁড়েখুঁড়ে গিলে খায়, তখন জন্ম নেয় এক বীভৎস উপাখ্যান। মানুষ তখন আর মানুষ থাকে না, হয়ে ওঠে এক জীবন্ত শবদেহ, যার আত্মা তৃষ্ণার্ত থাকে কেবল গলিত মাংসের জন্য। এই গল্পটি কোনো কল্পনা নয়, বরং মানুষের লালসা আর এক তান্ত্রিকের পৈশাচিক সাধনার এক কালজয়ী অন্ধকার অধ্যায়।
গ্রামের একদম শেষ মাথায়, যেখানে শ্মশান আর ঘন জঙ্গল মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে, সেখানে বাস করত ‘কালু তান্ত্রিক’। লোকটা সম্পর্কে গ্রামে নানারকম কথা প্রচলিত ছিল। কেউ বলত সে মড়া খেকো, কেউ বলত সে বাতাস থেকে আত্মা বন্দি করতে পারে। তবে তার সবচেয়ে ভীতি জাগানিয়া বিষয় ছিল তার তৈরি তাবিজে। লোকে বলত, কালু তান্ত্রিকের দেয়া তাবিজ যেমন কাজ করে, তেমনি তার খেসারত দিতে হয় হাড়মজ্জায়। সেই গ্রামেই বাস করত রতন। ছাব্বিশ-সাতাশ বছরের তেজি যুবক। অভাবের সংসার হলেও রতনের সাহস ছিল দেখার মতো। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে তার ব্যবসায় মন্দা চলায় সে কিছুটা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল। আর সেই সুযোগটাই নিয়েছিল কালু তান্ত্রিক।
সেদিন ছিল অমাবস্যার রাত। আকাশে চাঁদ নেই, চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। রতন গিয়েছিল কালু তান্ত্রিকের কুটিরে। কুটিরের ভেতরটা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, আর কিসের একটা বিদঘুটে গন্ধ চারদিকে। কালু তান্ত্রিক আগুনের সামনে বসে বিড়বিড় করে কী যেন পড়ছিল। রতনকে দেখে সে একটা কুটিল হাসি হাসল। তার চোখের মণি দুটো আগুনের আলোয় লাল হয়ে জ্বলছিল।
"এসেছিস তবে? জানতাম আসবি। তোর হাতের রেখা বলছে তোর খুব খারাপ সময় যাচ্ছে। কিন্তু এই নে, এটা ধারণ কর। তোর সব বাধা কেটে যাবে।"
তান্ত্রিক রতনের দিকে একটা তামাটে রঙের তাবিজ বাড়িয়ে দিল। তাবিজের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে খসখসে। রতন যখন সেটা হাতে নিল, তার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। তাবিজটা গলায় পরার সময় তার মনে হলো, ওটা যেন হালকা স্পন্দিত হচ্ছে। ঠিক যেন একটা জীবন্ত হৃদপিণ্ড।
"বাবা, এর ভেতরে কী আছে?" রতন আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল।
তান্ত্রিকের হাসিটা আরও চওড়া হলো। "ওটা একটা বিশেষ হাড়। শকুনের হাড়। যে শকুন মরা পশুর মাংস খেয়ে বাঁচে, সেই শকুনের হাড় দিয়ে তৈরি এই কবচ। এটা তোকে শক্তি দেবে, তোর ক্ষুধা মেটাবে।"
রতন তান্ত্রিকের কথাগুলোর গূঢ় অর্থ তখন বুঝতে পারেনি। সে তাবিজটা গলায় পরে বাড়িতে ফিরে এল। কিন্তু সেই রাত থেকেই শুরু হলো এক অদ্ভুত পরিবর্তন। প্রথম কয়েকদিন রতনের খুব ভালো ঘুম হলো। কিন্তু সাত দিন পার হওয়ার পর থেকেই তার নাকে এক অদ্ভুত গন্ধ আসতে শুরু করল। যেখানেই সে যায়, তার মনে হয় কোথাও যেন কোনো পশু মরে পচে পড়ে আছে। সে তার মা’কে জিজ্ঞেস করল, "মা, বাড়িতে কি ইঁদুর মরেছে? গন্ধে টেকা যাচ্ছে না।"
তার মা অবাক হয়ে বললেন, "কই না তো রে? আমি তো কোনো গন্ধ পাচ্ছি না। তোর হয়তো সর্দি হয়েছে, তাই এরকম লাগছে।"
কিন্তু গন্ধটা রতনের পিছু ছাড়ল না। শুধু তাই নয়, ধীরে ধীরে রতনের গায়ের থেকেও সেই একই গন্ধ বের হতে শুরু করল। একটা উটকো, পচাগলা গন্ধ। রতন দিনে তিনবার করে গোসল করতে লাগল, গায়ে সুগন্ধি মাখল, কিন্তু কোনো লাভ হলো না। সেই পচা গন্ধটা তার চামড়ার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছিল।
দশম দিনের মাথায় রতনের খাদ্যাভ্যাস আমূল বদলে গেল। বাড়িতে মাছের ঝোল রান্না হয়েছে, রতনের প্রিয় খাবার। কিন্তু পাতে খাবার নিতেই তার গা গুলিয়ে উঠল। টাটকা মাছের গন্ধ তার কাছে মনে হলো কোনো নর্দমার দুর্গন্ধের মতো। সে থালা ঠেলে উঠে দাঁড়াল।
"কী হলো রে রতন? খেলি না যে বড়?" তার মা চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন।
রতন রুক্ষ স্বরে বলল, "ভালো লাগছে না। এসব বাসি খাবার দাও কেন আমাকে? টাটকা কিছু নেই?"
"বাসি কোথায় রে? এই তো মাত্র পুকুরের মাছ ধরে নিয়ে এল তোর কাকা।"
রতন আর কোনো কথা না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার পেটের ভেতর তখন এক অদ্ভুত যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। ক্ষুধা লেগেছে প্রচণ্ড, কিন্তু সেই ক্ষুধা সাধারণ খাবারের নয়। তার জিহ্বা তখন খুঁজছে এমন কিছু যা নোনা, যা অনেক দিনের পুরনো, যা গলে গেছে। রতন হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের নির্জন রাস্তার দিকে চলে গেল। তার হাঁটাচলাও যেন বদলে গেছে। সে এখন কুঁজো হয়ে হাঁটে, আর বারবার নাক টেনে বাতাসের গন্ধ শোঁকে।
মাঝরাস্তায় সে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। বাতাসের ঝাপটায় একটা তীব্র গন্ধ তার নাকে এল। আহ! কী অপূর্ব সেই গন্ধ! রতনের লালা ঝরতে শুরু করল। সে উন্মাদের মতো সেই গন্ধের উৎস খুঁজতে লাগল। ঝোপঝাড় ঠেলে সে যখন গ্রামের ভাগাড়ের কাছে পৌঁছাল, দেখল সেখানে একটা মরা গরু পড়ে আছে। দুই দিন আগের মরা গরু, পেটটা ফুলে ঢোল হয়ে গেছে, চামড়া ফেটে রস বের হচ্ছে।
সাধারণ কোনো মানুষ হলে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকাই দায় হতো। কিন্তু রতনের চোখেমুখে তখন এক পৈশাচিক আনন্দ। সে হামাগুড়ি দিয়ে সেই মরা গরুটার কাছে এগিয়ে গেল। তার বিবেক তাকে বাধা দিতে চাইল, কিন্তু গলার সেই শকুনের হাড়ের তাবিজটা তখন আগুনের মতো গরম হয়ে উঠেছে। রতনের মনে হলো, কেউ একজন তার কানে কানে ফিসফিস করে বলছে, "খাও... এটাই তো তোর আসল খাদ্য। এটাই তোকে শক্তি দেবে।"
রতন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে তার নখ দিয়ে গরুর পচা চামড়া ছিঁড়তে শুরু করল। তার দাঁতগুলো যেন মুহূর্তেই তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। সে কাঁচা, পচা মাংস ছিঁড়ে গোগ্রাসে গিলতে লাগল। তার সারা মুখে রক্ত আর পুঁজ লেগে এক বীভৎস অবস্থার সৃষ্টি হলো। সেই রাতে রতন মানুষ থেকে এক শকুন-মানব হয়ে উঠল।
পরদিন সকালে রতন যখন বাড়ি ফিরল, তার চোখেমুখে এক অদ্ভুত আচ্ছন্নতা। তার মা তাকে দেখে আঁতকে উঠলেন।
"রতন! তোর একি অবস্থা? তোর জামাকাপড়ে ওসব কিসের দাগ? আর তোর গা দিয়ে ওমন মড়াকাটা গন্ধ বেরোচ্ছে কেন?"
রতন কোনো উত্তর দিল না। সে সরাসরি নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল। তার মা খেয়াল করলেন, রতনের নখের কোণে জমাট বাঁধা রক্ত আর মাংসের কুচি লেগে আছে। ভয়ে তার মায়ের বুক কেঁপে উঠল। তিনি বুঝতে পারলেন, তার ছেলে কোনো এক অশুভ শক্তির কবলে পড়েছে।
গ্রামে ধীরে ধীরে রতনের এই পরিবর্তনের কথা ছড়িয়ে পড়তে লাগল। প্রতি রাতে গ্রামের কোনো না কোনো গোয়াল থেকে বা ভাগাড় থেকে অদ্ভুত সব শব্দ শোনা যায়। কেউ একজন যেন অন্ধকারে মরা প্রাণীদের খুবলে খাচ্ছে। গ্রামের চকিদার একদিন রাতে রতনকে দেখে ফেলেছিল ভাগাড়ে। সে এসে পরদিন সকালে সবাইকে বলল, "বিশ্বাস করেন মন্ডল মশাই, আমি নিজের চোখে দেখেছি রতনকে। ও মানুষ না, ও যেন একটা নরখাদক শকুনে পরিণত হয়েছে। মরা পশুর নাড়িভুঁড়ি ও যেভাবে ছিঁড়ে খাচ্ছিল, তা দেখে আমার জান শুকিয়ে গেছে।"
গ্রামের মাতব্বররা স্থির করলেন তারা রতনের বাড়িতে যাবেন। কিন্তু রতন তখন আর ঘরে নেই। সে দিনের বেলা ঘরের কোণে অন্ধকারে বসে থাকে, আর সূর্য ডুবলেই তার আসল রূপ বেরিয়ে আসে। তার গায়ের চামড়া ফ্যাকাশে হয়ে ঝুলে গেছে, চোখ দুটো কোটরাগত আর লাল।
রতনের মা কান্নাকাটি শুরু করলেন। "ও বাবা কালু তান্ত্রিক, আমার ছেলের একি দশা করলে তুমি? ও তো আর আগের মতো নেই। ও এখন মরা মাংসের জন্য পাগল হয়ে থাকে।"
গ্রামের লোকজন যখন কালু তান্ত্রিকের ডেরায় পৌঁছাল, দেখল কুটিরটা ফাঁকা। তান্ত্রিক উধাও। শুধু মেঝেতে পড়ে আছে কিছু মানুষের হাড় আর শুকনো রক্তের দাগ। কালু তান্ত্রিক তার কাজ শেষ করে চলে গেছে। সে রতনকে এক অন্তহীন অভিশাপের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এদিকে রতনের অবস্থা দিনে দিনে আরও খারাপ হতে লাগল। সে এখন আর শুধু ভাগাড়ে সীমাবদ্ধ নেই। গ্রামের ছোট ছোট পশুগুলো নিখোঁজ হতে শুরু করল। রতনের ক্ষুধার কোনো শেষ নেই। সে এখন পচা মাংসের গন্ধে এতটাই নেশাগ্রস্ত যে, সে মানুষের গন্ধ শুঁকেও লালা ঝরানো শুরু করেছে। একদিন সন্ধ্যায় রতনের মা যখন তার জন্য খাবার নিয়ে ঘরে ঢুকলেন, রতন অন্ধকারে বসে ছিল।
তার মা ডাকলেন, "রতন, বাবা একটু খেয়ে নে। দেখ আজ তোর জন্য দুধ-ভাত এনেছি।"
রতন অন্ধকারে মাথা ঘুরিয়ে তার মায়ের দিকে তাকাল। তার চোখ দুটো অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছে। সে নাক টেনে তার মায়ের শরীরের গন্ধ নিতে লাগল।
"মা... তোমার গায়ের গন্ধটা বড় টাটকা। কিন্তু আমার পচা গন্ধ চাই... তোমার ভেতরেও কি পচা মাংস আছে মা?"
রতনের মা ভয়ে চিৎকার দিয়ে থালা ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, তার ছেলে আর বেঁচে নেই। তার শরীরের ভেতর এখন এক ক্ষুধার্ত শকুন বাস করছে। রতন ঘর থেকে বেরিয়ে এল। তার হাঁটার ধরন এখন পুরোই পশুর মতো। সে চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে দ্রুত গতিতে বনের দিকে ছুটে গেল।
গ্রামের মানুষ লাঠিসোঁটা আর মশাল নিয়ে রতনকে খুঁজতে বের হলো। তারা জানে, এই দানবকে যদি এখনই থামানো না যায়, তবে এই গ্রাম শ্মশানে পরিণত হবে। বনের ভেতরে তারা যখন পৌঁছাল, দেখল রতন একটা পুরনো বটগাছের নিচে বসে আছে। তার সামনে পড়ে আছে একটা পচা শিয়ালের দেহ। রতন সেটা ছিঁড়ে খাচ্ছে।
মশালের আলোয় রতনের চেহারা দেখে সবাই শিউরে উঠল। তার গলার সেই তাবিজটা এখন কালো হয়ে গেছে, আর সেটা রতনের চামড়ার সাথে যেন গেঁথে গেছে। ওটা আর আলাদা করার উপায় নেই। রতন মানুষের কথা বলা ভুলে গেছে, সে শুধু গলার ভেতর দিয়ে এক অদ্ভুত ঘড়ঘড় শব্দ করছে।
গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ মন্ডল মশাই বললেন, "ওর ওপর শকুনের হাড়ের অভিশাপ লেগেছে। কালু তান্ত্রিক ওকে জীবন্ত প্রেত বানিয়ে দিয়ে গেছে। ওকে মারলে ওর মুক্তি হবে না, বরং ওর আত্মা এই গ্রামেই ঘুরে বেড়াবে।"
রতন হঠাৎ সবার দিকে ফিরে তাকাল। তার মুখভর্তি পচা মাংস। সে একটা বিকট চিৎকার দিল, যা কোনো মানুষের কন্ঠ হতে পারে না। তারপর সে অন্ধকারের গভীরে মিলিয়ে গেল। এরপর থেকে রতনকে আর কেউ গ্রামে দিনের আলোয় দেখেনি। কিন্তু প্রতি অমাবস্যার রাতে, যখন বাতাস ভারি হয়ে ওঠে মরা পশুর গন্ধে, যখন গ্রামের কুকুরের দল অকারণে ডাকতে শুরু করে, তখন লোকে বুঝতে পারে—রতন আশেপাশে কোথাও আছে। সে এখনো খুঁজছে তার সেই প্রিয় খাদ্য, আর তার গলার সেই তাবিজে এখনো স্পন্দিত হচ্ছে শকুনের সেই অভিশপ্ত হাড়।
গ্রামের বাতাস যেন ভারী হয়ে জমে গিয়েছিল। সেই যে রাতে রতন বনের অন্ধকারে হারিয়ে গেল, তারপর থেকে রাতের নিস্তব্ধতা আর আগের মতো নেই। এখন অন্ধকার নামলেই এক অদ্ভুত ঘষটানোর শব্দ শোনা যায় ঝোপঝাড়ের আড়ালে। রতনের মা পাগলের মতো হয়ে গেছেন। দিনভর দাওয়ায় বসে থাকেন আর বিড়বিড় করেন, "খাবে না ও, আমার রতন ওসব খাবে না। ও তো আমার কোল আলো করা ছেলে।" কিন্তু তার চোখের কোণে জমে থাকা ভয় বলে দেয়, তিনি নিজেও জানেন তার সন্তান আর মানুষ নেই। তিনি দেখেছেন রতনের নখের নিচে আটকে থাকা সেই থিকথিকে কালচে রক্ত আর চামড়ার টুকরো। গ্রামের মানুষ এখন আর সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হয় না। ঘরে ঘরে ধুনো দেওয়া হয়, দরজায় শক্ত হুড়কো আঁটা হয়। তবুও সেই গন্ধটা আটকানো যায় না। পচা মাংসের সেই বিদঘুটে কটু গন্ধ দেয়াল ফুঁড়ে ঘরে ঢোকে, ঘুমের ঘোরে মানুষের দম বন্ধ হয়ে আসে। রতনের সেই গলার হাড়ের কবচ যেন পুরো গ্রামকে একটা বিশাল মড়াকাটা ঘরের মতো গুমোট করে দিয়েছে।
ঘটনার প্রায় এক মাস পরের কথা। গ্রামের প্রান্তে থাকা সেই বিশাল ভাগাড়ের পাশে এক রাতে এক ভয়াবহ দৃশ্য দেখা গেল। গ্রামের কয়েকজন সাহসী জোয়ান, যারা পাহারা দিচ্ছিল, তারা দূর থেকে মশালের আলোয় দেখল, রতন আর চার হাত-পায়ে হাঁটছে না। সে এখন পুরোপুরি কুঁজো হয়ে একপাশে কাত হয়ে চলছে, তার হাতের আঙুলগুলো অস্বাভাবিক লম্বা হয়ে গেছে। সে একটা মরা ছাগলকে টেনে হিঁচড়ে জঙ্গলের গভীরে নিয়ে যাচ্ছে। তার মুখ দিয়ে অস্ফুট এক শব্দ বের হচ্ছে, যা অনেকটা শকুনের ডানা ঝাপটানোর শব্দের মতো। তারা পিছু নেওয়ার সাহস পেল না, কারণ রতনের শরীর থেকে যে আদিম ও পৈশাচিক শক্তির বিকিরণ ঘটছিল, তা তাদের রক্ত হিম করে দিচ্ছিল। পরদিন সকালে সেই ছাগলটার যে অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেল, তা দেখে গ্রামের কসাইও বমি করে ফেলল। হাড়গুলো এমনভাবে চিবানো হয়েছে যে ভেতর থেকে মজ্জাটুকু পর্যন্ত শুষে নেওয়া হয়েছে। এটা কোনো মানুষের কাজ হতে পারে না, এমনকি কোনো হায়েনার পক্ষেও এভাবে হাড় চূর্ণ করা অসম্ভব।
গ্রামের মন্ডল মশাই আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে এক তান্ত্রিককে নিয়ে এলেন। লিকলিকে শরীর, কপালে সিঁদুরের তিলক আর চোখে এক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। তান্ত্রিক রতনের ঘরে ঢুকেই নাক চেপে ধরলেন। তারপর রতনের বিছানা থেকে এক মুঠো ধুলো নিয়ে মন্ত্র পড়ে ফুঁ দিলেন। ধুলোটা সাথে সাথে আগুনের মতো জ্বলে উঠল। তান্ত্রিক গম্ভীর গলায় বললেন, "এ বড় ভয়ানক খেলা। কালু তান্ত্রিক যা করেছে, তা কোনো সাধারণ মন্ত্র নয়। ও মৃত আত্মার ক্ষুধা এক জীবন্ত মানুষের শরীরে পুরে দিয়েছে। ওই শকুনের হাড়টা সাধারণ কোনো হাড় নয়; ওটা এমন এক শকুনের যে কোনো এক তান্ত্রিকের অভিশাপে নিজেই নিজেকে খেয়ে ফেলেছিল। সেই হাড় এখন রতনের হৃদপিণ্ডের সাথে মিশে গেছে।"
সবাই যখন তান্ত্রিকের কথা শুনছিল, ঠিক তখনই বাড়ির পেছনের জঙ্গল থেকে একটা খিলখিল হাসি শোনা গেল। হাসিটা রতনের, কিন্তু তাতে কোনো মনুষ্যত্ব নেই। মনে হচ্ছিল যেন কয়েকশ শকুন একসাথে ডানা ঝাপটানি দিচ্ছে।
"কে ওখানে? রতন? রতন রে, ঘরে আয় বাবা! তোর জন্য কত কী রান্না করেছি দেখ!" রতনের মা চিৎকার করে দৌড়ে বাইরে গেলেন।
তান্ত্রিক তাকে বাধা দিতে চাইলেন কিন্তু পারলেন না। সবাই যখন বাইরে এল, দেখল অন্ধকারের একদম কিনারে রতন দাঁড়িয়ে আছে। মশালের আলো তার মুখে পড়তেই সবার বুক কেঁপে উঠল। রতনের গায়ের চামড়া এখন ধূসর রঙের হয়ে গেছে, চোখের মণি বলতে কিছু নেই, শুধু সাদা দুটো গর্ত। তার গলার সেই তাবিজটা এখন চামড়া ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে এসেছে, ঠিক যেন গলার হাড়েরই একটা অংশ। তার শরীর থেকে একটা কালচে তরল চুঁইয়ে পড়ছে, যার গন্ধে চারপাশের গাছপালা যেন কুঁকড়ে যাচ্ছে।
রতন তার মায়ের দিকে তাকাল। তার ঠোঁট দুটো বীভৎসভাবে কাঁপাছে। সে অস্ফুট স্বরে বলল, "মা... ক্ষুধা... বড় ক্ষুধা... ভেতরে কে যেন কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।"
রতনের মা কাঁদতে কাঁদতে এগিয়ে গেলেন, "আয় বাবা, আমার কাছে আয়। কী খাবি তুই? আমি তোকে সব দেব।"
রতন একটা বিকট হাঁ করল। তার দাঁতগুলো এখন ছোট ছোট করাতের মতো তীক্ষ্ণ। সে তার মায়ের দিকে এক পা এগিয়ে এসে আবার পিছিয়ে গেল। তার ভেতরে বোধহয় এখনো সামান্য কিছু মানবিকতা অবশিষ্ট ছিল। সে তীব্র আর্তনাদ করে উঠল, "না! দূরে থাকো! তোমার ভেতরেও মাংস আছে মা... তোমার হাড়ের ভেতরেও রক্ত আছে... ওটা চাইছে... হাড়টা চাইছে!"
তান্ত্রিক তখন চিৎকার করে উঠলেন, "সবাই সরো! ও এখন আর মানুষ নেই। ওর ক্ষুধা এখন জীবিত মাংসের স্বাদ নিতে চাইছে। ওই কবচ ওকে দিয়ে পুরো গ্রাম সাবাড় করাবে।"
তান্ত্রিক তার ঝোলা থেকে কিছু কালো সরিষা বের করে রতনের দিকে ছুঁড়ে মারলেন। সরিষাগুলো রতনের গায়ে লাগার সাথে সাথে সেখান থেকে ধোঁয়া বের হতে শুরু করল। রতন যন্ত্রণায় কাতরে উঠল। সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে নিজের গলা নিজেই আঁচড়াতে লাগল। সে সেই তাবিজটা ছিঁড়ে ফেলতে চায়, কিন্তু কবচটা এখন তার মেরুদণ্ডের সাথে গেঁথে গেছে। রতনের নখের আঁচড়ে তার নিজের গলার মাংস ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে লাগল, কিন্তু রক্ত বেরোলো না। বেরোলো কিছু পচা পুঁজ আর পোকা। দৃশ্যটা এতটাই বীভৎস ছিল যে কয়েকজন লোক সেখানেই মূর্ছা গেল।
"আমাকে মারো... দয়া করে আমাকে শেষ করো..." রতন গোঙাতে গোঙাতে বলল। কিন্তু তার কণ্ঠস্বর ধীরে ধীরে বদলে গিয়ে এক কর্কশ শকুনের ডাকে পরিণত হলো।
হঠাৎ এক দমকা হাওয়া এল। মশালের আগুনগুলো নিভে গেল এক লহমায়। অন্ধকারের ভেতর শুধু রতনের সেই সাদা চোখ দুটো জ্বলতে দেখা গেল। তান্ত্রিক তার ঝোলা থেকে একটা রুপোর ছুরি বের করে অন্ধকারের দিকে ছুড়লেন। এক বিকট আর্তনাদ শোনা গেল, তারপর সব চুপ। গ্রামের লোক যখন আবার মশাল জ্বালাল, দেখল রতন সেখানে নেই। মাটিতে পড়ে আছে শুধু এক দলা মাংস আর রতনের সেই ছেঁড়া জামাটা। তান্ত্রিক ঘামতে ঘামতে বললেন, "ও পালিয়ে গেছে। কিন্তু ও শেষ হয়নি। ওর ভেতরের সেই শকুনের আত্মা এখন পুরোপুরি ওর শরীর দখল করে নিয়েছে। ও এখন শুধু অন্ধকারেই বিচরণ করবে।"
সেই রাতের পর থেকে রতনকে আর কখনো সোজা হয়ে দাঁড়াতে দেখা যায়নি। কিন্তু গ্রামের বিভীষিকা তাতে শেষ হয়নি। বরং আরও ঘনীভূত হয়েছে। এখন গভীর রাতে গ্রামের মানুষ ঘরের বাইরে খচখচ শব্দ শুনতে পায়। যেন কেউ দরজার নিচ দিয়ে তার লম্বা নখ ঢুকিয়ে ভেতরের গন্ধ শোঁকার চেষ্টা করছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, রতনের মা একদিন সকালে ঘর থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। তার ঘরে শুধু পাওয়া গেল একগুচ্ছ ধূসর পালক আর বিছানায় লেগে থাকা সেই মড়াকাটা গন্ধ।
তান্ত্রিক বলেছিলেন, ওই হাড়ের কবচ যার ওপর ভর করে, সে তার চারপাশের সব জীবন্ত অস্তিত্বকে পচিয়ে দেয়। গ্রামের গাছপালাগুলো ধীরে ধীরে মরে যেতে লাগল। কুয়োর জল হয়ে গেল কালচে আর দুর্গন্ধযুক্ত। গ্রামের পশুগুলো অকারণে মারা যেতে শুরু করল। আর প্রতিটি পশুর দেহ থেকে একই কায়দায় মজ্জা শুষে নেওয়া হতে লাগল।
গল্পের শেষ এখানেই হতে পারত, কিন্তু ডার্ক সাইকোলজির খেলাটা শুরু হলো অন্যখানে। গ্রামের মানুষের মধ্যে এক অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা দিল। তারা সারাক্ষণ একে অপরের দিকে সন্দেহের চোখে তাকাতে লাগল। রতনের সেই পচা গন্ধটা যেন সবার মনে গেঁথে গেছে। মানুষ এখন টাটকা খাবারের চেয়ে বাসি আর পচা খাবারের দিকে বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে। রতনকে না পাওয়া গেলেও, সেই হাড়ের কবচের প্রভাব পুরো গ্রামকে একটা ‘জীবন্ত কবরস্থানে’ পরিণত করেছে। মানুষ এখন রাতে ঘুমানোর বদলে ঘরের কোণে বসে থাকে, ঠিক যেমন রতন থাকত। তাদের চোখগুলো ধীরে ধীরে কোটরাগত হয়ে যাচ্ছে।
একদিন রাতে মন্ডল মশাই নিজে আবিষ্কার করলেন, তিনি তার নিজের হাতের চামড়া কামড়াচ্ছেন। তার কাছে মনে হচ্ছে, তার শরীরের রক্তগুলো পচে গেলে বুঝি খুব ভালো হতো। তিনি আয়নায় তাকিয়ে দেখলেন, তার গলায় একটা হালকা কালচে দাগ পড়ছে, ঠিক যেন কোনো তাবিজের ফিতে বসে যাওয়ার দাগ। তিনি চিৎকার করতে চাইলেন, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না, শুধু এক কর্কশ ঘড়ঘড়ানি শব্দ বের হলো।
বনের গভীরে সেই বটগাছের তলায় এখন এক নতুন রাজা বাস করে। যার অর্ধেক শরীর মানুষের আর অর্ধেক শরীর এক বিশালাকার শকুনের মতো। সে একা নয়, গ্রামের অদৃশ্য আত্মাগুলো এখন তার চারপাশে ঘোরে। কালু তান্ত্রিকের সেই শকুনের হাড়ের কবচ শুধু রতনকে ধ্বংস করেনি, সে একটা পুরো জনপদকে মৃত্যুর ওপারে নিয়ে গেছে। অন্ধকার রাতে এখনো যদি কেউ সেই গ্রামের পাশ দিয়ে যায়, সে শুনতে পায় অগণিত ডানা ঝাপটানোর শব্দ। আর নাকে আসে সেই গা গুলিয়ে ওঠা পচা মাংসের গন্ধ। বাতাস ফিসফিস করে বলে ওঠে— "ক্ষুধা... বড় ক্ষুধা।"
আপনার যদি মনে হয় ঘরের কোণে কেউ বসে আছে আর আপনার ঘাড়ের দিকে তাকিয়ে নিঃশ্বাস ফেলছে, তবে একবার হাত দিয়ে দেখুন তো— আপনার গলায় কোনো অদৃশ্য ফিতের দাগ পড়ছে কি না? কারণ শকুনের সেই হাড়ের ক্ষুধা কখনো মেটে না, সে শুধু নতুন নতুন শরীর খোঁজে। অন্ধকার আপনার খুব কাছেই দাঁড়িয়ে আছে, হয়তো সে আপনার নিশ্বাসের পচা গন্ধ হওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছে।
(END)
Noted: This story is protected under copyright law and copyrighted by Bhoutik kotha. Unauthorized copying, posting, or sharing may result in DMCA takedown, legal action, and Facebook account penalties. Content is tracked digitally—violators will be reported and penalized.
#ভূতেরগল্প #ভৌতিক #ভুত